মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৩- ইলমের অধ্যায়

হাদীস নং: ২৫৭
- ইলমের অধ্যায়
তৃতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৭। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর মসজিদে সাহাবীগণের দুইটি মজলিসের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। (একটি মজলিসে দোয়া করা হচ্ছিল। আর অপর মজলিসে ইলমের আলোচনা চলছিল।) তখন তিনি বললেন, দুইটি মজলিসেই ভাল কাজ চলছে। তবে এর একটি অন্যটির তুলনায় উত্তম। অবশ্য এরা আল্লাহ্কে ডাকছে এবং আল্লাহর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করছে। আল্লাহ্ পাক তাদের আকাঙ্ক্ষা ইচ্ছা করলে পূর্ণ করতে পারেন, ইচ্ছা করলে অপূর্ণও রাখতে পারেন; আর এরা যে ইলম শিক্ষা করছে এবং অশিক্ষিতদেরকে শিক্ষাদান করছে এরাই উত্তম। আর আমিই তো শিক্ষাদানকারীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই কথা বলে তিনি এই দলটির মাঝেই বসে গেলেন। -দারেমী
كتاب العلم
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بِمَجْلِسَيْنِ فِي مَسْجِدِهِ فَقَالَ: «كِلَاهُمَا عَلَى خَيْرٍ وَأَحَدُهُمَا أَفْضَلُ مِنْ صَاحِبِهِ أَمَّا هَؤُلَاءِ فَيَدْعُونَ اللَّهَ وَيَرْغَبُونَ إِلَيْهِ فَإِنْ شَاءَ أَعْطَاهُمْ وَإِنْ شَاءَ مَنَعَهُمْ. وَأَمَّا هَؤُلَاءِ فَيَتَعَلَّمُونَ الْفِقْهَ أَوِ الْعِلْمَ وَيُعَلِّمُونَ الْجَاهِلَ فَهُمْ أَفْضَلُ وَإِنَّمَا بُعِثْتُ مُعَلِّمًا» ثمَّ جلس فيهم. رَوَاهُ الدَّارمِيّ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

উপরোক্ত হাদীসে 'ইলম', 'তালিবীনে ইলম', 'উলামা', ও 'মু'আল্লিমীন'-এর অসাধারণ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। এর মুদ্দাকথা ও রহস্য এই যে, এ ইলম আল্লাহ্ তা'আলার নাযিলকৃত হিদায়াতের আলো, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে এসেছে। আর দুনিয়া থেকে তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর আনীত ওহীর ইলম (যা কুরআন মজীদে রয়েছে) উম্মতের জন্য তাঁর নবুওতীর অস্তিত্বের স্থলবর্তী। আর এটা বহনকারী উলামা ও উস্তাদবৃন্দ জীবন্ত মানুষের আকৃতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্থলবর্তী। তাঁরা নবী তো নন, তবে নবীগণের উত্তরাধীকারী হিসাবে নবুওতের কাজ সামলে রেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজই আঞ্জাম দিচ্ছেন তাঁর সাহায্যকারী ও সহায়ক শক্তি হিসাবে। এ বৈশিষ্ট্যই তাঁদেরকে সেই স্থানে ও তাঁর সাহায্যকারী ও সহায়ক শক্তি হিসাবে। এ বৈশিষ্ট্যই তাঁদেরকে সেই স্থানে ও মর্যাদায় উপনীত করে আল্লাহর অসাধারণ দানের যোগ্য করেছে। তবে শর্ত হচ্ছে, ইলমে দীন অন্বেষণ ও অর্জন এবং পঠন-পাঠন কেবল আল্লাহর জন্য এবং আখিরাতের পুরস্কারের জন্য হতে হবে। আল্লাহ না করুন যদি পার্থিব উদ্দেশ্য হয়, তবে তা নিকৃষ্টতম গুনাহ। বিশুদ্ধ হাদীসের স্পষ্ট বর্ণনানুযায়ী এ জাতীয় লোকদের ঠিকানা জাহান্নাম। আল্লাহ্ আমাদের রক্ষা করুন।

একটি জরুরি ব্যাখ্যা

এ ধারাবাহিকতায় এখানে একটি বিষয়ের ব্যাখ্যা আবশ্যক। আমাদের এ যুগে দীনী মাদ্রাসা ও দারুল উলূমগুলোর আকৃতিতে দীনী ইলম শিক্ষা করার যে পদ্ধতি চালু রয়েছে এ প্রেক্ষিতে যখন আমাদের দীনী মাহফিলসমূহে তালিব ইলম শব্দ বলা হয়, তখন মস্তিষ্ক এই দীনী মাদ্রাসাসমূহে শিক্ষাগ্রহণকারী তালিব ইলমদের প্রতিই ধাবিত হয়। এভাবে দীনের 'আলিম' অথবা দীনের 'মু'আল্লিম' শব্দ শুনে মস্তিষ্ক পরিভাষা ও সাধারণে পরিচিত উলামা ও দীনী মাদ্রাসাসমূহে অধ্যাপনাকারী শিক্ষকদের প্রতি ধাবিত হয়। এরপর এর স্বাভাবিক পরিণাম এই যে, উপরে উল্লেখিত হাদীসসমূহে, এভাবে এ অনুচ্ছেদের অন্যান্য হাদীসসমূহে দীনী ইলম অন্বেষণ ও অর্জন কিংবা ইলমে দীনের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকমণ্ডলীর যে সব মর্যাদা ও প্রশংসা বর্ণিত হয়েছে, আর তাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে আগমনকারী যে সব অসাধারণ নি'আমতরাজির সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, সে গুলোর প্রয়োগস্থল এই মাদ্রাসাগুলোরই শিক্ষা ধারাবাহিকতা-এর ছাত্র ও শিক্ষকমণ্ডলীকে মনে করা হয়। অথচ যেমন প্রথমে উল্লিখিত হয়েছে, নবীযুগে, এরপর সাহাবা কিরাম বরং তাবিঈনের যুগেও এ জাতীয় কোন পঠন-পাঠনের ধারাবাহিকতা ছিল না। না মাদ্রাসা ও দারুল উলূম ছিল, না কিতাব পাঠকারী ও পাঠদানকারী ছাত্র ও শিক্ষকমণ্ডলীর কোন শ্রেণী ছিল। বরং শুরুতে কিতাবের অস্তিত্ব ছিল না। কেবল সাহচর্য ও শ্রবণই পঠন-পাঠনের অবলম্বন ছিল। সাহাবা কিরাম (রা) (তাঁদের প্রথম শ্রেণীর আলিম ও ফকীহগণ যেমন- খুলাফায়ে রাশিদীন, মু'আয ইবনে জাবাল (রা), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), উবাই ইবনে কা'ব (রা), যায়দ ইবনে সাবিত (রা)) প্রমুখও যা কিছু অর্জন করেছিলেন কেবল সাহচর্য ও শ্রবণের মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন। এরপর সাহাবা কিরাম থেকে তাবিঈন, তাঁদের থেকে আলিম ও ফকীহগণ যে ইলম অর্জন করেছিলেন তা অনুরূপ সাহচর্য ও শ্রবণ মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন। নিঃসন্দেহে সেই সব ব্যক্তিত্ব এ হাদীসগুলোর সুসংবাদের প্রাথমিক প্রয়োগস্থল ছিলেন।

লিখক বলেন, আজও আল্লাহর যে সব বান্দা কোন অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে যেমন, সাহচর্য ও শ্রবণের মাধ্যমে নিষ্ঠার সাথে দীন শিখতে ও শিক্ষা দিতে ব্যবস্থাপনা করেন, নিঃসন্দেহে তাঁরাও এ সব হাদীসের প্রয়োগস্থল। আর সন্দেহাতীতভাবে তাঁদের জন্যেও এ সব সুসংবাদ প্রযোজ্য। বরং ভাষাগত ও সাধারণে পরিচিত ছাত্র ও শিক্ষক মণ্ডলীর ওপর তাঁদের এক প্রকার মর্যাদা ও প্রাধান্য অর্জিত। কারণ আমাদের বর্তমান মাদ্রাসা ও দারুল উলূম গুলোতে পাঠকারী ও পাঠদানকারী ছাত্র ও শিক্ষকমণ্ডলীর সামনে এই ইলম অন্বেষণ ও শিক্ষার কতক পার্থিব লাভও থাকতে পারে। (এ হিসাবে কেবল আল্লাহই জানেন আমাদের ভাইদের কি অবস্থা?) কিন্তু যে ব্যক্তি সংশোধন ও ওয়াজের মাহফিলে অথবা কোন দীনী হালকায় নিজের সংশোধন ও দীন শিক্ষার উদ্দেশ্যে শরীক হয় অথবা দীন শিক্ষাকারী ও শিক্ষাদানকারী কোন জামাআতের সাথে এই উদ্দেশ্যে কিছু সময় কাটায়, স্পষ্টত সে এ থেকে কোন পার্থিব লাভের আশা করতে পারে না। এজন্য তার এ অনানুষ্ঠানিক 'ছাত্রত্ব' 'শিক্ষকত্ব' ধান্ধা ছাড়া কেবল আল্লাহ্ এবং আখিরাতের জন্যই হয়ে থাকে। আল্লাহর নিকট এরূপ কাজের কদর ও মূল্যায়ন হয়ে থাকে, যা কেবল আল্লাহর জন্য হয়।

এ অক্ষম এ যুগেই আল্লাহর এরূপ বান্দা দেখেছে, তাদের মধ্যে এরূপ বহু লোকও পেয়েছে যাদের নিকট থেকে আমাদের মত ব্যক্তি (যাদেরকে দুনিয়াবাসী আলিম, ফাযিল মনে করে) প্রকৃত দীনের পাঠ নিতে পারে।

এখানে এ ব্যাখ্যা এজন্য আবশ্যক মনে করছি যে, আমাদের এ যুগে আলিম মু'আল্লিম ও তালিবে ইলম-এর প্রয়োগস্থল হিসাবে উপরে উল্লিখিত ভুল উপলদ্ধি ব্যাপক। যদিও অজ্ঞাতসারে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান