মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৪- পাক-পবিত্রতার অধ্যায়

হাদীস নং: ২৯৮
- পাক-পবিত্রতার অধ্যায়
তৃতীয় অনুচ্ছেদ
২৯৮। হযরত আবু হুরায়রাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলে পাক (ﷺ) (জান্নাতুল বাকী নামক) কবরস্থানে গেলেন এবং বললেন*, আসসালামু আলাইকুম দারা ক্বাওমিম মু'মিনীন ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকুন। অর্থাৎ তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক হে মু'মিন অধিবাসীগণ! আমরাও আল্লাহর মর্জি তোমাদের সাথে এসে মিলিত হচ্ছি। আমার আকাঙ্ক্ষা আমরা যেন আমাদের ভাইদেরকে দেখতে পাই। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি বললেন, তোমরা আমার সঙ্গী সহচর। আমার ভাই তারাই যারা এখনও দুনিয়ায় আসে নি। তাঁরা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কিভাবে আপনার উম্মতের এইরূপ লোকদেরকে চিনবেন, যারা এখনও (দুনিয়ায়) আগমন করে নাই? তিনি বললেন, বলতো যদি কারো একেবারে কালো এক রংয়ের ঘোড়াসমূহের মধ্যে কতকগুলি ধবধবে সাদা ললাট ও সাদা হাত পা বিশিষ্ট ঘোড়া থাকে, সে কি তার ঘোড়াসমূহ চিনতে পারে না? তারা বললেন, হ্যাঁ নিশ্চয়ই পারে ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তারাও অজুর কারণে ধবধবে সাদা ললাট ও সাদা হাত-পা অবস্থায় উপস্থিত হবে এবং আমি হাউজে কাওছারের নিকট তাদের অগ্রবর্তী হিসাবে উপস্থিত থাকব। -মুসলিম

* উপরোক্ত হাদীস দ্বারা বুঝা যায় নবী করীম (ﷺ) কবরস্থানে এসে মৃতদেরকে সালাম দিয়েছেন। অথচ তারা মৃত এবং কিছুই শুনতে পায় না। কুরআন মজীদেও বলা হয়েছেঃ
إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ ٱلْمَوْتَىٰ অর্থাৎ নিশ্চয়ই তুমি মৃত ব্যক্তিদের কিছুই শুনতে পারবে না। হাদীস ও কুরআনের মধ্যে বিরোধ দেখা যাচ্ছে। এর সমাধান কল্পে হাদীস বিশারদগণ নিম্নোক্ত মতামত পেশ করেছেনঃ
১. কুরআন মজীদের ভাষাটি রূপকভাবে কাফিরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ কাফিরদেরকে আপনি দ্বীনের কথা শুনাতে পারবেন না। কারণ, তারা মৃতদের ন্যায়।
২. এক হাদীসে পাওয়া যায়, সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তারা (মৃতগণ) কি শুনতে পায়? হুজুর (ﷺ) বললেন, তোমাদের ন্যায় তারাও শুনতে পায়, কিন্তু জবাব দিতে পারে না।
كتاب الطهارة
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم أَتَى الْمَقْبَرَةَ فَقَالَ: «السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ وَدِدْتُ أَنَّا قَدْ رَأَيْنَا إِخْوَانَنَا قَالُوا أَوَلَسْنَا إِخْوَانَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ أَنْتُمْ أَصْحَابِي وَإِخْوَانُنَا الَّذِينَ لَمْ يَأْتُوا بَعْدُ فَقَالُوا كَيْفَ تَعْرِفُ مَنْ لَمْ يَأْتِ بَعْدُ مِنْ أُمَّتِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ أَرَأَيْتَ لَوْ أَنَّ رَجُلًا لَهُ خَيْلٌ غُرٌّ مُحَجَّلَةٌ بَيْنَ ظَهْرَيْ خَيْلٍ دُهْمٍ بُهْمٍ أَلَا يَعْرِفُ خَيْلَهُ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ فَإِنَّهُمْ يَأْتُونَ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنَ الْوُضُوءِ وَأَنَا فَرَطُهُمْ عَلَى الْحَوْض» . رَوَاهُ مُسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

أَنْ رَسُولَ الله أتى المَقْرَة
(একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কবরস্থানে আসলেন)। অন্যান্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায় এটা ছিল মসজিদে নববীর নিকটবর্তী কবরস্থান, যা আল-বাকী' নামে প্রসিদ্ধ। তিনি মাঝেমধ্যেই এ কবরস্থানে যেতেন এবং কবরবাসীদের জন্য দু'আ করতেন। প্রথমদিকে তিনি কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু পরে এর অনুমতি দেন। তিনি ইরশাদ করেন-

كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَزُورُوهَا فَإِنَّهَا تُزَهِّدُ فِي الدُّنْيَا وتذكر الْآخِرَة

আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা তা যিয়ারত করো। কেননা কবর যিয়ারত দুনিয়ার মোহ দূর করে এবং আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেয়। (সুনানে ইবন মাজাহ ১৫৭; সুনানে আবু দাউদ: ৩২৩৫; জামে' তিরমিযী: ১০৫৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৬৭১৪; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ১১৮০৬: মুসনাদে আহমাদ: ১২৩৬)

কবর যিয়ারতের ফায়দা
কবরস্থানে গেলে মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়। মৃত্যু যে-কোনও মুহূর্তেই এসে যেতে পারে। এখন যারা কবরে আছে, তারাও একদিন আমারই মতো মাটির উপর চলাফেরা করত। একদিন তাদের আয়ু ফুরিয়ে যায়। তারা দুনিয়ার জীবন সাঙ্গ করে এখন মাটির নিচে অবস্থান করছে। আমারও একদিন দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়ে মাটির নিচে চলে যেতে হবে। তা যে-কোনও দিনই হতে পারে। দিনের বেলা জীবিত, রাতে সে মায়্যিত। কিংবা রাতের বেলা জীবিত, দিনের বেলা সমাহিত। ভোরের জীবিত ব্যক্তি সন্ধ্যাবেলা মৃত আবার সন্ধ্যাবেলায় জীবিত ব্যক্তি সকাল বেলা কবরের বাসিন্দা। এই যখন ইহজীবনের অবস্থা, তখন কীসের মোহে আখিরাত ভুলে গেছি, কবর সম্পর্কে উদাসীন হয়ে আছি? যে-কোনওদিন আমাকেও এই কবরবাসীর মতো দুনিয়া ছেড়ে যেতে হবে। সেজন্য আমার কী প্রস্তুতি আছে? না, দুনিয়ার মোহে পড়ে কবর সম্পর্কে উদাসীন থাকা আর নয়। সঠিকভাবে যাবতীয় কর্তব্যকর্ম পালন করার দ্বারা আমাকে এখন থেকেই কবরের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এই সচেতনতা মানুষের অন্তর থেকে দুনিয়ার ভালোবাসা দূর করে দেয়, মানুষকে আখিরাতমুখী করে তোলে। এ সচেতনতারই প্রকাশ রয়েছে কবর যিয়ারতের দু'আয়।

কবর যিয়ারতের দু'আ ও তার ব্যাখ্যা
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারতকালে বলতেন-السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ (হে মুমিন সম্প্রদায়ের নিবাসের বাসিন্দাগণ! তোমাদের প্রতি সালাম। ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব)। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তোমাদের শান্তিতে রাখুন। কবরের আযাব থেকে তোমাদের নিরাপদ রাখুন। তোমরা একসময় আমাদের সঙ্গে ছিলে। আয়ু ফুরিয়ে যাওয়ার পর তোমরা আমাদের ছেড়ে কবরে চলে গেছ। আমাদেরও একদিন এরূপ অবস্থা হবে। আমরা দুনিয়া ছেড়ে তোমাদের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হব।

প্রশ্ন হতে পারে, কবরে যাওয়া তো নিশ্চিত, তা সত্ত্বেও এ দু'আয় إِنْ شَاء الله (আল্লাহ চাইলে) বলা হয়েছে কেন? এর উত্তর হলো, নিশ্চিত বিষয়ের জন্যও ইনশাআল্লাহ বলা যায়। তখন এর দ্বারা উদ্দেশ্য সে বিষয়টির প্রতি নিজ বিশ্বাসের দৃঢ়তা প্রকাশ করা এবং যিকিরের বরকত হাসিল করা। তাছাড়া এর দ্বারা জানান দেওয়া উদ্দেশ্য যে, সবকিছুই আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাতেই ঘটে। কারও মৃত্যু হওয়া, কবরে যাওয়া সবই আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ।

কথাটির সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট স্থানটির সঙ্গেও হতে পারে। অর্থাৎ তোমরা যেখানে আছ, সেখানে আমার দাফন হওয়াটা আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। সাক্ষাৎ হওয়ার বিষয়টাও আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাধীন। মৃত্যুর পর সকল মুমিনের রূহ ইল্লিয়‍্যীনে রাখা হয়। সেখানে পরস্পরের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। পাপী ব্যক্তির রূহ রাখা হয় সিজ্জীনে। তাই নেককার ও পাপীর রূহের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় দু'জনই যদি ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুলাভ করে, তবে তাদের রূহের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হবে। মোটকথা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা সবকিছুর সঙ্গে জড়িত। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোনওকিছুই হতে পারে না। তাই আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার প্রতি নিজ ঈমান ও বিশ্বাসকে বলিষ্ঠ করার এক উত্তম উপায় হলো সকল সঠিক কাজে সঠিক বিষয়ে ইনশাআল্লাহ বলা।

উল্লেখ্য, কবর যিয়ারতের এ দু'আটি খুবই সংক্ষিপ্ত। এ বিষয়ে আরও বিভিন্ন দু'আ আছে। যেমন-

السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أهلَ الدِّيَارِ مِنَ المُؤْمِنينَ وَالمُسلمينَ، وَإنَّا إنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ للاَحِقونَ، أَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ العَافِيَةَ.

হে মুমিন ও মুসলিম বাসিন্দাগণ! তোমাদের প্রতি সালাম। ইনশাআল্লাহ আমরাও তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের ও তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। (সহীহ মুসলিম: ৯৭৫)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক সাহাবায়ে কেরামকে 'আসহাব' ও পরিবর্তীকালের লোকদেরকে 'ভাই' আখ্যা দেওয়া।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারতের দু'আ পড়ার পর বললেন-وَدِدْتُ أَنَّا قَدْ رَأَيْنَا إِخْوَانَنَا (আমার তো আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, আমরা আমাদের ভাইদের দেখব)। অর্থাৎ আমার উম্মতের যারা এখনও দুনিয়ায় আসেনি, পরে আসবে এবং ঈমানও আনবে, আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল দুনিয়ার জীবনেই আমি আমার সে ভাইদেরকে দেখব। তিনি এ কথা বলার সময় যেসকল সাহাবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারা বললেন-

أَوَلَسْنَا إِخْوَانَكَ يَا رَسُوْلَ اللَّهِ؟ (ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি আপনার ভাই নই?) অর্থাৎ আপনি যে আপনার ভাইদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করছেন, তা আমরা কি আপনার ভাই নই? এটা ছিল তাঁদের নবীপ্রেমের আকুলতা অথবা তারা বোঝাতে চাচ্ছিলেন দীনের সূত্রে আমরাও তো আপনার ভাই। আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন-

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

প্রকৃতপক্ষে সমস্ত মুসলিম ভাই-ভাই। (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১০)

সুতরাং আপনি আমাদেরকে ভাই না বলে অন্য কাদেরকে ভাই বলে অভিহিত করছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

أَنتُمْ أَصْحَابِي، وَإِخْوَانُنَا الَّذِينَ لَمْ يَأْتُوْا بَعْدُ (তোমরা আমার সাহাবী। আমার ভাই তারা, যারা এখনও আসেনি)। অর্থাৎ তোমরা আমার ভাই বটে, তবে তোমাদের আরেকটি বিশেষ পরিচয় আছে। সে পরিচয়েই তোমরা পরিচিত। তা হচ্ছে সাহাবী। তোমরা হলে আমার এমন ভাই, যারা আমার সাহাবীও বটে। সে হিসেবে তোমাদের মর্যাদা এমন সব লোকের অনেক উপরে, যারা আমার কেবলই ভাই, সাহাবী নয়। আমি আমার সেই সকল ভাইয়ের সাক্ষাৎলাভের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছি, যারা আমার

সাহাবী নয়; বরং তারা আমার কেবলই ভাই। এর দ্বারা যেমন জানা যাচ্ছে সাহাবায়ে কেরামের 'সাহাবী' আখ্যাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই দেওয়া, তেমনি এর দ্বারা সাধারণ মুমিন-মুসলিমদের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপরিসীম স্নেহ-মমতারও পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে।

সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন-
كَيْفَ تَعْرِفُ مَنْ لَمْ يَأْتِ بَعْدُ مِنْ أُمَّتِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ (ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার উম্মতের যারা এখনও পর্যন্ত আসেনি, আপনি তাদের কীভাবে চিনবেন)? অর্থাৎ আখিরাতে যখন তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে, তখন তারা যে আপনার উম্মত এটা কীভাবে বুঝবেন? দুনিয়ায় যাদেরকে দেখেছেন, তাদেরকে তো দেখেই চিনে ফেলা সম্ভব। কিন্তু যাদেরকে কখনও দেখেননি, তাদেরকে সেদিন চিনবেন কী উপায়ে? তিনি বললেন-

أَرَأَيْتَ لَوْ أَنَّ رَجُلًا لَهُ خَيْلٌ غُرٌّ مُحَجَّلَةٌ بَيْنَ ظَهْرَيْ خَيْلٍ دُهْمٍ بُهْمٍ أَلَا يَعْرِفُ خَيْلَهُ؟ 'বলো তো, কোনও ব্যক্তির সাদা কপাল ও সাদা পায়ের ঘোড়া যদি (অন্যদের) ঘোর কালো ঘোড়াদের মধ্যে থাকে, তবে সে কি তার নিজ ঘোড়া চিনতে পারবে না'? دهم শব্দটি أدهم এর বহুবচন। এর অর্থ কালো। بهم শব্দটি أَبهم এর বহুবচন। এর অর্থও কালো। উভয় শব্দটি সম্মিলিতভাবে কালো রঙের আতিশয্য বোঝায়। তার মানে ঘোর কালো। রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশ্নের উত্তরে সাহাবায়ে কেরাম বললেন-

بَلَى يَا رَسُوْلَ اللَّهِ (অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ)। অর্থাৎ প্রত্যেকেরই নিজ ঘোড়া বা অন্য যে-কোনও পশুর বিশেষ ছাপ ও চিহ্ন থাকে। ফলে সে পশু অন্য যত পশুর সঙ্গেই মিশে যাক না কেন, সেটিকে তার মালিকের চিনতে কোনও অসুবিধা হয় না। ওই চিহ্ন দেখে সে তার নিজ পশু ঠিকই চিনে নেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

فَإِنَّهُمْ يَأْتُوْنَ غُرًا مُحَجَّلَيْنَ مِنَ الْوُضُوْءِ (তারা তো এমন অবস্থায় আসবে যে, ওযূর কারণে তাদের চেহারা ও হাত-পা থাকবে উজ্জ্বল)। এ উজ্জ্বলতা হবে তাদের বিশেষ আলামত। এ আলামত অন্য কোনও জাতির থাকবে না। ফলে কিয়ামতের ময়দানে অসংখ্য জাতির ভেতর মিলেমিশে থাকা সত্ত্বেও আমি তাদের চিনে ফেলব। কাজেই তাদের চেনার জন্য আগে থেকে তাদের সঙ্গে পরিচিত থাকার প্রয়োজন নেই। দুনিয়ায় তারা আমার যত পরেই আসুক না কেন, তাদেরকে চিনতে আমার কোনও অসুবিধা হবে না।

কাউছার ও হাউযে কাউছার
وَأَنَا فَرَطُهُمْ عَلَى الْحَوْض 'আমি তাদের আগে আগেই হাউযে (কাউছারে) পৌঁছে যাব'। এটা উম্মতের প্রতি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপরিসীম দয়ামায়ার পরিচয় বহন করে। হাশরের ময়দানের বিভীষিকায় ক্লান্ত পিপাসার্ত উম্মতকে পানি পান করানোর জন্য তিনি আগে থেকেই তাঁর হাউযে পৌঁছে যাবেন এবং উম্মতের অপেক্ষায় থাকবেন।

এ হাউয হাশর ময়দানের এক বিশালাকার জলাশয়। এর পানি আসে জান্নাতের এক জলাধার থেকে। সে জলাধারের নাম কাউছার। তা অফুরন্ত কল্যাণে ভরপুর। এ কল্যাণময় জলাশয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য বরাদ্দ করেছেন। সূরা কাউছারে ইরশাদ হয়েছে-

إِنَّا أَعْطَيْنَكَ الْكَوْثَرَ

'নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দান করেছি কাউছার।'

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন হাদীছে 'কাউছার'-এর ব্যাখ্যা বর্ণিত রয়েছে। হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে আছে-

أَتَدْرُونَ مَا الْكَوْثَرُ؟ فَقُلْنَا : اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ ، قَالَ : فَإِنَّهُ نَهْرٌ وَعَدَنِيهِ رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ، عَلَيْهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ ، هُوَ حَوْضٌ تَرِدُ عَلَيْهِ أُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ.

তোমরা কি জান কাউছার কী? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, এটা একটা নহর। আমার প্রতিপালক আমাকে এর ওয়াদা দিয়েছেন। এর রয়েছে বিপুল কল্যাণ। এটা একটা হাউয। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত এখানে উপস্থিত হবে। (সহীহ মুসলিম: ৪০০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৬৫৫)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

الْكَوْثَرُ نَهْرٌ فِي الْجَنَّةِ، حَافَتَاهُ مِنْ ذَهَبٍ، وَمَجْرَاهُ عَلَى الدُّرِّ وَالْيَاقُوتِ، تُرْبَتُهُ أَطْبَبُ مِنَ الْمِسْكِ، وَمَاؤُهُ أَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ، وَأَبْيَضُ مِنَ الثَّلْجِ

কাউছার হলো জান্নাতের একটি নহর। তার দুই তির স্বর্ণের। সেটি প্রবাহিত মুক্তা ও ইয়াকুতের উপর। তার মাটি মিশকের চেয়েও বেশি সুগন্ধিময়। তার পানি মধুর চেয়েও বেশি মিষ্টি এবং বরফের চেয়েও বেশি সাদা। (জামে' তিরমিযী: ৩৩৬১; সুনানে ইবন মাজাহ ৪৩৩৪; মুসনাদে আহমাদ ৫৯১৪; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩১৬৬২; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী: ২০৪৫; সুনানে দারিমী: ২৮৭৯; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৬৩০৮; আল আজুররী, আশ শারী'আহ: ১০৮৫)

এ নহর অর্থাৎ কাউছার কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই দেওয়া হবে। এটা তাঁর বিশেষত্ব। অন্য কোনও নবীর জন্য এরূপ নহরের ওয়াদা নেই।

তো কাউছার হলো জান্নাতের নহর। হাশরের ময়দানে একটি স্বতন্ত্র হাউয থাকবে। সে হাউযের কথাই আলোচ্য হাদীছের وَأَنَا فَرَطُهُمْ عَلَى الْحَوْضِ (আমি তাদের আগে আগেই হাউযে পৌঁছে যাব) বাক্যটিতে বলা হয়েছে। একে হাউযে কাউছারও বলা হয়। তার মানে 'কাউছার'-এর হাউয। অর্থাৎ এর পানি আসবে জান্নাতের কাউছার নামক নহর থেকে। হাশরের ময়দানের এ হাউয সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ، مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ اللَّبَنِ، وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ المِسْكِ، وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ، مَنْ شَرِبَ مِنْهَا فَلاَ يَظْمَأُ أَبَدًا.

আমার হাউয এক মাসের দূরত্ব পরিমাণ (বিস্তৃত)। তার পানি দুধের চেয়ে সাদা। তার ঘ্রাণ মিশকের চেয়েও উৎকৃষ্ট। তার পেয়ালা আকাশের নক্ষত্রের সমপরিমাণ। যে ব্যক্তি তার পানি পান করবে, সে কখনও পিপাসার্ত হবে না। (সহীহ বুখারী: ৬৫৭৯; সহীহ মুসলিম: ২৩০৩; মুসনাদে আহমাদ: ৬১৬২; জামে' তিরমিযী: ৩৪৪৪; সুনানে ইবন মাজাহ: ৪৩০৩; সহীহ ইবন হিব্বান ৬৪৫২; মুসনাদুল বাযযার: ৭৫২৬; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ১০০১৭; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ১০০০৩)

হযরত আবু যার রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-

يَشْخَبُ فِيهِ مِيزَابَانِ مِنْ الْجَنَّةِ مَنْ شَرِبَ مِنْهُ لَمْ يَظْمَأ

জান্নাতের দুটি নালা থেকে এ হাউযে পানি প্রবাহিত হবে। যে ব্যক্তি তার পানি পান করবে, সে কখনও পিপাসার্ত হবে না। (সহীহ মুসলিম: ২৩০০)

হযরত ছাওবান রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ اللَّبَنِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ يَغُتُّ فِيهِ مِيزَابَانِ يَمُدَّانِهِ مِنَ الْجَنَّةِ أَحَدُهُمَا مِنْ ذَهَبٍ وَالآخَرُ مِنْ وَرِق.

এর পানি দুধের চেয়ে বেশি সাদা এবং মধুর চেয়ে বেশি মিষ্ট। জান্নাত থেকে দুটি নালার দ্বারা এতে পানি প্রবাহিত হবে। একটির নালা স্বর্ণের, অন্যটি রূপার। (সহীহ মুসলিম: ২৩০১; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৬৭২; মুসনাদুল বাযযার। ৪১৯০; সহীহ ইবন হিব্বান : ৬৪৫৬; বায়হাকী, আল বা'ছ ওয়ান নুশুর: ১৩১; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৪৩৪২; আল আজুররী, আশ শারী'আহ: ৮২২)

তো এক হলো জান্নাতের কাউছার। তা কুরআন মাজীদের সূরা কাউছার দ্বারা প্রমাণিত। আরেক হলো হাশর ময়দানের হাউয, যাকে হাউযে কাউছার বলা হয়। এটি প্রমাণিত হাদীছ দ্বারা। তবে এ সম্পর্কিত হাদীছ প্রচুর। ইমাম ইবন হাজার আসকালানী রহ.-এর বক্তব্যমতে এর বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা ৫০ এরও বেশি। কেউ কেউ এ সংখ্যা ৮০-ও বলেছেন। তাঁদের থেকে বিপুলসংখ্যক তাবি'ঈর দ্বারা এটি বর্ণিত হয়েছে। সে হিসেবে এটি তাওয়াতুর পর্যায়ের হাদীছ। এর সত্যতা অস্বীকার করার কোনও সুযোগ নেই। তাই এতে বিশ্বাস রাখা জরুরি।

জান্নাতের কাউছার তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাস। হাশর ময়দানের হাউযও কি কেবল তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট, না অন্য নবীদেরও থাকবে? কেউ কেউ এটিকেও তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট বলেছেন। তবে এক হাদীছ দ্বারা জানা যায় যে, অন্য নবীদেরও এরূপ হাউয থাকবে। সুতরাং হযরত সামুরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنَّ لِكُلِّ نَبِي حَوْضًا، وَإِنَّهُمْ يَتَبَاهَوْنَ أَيُّهُمْ أَكْثَرُ وَارِدَةً، وَإِنِّي أَرْجُوْ أَنْ أَكُونَ أَكْثَرَهُمْ وَارِدَةً.

প্রত্যেক নবীরই হাউয থাকবে। কার হাউযে আগত লোক সংখ্যা বেশি, এ নিয়ে তাঁরা একে অন্যের উপর গর্ব করবে। আমি আশা করি আমার হাউযে আগত লোকসংখ্যাই সর্বাপেক্ষা বেশি হবে। (জামে তিরমিযী: ২৪৪৩; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৬৮৮১)

হাদীছটির সনদ শক্তিশালী নয়। তবে বহু সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় কেউ কেউ এটিকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন।

উল্লেখ্য, বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া দীনের ভেতর রদবদল ঘটায় ও বিদ'আতী কাজকর্মে লিপ্ত হয়, তারা হাশরের ময়দানে হাউযে কাউছার থেকে পানি পান করার সুযোগ যাবে না। তারা পানি পান করার জন্য সেখানে উপস্থিত হলে ফিরিশতাগণ তাদেরকে তাড়িয়ে দেবে। (সহীহ বুখারী: ২৩৬৭; সহীহ মুসলিম: ২৩০২; মুসনাদে ইসহাক ইবন রাহুয়াহ। ৫৬; মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৫৫; বায়হাকী, আল বা'ছ ওয়ান নুশুর: ১৪৮; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৪৩৪৫)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সালাম মুসলিমদের অভিবাদন। এটা যেমন জীবিতদের জন্য সুন্নত, তেমনি জীবিতদের পক্ষ হতে মৃত মুসলিমদের জন্যও সুন্নত। কাজেই কবরের সামনে গেলে সালাম দেওয়া চাই।

খ. কবরস্থানে পড়ার জন্য বিভিন্ন দু'আ আছে। আলোচ্য হাদীছে বর্ণিত সংক্ষিপ্ত দু'আটিও সেখানে পড়া যেতে পারে।

গ. মৃত্যু এক অমোঘ সত্য। এর থেকে কারও নিস্তার নেই। কার কখন মৃত্যু হবে তা কেউ জানে না।

ঘ. মহাবিশ্বে যা-কিছু ঘটে, সবই আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় ঘটে। তাঁর ইচ্ছার বাইরে কোনওকিছুই হতে পারে না।

ঙ. আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীরে বিশ্বাস রাখা ফরয।

চ. মাঝেমধ্যে কবর যিয়ারত করতে যাওয়া উচিত।

ছ. কবর মানুষকে আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেয় এবং দুনিয়ার প্রতি আসক্তি কমায়।

জ. প্রত্যেকেরই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত।

ঝ. সকল মুমিন ভাই ভাই। তাই নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃসুলভ আচরণ করতে হবে।

ঞ. হাশরের ময়দানে মুসলিম উম্মাহর একটি বিশেষ চিহ্ন থাকবে। সে চিহ্ন ওযূর অঙ্গসমূহের উজ্জ্বলতা। সুতরাং প্রত্যেককে নিখুঁত ও সুন্দরভাবে ওযূ করতে হবে।

ট. হাশরের ময়দানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত একটি হাউয থাকবে। তাকে হাউযে কাউছার বা কাউছারের হাউয বলা হয়। সুন্নতের অনুসারী মুমিনগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে সে হাউযের পানি পান করতে পারবে। আর কাউছার হলো তাঁর জন্য নির্ধারিত জান্নাতের নহর।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)