মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)
৯- কুরআনের ফাযাঈল অধ্যায়
হাদীস নং: ২১১২
- কুরআনের ফাযাঈল অধ্যায়
প্রথম অনুচ্ছেদ
২১১২। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন কোরআন পাঠে দক্ষ ব্যক্তি সম্মানিত লিপিকার ফিরিশতাদের সাথে থাকিবেন, আর যে কোরআন পড়ে ও উহাতে আটকায় এবং কোরআন তাহার পক্ষে কষ্টদায়ক হয়, তাহার জন্য দুইটি পুরস্কার রহিয়াছে।
كتاب فضائل القرآن
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شاق لَهُ أَجْرَانِ»
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীছটিতে সাধারণ ও বিশিষ্ট সকলকে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতের প্রতি উৎসাহ দেওয়া উদ্দেশ্য। সে লক্ষ্যে কুরআন তিলাওয়াতে দক্ষ ও অদক্ষ সকলের কর্যীলত বর্ণিত হয়েছে। যারা কুরআন তিলাওয়াত খুব ভালোভাবে করতে পারে, তাদের সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-
الذي يقرأ القُرْآنَ وَهُوَ مَاهِرٌ بِهِ مَعَ السفرة الكرام البررة
কুরআনপাঠে দক্ষও বটে, সে পুণ্যবান সম্মানিত বার্তাবাহী (ফিরিশতা)-দের সঙ্গে থাকবে'। দক্ষতার সঙ্গে কুরআন পড়ার অর্থ কুরআন যেভাবে সহীহ-শুদ্ধ করে পড়া উচিত ঠিক সেইভাবে পড়া, সাবলীলভাবে পড়া এবং পড়ায় আটকে না যাওয়া। হঠাৎ করেই এটা হয়ে যায় না। এর জন্য নিয়মিত চর্চা দরকার। সাধারণত হাফেজগণই এভাবে পড়তে পারে। যারা হাফেজ নয় তাদের পক্ষেও এটা সম্ভব, যদি নিয়মিত তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলে।
السفرة শব্দটি এর سفير বহুবচন। এর অর্থ বার্তাবাহী। আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতাদের দ্বারা বিভিন্ন রকমের কাজ নিয়ে থাকেন। একশ্রেণির ফিরিশতার কাজ ছিল বার্তা বহন করা। অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা'আলার বাণী ও তাঁর আদেশ-নিষেধ নবীদের কাছে নিয়ে আসতেন। হাদীছটিতে السفرة দ্বারা হয়তো তাদেরকে বোঝানো হয়েছে। তারা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ফিরিশতা। তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হলেন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম। কখনও কখনও হযরত মীকাঈল আলাইহিস সালাম দ্বারাও এ কাজ করানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও বিভিন্ন ফিরিশতা এ কাজ করেছেন।
আরেকদল ফিরিশতা লাওহে মাহফুজের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। হাদীছটিতে তাদেরকেও বোঝানো হতে পারে। তাদের সম্পর্কে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
بِأَيْدِي سَفَرَةٍ كِرَامٍ بَرَرَةٍ
এমন লিপিকরদের হাতে লিপিবদ্ধ যারা অতি মর্যাদাসম্পন্ন, পুণ্যবান। (সূরা আবাসা, আয়াত ১৫ ও ১৬)
আয়াতের ভাষার সঙ্গে আলোচ্য হাদীছটির ভাষার মিল রয়েছে। সে হিসেবে অসম্ভব নয় যে, আয়াতে যেসকল ফিরিশতাকে বোঝানো উদ্দেশ্য, হাদীছেও তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ লাওহে মাহফুজ লেখার দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতাগণ।
আবার এর দ্বারা বান্দার আমল লিপিবদ্ধকারী ফিরিশতাদেরও বোঝানো হতে পারে। বান্দার আমল লেখার দ্বারা তারাও একভাবে আল্লাহ তা'আলা ও বান্দার মাঝখানে বার্তাবহনের কাজ করে থাকেন। আল্লাহ তা'আলার কাছে তারাও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। কুরআন মাজীদে তাদেরকে كِرَامًا كَاتِبِينَ (সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ। শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। আলোচ্য হাদীছেও তাদেরকে الْكِرَامُ (সম্মানিত) বলা হয়েছে। এ শব্দটি کریم এর বহুবচন।
হাদীছে উল্লিখিত ফিরিশতাদের দ্বিতীয় বিশেষণরূপে الْبَرَرَةُ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ পুণ্যবান, অনুগত। শব্দটি الْبَر এর বহুবচন। এটা ফিরিশতাদের বিশেষ গুণ। তাদের সম্পর্কে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে-
لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا آمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُوْنَ
যারা আল্লাহর কোনও হুকুমে তাঁর অবাধ্যতা করে না এবং সেটাই করে, যার নির্দেশ তাদেরকে দেওয়া হয়। (সূরা তাহরীম, আয়াত ৬)
হাদীছে বলা হয়েছে, যারা কুরআন তিলাওয়াতে দক্ষ, তারা সে পুণ্যবান সম্মানিত বার্তাবাহী (ফিরিশতা)-দের সঙ্গে থাকবে। অর্থাৎ আখিরাতে তারা ওইসকল ফিরিশতার সঙ্গে থাকবে। অর্থাৎ তারা জান্নাতের এমন উচ্চতর এক স্থানে থাকবে, যেখানে ওইসকল ফিরিশতা তাদের সঙ্গী হবে। অথবা এর অর্থ, মর্যাদায় তারা ওইসকল ফিরিশতার সমতুল্য।
বলা হয়েছে, যারা কুরআন তিলাওয়াতে দক্ষ, তারা ওইসকল ফিরিশতার সঙ্গে থাকবে, যারা الْبَرَرَةُ অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ পালনকারী। এর ভেতর ইঙ্গিত রয়েছে, দক্ষতা দ্বারা কেবল ভালোভাবে পড়তে পারাটাই বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে চলা ও কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাও জরুরি। যে ব্যক্তি উত্তমরূপে কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ারও চেষ্টা করে, সে-ই প্রকৃত মাহিরুল কুরআন অর্থাৎ কুরআনে সুদক্ষ।
আর যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াতে দক্ষ নয় অর্থাৎ সাবলীলভাবে কুরআন পড়তে পারে না, তার সম্পর্কে বলা হয়েছে-
وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَعْتَعُ فِيْهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌ، لَهُ أَجْرَانِ (আর যে ব্যক্তি এ অবস্থায় কুরআন পড়ে যে, সে তাতে আটকে আটকে যায় এবং তার পক্ষে তা কঠিন হয়, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ ছাওয়াব)। এক ছাওয়াব তিলাওয়াতের বিনিময়ে, আর দ্বিতীয় ছাওয়াব কষ্টের বিনিময়ে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তার ছাওয়াব দক্ষ তিলাওয়াতকারীর চেয়ে বেশি। বরং বোঝানো উদ্দেশ্য হলো তার কষ্ট বৃথা যাবে না।
কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সে যে তিলাওয়াত করছে, সে কারণেও তাকে ছাওয়াব দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি সাবলীল তিলাওয়াত করে, তার জন্য দ্বিগুণ ছাওয়াবের কথা বলা হয়নি বটে,
কিন্তু যা বলা হয়েছে তার মধ্যেই ইঙ্গিত রয়েছে যে, তার ছাওয়াব দ্বিগুণ নয়; বরং আরও অনেক বেশি। কেননা তাকে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ও পুণ্যবান ফিরিশতাদের সমতুল্য গণ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ তার মর্যাদা সাধারণ তিলাওয়াতকারীর তুলনায় অনেক বেশি। আর তা হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা তার তিলাওয়াত সাবলীল তো এমনি এমনিই হয়নি। শুরুতে তারও তিলাওয়াত করতে কষ্ট হয়েছে। তা সত্ত্বেও সে তিলাওয়াত অব্যাহত রেখেছে। এভাবে নিয়মিত সাধনা চালিয়ে যাওয়ার পর একপর্যায়ে তার তিলাওয়াত সাবলীল হয়েছে এবং যে ব্যক্তি কষ্টের সঙ্গে পড়ে তাকে ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। অব্যাহত সাধনার দ্বারা তিলাওয়াতে যেমন সে অন্যদের ছাড়িয়ে গেছে, তেমনি ছাওয়াব ও মর্যাদায়ও তাদেরকে ছাড়িয়ে অনেক ঊর্ধ্বে থাকবে বৈ কি।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. কুরআনের হাফেজ অন্যদের তুলনায় উত্তম ও সাবলীলভাবে তিলাওয়াত করে থাকে। তাই তার মর্যাদা অন্যদের তুলনায় অনেক উপরে।
খ. কুরআন তিলাওয়াতের পরিপূর্ণ কল্যাণ ও উপকার লাভ করতে হলে কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবনগঠনও জরুরি।
গ. সাবলীলভাবে তিলাওয়াত করতে পারা উচ্চমর্যাদা লাভের কারণ। তাই প্রত্যেকের উচিত অব্যাহত চেষ্টার দ্বারা নিজ তিলাওয়াতকে সাবলীল ও সুন্দর করে তোলা।
ঘ. নতুন নতুন যারা তিলাওয়াত করে, তাদের তিলাওয়াত করতে কষ্ট হয়। কিন্তু তাই বলে তিলাওয়াত বন্ধ করা উচিত নয়। কেননা তিলাওয়াতের বিনিময়ে যেমন ছাওয়াব পাওয়া যাবে, তেমনি কষ্টের বিনিময়েও বাড়তি ছাওয়াব অর্জিত হবে।
ঙ. কুরআন তিলাওয়াতসহ যে-কোনও নেক আমল যারা কষ্ট-ক্লেশের সঙ্গে করে, তাদেরকে হেলা করতে নেই। কেননা কষ্টের বিনিময়ে তারা ছাওয়াব পাচ্ছে।
চ. কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য নেক আমল যারা কষ্ট-ক্লেশের সঙ্গে করে, তাদেরকে উৎসাহ দেওয়া উচিত, যাতে তারা আমলটি অব্যাহত রাখে এবং একপর্যায়ে তাদের জন্য তা সহজ ও সাবলীল হয়ে যায়।
الذي يقرأ القُرْآنَ وَهُوَ مَاهِرٌ بِهِ مَعَ السفرة الكرام البررة
কুরআনপাঠে দক্ষও বটে, সে পুণ্যবান সম্মানিত বার্তাবাহী (ফিরিশতা)-দের সঙ্গে থাকবে'। দক্ষতার সঙ্গে কুরআন পড়ার অর্থ কুরআন যেভাবে সহীহ-শুদ্ধ করে পড়া উচিত ঠিক সেইভাবে পড়া, সাবলীলভাবে পড়া এবং পড়ায় আটকে না যাওয়া। হঠাৎ করেই এটা হয়ে যায় না। এর জন্য নিয়মিত চর্চা দরকার। সাধারণত হাফেজগণই এভাবে পড়তে পারে। যারা হাফেজ নয় তাদের পক্ষেও এটা সম্ভব, যদি নিয়মিত তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলে।
السفرة শব্দটি এর سفير বহুবচন। এর অর্থ বার্তাবাহী। আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতাদের দ্বারা বিভিন্ন রকমের কাজ নিয়ে থাকেন। একশ্রেণির ফিরিশতার কাজ ছিল বার্তা বহন করা। অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা'আলার বাণী ও তাঁর আদেশ-নিষেধ নবীদের কাছে নিয়ে আসতেন। হাদীছটিতে السفرة দ্বারা হয়তো তাদেরকে বোঝানো হয়েছে। তারা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ফিরিশতা। তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হলেন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম। কখনও কখনও হযরত মীকাঈল আলাইহিস সালাম দ্বারাও এ কাজ করানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও বিভিন্ন ফিরিশতা এ কাজ করেছেন।
আরেকদল ফিরিশতা লাওহে মাহফুজের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। হাদীছটিতে তাদেরকেও বোঝানো হতে পারে। তাদের সম্পর্কে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
بِأَيْدِي سَفَرَةٍ كِرَامٍ بَرَرَةٍ
এমন লিপিকরদের হাতে লিপিবদ্ধ যারা অতি মর্যাদাসম্পন্ন, পুণ্যবান। (সূরা আবাসা, আয়াত ১৫ ও ১৬)
আয়াতের ভাষার সঙ্গে আলোচ্য হাদীছটির ভাষার মিল রয়েছে। সে হিসেবে অসম্ভব নয় যে, আয়াতে যেসকল ফিরিশতাকে বোঝানো উদ্দেশ্য, হাদীছেও তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ লাওহে মাহফুজ লেখার দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতাগণ।
আবার এর দ্বারা বান্দার আমল লিপিবদ্ধকারী ফিরিশতাদেরও বোঝানো হতে পারে। বান্দার আমল লেখার দ্বারা তারাও একভাবে আল্লাহ তা'আলা ও বান্দার মাঝখানে বার্তাবহনের কাজ করে থাকেন। আল্লাহ তা'আলার কাছে তারাও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। কুরআন মাজীদে তাদেরকে كِرَامًا كَاتِبِينَ (সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ। শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। আলোচ্য হাদীছেও তাদেরকে الْكِرَامُ (সম্মানিত) বলা হয়েছে। এ শব্দটি کریم এর বহুবচন।
হাদীছে উল্লিখিত ফিরিশতাদের দ্বিতীয় বিশেষণরূপে الْبَرَرَةُ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ পুণ্যবান, অনুগত। শব্দটি الْبَر এর বহুবচন। এটা ফিরিশতাদের বিশেষ গুণ। তাদের সম্পর্কে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে-
لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا آمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُوْنَ
যারা আল্লাহর কোনও হুকুমে তাঁর অবাধ্যতা করে না এবং সেটাই করে, যার নির্দেশ তাদেরকে দেওয়া হয়। (সূরা তাহরীম, আয়াত ৬)
হাদীছে বলা হয়েছে, যারা কুরআন তিলাওয়াতে দক্ষ, তারা সে পুণ্যবান সম্মানিত বার্তাবাহী (ফিরিশতা)-দের সঙ্গে থাকবে। অর্থাৎ আখিরাতে তারা ওইসকল ফিরিশতার সঙ্গে থাকবে। অর্থাৎ তারা জান্নাতের এমন উচ্চতর এক স্থানে থাকবে, যেখানে ওইসকল ফিরিশতা তাদের সঙ্গী হবে। অথবা এর অর্থ, মর্যাদায় তারা ওইসকল ফিরিশতার সমতুল্য।
বলা হয়েছে, যারা কুরআন তিলাওয়াতে দক্ষ, তারা ওইসকল ফিরিশতার সঙ্গে থাকবে, যারা الْبَرَرَةُ অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ পালনকারী। এর ভেতর ইঙ্গিত রয়েছে, দক্ষতা দ্বারা কেবল ভালোভাবে পড়তে পারাটাই বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে চলা ও কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাও জরুরি। যে ব্যক্তি উত্তমরূপে কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ারও চেষ্টা করে, সে-ই প্রকৃত মাহিরুল কুরআন অর্থাৎ কুরআনে সুদক্ষ।
আর যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াতে দক্ষ নয় অর্থাৎ সাবলীলভাবে কুরআন পড়তে পারে না, তার সম্পর্কে বলা হয়েছে-
وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَعْتَعُ فِيْهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌ، لَهُ أَجْرَانِ (আর যে ব্যক্তি এ অবস্থায় কুরআন পড়ে যে, সে তাতে আটকে আটকে যায় এবং তার পক্ষে তা কঠিন হয়, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ ছাওয়াব)। এক ছাওয়াব তিলাওয়াতের বিনিময়ে, আর দ্বিতীয় ছাওয়াব কষ্টের বিনিময়ে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তার ছাওয়াব দক্ষ তিলাওয়াতকারীর চেয়ে বেশি। বরং বোঝানো উদ্দেশ্য হলো তার কষ্ট বৃথা যাবে না।
কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সে যে তিলাওয়াত করছে, সে কারণেও তাকে ছাওয়াব দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি সাবলীল তিলাওয়াত করে, তার জন্য দ্বিগুণ ছাওয়াবের কথা বলা হয়নি বটে,
কিন্তু যা বলা হয়েছে তার মধ্যেই ইঙ্গিত রয়েছে যে, তার ছাওয়াব দ্বিগুণ নয়; বরং আরও অনেক বেশি। কেননা তাকে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ও পুণ্যবান ফিরিশতাদের সমতুল্য গণ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ তার মর্যাদা সাধারণ তিলাওয়াতকারীর তুলনায় অনেক বেশি। আর তা হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা তার তিলাওয়াত সাবলীল তো এমনি এমনিই হয়নি। শুরুতে তারও তিলাওয়াত করতে কষ্ট হয়েছে। তা সত্ত্বেও সে তিলাওয়াত অব্যাহত রেখেছে। এভাবে নিয়মিত সাধনা চালিয়ে যাওয়ার পর একপর্যায়ে তার তিলাওয়াত সাবলীল হয়েছে এবং যে ব্যক্তি কষ্টের সঙ্গে পড়ে তাকে ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। অব্যাহত সাধনার দ্বারা তিলাওয়াতে যেমন সে অন্যদের ছাড়িয়ে গেছে, তেমনি ছাওয়াব ও মর্যাদায়ও তাদেরকে ছাড়িয়ে অনেক ঊর্ধ্বে থাকবে বৈ কি।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. কুরআনের হাফেজ অন্যদের তুলনায় উত্তম ও সাবলীলভাবে তিলাওয়াত করে থাকে। তাই তার মর্যাদা অন্যদের তুলনায় অনেক উপরে।
খ. কুরআন তিলাওয়াতের পরিপূর্ণ কল্যাণ ও উপকার লাভ করতে হলে কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবনগঠনও জরুরি।
গ. সাবলীলভাবে তিলাওয়াত করতে পারা উচ্চমর্যাদা লাভের কারণ। তাই প্রত্যেকের উচিত অব্যাহত চেষ্টার দ্বারা নিজ তিলাওয়াতকে সাবলীল ও সুন্দর করে তোলা।
ঘ. নতুন নতুন যারা তিলাওয়াত করে, তাদের তিলাওয়াত করতে কষ্ট হয়। কিন্তু তাই বলে তিলাওয়াত বন্ধ করা উচিত নয়। কেননা তিলাওয়াতের বিনিময়ে যেমন ছাওয়াব পাওয়া যাবে, তেমনি কষ্টের বিনিময়েও বাড়তি ছাওয়াব অর্জিত হবে।
ঙ. কুরআন তিলাওয়াতসহ যে-কোনও নেক আমল যারা কষ্ট-ক্লেশের সঙ্গে করে, তাদেরকে হেলা করতে নেই। কেননা কষ্টের বিনিময়ে তারা ছাওয়াব পাচ্ছে।
চ. কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য নেক আমল যারা কষ্ট-ক্লেশের সঙ্গে করে, তাদেরকে উৎসাহ দেওয়া উচিত, যাতে তারা আমলটি অব্যাহত রাখে এবং একপর্যায়ে তাদের জন্য তা সহজ ও সাবলীল হয়ে যায়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)