মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)
১০- যাবতীয় দোয়া-যিক্র
হাদীস নং: ২৩৫৮
- যাবতীয় দোয়া-যিক্র
২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ক্ষমা ও তাওবাহ্
২৩৫৮। (তাবেয়ী) হারেস ইবনে সুওয়াইদ বলেন, আমাকে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ দুইটি কথা বলিয়াছেন—একটি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর পক্ষ হইতে, অপরটি নিজের পক্ষ হইতে। তিনি বলিয়াছেনঃ মু'মিন নিজের গোনাহকে এইরূপ মনে করে, যেন সে কোন পাহাড়ের নীচে বসা, যাহা সে তাহার উপর ভাঙ্গিয়া পড়ার আশংকা করে। পক্ষান্তরে ফাজের ব্যক্তি আপন গোনাকে দেখে—যেন একটি মাছি তাহার নাকের উপর বসিল, আর সে আপন হাতের ইঙ্গিতে উহাকে তাড়াইয়া দিল। অতঃপর তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে বলিতে শুনিয়াছি, আল্লাহ্ তাঁহার মু'মিন বান্দার তওবায় সেই ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক খুশী হন, যে কোন ধ্বংসকারী মরুভূমিতে পৌঁছিয়াছে, আর তাহার সাথে তাহার বাহন রহিয়াছে, যাহার উপর তাহার খাদ্য ও পানীয় রহিয়াছে। সে তথায় যমীনে মাথা রাখিল এবং সামানা ঘুমাইল। অতঃপর জাগিয়া দেখিল তাহার বাহন ভাগিয়া গিয়াছে। সে উহা তালাশ করিতে রহিল, অবশেষে তাপ ও পিপাসা এবং অপরাপর কষ্ট যাহা আল্লাহর মর্জি তাহাকে কাতর করিয়া ফেলিল। তখন সে সিদ্ধান্ত করিল, আমি যেখানে ছিলাম সেখানে যাইয়া শুইয়া থাকিব, যাবৎ না মরিয়া যাই। সুতরাং সে তথায় আপন বাহুর উপর মাথা রাখিয়া শুইয়া পড়িল যাহাতে সে মরিয়া যায়। এ সময় হঠাৎ জাগিয়া দেখে তাহার বাহন তাহার নিকটে—তাহার উপর তাহার পাথেয় ও পানীয় আছে। এইরূপে – আল্লাহ্ তাঁহার মু'মিন বান্দার তওবায় এই ব্যক্তি তাহার বাহন ও পাথেয় পাইয়া যেরূপ খুশী হইয়াছে, তাহা অপেক্ষাও অধিক খুশী হন। —মুসলিম শুধু মর'ফূ অংশ এবং বুখারী মউকুফ এবং মরফূ' উভয় অংশ বর্ণনা করিয়াছেন।
كتاب الدعوات
وَعَن الْحَارِث بن سُويَدٍ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ حَدِيثَيْنِ: أحدُهما عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْآخِرُ عَنْ نَفْسِهِ قَالَ: إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدٌ تَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ وَإِنَّ الْفَاجِرَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَذُبَابٍ مَرَّ عَلَى أَنْفِهِ فَقَالَ بِهِ هَكَذَا أَيْ بِيَدِهِ فَذَبَّهُ عَنْهُ ثُمَّ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يَقُول: لَلَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ الْمُؤْمِنِ مِنْ رَجُلٍ نَزَلَ فِي أَرْضٍ دَوِيَّةٍ مَهْلَكَةٍ مَعَهُ رَاحِلَتُهُ عَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَوَضَعَ رَأْسَهُ فَنَامَ نَوْمَةً فَاسْتَيْقَظَ وَقَدْ ذَهَبَتْ رَاحِلَتُهُ فَطَلَبَهَا حَتَّى إِذَا اشْتَدَّ عَلَيْهِ الْحَرُّ وَالْعَطَشُ أَوْ مَا شَاءَ اللَّهُ قَالَ: أَرْجِعُ إِلَى مَكَانِي الَّذِي كُنْتُ فِيهِ فَأَنَامُ حَتَّى أَمُوتَ فَوَضَعَ رَأْسَهُ عَلَى سَاعِدِهِ لِيَمُوتَ فَاسْتَيْقَظَ فَإِذَا رَاحِلَتُهُ عِنْدَهُ عَلَيْهَا زَادُهُ وَشَرَابُهُ فَاللَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ الْعَبْدِ الْمُؤْمِنِ مِنْ هَذَا بِرَاحِلَتِهِ وَزَادِهِ . رَوَى مُسْلِمٌ الْمَرْفُوع إِلَى رَسُول صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْهُ فَحَسْبُ وَرَوَى البُخَارِيّ الموقوفَ على ابنِ مَسْعُود أَيْضا
হাদীসের ব্যাখ্যা:
ঐ বেদুইন মুসাফিরের কথাটা একটু চিন্তা করুন তো, যে একা তার উটনীটিকে সঙ্গে নিয়ে গোটা পাথেয় ও সফর কালের আহার্য পানীয় উটনীর পিঠে তুলে নিয়ে দূর দরাজের এমন সফরে বেরিয়েছে, যে পথে কোথাও দানাপানি পাওয়ার কোনই আশা নেই। তার পর সফর কালেই কোন এক দুপুরে কোন এক গাছের ছায়াতলে একটু শুয়ে পড়তেই সে ক্লান্ত-শ্রান্ত মুসাফির নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। একটু পরে চোখ খুলতেই সে মুসাফির কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দেখলো যে, উটনীটি সব কিছু নিয়ে নিরুদ্দেশ। তারপর সে উটনীটির খোঁজে ছুটাছুটি করে এমনি ক্লান্ত-শ্রান্ত-পিপাসার্ত এবং খরতাপে কাতর হয়ে পড়লো যে, তার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠলো। সে বেচারা ভাবলো যে, এরূপ বিজন-বিভুঁইয়ে তরুলতা হীন প্রান্তরে মৃত্যুই বুঝি তার ভাগ্যলিপি। তাই সেই ছায়ায় গিয়ে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে। এ অবস্থায় পুনরায় সে নিদ্রাভিভূত হয়ে পড়লো। তার পর চোখ খুলতেই দেখে, তার উটনীটি সকল দ্রব্যসম্ভার নিয়ে তার মাথার উপর খাড়া।
একটু ভেবে দেখুন তো, পলাতক ও হারিয়ে যাওয়া যে উটনীটিকে হারিয়ে যে বেদুইন মরতে বসেছিল, সে উটনীটি অপ্রত্যাশিত ভাবে পুনরায় ফিরে আসায় সে বেদুইনটি কী পরিমাণ খুশি হতে পারে! পরম সত্যবাদী এবং সত্যবাদীতার সার্টিফিকেট প্রাপ্ত নবী করীম ﷺ হাদীসে পাকে আল্লাহর কসম খেয়ে বলছেন, আল্লাহর শপথ, বান্দা যখন গুনাহর পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, সাচ্চা দেলে তাওবা ইস্তিগফার করে তখন রহীম ও করীম আল্লাহ্ তার চাইতেও অধিক খুশি হন যতটুকু খুশি ঐ পলাতক উটনীটির ফিরে আসায় ঐ বেদুইনটি হতে পারে।
প্রায় একই রিওয়ায়াত সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ ছাড়াও হযরত আনাস (রা) কর্তৃকও বর্ণিত হয়েছে এবং সহীহ মুসলিমে এ মহাপুরুষদ্বয় ছাড়াও হযরত আবূ হুরায়রা, হযরত নু'মান ইব্ন বশীর এবং হযরত বারা ইব্ন আযিব (রা) থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। বরং হযরত আনাস (রা)-এর বর্ণনায় এতটুকু বাড়তিও আছে যে, রসূলুল্লাহ ﷺ ঐ বেদুইন মুসাফিরটির পরম খুশির অবস্থার বর্ণনা করে বলেন যে, উটনীটি এরূপ অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে পাওয়ায় বেদুইনটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে তার অসীম দয়ার স্বীকারোক্তি করে বলতে চাচ্ছিল:
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ رَبِّي وَأَنَا عَبْدُكَ
“হে আল্লাহ! তুমিই আমার প্রতিপালক আর আমি তোমারই বান্দা।” কিন্তু আনন্দের আতিশয্যে তার রসনায় পর্যন্ত বিভ্রম দেখা দিল, সে বলে উঠলোঃ
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ
“হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা আর আমি তোমার প্রতিপালক।"
হুযুর ﷺ তার মতি বিভ্রমের সাফাই দিতে গিয়ে বললেন:
أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرْحِ
(আনন্দের আতিশয্যে বেচারা ভুল করে বসেছে।১)
নিঃসন্দেহে এ হাদীসে তাওবাকারী গুনাহগার বান্দাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্টির যে সুসংবাদ দিয়েছেন, তা জান্নাত এবং জান্নাতের সকল নিয়ামত থেকেও উত্তম। শায়খ ইবনুল কাইয়েম তাঁর 'মাদারিজুস সালিকীন' গ্রন্থে তাওবা ও ইস্তিগফার সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে এ হাদীস সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির ব্যাখ্যায় বড় চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন, যা পাঠ করে ঈমানী রূহ আনন্দে নেচে উঠে! নিম্নে তার কেবল সারাংশ তুলে ধরছি:
"আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানব জাতিকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন এবং পৃথিবীর তাবৎ বস্তু তাদের জন্যেই সৃষ্টি করেছেন। আর মানবকে তিনি সৃষ্টি করেছেন কেবল তাঁর মা'রিফত, আনুগত্য এবং ইবাদতের জন্যে। গোটা সৃষ্টি জগতকে তিনি মানুষের বশীভূত করে দিয়েছেন। এবং তাঁর ফেরেশতাগণকে পর্যন্ত তাদের সেবায় ও প্রহরায় নিয়োজিত করেছেন। তারপর তাদের হিদায়াত ও পথ প্রদর্শনের জন্যে কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন। নবুওত ও রিসালতের সিলসিলা জারী করেছেন। তারপর তাদেরই মধ্য থেকে কাউকে 'খলীল' (পরম বন্ধু) বানিয়েছেন, কাউকে 'কলীম' (তাঁর সাথে একান্তে আলাপকারী) বানিয়েছেন এবং অনেককে তাঁর বেলায়েত এবং নৈকট্য দানে ধন্য করেছেন এবং প্রধানতঃ মানব জাতির জন্যেই জান্নাত জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন।
মোদ্দা কথা, ইহলোকে পরলোকে এ বিশ্ব জগতে যা কিছু আছে এবং অনাগতকালে হবে, এ সবেরই কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এ মানব জাতি। একে কেন্দ্র করেই সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে। এ মানবই আমানতের বোঝা বহন করেছে। তারই জন্যে শরীয়ত নাযিল হয়েছে এবং ছাওয়াব ও আযাবও তারই জন্যেই। সুতরাং এ গোটা বিশ্বজাহানের আসল মকসুদ হচ্ছে এই মানব জাতি। আল্লাহ তাঁর নিজ কুদরতী হাতে তাকে বানিয়েছেন। তাতে তাঁর নিজ 'রূহ' নিক্ষেপ করেছেন। আপন ফেরেশতাদের দিয়ে তাকে সাজদা করিয়েছেন। তাকে সাজদা না করায় ইবলীসকে আপন দরবারে থেকে বিতাড়িত করেছেন এবং আল্লাহ তাকে তার শত্রু বলে ঘোষণা করেছেন। এসব এজন্যে যে, ঐ স্রষ্টা কেবল মানুষের মধ্যেই এ যোগ্যতা রেখেছেন যে, সে একটি যমীনী ও জড় পদার্থ থেকে সৃষ্ট মাখলুক হওয়া সত্ত্বেও নিজের স্রষ্টা ও প্রতিপালকের (যিনি গোপন থেকে গোপনতর এবং গায়েব থেকে গায়েবতর হওয়া সত্ত্বেও) উচ্চতর মা'রিফত হাসিল করার এবং তাঁর রহস্যাবলী ও কৌশলাদি সম্পর্কে অভিজ্ঞান হাসিল করতে পারে। তাঁকে ভালবাসতে এবং তাঁর আনুগত্য করতে পারে। তাঁর উদ্দেশ্যে নিজের পরম প্রিয় বস্তু কুরবানী করতে ও বিসর্জন দিতে পারে। তাঁর খাস রহমত ও অগণিত দানের যোগ্যতা অর্জন করে তাঁর অনন্ত অসীম করুণায় সিক্ত হতে পারে। আর সেই বদান্যশীল প্রভু যেহেতু নিজ গুণেই রহীম বা পরম দয়াময়। দয়া ও বদান্যতা তাঁর স্বকীয় গুণ (যেভাবে মমতা মায়ের অনন্য গুণ) এজন্যে আপন বিশ্বস্ত ও সৎকর্মশীল বান্দাদের ইনাম ইহসান দিয়ে ধন্য করা, এবং আপন দানে তাদের ঝুলি ভরে দিয়ে সন্তুষ্টি ও তৃপ্তি লাভ করা তার তেমনি অনন্য বৈশিষ্ট্য, যেমনটি মমতাময়ী মায়ের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিজ সন্তানকে দুগ্ধদান করা তাকে নাইয়ে ধুইয়ে দিয়ে উত্তম কাপড় চোপড় পরিয়ে পরম তৃপ্তি লাভ করা।
এখন বান্দা যদি তার চরম দুর্ভাগ্যের দরুন আপন স্রষ্টা প্রতিপালকের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার পথ ছেড়ে দিয়ে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার পথ বেছে নেয় এবং তাঁর দুশমন ও বিদ্রোহী শয়তানের বাহিনী এবং তার অনুসারীদের দলে ভিড়ে যায় এবং পরম বদান্যশীল প্রভু পরোয়ারদিগারের রহমত, দয়া-দাক্ষিণ্য ও সৃষ্টি-বাৎসল্যকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার পরিবর্তে তাঁর গযব ও কহরকেই উসকিয়ে দিতে শুরু করে, তাহলে তাঁর (অনন্য) গযব কহর ও অসন্তুষ্টির আগুন প্রজ্বলিত হবে, তা বলাই বাহুল্য যেমনটি ক্রোধের সঞ্চার হয়ে থাকে অবাধ্য ও অধম অভাগা দুষ্কৃতকারী সন্তানের বিরুদ্ধে মমতাময়ী মায়ের মনে। তারপর যদি সে বান্দার নিজ ভুল-ত্রুটির চেতনা-অনুভূতি জাগ্রত হয় এবং সে অনুভব করতে সমর্থ হয় যে, আমি আমার মালিক মওলা ও প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করে নিজেকে ও নিজের ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে দিয়েছি, আর তাঁর রহমত ও বদান্যশীলতা ছাড়া আমার বাঁচার আর কোন পথই নেই, তারপর লজ্জিত-অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা ও দয়ার প্রার্থী হয়ে তাঁর রহমত ও বদান্যশীলতার দরবারের দিকে রুজু হয়, সাচ্চা দেলে তাওবা করে মিনতি ও কান্নাকাটি করে ক্ষমা প্রার্থনা করে, ভবিষ্যতে বাধ্য ও অনুগত হয়ে চলার অঙ্গীকার করে, তাহলে আশা করা যেতে পারে যে, মায়ের চাইতে হাজার হাজার গুণ বেশি করুণা ও বাৎসল্যের অধিকারী প্রতিপালক যিনি বান্দাকে করুনা ও রহমত বর্ষণ করে এত আনন্দিত-উল্লসিত হন, যতটুকু আনন্দিত-উল্লসিত স্বয়ং মুখাপেক্ষী বান্দা তা পেয়ে হয় না, তাহলে চিন্তা করা যেতে পারে যে, এমন করুণাময় বদান্যশীল প্রভু পরোয়ারদিগার তাঁর সে বান্দার তাওবা ও রুজু করায় কতটুকু আনন্দিত-উল্লসিত হতে পারেন।"
শায়খ ইবনুল কাইয়েম তার চাইতে অনেক বিশদভাবে এ ব্যাপারটি আলোচনা করে উপসংহারে কোন এক আল্লাহওয়ালা আরিফ বুযুর্গের ঘটনা লিখেছেন, যিনি শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়েছিলেন এবং পাপের রোগজীবাণু তাঁর অন্তরকেও কলুষিত-রোগগ্রস্ত করে ফেলেছিল। তিনি লিখেন:
সেই দরবেশ একটি গলিপথ অতিক্রম করছিলেন। এমন সময় তিনি একটি দরজা খোলা খোলা দেখতে পান। একটি শিশু কাঁদতে কাঁদতে সে দরজা দিয়ে বের হলো। সে বের হতেই তার মা ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। শিশুটি এভাবে কাঁদতে কাঁদতে কিছুদূর অগ্রসর হলো। কিন্তু কিছু দূর গিয়েই সে এক স্থানে থমকে দাঁড়ালো। সে তখন ভাবলো- বাপমার ঘর ছেড়ে আমি যাবোই বা কোথায়? একথা ভেবে সে ব্যথা ভারাক্রান্ত মনে ঘরের দিকে ফিরে এলো এবং দরজা ভিতর থেকে বন্ধ দেখে দরজার চৌকাঠে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। এ অবস্থায়ই সে নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। তারপর তার মা এসে দরজা খুলে এ অবস্থায় তাকে শায়িত দেখে তার মনও ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। তার করুণা সিন্ধু উথলে উঠলো। তার চোখে অশ্রুর বন্যা দেখা দিল। সে তার সন্তানকে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। তাকে সোহাগ করতে করতে বলতে লাগলো-
বৎস, তুই দেখলি তো, আমি ছাড়া তোর জন্যে আর কে আছে? তুই অবাধ্যতা ও মূর্খতার পথ বেছে নিয়ে আমার মনে কষ্ট দিয়ে আমাকে এমনি রাগান্বিত ও ক্রুদ্ধমূর্তি করলে, যেমনটি তোর জন্যে আমার স্বভাবজাত ভাবে থাকার কথা ছিল না। আমার স্বভাবধর্মের তাগিদ তো হলো তোকে আদর-সোহাগ করা। তোর আরাম-আয়েশ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা। তোর সর্বপ্রকার মঙ্গল কামনা করা। আমার যা কিছু সব তো তোর জন্যেই।
সেই দরবেশ এ সব দেখলেন। তিনি তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলেন।
এ কাহিনী সম্পর্কে চিন্তা করার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ বাণীটি সম্মুখে রাখুন যাতে তিনি বলেছেন: اللّٰهُ أَرْحَمَ لِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِهَا
"আল্লাহর কসম, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দার প্রতি অধিকতর স্নেহ মমতাশীল- যতটুকু এ মা তার এ সন্তানের প্রতি।'২
কত অভাগা ও বঞ্চিতই না ঐসব বান্দা, যারা না-ফরমানী ও পাপাচারের পথ বেছে নিয়ে রহীম ও করীম পরম দয়ালু ও পরম বদান্যশীল প্রভু পরোয়ারদিগারের রহমত থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করেছে এবং তাঁর গযব ও কহরকেই আমন্ত্রণ জানাচ্ছে! উসকিয়ে দিচ্ছে! অথচ তাওবার দরজা তাদের জন্যে সতত উন্মুক্ত! সেদিকে অগ্রসর হয়ে তারা সেই করুণাময় আল্লাহ তা'আলার আদর-সোহাগ লাভ করতে পারে- যাঁর আদর-সোহাগ ও করুণার সম্মুখে মায়ের আদর সোহাগ ও করুণা কিছুই নয়। আল্লাহ তা'আলা এ হাকীকত অনুধাবনের তাওফীক দান করুন এবং সে একীন বিশ্বাস আমাদের অন্তরে দান করুন!
يَا غَفَّارُ اغْفِرْ لِي يَا تَوَّابُ تُبْ عَلَيَّ يَا رَحْمٰنُ ارْحَمْنِي يَارَؤُوفُ ارْؤُفْ بِي يَا عَفُوُّ اعْفُ عَنِّى يَارَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَطَوِّقْنِي حُسْنَ عِبَادَتِكَ
হে ক্ষমাশীল! আমায় ক্ষমা কর। হে তাওবা কবুলকারী! আমার তাওবা কবুল কর। হে দয়াময়! আমায় দয়া কর। হে মেহেরবান! আমায় মেহেরবানী কর। হে ক্ষমাশীল! আমায় ক্ষমা কর। হে পালনকর্তা! আমার প্রতি তুমি যে নিয়ামত দান করেছ, আমাকে তার শুকরিয়া আদায় করার শক্তি দাও এবং সুন্দরভাবে তোমার ইবাদত করার ক্ষমতা আমাকে দান কর।
টিকা ১. উলামা ও ফেকাহবিদগণ হুযুর ﷺ-এর এ বাণী থেকে বুঝেছেন যে, এরূপ বিভ্রমের ফলে যদি কারো মুখ দিয়ে কুফরী কালাম বেরিয়ে যায় তবে সে ফাকির হবে না। ফিকহ ও ফতোয়ার কিতাবাদিতে তা স্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে।
টিকা ২. এটা সহীহ্ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীসের অংশ। তাতে আছে, জনৈকা মহিলা উম্মাদের মত তার সন্তানকে কোলে নিয়ে বারবার তাকে চুমু খাচ্ছিলো। দুধ পান করাচ্ছিল। দর্শকমাত্র তার এ সন্তান বাৎসল্য ও উতালাভাব দেখে অভিভূত হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন: "আল্লাহর কসম, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দার প্রতি অধিকতর সদয়, যতটুকু না এ মহিলাটি তার সন্তানের প্রতি সদয়।"
একটু ভেবে দেখুন তো, পলাতক ও হারিয়ে যাওয়া যে উটনীটিকে হারিয়ে যে বেদুইন মরতে বসেছিল, সে উটনীটি অপ্রত্যাশিত ভাবে পুনরায় ফিরে আসায় সে বেদুইনটি কী পরিমাণ খুশি হতে পারে! পরম সত্যবাদী এবং সত্যবাদীতার সার্টিফিকেট প্রাপ্ত নবী করীম ﷺ হাদীসে পাকে আল্লাহর কসম খেয়ে বলছেন, আল্লাহর শপথ, বান্দা যখন গুনাহর পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, সাচ্চা দেলে তাওবা ইস্তিগফার করে তখন রহীম ও করীম আল্লাহ্ তার চাইতেও অধিক খুশি হন যতটুকু খুশি ঐ পলাতক উটনীটির ফিরে আসায় ঐ বেদুইনটি হতে পারে।
প্রায় একই রিওয়ায়াত সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ ছাড়াও হযরত আনাস (রা) কর্তৃকও বর্ণিত হয়েছে এবং সহীহ মুসলিমে এ মহাপুরুষদ্বয় ছাড়াও হযরত আবূ হুরায়রা, হযরত নু'মান ইব্ন বশীর এবং হযরত বারা ইব্ন আযিব (রা) থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। বরং হযরত আনাস (রা)-এর বর্ণনায় এতটুকু বাড়তিও আছে যে, রসূলুল্লাহ ﷺ ঐ বেদুইন মুসাফিরটির পরম খুশির অবস্থার বর্ণনা করে বলেন যে, উটনীটি এরূপ অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে পাওয়ায় বেদুইনটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে তার অসীম দয়ার স্বীকারোক্তি করে বলতে চাচ্ছিল:
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ رَبِّي وَأَنَا عَبْدُكَ
“হে আল্লাহ! তুমিই আমার প্রতিপালক আর আমি তোমারই বান্দা।” কিন্তু আনন্দের আতিশয্যে তার রসনায় পর্যন্ত বিভ্রম দেখা দিল, সে বলে উঠলোঃ
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ
“হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা আর আমি তোমার প্রতিপালক।"
হুযুর ﷺ তার মতি বিভ্রমের সাফাই দিতে গিয়ে বললেন:
أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرْحِ
(আনন্দের আতিশয্যে বেচারা ভুল করে বসেছে।১)
নিঃসন্দেহে এ হাদীসে তাওবাকারী গুনাহগার বান্দাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্টির যে সুসংবাদ দিয়েছেন, তা জান্নাত এবং জান্নাতের সকল নিয়ামত থেকেও উত্তম। শায়খ ইবনুল কাইয়েম তাঁর 'মাদারিজুস সালিকীন' গ্রন্থে তাওবা ও ইস্তিগফার সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে এ হাদীস সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির ব্যাখ্যায় বড় চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন, যা পাঠ করে ঈমানী রূহ আনন্দে নেচে উঠে! নিম্নে তার কেবল সারাংশ তুলে ধরছি:
"আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানব জাতিকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন এবং পৃথিবীর তাবৎ বস্তু তাদের জন্যেই সৃষ্টি করেছেন। আর মানবকে তিনি সৃষ্টি করেছেন কেবল তাঁর মা'রিফত, আনুগত্য এবং ইবাদতের জন্যে। গোটা সৃষ্টি জগতকে তিনি মানুষের বশীভূত করে দিয়েছেন। এবং তাঁর ফেরেশতাগণকে পর্যন্ত তাদের সেবায় ও প্রহরায় নিয়োজিত করেছেন। তারপর তাদের হিদায়াত ও পথ প্রদর্শনের জন্যে কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন। নবুওত ও রিসালতের সিলসিলা জারী করেছেন। তারপর তাদেরই মধ্য থেকে কাউকে 'খলীল' (পরম বন্ধু) বানিয়েছেন, কাউকে 'কলীম' (তাঁর সাথে একান্তে আলাপকারী) বানিয়েছেন এবং অনেককে তাঁর বেলায়েত এবং নৈকট্য দানে ধন্য করেছেন এবং প্রধানতঃ মানব জাতির জন্যেই জান্নাত জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন।
মোদ্দা কথা, ইহলোকে পরলোকে এ বিশ্ব জগতে যা কিছু আছে এবং অনাগতকালে হবে, এ সবেরই কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এ মানব জাতি। একে কেন্দ্র করেই সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে। এ মানবই আমানতের বোঝা বহন করেছে। তারই জন্যে শরীয়ত নাযিল হয়েছে এবং ছাওয়াব ও আযাবও তারই জন্যেই। সুতরাং এ গোটা বিশ্বজাহানের আসল মকসুদ হচ্ছে এই মানব জাতি। আল্লাহ তাঁর নিজ কুদরতী হাতে তাকে বানিয়েছেন। তাতে তাঁর নিজ 'রূহ' নিক্ষেপ করেছেন। আপন ফেরেশতাদের দিয়ে তাকে সাজদা করিয়েছেন। তাকে সাজদা না করায় ইবলীসকে আপন দরবারে থেকে বিতাড়িত করেছেন এবং আল্লাহ তাকে তার শত্রু বলে ঘোষণা করেছেন। এসব এজন্যে যে, ঐ স্রষ্টা কেবল মানুষের মধ্যেই এ যোগ্যতা রেখেছেন যে, সে একটি যমীনী ও জড় পদার্থ থেকে সৃষ্ট মাখলুক হওয়া সত্ত্বেও নিজের স্রষ্টা ও প্রতিপালকের (যিনি গোপন থেকে গোপনতর এবং গায়েব থেকে গায়েবতর হওয়া সত্ত্বেও) উচ্চতর মা'রিফত হাসিল করার এবং তাঁর রহস্যাবলী ও কৌশলাদি সম্পর্কে অভিজ্ঞান হাসিল করতে পারে। তাঁকে ভালবাসতে এবং তাঁর আনুগত্য করতে পারে। তাঁর উদ্দেশ্যে নিজের পরম প্রিয় বস্তু কুরবানী করতে ও বিসর্জন দিতে পারে। তাঁর খাস রহমত ও অগণিত দানের যোগ্যতা অর্জন করে তাঁর অনন্ত অসীম করুণায় সিক্ত হতে পারে। আর সেই বদান্যশীল প্রভু যেহেতু নিজ গুণেই রহীম বা পরম দয়াময়। দয়া ও বদান্যতা তাঁর স্বকীয় গুণ (যেভাবে মমতা মায়ের অনন্য গুণ) এজন্যে আপন বিশ্বস্ত ও সৎকর্মশীল বান্দাদের ইনাম ইহসান দিয়ে ধন্য করা, এবং আপন দানে তাদের ঝুলি ভরে দিয়ে সন্তুষ্টি ও তৃপ্তি লাভ করা তার তেমনি অনন্য বৈশিষ্ট্য, যেমনটি মমতাময়ী মায়ের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিজ সন্তানকে দুগ্ধদান করা তাকে নাইয়ে ধুইয়ে দিয়ে উত্তম কাপড় চোপড় পরিয়ে পরম তৃপ্তি লাভ করা।
এখন বান্দা যদি তার চরম দুর্ভাগ্যের দরুন আপন স্রষ্টা প্রতিপালকের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার পথ ছেড়ে দিয়ে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার পথ বেছে নেয় এবং তাঁর দুশমন ও বিদ্রোহী শয়তানের বাহিনী এবং তার অনুসারীদের দলে ভিড়ে যায় এবং পরম বদান্যশীল প্রভু পরোয়ারদিগারের রহমত, দয়া-দাক্ষিণ্য ও সৃষ্টি-বাৎসল্যকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার পরিবর্তে তাঁর গযব ও কহরকেই উসকিয়ে দিতে শুরু করে, তাহলে তাঁর (অনন্য) গযব কহর ও অসন্তুষ্টির আগুন প্রজ্বলিত হবে, তা বলাই বাহুল্য যেমনটি ক্রোধের সঞ্চার হয়ে থাকে অবাধ্য ও অধম অভাগা দুষ্কৃতকারী সন্তানের বিরুদ্ধে মমতাময়ী মায়ের মনে। তারপর যদি সে বান্দার নিজ ভুল-ত্রুটির চেতনা-অনুভূতি জাগ্রত হয় এবং সে অনুভব করতে সমর্থ হয় যে, আমি আমার মালিক মওলা ও প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করে নিজেকে ও নিজের ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে দিয়েছি, আর তাঁর রহমত ও বদান্যশীলতা ছাড়া আমার বাঁচার আর কোন পথই নেই, তারপর লজ্জিত-অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা ও দয়ার প্রার্থী হয়ে তাঁর রহমত ও বদান্যশীলতার দরবারের দিকে রুজু হয়, সাচ্চা দেলে তাওবা করে মিনতি ও কান্নাকাটি করে ক্ষমা প্রার্থনা করে, ভবিষ্যতে বাধ্য ও অনুগত হয়ে চলার অঙ্গীকার করে, তাহলে আশা করা যেতে পারে যে, মায়ের চাইতে হাজার হাজার গুণ বেশি করুণা ও বাৎসল্যের অধিকারী প্রতিপালক যিনি বান্দাকে করুনা ও রহমত বর্ষণ করে এত আনন্দিত-উল্লসিত হন, যতটুকু আনন্দিত-উল্লসিত স্বয়ং মুখাপেক্ষী বান্দা তা পেয়ে হয় না, তাহলে চিন্তা করা যেতে পারে যে, এমন করুণাময় বদান্যশীল প্রভু পরোয়ারদিগার তাঁর সে বান্দার তাওবা ও রুজু করায় কতটুকু আনন্দিত-উল্লসিত হতে পারেন।"
শায়খ ইবনুল কাইয়েম তার চাইতে অনেক বিশদভাবে এ ব্যাপারটি আলোচনা করে উপসংহারে কোন এক আল্লাহওয়ালা আরিফ বুযুর্গের ঘটনা লিখেছেন, যিনি শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়েছিলেন এবং পাপের রোগজীবাণু তাঁর অন্তরকেও কলুষিত-রোগগ্রস্ত করে ফেলেছিল। তিনি লিখেন:
সেই দরবেশ একটি গলিপথ অতিক্রম করছিলেন। এমন সময় তিনি একটি দরজা খোলা খোলা দেখতে পান। একটি শিশু কাঁদতে কাঁদতে সে দরজা দিয়ে বের হলো। সে বের হতেই তার মা ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। শিশুটি এভাবে কাঁদতে কাঁদতে কিছুদূর অগ্রসর হলো। কিন্তু কিছু দূর গিয়েই সে এক স্থানে থমকে দাঁড়ালো। সে তখন ভাবলো- বাপমার ঘর ছেড়ে আমি যাবোই বা কোথায়? একথা ভেবে সে ব্যথা ভারাক্রান্ত মনে ঘরের দিকে ফিরে এলো এবং দরজা ভিতর থেকে বন্ধ দেখে দরজার চৌকাঠে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। এ অবস্থায়ই সে নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। তারপর তার মা এসে দরজা খুলে এ অবস্থায় তাকে শায়িত দেখে তার মনও ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। তার করুণা সিন্ধু উথলে উঠলো। তার চোখে অশ্রুর বন্যা দেখা দিল। সে তার সন্তানকে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। তাকে সোহাগ করতে করতে বলতে লাগলো-
বৎস, তুই দেখলি তো, আমি ছাড়া তোর জন্যে আর কে আছে? তুই অবাধ্যতা ও মূর্খতার পথ বেছে নিয়ে আমার মনে কষ্ট দিয়ে আমাকে এমনি রাগান্বিত ও ক্রুদ্ধমূর্তি করলে, যেমনটি তোর জন্যে আমার স্বভাবজাত ভাবে থাকার কথা ছিল না। আমার স্বভাবধর্মের তাগিদ তো হলো তোকে আদর-সোহাগ করা। তোর আরাম-আয়েশ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা। তোর সর্বপ্রকার মঙ্গল কামনা করা। আমার যা কিছু সব তো তোর জন্যেই।
সেই দরবেশ এ সব দেখলেন। তিনি তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলেন।
এ কাহিনী সম্পর্কে চিন্তা করার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ বাণীটি সম্মুখে রাখুন যাতে তিনি বলেছেন: اللّٰهُ أَرْحَمَ لِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِهَا
"আল্লাহর কসম, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দার প্রতি অধিকতর স্নেহ মমতাশীল- যতটুকু এ মা তার এ সন্তানের প্রতি।'২
কত অভাগা ও বঞ্চিতই না ঐসব বান্দা, যারা না-ফরমানী ও পাপাচারের পথ বেছে নিয়ে রহীম ও করীম পরম দয়ালু ও পরম বদান্যশীল প্রভু পরোয়ারদিগারের রহমত থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করেছে এবং তাঁর গযব ও কহরকেই আমন্ত্রণ জানাচ্ছে! উসকিয়ে দিচ্ছে! অথচ তাওবার দরজা তাদের জন্যে সতত উন্মুক্ত! সেদিকে অগ্রসর হয়ে তারা সেই করুণাময় আল্লাহ তা'আলার আদর-সোহাগ লাভ করতে পারে- যাঁর আদর-সোহাগ ও করুণার সম্মুখে মায়ের আদর সোহাগ ও করুণা কিছুই নয়। আল্লাহ তা'আলা এ হাকীকত অনুধাবনের তাওফীক দান করুন এবং সে একীন বিশ্বাস আমাদের অন্তরে দান করুন!
يَا غَفَّارُ اغْفِرْ لِي يَا تَوَّابُ تُبْ عَلَيَّ يَا رَحْمٰنُ ارْحَمْنِي يَارَؤُوفُ ارْؤُفْ بِي يَا عَفُوُّ اعْفُ عَنِّى يَارَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَطَوِّقْنِي حُسْنَ عِبَادَتِكَ
হে ক্ষমাশীল! আমায় ক্ষমা কর। হে তাওবা কবুলকারী! আমার তাওবা কবুল কর। হে দয়াময়! আমায় দয়া কর। হে মেহেরবান! আমায় মেহেরবানী কর। হে ক্ষমাশীল! আমায় ক্ষমা কর। হে পালনকর্তা! আমার প্রতি তুমি যে নিয়ামত দান করেছ, আমাকে তার শুকরিয়া আদায় করার শক্তি দাও এবং সুন্দরভাবে তোমার ইবাদত করার ক্ষমতা আমাকে দান কর।
টিকা ১. উলামা ও ফেকাহবিদগণ হুযুর ﷺ-এর এ বাণী থেকে বুঝেছেন যে, এরূপ বিভ্রমের ফলে যদি কারো মুখ দিয়ে কুফরী কালাম বেরিয়ে যায় তবে সে ফাকির হবে না। ফিকহ ও ফতোয়ার কিতাবাদিতে তা স্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে।
টিকা ২. এটা সহীহ্ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীসের অংশ। তাতে আছে, জনৈকা মহিলা উম্মাদের মত তার সন্তানকে কোলে নিয়ে বারবার তাকে চুমু খাচ্ছিলো। দুধ পান করাচ্ছিল। দর্শকমাত্র তার এ সন্তান বাৎসল্য ও উতালাভাব দেখে অভিভূত হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন: "আল্লাহর কসম, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দার প্রতি অধিকতর সদয়, যতটুকু না এ মহিলাটি তার সন্তানের প্রতি সদয়।"
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)