মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

১০- যাবতীয় দোয়া-যিক্‌র

হাদীস নং: ২৪৩১
- যাবতীয় দোয়া-যিক্‌র
৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিভিন্ন সময়ের পঠিতব্য দুআ
২৪৩১। হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলিয়াছেনঃ যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশ করিয়া বলে – “আল্লাহ্ ব্যতীত কোন মা'বূদ নাই, তিনি এক, তাঁহার কোন শরীক নাই, তাঁহারই রাজত্ব, তাঁহারই প্রশংসা, তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু দান করেন, তিনি চিরঞ্জীব, কখনও মৃত্যুবরণ করিবেন না। তাঁহার হাতেই কল্যাণ এবং তিনি সমস্ত জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।” –আল্লাহ্ তাহার জন্য দশ লক্ষ পুণ্য লিখিবেন, দশ লক্ষ পাপ মুছিয়া দিবেন, অধিকন্তু তাহার দশ লক্ষ মর্যাদা বাড়াইয়া দিবেন এবং বেহেশতে তাহার জন্য একটি ঘর প্রস্তুত করিবেন। -তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ্। কিন্তু তিরমিযী বলেন, হাদীসটি গরীব। আর শরহে সুন্নাহয় 'বাজার' শব্দের স্থলে রহিয়াছে 'বড় বাজার', যেখানে বেচা-বিক্রি হয়।
كتاب الدعوات
وَعَنْ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ دَخَلَ السُّوقَ فَقَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ حَيٌّ لَا يَمُوتُ بِيَدِهِ الْخَيْرُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ كَتَبَ اللَّهُ لَهُ أَلْفَ أَلْفَ حَسَنَةٍ وَمَحَا عَنْهُ أَلْفَ أَلْفَ سَيِّئَةٍ وَرَفَعَ لَهُ أَلْفَ أَلْفَ دَرَجَةٍ وَبَنَى لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ وَفِي شَرْحِ السُّنَّةِ: «مَنْ قَالَ فِي سُوقٍ جَامِعٍ يباعُ فِيهِ» بدل «من دخل السُّوق»

হাদীসের ব্যাখ্যা:

বাজার নিঃসন্দেহে গাফলত ও পাপতাপের স্থান এবং শয়তানের আড্ডাখানা হয়ে থাকে। এমন পাপতাপপূর্ণ শয়তানী পরিবেশে আল্লাহর যে নেককার বান্দাগণ এমন তরীকা ও এমন কালিমা অবলম্বনে আল্লাহর যিকির করেন যে, এর দ্বারা সে পাপ-পঙ্কিলতা দূর হয়ে যায় তাঁরা নিঃসন্দেহে আল্লাহর বে-হিসাব পুরস্কার ও নেকি লাভের যোগ্য পাত্র। তাদের জন্যে হাজার হাজার নেকি লিখিত হওয়া, তাদের হাজার হাজার গুনাহ মোচন হওয়া এবং হাজার হাজার দরজা বুলন্দ হওয়া এবং বেহেশতে তাঁদের জন্যে একটি মহল তৈরি হওয়া তাঁর সে পুরস্কারেরই বর্ণনা মাত্র।

বাজারে পদে পদে এমন সব বস্তু মানুষের চোখে পড়ে, যা দর্শনে সে ভুলে যায় আল্লাহ্ কথা, ভুলে যায় তার নিজের ও এ বিশ্বভুবনের নশ্বরতা ও অস্থায়িত্বের কথা। এ সব বস্তু তাকে আকর্ষণ করে নিজেদের দিকে। কোনটা তার কাছে অত্যন্ত মনোহর আবার কোনটা অনেক উপকারী, উপাদেয় ও উপভোগ্য বলে প্রতিভাত হয়। কোন সফল ব্যবসায়ী বা ধনাঢ্য ব্যক্তিকে দেখে মনে হয় এমন বিত্ত-বিভবের মালিকের সাথে কোনরূপ সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করতে পারলেই বুঝি বাজীমাত হবে। বাজারের পরিবেশে এরূপ ওসওয়াসাই সাধারণত মন-মানসকে বিভ্রান্ত-বিপথগামী করে থাকে। এরই প্রতিকার প্রতিষেধক রূপে রাসূলুল্লাহ ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন যে, যখন বাজারে যাবে, তখন তোমাদের যবানে থাকবে উক্ত ব্যাপক অর্থপূর্ণ ও মাহাত্ম্যপূর্ণ দু'আটি। এ কালিমা বা দু'আটি উক্তরূপ শয়তানী ওসওয়াসা ও বিভ্রান্তিকর ধ্যান-ধারণার উপর কার্যকর আঘাত হানবে, যা সাধারণত: ৰাজারের পরিবেশে মানুষের দেল-দেমাগকে প্রভাবন্বিত করে রাখে। উক্ত দু'আটি দ্বারা মন-মগজে যে একীন-বিশ্বাসের স্মৃতি জাগরুক হয় তা হলোঃ

১. সত্যিকারের ইলাহ বা উপাস্য-আরাধ্য হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। তাঁর ইবাদত ও সন্তুষ্টিই হবে জীবনের সবচাইতে বড় চাওয়া পাওয়া। এ ব্যাপারে অন্য কেউ বা অন্য কিছুই তাঁর শরীক হতে পারে না।

২. সারা ভূ-মণ্ডলে একমাত্র তাঁরই রাজত্ব-আধিপত্য। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মালিক একমাত্র এবং একমাত্র তিনিই। গোটা বিশ্বের মালিক-মুখতার এবং সার্বভৌমত্বের অধিকার একমাত্র তাঁরই।

৩. স্তব-স্তুতির মালিকও একমাত্র তিনিই। তিনি ব্যতীত তাঁর সৃষ্ট এ বিশ্বভুবনে যা কিছু সুন্দর, মনোহর ও চিত্তাকর্ষক, সেসব তাঁরই সৃষ্ট, তাঁরই কুশলী হাতের কারিগরী। এগুলোর সৌন্দর্য-সুষমা তাঁরই দান।

৪. তিনি এবং একমাত্র তিনিই সেই সত্তা, যিনি চিরঞ্জীব, যার মৃত্যু নেই, বিনাশ নেই। তিনি ছাড়া আর সবকিছুই নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। সবকিছুর জীবন-মৃত্যু, স্থায়িত্ব ও ধ্বংস তাঁরই হাতে।

৫. সমস্ত মঙ্গলের অধিপতিও একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া আর কারো হাতেই কোন ইখতিয়ার বা ক্ষমতা নেই।

৬. তিনি এবং একমাত্র তিনিই সর্বশক্তিমান। প্রতিটি বস্তু এবং প্রতিটি উত্থান-পতন তাঁরই কুদরতী হাতে রয়েছে।

বাজারের পরিবেশে আল্লাহর যে বান্দা আল্লাহকে এভাবে স্মরণ করে, সে যেন শয়তানেরই রাজত্বে আল্লাহর পতাকা উড্ডীন করে এবং গোমরাহীর ঘোর অন্ধকারে হিদায়াতের প্রদীপই প্রজ্বলিত করে। এজন্যে এমন ব্যক্তি এ অসাধারণ খায়র ও বরকত এবং রহমতের অধিকারী হয়, যার বর্ণনা উক্ত হাদীসে রয়েছে।

হাদীসের পাঠে আরবী শব্দটির অনুবাদ আমরা ইচ্ছাকৃতভাবেই দশ লাখ না করে হাজার হাজার করছি। কেননা, আমাদের মতে হাদীসের ঐসব ভাষ্যকারের মতই বেশি যুক্তিযুক্ত, যাঁরা বলেছেন, এখানে এ শব্দটি নির্দিষ্ট সংখ্যা জ্ঞাপক নয়, এবং ছাওয়াবের আধিক্য বুঝানোই এখানে উদ্দেশ্য। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান