মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২০- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৯০৯
- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়
২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০৯। হযরত আনাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলিয়াছেনঃ তোমরা অবশ্যই রাত্রি বেলায় সফর কর। কেননা, রাত্রির বেলায় যমীন সংকুচিত হয়। –আবু দাউদ
كتاب الجهاد
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَيْكُمْ بِالدُّلْجَةِ فَإِنَّ الْأَرْضَ تُطوَى بالليلِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. دلجة সন্ধ্যা-রাত্রের অন্ধকার, আর ادلج শেষ রাত্রের অন্ধকারকে বলা হয়। আসলে রাত্রের বেলায় সফরে অনেকক্ষণ নাগাদ চলিলেও মনে হইবে, এই মাত্র রওয়ানা হইয়াছে। আর দিনের বেলায় এইদিক সেইদিক চাহিতে চাহিতে অধিক পথ অতিক্রম করা যায় না। কিন্তু রাত্রের বেলায় সেসব কিছু দৃষ্টিতে পড়ে না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক দূর পথ আগাইয়া যায়। আর হাদীসের অর্থ ইহাও নহে যে, দিনের বেলায় সফর করা নিষেধ; বরং দিনের চাইতে রাত্রের সফর অশ্রান্ত ও অধিক আরামদায়ক।

২.
الدُّلْجَة শব্দটির অর্থ রাতের বেলা চলা, তা রাতের যে অংশেই হোক। মানুষের যেহেতু নানা কারণে সফর করার প্রয়োজন হয়, আর সফরের কাজটাই সাধারণত কষ্টের হয়ে থাকে, যেহেতু সবরকম সুবিধা তাতে হাতের কাছে থাকে না, তাই নিজের পক্ষ হতে যথাসম্ভব আসানির দিকে লক্ষ রাখা উচিত। সে আসানির প্রতি দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্যই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

عَلَيْكُمْ بِالدُّلْجَةِ (তোমরা অবশ্যই সফর করবে রাতে)। কেন সফরের জন্য রাতের সময়টাকে বেছে নিতে বলা হয়েছে? পরের বাক্যে এর উত্তর রয়েছে। বলা হয়েছে-

فَإِنَّ الْأَرْضَ تُطْوَى بِاللَّيْلِ (কেননা রাতে যমীন গুটিয়ে নেওয়া হয়)। অর্থাৎ ভূমি সঙ্কুচিত করে ফেলা হয়। ফলে দূরের পথ কাছের হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা সর্বশক্তিমান। তাঁর জন্য বাস্তবিকপক্ষেও এটা করা সম্ভব। কেউ কেউ বলেন, যমীন গুটিয়ে নেওয়ার দ্বারা রূপকার্থে অল্প সময়ে পথ অতিক্রম করা বোঝানো হয়েছে।

অর্থাৎ যমীন যেমনটা তেমনই থাকে, কিন্তু তা সত্ত্বেও দিনে যে পথ অতিক্রম করতে দীর্ঘ সময় লাগে, রাতের বেলা তা অল্প সময়েই পার হওয়া যায়। সেকালে মানুষ সফর করত উটের পিঠে। দিনের বেলা আবহাওয়া উত্তপ্ত থাকত বলে মানুষ তখন বাইরে বের হতো না। বের হতো রাতে। ফলে দিনের বেলা যাত্রীবাহী উট বিশ্রামের সুযোগ পেত। এতে করে রাতে তার শরীর ঝরঝরে হয়ে উঠত। রাতের ঠান্ডা ও শান্ত পরিবেশে সে দিনের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে পথ চলতে পারত। এভাবে রাতের সফরে অল্প সময়ের মধ্যেই মুসাফির তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যেত। এটাকেই হাদীছে 'যমীন সঙ্কুচিত করে দেওয়া' শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে।

বর্তমানকালে যদিও মানুষ সফর করে যান্ত্রিক যানবাহনে, তবুও দিনের তুলনায় রাতের সফর অপেক্ষাকৃত কম ক্লান্তিকর হয়। আবহাওয়া ঠান্ডা থাকায় যানবাহন তুলনামূলক কম গরম হয়। ফলে একদিকে যানবাহনেরও শক্তিক্ষয় তুলনামূলক কম হয় এবং যাত্রীরও শরীর-মন দিনের তুলনায় বেশি চাঙ্গা থাকে। এভাবে দীর্ঘ সময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরও মনে হয় অল্প সময়ের ভেতরেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেছে।

যা হোক, রাতের সফরে বাস্তবিক অর্থে হোক বা রূপকার্থে, মুসাফিরের জন্য পথ সঙ্কুচিত করে দেওয়া হয়। তা করেন আল্লাহ তা'আলাই। মুসাফিরের প্রতি এটা আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ রহমত। তাই হাদীছে পথের দূরত্ব কমিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআ করারও শিক্ষাদান করা হয়েছে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সফরের জন্য দিনের তুলনায় রাতের সময়টাই উত্তম।

খ. রাতে পথের দূরত্বের অনুভূতি কম হয়। তাই সফরের জন্য রাতকেই বেছে নেওয়া উচিত।

গ. যে-কোনও কাজে অপেক্ষাকৃত সহজ ও সুবিধাজনক পন্থা অবলম্বন করা উচিত।
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান