মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২৭- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়

হাদীস নং: ৫২৫৬
- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গরীবদের ফযীলত ও নবী (সা.) -এর জীবন-যাপন
৫২৫৬। হযরত আমর ইবনে শো'আইব তাঁহার পিতার মাধ্যমে তাঁহার দাদা হইতে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলিয়াছেনঃ দুইটি গুণ যাহার মধ্যে বিদ্যমান আছে, আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল লোকদের মধ্যে লিপিবদ্ধ করেন। (একটি হইল,) দ্বীনী ব্যাপারে যে ব্যক্তি নিজের চাইতে উত্তম ও উচ্চ মানের তাহার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া তাহার অনুসরণ করে এবং পার্থিব ব্যাপারে সে এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে তাহার চাইতে নিম্নস্তরের। সুতরাং সে আল্লাহর প্রশংসা করে যে, আল্লাহ্ তাহাকে এই ব্যক্তির উপরে মর্যাদা দান করিয়াছেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে শোকরগোজার ও ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত করেন। আর (দ্বিতীয়টি হইল,) যে ব্যক্তি দ্বীনদারীর ব্যাপারে এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে তাহার চাইতে নিম্নস্তরের আর পার্থিব ব্যাপারে সে এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে তাহার চাইতে উচ্চ পর্যায়ের এবং সে আক্ষেপ করিতে থাকে ঐ সকল বস্তুর জন্য যাহা হইতে সে বঞ্চিত হইয়াছে। এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ শোকরগোজার ও ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত করেন না। —তিরমিযী। হযরত আবু সাঈদের বর্ণিত হাদীস أَبْشِرُوايَامَعْشَرَصَعَالِيكِ الْمُهَاجِرِينَ ফাযায়েলে কোরআন-এর পরের অধ্যায়ে বর্ণনা করা হইয়াছে।
كتاب الرقاق
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: خَصْلَتَانِ مَنْ كَانَتَا فِيهِ كَتَبَهُ اللَّهُ شاكراً: مَنْ نَظَرَ فِي دِينِهِ إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَهُ فَاقْتَدَى بِهِ وَنَظَرَ فِي دُنْيَاهُ إِلَى مَنْ هُوَ دُونَهُ فَحَمِدَ اللَّهَ عَلَى مَا فَضَّلَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ كَتَبَهُ اللَّهُ شَاكِرًا صَابِرًا. وَمَنْ نَظَرَ فِي دِينِهِ إِلَى مَنْ هُوَ دُونَهُ وَنَظَرَ فِي دُنْيَاهُ إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَهُ فَأَسِفَ عَلَى مَا فَاتَهُ مِنْهُ لَمْ يَكْتُبْهُ اللَّهُ شَاكِرًا وَلَا صَابِرًا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَذَكَرَ حَدِيثَ أَبِي سَعِيدٍ: «أَبْشِرُوا يَا مَعْشَرَ صَعَالِيكِ الْمُهَاجِرِينَ» فِي بَابٍ بَعْدَ فَضَائِلِ الْقُرْآنِ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর শিক্ষা হইল, দ্বীনদারীর ব্যাপারে নিজের অপেক্ষা নেককার ও উত্তম ব্যক্তির প্রতি তাকাও এবং পার্থিব মাল-সম্পদে নিজের চাইতে অসহায়-দুস্থের প্রতি তাকাও। ফলে উভয় অবস্থায় ছবর ও শোকরের তওফীক হইবে এবং মানসিক প্রশান্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হইবে।

২. দীনের ব্যাপারে নজর উর্ধ্বমুখী করার মধ্যে ফায়দা রয়েছে। সৎকর্মের জন্য মনের মধ্যে ঈর্ষা পোষণ করা বা ভাল কাজ করার জন্য কারো সাথে প্রতিযোগিতা করার মধ্যে কোন লোকসান নেই, বরং কল্যাণ রয়েছে। যে সৎ নিয়্যত সহকারে দীনি কাজে প্রতিযোগিতা করে, সে নিজেকে উন্নত করে। যে দীনি কাজে ঊর্ধ্বতন মর্যাদার অধিকারীর দিকে দৃষ্টিপাত করে এবং তাকে অনুসরণ করে, সে দীনের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য শ্রম ও মেহনত করে। অনেক লোভনীয় ও আকর্ষণীয় বস্তু ত্যাগ করে এবং নফসের অনেক দাবি প্রত্যাখ্যান করে। বস্তুত নফসের সাথে অবিরাম সংগ্রাম করার কারণে সে নিজের মধ্যে সবর ও শোকরের গুণাবলী সৃষ্টি করে।

অনুরূপভাবে যখন সে দুনিয়ার ব্যাপারে তার চেয়ে কম সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী ব্যক্তির দিকে নজর করে, তখন সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ এবং নিজের বিত্ত ও সম্পদের উপর সন্তুষ্ট থাকে। বান্দা যখন তার অবস্থার উপর সন্তুষ্ট থাকে এবং যা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন তার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তখন আল্লাহও তার উপর সন্তুষ্ট হন। দুনিয়া ও আখিরাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। তাই এ দুটো গুণের অধিকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ সবর ও শোকরের বুলন্দ মাকাম দান করেন।

হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে, এ দুটো স্বভাবের বিপরীত স্বভাব যাদের রয়েছে তাদেরকে শোকরগুযার ও সবরকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না। যার ভিতর এ দুটো গুণ নেই, তার মধ্যে বিপরীতধর্মী দুটো মন্দ অভ্যাস সৃষ্টি হয়। দীনের ব্যাপারে সে নীচের দিকে নজর দেয়ার কারণে তার তরক্কী না হয়ে বরং অবনতি হয় এবং দুনিয়ার ব্যাপারে উপরের দিকে নজর দেয়ার কারণে তার মন হিংসা ও অশান্তির অনলে পুড়তে থাকে। বান্দা যখন তার দোষে নিজেকে অশান্তি ও অবনতির দিকে ঠেলে দেয়, তখন আল্লাহ তাকে কি করে সবর ও শোকরের আলীশান মাকাম দান করতে পারেন? বরং এ দুটো বদ অভ্যাসের কারণে বান্দা যদি সীমা অতিক্রম করে বসে, তাহলে আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট ও নারায হবেন।
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান