মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২৭- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৩২৩
- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - লোক দেখানো ও শুনানোর ব্যাপারে বর্ণনা
৫৩২৩। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলিয়াছেনঃ শেষ যমানায় এমন কিছুসংখ্যক লোকের আবির্ভাব ঘটিবে যাহারা দ্বীনের দ্বারা দুনিয়া হাসিল করিবে। (অর্থাৎ, দ্বীনদারী প্রকাশ করিয়া মানুষকে ধোঁকায় ফেলিবে) মানুষের দৃষ্টিতে বিনয়ভাব প্রকাশের জন্য মেষ-দুম্বার চামড়া পরিধান করিবে (অর্থাৎ, মোটা কম্বল বা পোশাক পরিধান করিয়া নিজেকে সুফী-দ্বীনদার প্রকাশ করিবে, তাহাদের মুখের ভাষা হইবে চিনি অপেক্ষা মিষ্টি। পক্ষান্তরে তাহাদের অন্তর হইবে ব্যাঘ্রের ন্যায় (হিংস্র)। আল্লাহ তা'আলা এই জাতীয় লোকদের সম্পর্কে বলেনঃ ইহারা কি আমাকে ধোঁকা দিতে চায়, নাকি আমার উপরে ধৃষ্টতা পোষণ করিতেছে? (জানিয়া রাখ !) আমি আমার শপথ করিয়া বলিতেছি, আমি তাহাদের উপর তাহাদের মধ্য হইতে এমন বিপদ প্রেরণ করিব যাহাতে তাহাদের বিচক্ষণ বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণও দিশাহারা হইয়া পড়িবে। —তিরমিযী
كتاب الرقاق
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَخْرُجُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ رِجَالٌ يَخْتِلُونَ الدُّنْيَا بِالدِّينِ يَلْبَسُونَ لِلنَّاسِ جُلُودَ الضَّأْنِ مِنَ اللِّينِ أَلْسِنَتُهُمْ أَحْلَى مِنَ السُّكَّرِ وَقُلُوبُهُمْ قُلُوبُ الذِّئَابِ يَقُولُ اللَّهُ: «أَبِي يَغْتَرُّونَ أَمْ عليَّ يجترؤون؟ فَبِي حَلَفْتُ لَأَبْعَثَنَّ عَلَى أُولَئِكَ مِنْهُمْ فِتْنَةً تدع الْحَلِيم فيهم حيران» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

দীনের আবরণে দুনিয়া হাসিল করা খুবই গর্হিত কাজ। বৈধ পন্থায় দুনিয়ার ধন-দৌলত উপার্জন করা অন্যায় নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে দুনিয়ার উপায়-উপকরণ হাসিল করা খুবই সওয়াবের কাজ। কিন্তু দীনের ছদ্মবেশে দুনিয়ার সুযোগ-সুবিধা হাসিল করা বা নিজের পার্থিব স্বার্থ হাসিল করার জন্য আল্লাহর দীনকে ব্যবহার করা চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রতারণা। তাদের বেশভূষা, চাল-চলন, কথাবার্তা, পলিসি-প্রোগ্রাম এবং প্রচারের দ্বারা সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয়। আল্লাহর বান্দাগণ এ ধরনের বকধার্মিকদেরকে প্রকৃত ধার্মিক জ্ঞান করে তাদের উপদেশ গ্রহণ করে, তাদেরকে অনুসরণ করে, তাদের ইশারা-ইঙ্গিতে শ্রম ও অর্থ কুরবান করে, তাদের প্রদর্শিত রাস্তাকে হিদায়াতের সঠিক তরীকা জ্ঞান করে এবং সারা জীবন তাদের ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণার প্রচারে প্রকাশ্যে সাহায্য করে। বকধার্মিকদের বাহ্যিক আচরণ ও মিষ্ট কথাবার্তা থেকে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না যে, তারা উঁচুদরের প্রতারক, বিরাট মুনাফা অর্জনের জন্য তারা এরূপ সুকৌশলে দীনের তেজারত শুরু করেছে। এ ধরনের মানুষ যে সমাজের কত বিরাট ক্ষতি করে, তা নবী করীম ﷺ-এর উপমা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়। তিনি এ ধরনের ধর্ম ব্যবসায়ীদেরকে ভেড়ার চামড়ায় আবৃত নেকড়ে বাঘের সাথে তুলনা করেছেন। যদি কোন নেকড়ে বাঘ মেষের আকৃতি ধারণ করে মেষপালের নিকট যায়, তাহলে পালের মেষ তাকে ভিন্ন পশু মনে করবে না এবং তা থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টাও করবে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নেকড়ে বাঘ মেষপালের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করবে। অনুরূপভাবে ধর্ম ব্যবসায়ী প্রতারক হিসেবে মানুষের কাছে আসে না; বরং একজন ধার্মিক ব্যক্তির আকৃতি ধারণ করে মানুষের সরলতা ও বিশ্বাসের সুযোগ গ্রহণ করে সমাজের ক্ষতি সাধন করে। একজন সাধারণ প্রতারক সমাজের যা ক্ষতি না করতে পারে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি একজন ধর্ম ব্যবসায়ী সমাজের ক্ষতি করে। আখেরী যামানায় ধর্ম ব্যবসায়ীদের আবির্ভাব হবে বলে নবী করীম ﷺ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। ধর্ম ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে।

যারা দীনের ছদ্মাবরণে দুনিয়া হাসিল করে, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার যিন্দেগীতে শাস্তি দান করবেন। আল্লাহ এ ধরনের বকধার্মিকদেরকে শাস্তি দান করার জন্য তাদের নিজেদের মধ্য থেকেএমন মারাত্মক ফিতনার সৃষ্টি করবেন যা তাদেরকে চরম হয়রান-পেরেশান করবে। জঘন্য দুষ্কর্মের কারণে দুনিয়ার যিন্দেগীতে অশান্তি ও অপমানের আগুনে জ্বলেপুড়ে মরবে এবং আখিরাতে আগুনের আযাবে বিদগ্ধ হবে। (তিরমিযী)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান