মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৩০- নবীজী সাঃ এর মর্যাদা ও শামাঈল অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৭৬২
- নবীজী সাঃ এর মর্যাদা ও শামাঈল অধ্যায়
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নবীকুল শিরোমণি -এর মর্যাদাসমূহ
৫৭৬২। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর কতিপয় সাহাবী এক স্থানে বসিয়া কথাবার্তা বলিতেছিলেন। এই সময় হুযূর (ﷺ) সেই দিকে বাহির হইলেন এবং তাহাদের নিকটে পৌঁছিয়া তাহাদের কথাবার্তা ও আলোচনাগুলি শুনিলেন। তাহাদের একজন বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইবরাহীমকে খলীল বানাইয়াছেন। আরেকজন বলিলেন, হযরত মুসা কালীমুল্লাহ্) ছিলেন এমন, আল্লাহ্ তা'আলা যাঁহার সহিত সরাসরি কথা বলিয়াছেন। অপর একজন বলিলেন, হযরত ঈসা ছিলেন কালেমাতুল্লাহ্ ও রূহুল্লাহ্ এবং আরেকজন বলিলেন, হযরত আদমকে আল্লাহ্ তা'আলা ছফীউল্লাহ বানাইয়াছেন।
এই সময় রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, আমি তোমাদের কথাবার্তা এবং তোমরা যে বিস্ময় প্রকাশ করিয়াছ তাহা শুনিয়াছি। ইবরাহীম যে খলীলুল্লাহ্ ছিলেন ইহা ঠিকই। মুসা যে সরাসরি আল্লাহর সাথে কথাবার্তা বলিয়াছেন ইহাও সত্য কথা। ঈসা যে রূহুল্লাহ্ ও কালেমাতুল্লাহ্ ছিলেন ইহাও প্রকৃত কথা এবং আদম যে আল্লাহর মনোনীত, মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন, ইহাও সম্পূর্ণ বাস্তব। তবে জানিয়া রাখ, আমি হইলাম, 'আল্লাহর হাবীব', ইহাতে গর্ব নয় এবং কিয়ামতের দিন আমিই হামদের ঝাণ্ডা উত্তোলন ও বহনকারী হইব—আদম ও অন্যান্য নবীগণ উক্ত ঝাণ্ডার নীচেই থাকিবেন, ইহাতে গর্ব নয়। কিয়ামতের দিন আমিই হইব সর্বপ্রথম শাফা'আতকারী এবং সর্বপ্রথম আমার সুপারিশই কবূল করা হইবে, ইহাতে গর্ব নয়। আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতের দরওয়াজার কড়া নাড়া দিব। তখন আল্লাহ্ তা'আলা আমার জন্য উহা খুলিয়া দিবেন এবং আমাকে উহাতে প্রবেশ করাইবেন। আর আমার সঙ্গে থাকিবে গরীব ঈমানদারগণ, ইহাতে গর্ব নয়। পরিশেষে কথা হইল, আর আমিই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের চাইতে সম্মানিত, ইহাও গর্ব নয়। —তিরমিযী ও দারেমী
كتاب الفضائل والشمائل
وَعَن ابْن عَبَّاس قَالَ: جَلَسَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَخَرَجَ حَتَّى إِذَا دَنَا مِنْهُمْ سَمِعَهُمْ يَتَذَاكَرُونَ قَالَ بَعْضُهُمْ: إِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا وَقَالَ آخَرُ: مُوسَى كَلَّمَهُ اللَّهُ تَكْلِيمًا وَقَالَ آخَرُ: فَعِيسَى كَلِمَةُ الله وروحه. وَقَالَ آخَرُ: آدَمُ اصْطَفَاهُ اللَّهُ فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ: «قَدْ سَمِعْتُ كَلَامَكُمْ وَعَجَبَكُمْ أَنَّ إِبْرَاهِيمَ خَلِيل الله وَهُوَ كَذَلِكَ وَآدَمُ اصْطَفَاهُ اللَّهُ وَهُوَ كَذَلِكَ أَلَا وَأَنَا حَبِيبُ اللَّهِ وَلَا فَخْرَ وَأَنَا حَامِلُ لِوَاءِ الْحَمْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تَحْتَهُ آدَمُ فَمَنْ دُونَهُ وَلَا فَخْرَ وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا فَخْرَ وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ يُحَرِّكُ حَلَقَ الْجَنَّةِ فَيَفْتَحُ اللَّهُ لِي فَيُدْخِلُنِيهَا وَمَعِي فُقَرَاءُ الْمُؤْمِنِينَ وَلَا فَخْرَ وَأَنَا أَكْرَمُ الْأَوَّلِينَ وَالْآخَرِينَ عَلَى اللَّهِ وَلَا فَخر» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ والدارمي





(ضَعِيف)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্বভাব মুবারক ও সাধারণ রীতি ছিল বিনয়-নম্রতা প্রকাশের। তবে প্রয়োজন দেখা দিলে আল্লাহ্ তা'আলার বাণী- وَاَمَّا بِنِعۡمَۃِ رَبِّکَ فَحَدِّثۡ পালনার্থে আল্লাহর সেই বিশেষ নি'আমতরাজি, সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা এবং স্তরেরও উল্লেখ করতেন, যে গুলোর ব্যাপারে তিনি বৈশিষ্ট্যিমণ্ডিত ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা)-এর আলোচ্য হাদীস তাঁর সেই বর্ণনার ধারাবাহিকতা।

আলোচ্য হাদীসে যে সব সাহাবীর আলোচনা উল্লিখিত হয়েছে তাঁরা হযরত ইব্রাহীম (আ), হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ), হযরত আদম (আ) প্রমুখের প্রতি আল্লাহ তা'আলার দানকৃত বিশেষ নি'আমতরাজি সম্বন্ধে অবগত ছিলেন, তাই তাঁরা আলোচনা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা ও কুরআন মজীদ থেকে এ সব তাঁদের জানা ছিল। তবে সম্ভবত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদার স্তর সম্বন্ধে তাঁদের জানা অপ্রতুল ছিল। এজন্য এটা তাঁদের প্রয়োজন ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এ ব্যাপারে তাঁদেরকে বলবেন। সুতরাং তিনি তাঁদেরকে বললেন এবং এভাবে বললেন যে, হযরত ইব্রাহীম (আ), হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ) ও হযরত আদম (আ)-এর প্রতি আল্লাহ্ যে সব নি'আমতরাজি এবং তাঁদের যে ফযীলত ও প্রশংসা তাঁরা করছিলেন, প্রথমে তিনি সে সবের সত্যায়ন করেন। এর পর নিজের সম্বন্ধে বলেন, আমার প্রতি আল্লাহ্ তা'আলার এ বিশেষ বৈশিষ্টমণ্ডিত নি'আমতরাজি রয়েছে যে, আমাকে মাহবুবের স্থান দেওয়া হয়েছে। আর আমি আল্লাহর হাবীব। (উল্লেখ্য, সাহাবা কিরামকে তিনি একথা বলেছিলেন, তাঁরা জানতেন যে, মাহবুবের স্থান সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবার উর্ধ্বে। এ জন্য তিনি এ বিষয় অধিক সুস্পষ্ট করার প্রয়োজন মনে করেন নি)।

এরপর তিনি আল্লাহ্ তা'আলার কতক সেই নি'আমতের উল্লেখ করেন, যেগুলোর প্রকাশ এ জগত সমাপ্তির পর কিয়ামতে হবে। সে গুলোর মধ্যে لِوَاءُ الْحَمْدِ (প্রশংসার পতাকা) হাতে আসা। সর্ব প্রথম সুপারিশকারী ও সর্ব প্রথম সুপারিশ গৃহীত হওয়ার বিষয় উল্লিখিত হাদীসসমূহেও এসেছে। এরপর তিনি আল্লাহ্ তা'আলার দু'টি বিশেষ নি'আমতের উল্লেখ করেন। ১. জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করাবার জন্যে সর্ব প্রথম আমিই এর হুড়কাগুলো নাড়া দেব। (যে ভাবে কোন ঘরের দরজা খুলবার জন্যে করাঘাত করা হয়) আল্লাহ্ তা'আলা তৎক্ষণাত দরজা খুলিয়ে দেবেন ও আমাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। আর আমার সাথে মু'মিনদের ফকিরগণ হবে। তাদেরকেও আমার সাথে জান্নাতে দাখিল করা হবে। (এসব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাহবুবের দরজায় আসীন হওয়ার বাহ্যিক বিষয় হবে।)

এ ধারাবাহিকতায় তিনি শেষ কথা এই বলেন যে, وَأَنَا أَكْرَمُ الْأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ عَلَى اللَّهِ অর্থাৎ এটাও আমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ নি'আমত যে, তাঁর পূর্বাপর সবার থেকে অধিক সম্মান ও মর্যাদা আমারই। আর মর্যাদার যে স্তর আমাকে দেওয়া হয়েছে তা পূর্বাপর কাউকেই দেওয়া হয়নি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এই বাণীসমূহে আল্লাহ্ তা'আলার যে সব নি'আমতরাজির উল্লেখ করেছেন সেগুলোর প্রতিটির সাথে এটাও বলেছেন وَلَا فَخْرَ যে ভাবে বলা হয়েছে এর অর্থ এটাই যে, আল্লাহ্ তা'আলার এসব বিশেষ নি'আমতের উল্লেখ আমি গর্ব ও নিজের বড়ত্ব প্রকাশের জন্য করছি না, বরং কেবল আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে নি'আমতের আলোচনা ও শোকর আদায়ের জন্যে এবং তোমাদেরকে জ্ঞাত করার জন্য করছি। যেন তোমরাও সেই মহান আল্লাহর শোকর আদায় কর। কেননা, এসব নি'আমত তোমাদের জন্য সৌভাগ্য ও কল্যাণের ওসীলা হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান