মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৩১- সাহাবায়ে কিরামের রাঃ মানাকিব ও ফাযায়েল

হাদীস নং: ৬০৫৬
- সাহাবায়ে কিরামের রাঃ মানাকিব ও ফাযায়েল
প্রথম অনুচ্ছেদ - আবু বাকর সিদ্দীক ও উমার ফারূক (রাঃ)-এর মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য
৬০৫৬। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন: একদা এক ব্যক্তি একটি গাড়ী হাঁকাইয়া লইয়া যাইতেছিল। যখন লোকটি ক্লান্ত হইয়া পড়িল, তখন সে উহার উপর সওয়ার হইল। তখন গাভীটি বলিল, আমাদিগকে তো এই কাজের (সওয়ারীর) জন্য সৃষ্টি করা হয় নাই। বরং আমাদিগকে যমীনে কৃষিকাজের জন্যই সৃষ্টি করা হইয়াছে। তখন লোকজন (বিস্ময়ে) বলিয়া উঠিল, সুবহানাল্লাহ্! গাভীও কথা বলিতেছে? এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, আমি এই বিষয়ে ঈমান রাখি আর আবু বকর এবং ওমরও এই বিষয়ে ঈমান রাখেন। অথচ তাহারা দুইজনের কেহই তথায় উপস্থিত ছিলেন না।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরও বলেন, একদা এক রাখাল তাহার বকরীর পালের নিকট ছিল। হঠাৎ এক নেকড়ে বাঘ থাবা মারিয়া পাল হইতে একটি বকরী লইয়া গেল। পরক্ষণেই রাখাল বাঘটির কবল হইতে বকরীটিকে উদ্ধার করিয়া ফেলিল। তখন বাঘটি রাখালকে বলিল, (আজ তো আমার নিকট হইতে ছিনাইয়া নিয়াছ) হিংস্র জন্তুর স্বরাজের দিন এই বকরীর রক্ষাকারী কে থাকিবে? যেইদিন আমি ছাড়া আর কেহই উহার রাখাল থাকিবে না। তখন লোকজন (বিস্ময়ে) বলিয়া উঠিল, সুবহানাল্লাহ্। নেকড়ে বাঘও কথা বলিতে পারে? তখন রাসূলুল্লাহ্ (ছাঃ) বলিলেন, আমি ইহার উপর ঈমান রাখি আর আবু বকর এবং ওমরও ঈমান রাখেন। অথচ তাহারা দুইজনের কেহই তথায় উপস্থিত ছিলেন না। মোত্তাঃ
كتاب المناقب
بَابِ مَنَاقِبِ أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا: الْفَصْل الأول
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: بَينا رجل يَسُوق بقرة إِذْ أعيي فَرَكِبَهَا فَقَالَتْ: إِنَّا لَمْ نُخْلَقْ لِهَذَا إِنَّمَا خُلِقْنَا لِحِرَاثَةِ الْأَرْضِ. فَقَالَ النَّاسُ: سُبْحَانَ اللَّهِ بَقَرَةٌ تَكَلَّمُ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَإِنِّي أومن بِهَذَا أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ» . وَمَا هُمَا ثَمَّ وَقَالَ: بَيْنَمَا رَجُلٌ فِي غَنَمٍ لَهُ إِذْ عدا الذِّئْب فَذهب عَلَى شَاةٍ مِنْهَا فَأَخَذَهَا فَأَدْرَكَهَا صَاحِبُهَا فَاسْتَنْقَذَهَا فَقَالَ لَهُ الذِّئْبُ: فَمَنْ لَهَا يَوْمَ السَّبْعِ يَوْمَ لَا رَاعِيَ لَهَا غَيْرِي؟ فَقَالَ النَّاسُ: سُبْحَانَ الله ذِئْب يتَكَلَّم؟ . قَالَ: أُومِنُ بِهِ أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ وَمَا هما ثمَّ. مُتَّفق عَلَيْهِ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. হযরত আবু বকর এবং ওমর (রাঃ)-এর বিভিন্ন মর্যাদা সম্পর্কে ইতিপূর্বে পৃথক পৃথক অধ্যায়ে আলোচনা করা হইয়াছে। অত্র অধ্যায়ে তাঁহাদের যৌথ মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণনা করা হইবে।

يوم السبع অর্থাৎ, হিংস্র জন্তুর স্বরাজের দিন, যেইদিন সমস্ত মানুষ মরিয়া যাইবে। অবশিষ্ট থাকিবে শুধুমাত্র বন্য জন্তু। অথবা যখন ঘোর ফেতনা দেখা দিবে। ফলে মানুষেরা নিজেকে লইয়া ব্যস্ত থাকিবে, তখন এই বকরীর কোনই রাখাল থাকিবে না।

২. ঈমানের হাকীকত এই যে, আল্লাহর পয়গাম্বর ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সংবাদ পেয়ে যা কিছু বলবেন, এর উপর ঈমান আনতে হবে এবং এটাকে কোন সংশয়-সন্দেহ ছাড়া হক ও সত্য বলে মেনে নিতে হবে-যদিও দুনিয়ার সাধারণ অবস্থার দৃষ্টিতে ঐ বিষয়টি বোধগম্য না হয়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলদ ও বাঘের কথা বলার যে বিষয়টি বর্ণনা করেছেন, এটা এ ধরনের বিষয়ই ছিল। এ কারণেই উপস্থিত লোকদের কেউ কেউ এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তখন হুযুর (ﷺ) বললেন যে, আমার ঈমান এই যে, এটা সত্য ও বাস্তব। তিনি নিজের সাথে আবু বকর রাযি. ও উমরের রাযি. নাম নিয়েও বললেন যে, তাঁদের দু'জনেরও ঈমান রয়েছে যে, এটা সত্য ও বাস্তব। বর্ণনাকারী বলেন যে, একথা তিনি এমন সময় বললেন, যখন তাঁদের দু'জনের একজনও সেখানে বর্তমান ছিলেন না। এ জন্য এ সন্দেহও করা যায় না যে, তাঁদের প্রতি সম্মান দেখাতে গিয়ে কিংবা তাঁদেরকে খুশী করার জন্য তিনি এ কথা বলেছেন। এটা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পবিত্র যবানে হযরত আবু বকর রাযি. ও উমরের রাযি. পরিপূর্ণ ঈমান, ঈমানী অবস্থায় হুযুর (ﷺ)-এর অতি নিকটবর্তী হওয়া এবং এক্ষেত্রে তাঁদের বৈশিষ্ট্যের প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এ দু'জনের সাথে হুযুর (ﷺ)-এর ঐ আচরণেরও এটা একটি উদাহরণ, হযরত আলী রাযি.-এর উক্তিতে পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অনেক ক্ষেত্রে নিজের সাথে এ দু'জনের উল্লেখও তাঁদের নাম নিয়ে করতেন। رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَ وَأَرْضَاهُمَ

হাদীসের শেষাংশে يوم السبع শব্দ রয়েছে। হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ এর ব্যাখ্যায় বিভিন্ন বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। এ অধমের নিকট এ বক্তব্যটি প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য কিয়ামতের নিকটবর্তী ঐ দিন, যখন কিয়ামতের আলামতসমূহ প্রকাশ পেয়ে যাবে। ঐ সময় লোকেরা ভেড়া, বকরী ইত্যাদি গবাদি পশুর হেফাযত ও দেখাশোনার কথা ভুলে যাবে। এরা লাওয়ারিশ হয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরবে এবং বাঘ ইত্যাদি হিংস্র প্রাণীরাই এদের ওয়ারিস ও মালিক হয়ে যাবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই এটাকে يوم السبع (হিংস্র প্রাণীদের রাজত্বের দিন) বলা হয়েছে।
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান