আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৫০- নবীজীর সাঃ যুদ্ধাভিযানসমূহ

হাদীস নং: ৪১০৫
আন্তর্জাতিক নং: ৪৪৫২ - ৪৪৫৪
- নবীজীর সাঃ যুদ্ধাভিযানসমূহ
২২৪৭. নবী কারীম (ﷺ)- এর রোগ ও তাঁর ওফাত।
৪১০৫। ইয়াহয়া ইবনে বুকায়র (রাহঃ) .... আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু বকর (রাযিঃ) ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে তার সুনহের বাড়ি থেকে আগমন করেন। ঘোড়া থেকে অবতরণ করে তিনি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন, কিন্তু কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে সোজা আয়েশা (রাযিঃ)- এর কাছে উপস্থিত হন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)- এর উদ্দেশ্যে। তখন নবী কারীম (ﷺ) ইয়ামানী চাঁদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। তখন তিনি চেহারা হতে কাপড় হটিয়ে তাঁর ওপর ঝুঁকে পড়েন এবং তাঁকে চুমু দেন ও কেঁদে ফেললেন। তারপর বললেন, আমার মাতাপিতা আপনার প্রতি কুরবান হোক! আল্লাহর কসম আল্লাহ তো আপনাকে দু’বার মৃত্যু দিবেন না, যে মৃত্যু ছিলো আপনার জন্য নির্ধারিত সে মৃত্যু আপনি গ্রহণ করে নিলেন।
ইমাম যুহরী (রাহঃ) বলেন, আমাকে আবু সালামা (রাযিঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, আবু বকর (রাযিঃ) বের হয়ে আসেন তখন উমর (রাযিঃ) লোকজনের সাথে কথা বলছিলেন। এ সময় আবু বকর (রাযিঃ) তাঁকে বলেন, হে উমর বসে পড়। উমর (রাযিঃ) বসতে অস্বীকার করলেন। তখন সাহাবীগণ উমর (রাযিঃ)- কে ছেড়ে আবু বকর (রাযিঃ)- এর প্রতি মনোনিবেশ করলেন। তখন আবু বকর (রাযিঃ) ভাষণ দিলেন- “এরপর আপনাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদ (ﷺ)- এর ইবাদত করতেন, তিনি তো ইন্‌তিকাল করেছেন। আর যারা আপনাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদত করতেন (জেনে রাখুন) আল্লাহ চিরঞ্জীব, চির অমর। মহান আল্লাহ্ বলেন, وَمَا مُحَمَّدٌ إِلاَّ رَسُولٌ- قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ الخ মুহাম্মাদ (ﷺ) একজন রাসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন। ....কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন (৩ঃ ১৪৪)
ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, আবু বকর (রাযিঃ)- এর পাঠ করার পূর্বে লোকেরা যেন জানতো না যে আল্লাহ্ তাআলা এরূপ আয়াত নাযিল করেছেন। এরপর সমস্ত সাহাবী তাঁর থেকে উক্ত আয়াত শিখে নিলেন। তখন সকলে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে লাগলেন। আমাকে সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (রাহঃ) অবহিত করেন যে, উমর (রাযিঃ) বলেছেন, আল্লাহর কসম, আমি যখন আবু বকর (রাযিঃ)- কে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম, তখন হতভম্ব হয়ে গেলাম, এবং আমার পা দু’টি যেন আমাকে আর বহন করতে পারছিল না, আমি জমীনের ওপর পড়ে গেলাম। যখন আমি শুনতে পেলাম যে, তিনি তিলাওয়াত করছেন যে, নবী কারীম (ﷺ) ইন্‌তিকাল করেছেন।
كتاب المغازى
بَابُ مَرَضِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَوَفَاتِهِ
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ، أَنَّ عَائِشَةَ، أَخْبَرَتْهُ أَنَّ أَبَا بَكْرٍ ـ رضى الله عنه ـ أَقْبَلَ عَلَى فَرَسٍ مِنْ مَسْكَنِهِ بِالسُّنْحِ حَتَّى نَزَلَ، فَدَخَلَ الْمَسْجِدَ فَلَمْ يُكَلِّمِ النَّاسَ حَتَّى دَخَلَ عَلَى عَائِشَةَ، فَتَيَمَّمَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهْوَ مُغَشًّى بِثَوْبِ حِبَرَةٍ، فَكَشَفَ عَنْ وَجْهِهِ ثُمَّ أَكَبَّ عَلَيْهِ فَقَبَّلَهُ وَبَكَى. ثُمَّ قَالَ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي، وَاللَّهِ لاَ يَجْمَعُ اللَّهُ عَلَيْكَ مَوْتَتَيْنِ، أَمَّا الْمَوْتَةُ الَّتِي كُتِبَتْ عَلَيْكَ فَقَدْ مُتَّهَا. قَالَ الزُّهْرِيُّ وَحَدَّثَنِي أَبُو سَلَمَةَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ، خَرَجَ وَعُمَرُ يُكَلِّمُ النَّاسَ فَقَالَ اجْلِسْ يَا عُمَرُ، فَأَبَى عُمَرُ أَنْ يَجْلِسَ. فَأَقْبَلَ النَّاسُ إِلَيْهِ وَتَرَكُوا عُمَرَ، فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ أَمَّا بَعْدُ مَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ، وَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ حَىٌّ لاَ يَمُوتُ، قَالَ اللَّهُ (وَمَا مُحَمَّدٌ إِلاَّ رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ) إِلَى قَوْلِهِ (الشَّاكِرِينَ) وَقَالَ وَاللَّهِ لَكَأَنَّ النَّاسَ لَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ أَنْزَلَ هَذِهِ الآيَةَ حَتَّى تَلاَهَا أَبُو بَكْرٍ، فَتَلَقَّاهَا مِنْهُ النَّاسُ كُلُّهُمْ فَمَا أَسْمَعُ بَشَرًا مِنَ النَّاسِ إِلاَّ يَتْلُوهَا. فَأَخْبَرَنِي سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيَّبِ أَنَّ عُمَرَ قَالَ وَاللَّهِ مَا هُوَ إِلاَّ أَنْ سَمِعْتُ أَبَا بَكْرٍ تَلاَهَا فَعَقِرْتُ حَتَّى مَا تُقِلُّنِي رِجْلاَىَ، وَحَتَّى أَهْوَيْتُ إِلَى الأَرْضِ حِينَ سَمِعْتُهُ تَلاَهَا أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَدْ مَاتَ.

হাদীসের ব্যাখ্যা:

যে দিন হুযূর (ﷺ)-এর ওফাত হয়, সেদিন সকালে তাঁর অবস্থা অনেক ভাল ও স্বস্তিদায়ক হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যই হযরত আবু বকর রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের আবাসস্থলে 'সুন্‌হ', চলে গিয়েছিলেন। তিনি তখনও সেখানেই ছিলেন, এ দিকে হুযুর (ﷺ)-এর ওফাত হয়ে গেল। যারা এ সংবাদ জানতে পারল, তারা সমবেত হতে লাগল। তাদের মধ্যে হযরত উমর রাযি. ও ছিলেন, যিনি কোন ভাবেই একথা মানতে; বরং শুনতেও প্রস্তুত ছিলেন না যে, হুযূর (ﷺ) ইন্তিকাল করে গিয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার এ হাদীসেরই ব্যাখ্যায় মুসনাদে আহমদের বরাতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন যে, যখন হুযুর (ﷺ) ইন্তিকাল করলেন এবং আমি তাঁকে চাদর পরিয়ে দিলাম, তখন হযরত উমর ও মুগীরা ইবনে শো'বা রাযি. আসলেন এবং হুযুর (ﷺ)-কে দেখার জন্য ভিতরে আসার অনুমতি চাইলেন। আমি তখন পর্দার ভিতর চলে গেলাম এবং তাঁদের দু'জনকেই অনুমতি দিলাম। তাঁরা দু'জনই ভিতরে আসলেন। হযরত উমর রাযি. হুযুর (ﷺ)-কে দেখে বললেন, وا غشيتاه (হায়! এ কেমন মূর্ছা যাওয়া।) তারপর উভয়ে যখন বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন হযরত মুগীরা রাযি. হযরত উমরকে বললেন, এটা মূর্ছা যাওয়া নয়, হুযুর (ﷺ) তো বিদায় হয়ে গিয়েছেন। হযরত উমর রাযি. তখন তাকে জোরে ধমক দিলেন এবং বললেন, হুযুর (ﷺ)-কে সে সময় পর্যন্ত দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেওয়া হবে না, যে পর্যন্ত না অমুক অমুক কাজ আঞ্জাম দিবেন- যেগুলো এ পর্যন্ত আঞ্জাম দেওয়া হয়নি। বস্তুতঃ হযরত উমরের এ অবস্থাই ছিল এবং তিনি পূর্ণ জোর দিয়ে লোকদেরকে একথাই বলে যাচ্ছিলেন। এ অবস্থায়ই হযরত আবূ বকর রাযি. ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে এসে পৌঁছলেন। প্রথমে মসজিদে আসলেন, যেখানে লোকজন সমবেত ছিল, কিন্তু কারো সাথে কোন কথা বললেন না; বরং হযরত আয়েশার হুজরায় প্রবেশ করলেন, চেহারা মুবারক থেকে কাপড় সরালেন, কাঁদতে কাঁদতে চুমু খেলেন এবং বললেন, আমার পিতা মাতা আপনার উপর কোরবান। যে মৃত্যু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য লিপিবদ্ধ ছিল সেটা এসেই গিয়েছে।

(বুখারী শরীফেরই অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত আবু বকর রাযি. এ সময় إِنَّا لِلَّہِ وَإِنَّا إِلَیْہِ رَاجِعُون ও বললেন।) এরপর হযরত আবূ বকর রাযি. বাইরে তাশরীফ আনলেন। এখানে হযরত উমর রাযি. নিজের ধারণা অনুযায়ী লোকদের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন। হযরত আবু বকর রাযি. তাকে বললেন, বসে যাও, অর্থাৎ, লোকদের সামনে যে বক্তব্য রাখছ তা বন্ধ করে দাও। কিন্তু হযরত উমর রাযি. এ সময় অবস্থার কাছে এমন পরাজিত ছিলেন যে, হযরত আবু বকরের কথা তিনি মানলেন না; বরং মানতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানালেন। হযরত আবু বকর রাযি. হযরত উমরকে এ অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে মসজিদের মিম্বরে তাশরীফ আনলেন। এবার সব মানুষ হযরত উমরকে ছেড়ে দিয়ে আবু বকরের নিকট এসে গেল। তিনি তখন ভাষণ দিলেন। তিনি সেখানে কুরআন মজীদের সূরা আলে এমরানের ১৪৪ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন।

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-এর এ ভাষণ ও এ আয়াত প্রতিটি ঈমানদারের অন্তরে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিল যে, হুযুর (ﷺ)-কে একদিন এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে, তাই বিদায় নিয়েছেন। আর আমাদের জীবন-মরণ তাঁরই প্রদর্শিত পথে হওয়া উচিত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, এ বিশেষ মুহূর্তে হযরত আবু বকর রাযি.-এর মুখে এ আয়াত শোনার পর সবার মুখেই এটা উচ্চারিত হচ্ছিল। সবাই এ আয়াত তিলাওয়াত করে নিজের মনকে এবং অন্যদেরকে ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হেদায়াতের উপর দৃঢ়পদ থাকার সবক দিচ্ছিল।

এ ঘটনা প্রসঙ্গেই সামনে ইমাম যুহরী সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, স্বয়ং হযরত উমর রাযি. বলেছেন যে, যখন আবূ বকর রাযি. وَمَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوۡلٌ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন, তখন নিজের ভুল উপলব্ধি করে আমার এ অবস্থা হয়ে হয়ে গেল যে, আমি যেন নিষ্প্রাণ হয়ে গেলাম, আমার পায়ে এতটুকু শক্তি রইল না যে, আমি দাঁড়াতে পারি। আমার অন্তর সায় দিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিশ্চয়ই ওফাত পেয়ে গেছেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)