মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৩১- সাহাবায়ে কিরামের রাঃ মানাকিব ও ফাযায়েল

হাদীস নং: ৬১৩৪
- সাহাবায়ে কিরামের রাঃ মানাকিব ও ফাযায়েল
তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আশারাহ্ মুবাশশারা রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য
৬১৩৪। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলিয়াছেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা আবু বকরের প্রতি অনুগ্রহ করুন। তিনি স্বীয় কন্যাকে আমার নিকট বিবাহ দিয়াছেন, নিজের উটে আমাকে সওয়ার করাইয়া “দারুল হিজরতে” লইয়া আসিয়াছেন, সত্তর গুহায় আমার সাথে ছিলেন এবং নিজের মাল দ্বারা বেলালকে খরিদ করিয়া আযাদ করিয়াছেন। আল্লাহ্ ওমরের প্রতি অনুগ্রহ করুন। তিনি সত্যবাদী ছিলেন, যদিও তাহা (কাহারও কাছে) তিক্ত হইত। সত্যবাদিতা তাঁহাকে এমন পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে যে, তাঁহার কোন বন্ধু নাই। আল্লাহ্ ওসমানের প্রতি অনুগ্রহ করুন, ফিরিশতাও তাঁহাকে লজ্জা করেন। আল্লাহ্ তা'আলা আলীর প্রতি অনুগ্রহ করুন। হে আল্লাহ্। হককে আলীর সাথে করিয়া দাও, যেইদিকে আলী থাকেন (হকও যেন সেইদিকে থাকে)। —তিরমিযী, এবং তিনি বলিয়াছেন, হাদীসটি গরীব।
كتاب المناقب
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «رَحِمَ اللَّهُ أَبَا بَكْرٍ زَوَّجَنِي ابْنَتَهُ وَحَمَلَنِي إِلَى دَارِ الْهِجْرَةِ وَصَحِبَنِي فِي الْغَارِ وَأَعْتَقَ بِلَالًا مِنْ مَالِهِ. رَحِمَ اللَّهُ عُمَرَ يَقُولُ الْحَقَّ وَإِنْ كَانَ مُرًّا تَرَكَهُ الْحَقُّ وَمَا لَهُ مِنْ صَدِيقٍ. رَحِمَ اللَّهُ عُثْمَانَ تَسْتَحْيِيهِ الْمَلَائِكَةُ رَحِمَ اللَّهُ عَلِيًّا اللَّهُمَّ أَدِرِ الْحَقَّ مَعَهُ حَيْثُ دَارَ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর এ বক্তব্যে চারজন খুলাফায়ে রাশেদিনের জন্যই রহমত ও অনুগ্রহের দু‘আ করেছেন। সর্বপ্রথম খলীফায়ে আউয়াল হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর জন্য দু‘আ করেছেন এবং বিশেষভাবে তাঁর তিনটি পুণ্য কাজের উল্লেখ করেছেন। সর্বপ্রথম তিনি তাঁর ঐ কাজটির কথা উল্লেখ করেছেন যে, আবু বকর সিদ্দীক রাযি. স্বীয় কন্যা হযরত আয়েশাকে তাঁর নিকট বিয়ে দিয়েছিলেন। এ অধম সংকলকের ধারণা যে, হযরত আয়েশা রাযি. ছাড়া যদিও কমপক্ষে আরো আটজন স্ত্রী তাঁর ছিল, কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিশেষ গুরুত্ব এই ছিল যে, হুযুর (ﷺ)-এর সর্বপ্রথম জীবন সঙ্গিনী হযরত খাদীজাতুল কুবরা রাযি.-এর ইন্তিকালে হুযুর (ﷺ)-এর অন্তরে খুবই বেদনা ও শোক ছিল। কেননা, তাঁর ঈমানদারী, দুরদর্শিতা, জ্ঞান গরিমা ও সংসারের চিন্তা হুযুর (ﷺ)কে অনেকটা চিন্তামুক্ত রাখত। ঐ সময় অদৃশ্য জগত থেকে তিনি ইশারা পেয়েছিলেন যে, আবু বকর সিদ্দীকের কন্যা হযরত আয়েশা রাযি. আপনার জীবন সঙ্গিনী হবে। যদিও আয়েশা রাযি. তখন খুবই কমবয়সী ছিলেন; কিন্তু হুযুর (ﷺ) গায়েবী ইশারার ভিত্তিতে বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত হয়ে আছে এবং তাঁর সান্নিধ্য হযরত খাদীজার মতই আমার জন্য কল্যাণকর ও আত্মার প্রশান্তির কারণ হবে। অতএব, একজন নেককার মহিলা খাওলা বিনতে হাকীম হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর নিকট হুযুর (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে বিয়ের পয়গাম পাঠালেন। উপরে যেমন বলে আসা হয়েছে যে, হযরত আয়েশা রাযি. ঐ সময় খুবই অল্পবয়স্কা ছিলেন। তাছাড়া তাঁর বিয়ের কথাবার্তা যুবায়ের ইবনে মুতইমের ছেলের সাথে ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছিল- যিনি আবু বকরের রাযি. মতই মক্কার স্বচ্ছল ও বিত্তশালী লোকদের মধ্যে একজন ছিলেন। অপরদিকে হুযুর (ﷺ)-এর আর্থিক অবস্থা হযরত আবু বকরের রাযি. চোখের সামনেই ছিল। এতদসত্ত্বেও তিনি হুযুর (ﷺ)-এর এ অবস্থা উপেক্ষা করে এ আশায় যে, এ বিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অন্তরের প্রশান্তির কারণ হবে- নিজের এবং কন্যার সৌভাগ্য মনে করে এ প্রস্তাব মনযূর করে নিলেন এবং হযরত আয়েশাকে রাযি. তাঁর কাছে বিয়ে দিয়ে দিলেন।

বস্তুত হুযুর (ﷺ) নিজের উপরের বক্তব্যে হযরত আবু বকরের রাযি. জন্য রহমতের দু‘আ করার সাথে প্রথমে তাঁর এই এহসানের কথা উল্লেখ করেছেন। তারপর তাঁর ঐ দ্বিতীয় এহসান ও অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি মদীনা শরীফে হিজরত করার জন্য আমার সকল ব্যবস্থাপনা আঞ্জাম দিয়েছিলেন এবং পূর্ণ সফরে আমার সাথে ছিলেন। শেষে হুযুর (ﷺ) হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর ঐ তৃতীয় পুণ্য কাজটির কথা উল্লেখ করলেন যে, হযরত বিলাল হাবশীকে যিনি মক্কার এক চরম পাষাণ হৃদয় কাফেরের গোলাম ছিলেন। সে কেবল হুযূর (ﷺ)-এর প্রতি ঈমান আনার কারণে ও শিরক বর্জন করে তাওহীদ কবুল করার অপরাধে তাকে অমানবিক নির্যাতন করত। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি., হযরত বিলালের মালিককে তার চাওয়া দাম দিয়ে বিলালকে ক্রয় করে নিলেন এবং মুক্ত করে দিলেন। যদিও হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. হযরত বিলাল ছাড়াও এমন একাধিক দাসদাসীকে ক্রয় করে মুক্ত করে দিয়েছিলেন- যাদেরকে তাদের কাফের ও মুশরিক মালিকরা কেবল ইসলাম গ্রহণের কারণে নির্যাতন করত। কিন্তু হযরত বিলাল হাবশীর বৈশিষ্ট্যের কারণে হুযুর (ﷺ) এ বক্তব্যে কেবল তাকেই ক্রয় করে মুক্ত করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর পর হুযুর (ﷺ) দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর রাযি. এর বেলায় রহমতের দু‘আ করেছেন এবং তাঁর ঐ বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, তিনি মানুষের সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির পরওয়া না করে প্রতিটি ব্যাপারে হক কথা বলেন- যদিও মানুষের কাছে তা তিক্ত মনে হয় এবং তারা তার থেকে দূরে সরে যায় কিংবা অসন্তুষ্ট হয়ে যায়। বুঝা গেল যে, কোন বান্দার এ অবস্থাও আল্লাহ ও রাসূলের নিকট খুবই পছন্দীয় এবং এমন বান্দা আল্লাহ্ তা'আলার রহমতের পাত্র। হযরত উমর রাযি.-এর পর হুযুর (ﷺ)-এর তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রাযি.-এর পক্ষে রহমতের দু‘আ করেছেন এবং তাঁর ঐ গুণের কথা উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর ফিরিশতারাও তাঁকে দেখে লজ্জা করে। হযরত উসমান রাযি.-এর পর হুযুর (ﷺ) চতুর্থ খলীফা হযরত আলী রাযি.-এর পক্ষে রহমতের দু‘আ করেছেন এবং সাথে এ দু‘আও করেছেন যে, হে আল্লাহ্! তুমি আলীর সাথে হককে চলমান রাখ। অর্থাৎ, তিনি যেন সর্বদা হকের উপর কায়েম থাকেন এবং হক তাঁর সাথী হয়ে থাকে।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর এ বক্তব্যে যে তরতীব ও ক্রমধারার সহিত এ চারজনের কথা উল্লেখ করেছেন এবং তাঁদের জন্য রহমতের দু‘আ করেছেন, এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তাঁর উম্মতের মধ্যে এ চারজন সবার চাইতে শ্রেষ্ঠ ও উঁচু মর্যাদার অধিকারী এবং তাঁদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য এ ক্রমবিকাশ অনুযায়ীই। তাছাড়া এ তরতীবের দ্বারা এ ইঙ্গিতও পাওয়া যায় যে, হুযুর (ﷺ)-এর পর এ চারজন এ তরতীব অনুযায়ী একজনের পর আরেকজন তাঁর খলীফা হবে। এ ছাড়াও হুযূর (ﷺ)-এর অন্যান্য অনেক বক্তব্যেও এ তরতীব অনুযায়ীই এ চারজনের আলোচনা করা হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান