আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৫২- কুরআনের ফাযাঈল অধ্যায়

হাদীস নং: ৪৬৫৭
আন্তর্জাতিক নং: ৫০২৩
- কুরআনের ফাযাঈল অধ্যায়
২৬২৮. যে ব্যক্তি সুন্দর সুরে কুরআন তিলাওয়াত করে না। আল্লাহর বাণীঃ তাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, আমি আপনার নিকট কিতাব নাযিল করেছি, যা তাদের নিকট পাঠ করা হয়
৪৬৫৭। ইয়াহয়া ইবনে বুকায়র (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ কোন নবী কে ঐ অনুমতি দেননি, যা আমাকে দিয়েছেন, আর তা হয়েছে কুরআন তিলাওয়াত যথেষ্ট। বারী বলেন, এর অর্থ সুষ্পষ্ট করে আওয়াজের সাথে কুরআন পাঠ করা।
كتاب فضائل القرآن
باب مَنْ لَمْ يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ وَقَوْلُهُ تَعَالَى: {أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ}
5023 - حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنِي اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ: أَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَمْ يَأْذَنِ اللَّهُ لِشَيْءٍ مَا أَذِنَ لِلنَّبِيِّ أَنْ يَتَغَنَّى بِالقُرْآنِ» ، وَقَالَ صَاحِبٌ لَهُ: يُرِيدُ يَجْهَرُ بِهِ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীছটিতে উচ্চৈঃস্বরে সুন্দর সুরে কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

مَا أَذِنَ اللهُ لِشَيْء (আল্লাহ কোনওকিছু অতটা গুরুত্বের সঙ্গে শোনেন না)। أَذِنَ শব্দটির উৎপত্তি أَذَنٌ থেকে। এর অর্থ শ্রবণ করা। أِذْنٌ থেকে নয়, যার অর্থ অনুমতি দেওয়া।

مَا أَذِنَ لِنّبِيِّ حَسَنِ الصَّوْتِ يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ يَجْهَرُ بِهِ (সুমধুর সুরের নবীকর্তৃক উচ্চৈঃস্বরে সুর দিয়ে কুরআন পড়াটা আল্লাহ যতটা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন)। অর্থাৎ কোনও নবীর প্রতি আল্লাহ তা'আলা তাঁর যে কালাম নাযিল করেছেন, নবী যখন তা সুন্দর সুরে পাঠ করেন, তখন আল্লাহ তা'আলা খুব গুরুত্বের সঙ্গে তা শুনে থাকেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাতে খুশি হন। কোনও কোনও বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, প্রত্যেক নবীরই সুর ছিল মধুর। হাদীছটি দ্বারা বোঝা গেল কুরআন মাজীদ মধুর সুরে পড়া উচিত। মধুর সুরে কুরআন পড়াটা আল্লাহ পছন্দ করেন।

এর দ্বারা আরও বোঝা যায় সুন্দর সুর আল্লাহ তা'আলার একটা নি'আমত। এ নি'আমতের সদ্ব্যবহার করা উচিত। অনেকে এ নি'আমতের অপব্যবহার করে। তারা গান গেয়ে সময় নষ্ট করে, পাপ কামাই করে এবং নিজের ও অন্যদের ঈমান-আমল বরবাদ করে। এটা নি'আমতের কঠিন অকৃতজ্ঞতা। তাদের উচিত ছিল গান না গেয়ে কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল হওয়া। কুরআন তিলাওয়াত দ্বারা এমনিতেই ছাওয়াব পাওয়া যায়। তদুপরি সুর মধুর হলে সে তিলাওয়াতে নিজেরও মন নরম হয়, অন্যদেরও অন্তরে রেখাপাত করে। ফলে তারাও মনোযোগ দিয়ে শোনে। তাতে তারা ছাওয়াব তো পায়ই, সেইসঙ্গে কুরআন তিলাওয়াতের আছরে তাদের জীবনেও পরিবর্তন আসে।

يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ এর অর্থ সুর দিয়ে কুরআন পড়া। অর্থাৎ কুরআন পাঠের যে বিশেষ সুর, সেই সুরে, ভক্তি ও মুহাব্বতের সঙ্গে এবং আল্লাহর ভয়ে কান্নার ভঙ্গিতে কুরআন পড়া। অধিকাংশের মতে হাদীছে এটাই বোঝানো উদ্দেশ্য। তবে এর মানে এ নয় যে, সংগীত শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী গানের বিভিন্ন সুরের সাথে সুর মিলিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা হবে। এরূপ পড়াটা কুরআনের সঙ্গে সুস্পষ্ট বেআদবী। তাতে কুরআনপাঠের যে মূল উদ্দেশ্য, অন্তর নরম করা, দিল-মন আল্লাহর দিকে ঝোঁকা ও ঈমান বলীয়ান করা, তা মোটেই পূরণ হয় না। কাজেই এ জাতীয় সুরে কুরআন পাঠ করা হতে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। কোনও কোনও বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবেই এ জাতীয় সুরে কুরআন পড়তে নিষেধ করা হয়েছে।

বস্তুত সুন্দর সুরে পাঠ করলে কুরআন পাঠের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। তা বাড়ানোটা কাম্যও বটে। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

زَيَّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ.

তোমরা নিজেদের সুর দ্বারা কুরআনকে অলংকৃত করো। (সুনানে দারিমী: ৩৫৪৩; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৮৭৩৭; মুসনাদে ইবনুল জা'দ : ২০৭৭; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী: ৭৭৪)

অপর এক হাদীছে ইরশাদ-

حَسنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ، فَإِنَّ الصَّوْتَ الْحَسَنَ يَزِيدُ الْقُرْآنَ حُسْنًا.

তোমরা নিজেদের সুর দ্বারা কুরআনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করো। কেননা সুন্দর সুর কুরআনের সৌন্দর্য বাড়ায়। (সুনানে দারিমী: ৩৫৪৪: বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান ১৯৫৫)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কুরআন মাজীদ সুর দিয়ে পড়া উচিত।

খ. সুন্দর সুর আল্লাহ তা'আলার নি'আমত। এর অপব্যবহার করতে নেই।

গ. কুরআনের ইলম মহা নি'আমত। যার এ নি'আমত অর্জিত হয়েছে, তাকে আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী হতে হবে। ধনবানদের সামনে সে নিজেকে কখনওই ক্ষুদ্র ভাববে না। তার যে সম্পদ আছে তার তুলনায় তাদের সম্পদের কোনও মূল্য নেই।

ঘ. কুরআন একমাত্র হিদায়াতগ্রন্থ। এর বর্তমানে হিদায়াতের জন্য অন্য কোনও কিতাব বা বই-পুস্তকের দ্বারস্থ হওয়া ঈমান ও বুদ্ধিমত্তার পরিপন্থি।

ঙ. আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত গুণগ্রাহী। তিনি বান্দার কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য সৎকর্মের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)