আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

২- নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৯৫
- নামাযের অধ্যায়
সফরে কসর নামায পড়া।
১৯৫। নাফে (রাহঃ) বলেন যে, তিনি ইবনে উমার (রাযিঃ)-র সাথে বুরীদ পর্যন্ত সফর করতেন, কিন্তু তিনি (আব্দুল্লাহ) নামায কসর করতেন না।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, কোন ব্যক্তি যখন তিন দিনের দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য বের হয়, তখনই নামায কসর করা যেতে পারে। অর্থাৎ (কমপক্ষে) এতোটা দূরত্ব যা উটে সওয়ার হয়ে অথবা পদব্রজে তিন দিনে স্বাভাবিকভাবে অতিক্রম করা যায়। নিজ বাসস্থান থেকে বের হওয়ার পরই কসরের নামায পড়তে হয়। ইমাম আবু হানীফা (রাহঃ)-রও এই মত।**
أبواب الصلاة
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، حَدَّثَنَا نَافِعٌ، «أَنَّهُ كَانَ يُسَافِرُ مَعَ ابْنِ عُمَرَ الْبَرِيدُ، فَلا يَقْصُرُ الصَّلاةَ» .
قَالَ مُحَمَّدٌ: إِذَا خَرَجَ الْمُسَافِرُ أَتَمَّ الصَّلاةَ، إِلا أَنْ يُرِيدَ مَسِيرَةَ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ كَوَامِلَ بِسَيْرِ الإِبِلِ، وَمَشْيِ الأَقْدَامِ، فَإِذَا أَرَادَ ذَلِكَ، قَصَرَ الصَّلاةَ حِينَ يَخْرُجُ مِنْ مِصْرِهِ، وَيَجْعَلَ الْبُيُوتَ خَلْفَ ظَهْرِهِ، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ، رَحِمَهُ اللَّهُ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রা)-র সূত্রে বর্ণিত আছে যে, হিজরতের পূর্বে নামায দুই রাকআত করে ফরয ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন, তখন মুকীম অবস্থায় আরো দুই রাকআত করে বাড়িয়ে দেয়া হয়। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় আছে, মাগরিবের নামাযকে কসর থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মুকীম ও সফর উভয় অবস্থায় মাগরিবের নামায তিন রাকআত পড়তে হবে ('কসর' অর্থ 'হ্রাস করা' 'কম করা')। আল-কুরআনের আয়াতে কসরের নির্দেশ রয়েছেঃ
وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ إِنْ خِفْتُمْ أَنْ يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنَّ الْكَافِرِينَ

“তোমরা যখন সফরে বের হবে, তখন নামায সংক্ষিপ্ত করলে কোন দোষ নেই; (বিশেষত) কাফেররা তোমাদের বিপদগ্রস্ত করতে পারে বলে যখন তোমাদের আশংকা হবে” (সূরা নিসাঃ ১০১)।
সফরে কেবল ফরয নামায পড়তে হবে, না সুন্নাতও পড়তে হবে এ বিষয়ে মতভেদ আছে। মহানবী (স)-এর কর্মপন্থা থেকে শুধু এতোটুকু জানা যায় যে, তিনি সফররত অবস্থায় ফজরের সুন্নাত এবং বেতেরের নামায পড়তেন, কিন্তু অন্যান্য ওয়াক্তে কেবল ফরয নামাযই পড়তেন, নিয়মিত সুন্নাত পড়ার কথা প্রমাণিত নয়। অবশ্য সময়-সুযোগ হলে তিনি নফল নামায পড়তেন। আরোহী অবস্থায়ও চলতে চলতেও কখনো নফল নামায পড়তেন। এজন্য হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) সফররত অবস্থায় ফজরের সুন্নাত ছাড়া অন্যান্য ওয়াক্তের সুন্নাত পড়তে লোকদের নিষেধ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ আলেম সুন্নাত পড়া বা না পড়া উভয়টিই সংগত মনে করেন। তারা ব্যাপারটি লোকদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। হানাফী মাযহাবের বাছাই করা মত হচ্ছে, পথ অতিক্রম করাকালে সুন্নাত না পড়াই উত্তম। আর কোন মঞ্জিলে উপস্থিত হয়ে স্বস্তি লাভ করার পর সুন্নাত পড়াই উত্তম।
ইমাম শাফিঈ (র) কসর করাকে বাধ্যতামূলক মনে করেন না। তবে তার মতে কসর করা উত্তম এবং না করাটা উত্তম কাজ পরিত্যাগ করার শামিল। ইমাম আহমাদের মতে কসর যদিও ওয়াজিব নয়, কিন্তু কসর না করা মাকরূহ। ইমাম আবু হানীফার মতে কসর করা ওয়াজিব। এরূপ একটি মত ইমাম মালেক থেকেও বর্ণিত আছে। হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সফরে সব সময়ই নামায কসর করেছেন। তিনি সফরে কখনো চার রাকআত নামায পড়েছেন বলে কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় না। আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স), আবু বা (রা), উমার (রা) ও উছমান (রা)-র সফর সঙ্গী হয়েছি। কিন্তু তাদের কখনো কসর না করতে দেখিনি। ইবনে আব্বাস (রা)-সহ যথেষ্ট সংখ্যক সাহাবী বর্ণিত হাদীস এই মতেরই সমর্থন করে। তবে আয়েশা (রা) বর্ণিত দু'টি হাদীস থেকে জানা যায়, সফরে কসর করা বা পূর্ণ নামায পড়া দুটিই ঠিক । কিন্তু সনদ সূত্রের দিক থেকে হাদীস দু'টি দুর্বল। তবুও কেউ যদি পূর্ণ নামায পড়ে তবে তার নামায হয়ে যাবে।
কমপক্ষে কতো দূর পথ বা কতো সময়ের পথ অতিক্রম করার সংকল্প করলে কসর করা যায় সে সম্পর্কেও মতভেদ আছে। যাহেরী মাযহাবের ফিক্‌হে এ সম্পর্কে কোন কিছু নির্দিষ্ট নেই। এই মাযহাবের মত অনুযায়ী যে কোন সফরে কসর করা যায়, তা স্বল্প সময়ের জন্য হোক অথবা দীর্ঘ সময়ের জন্য। ইমাম মালেকের মতে আটচল্লিশ মাইলের কম অথবা একদিন এক রাতের কম সফরে কসর করা যায় না। ইমাম আহমাদেরও এই মত। ইবনে আব্বাস (রা)-ও এই মত প্রকাশ করেছেন। ইমাম শাফিঈ থেকেও এরূপ একটি মত বর্ণিত আছে। হযরত আনাস (রা) পনের মাইল দীর্ঘ সফরেও কসর জায়েয মনে করেন। “এক দিনের সফর কসরের জন্য যথেষ্ট" হযরত উমার (রা)-র এই কথাকে ইমাম যুহরী ও ইমাম আওযাঈ ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছেন। হাসান বসরী দুই দিন এবং ইমাম আবু ইউসুফ দুই দিনের অধিক দীর্ঘ সফরে কসর করা জায়েয মনে করেন। ইমাম আবু হানীফার মতে যে সফরে পায়ে হেঁটে অথবা উটযোগে গেলে তিন দিন অতিবাহিত হয় (প্রায় চুয়ান্ন মাইল) তাতে কসর করা যায়। ইবনে উমার (রা), ইবনে মাসউদ (রা) ও উছমান (রা) এই মত প্রকাশ করেছেন।
সফর ব্যপদেশে কোথাও যাত্রাবিরতি করলে কতো দিন পর্যন্ত কসর করা যাবে, এ সম্পর্কে ইমামদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। ইমাম আহমাদের মতে মুসাফির ব্যক্তি যদি একাধারে চার দিন কোথাও অবস্থান করার সংকল্প করে, তবে তাকে পূর্ণ নামায পড়তে হবে। ইমাম মালেক ও ইমাম শাফিঈর মতে চার দিনের অধিক সময় অবস্থান করার সংকল্প করলে সেখানে কসর করা জায়েয নয়। ইমাম আওযাঈর মতে ১৩ দিন এবং আবু হানীফার মতে ১৫ দিন কিংবা তদুৰ্দ্ধ সময় অবস্থান করার নিয়াত করলে পূর্ণ নামায পড়তে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে এ সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায় না।
সফরকারী যদি কোন কারণে কোথাও ঠেকায় পড়ে অবস্থান করতে থাকে এবং প্রতিটি মুহূর্তে অসুবিধা দূর হওয়ার ও বাড়ির উদ্দেশে প্রত্যাবর্তন করার সম্ভাবনা থাকে, তবে এমন স্থানে অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত কসর করা যেতে পারে। এ সম্পর্কে সকল আলেমই একমত। এরূপ অবস্থায় সাহাবাগণ একাধারে দু'বছর কসর করেছেন বলে প্রমাণ আছে। ইমাম আহমাদ এই ঘটনার উপর কিয়াস করে বন্দীদের জন্য সমস্ত মেয়াদ ব্যাপী কসর করার অনুমতি দিয়েছেন (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান