আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

৪- যাকাতের অধ্যায়

হাদীস নং: ৩২৫
- যাকাতের অধ্যায়
যেসব জিনিসের উপর যাকাত ধার্য হয়।
৩২৫। আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ পাঁচ ওয়াসাকের কম পরিমাণ খেজুরে যাকাত নাই, পাঁচ উকিয়ার কম পরিমাণ রূপায় যাকাত ধার্য হবে না এবং পাঁচ যাওদের কম সংখ্যক উটে যাকাত ধার্য হবে না।**
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এ হাদীসের উপর আমল করি। ইমাম আবু হানীফাও এই হাদীস অনুযায়ী আমল করেন, কিন্তু একটি ক্ষেত্রে মতভেদ আছে। ইমাম সাহেব বলেন, কৃষি উৎপাদনের উপর উশর ধার্য হবে, উৎপাদনের পরিমাণ কম হোক অথবা বেশী, যদি জমি নদীর পানি বা বৃষ্টির পানির দ্বারা সঞ্জীবিত হয়। কিন্তু সেচের মাধ্যমে যে জমীনে পানি সরবারহ করা হয়, তার উৎপাদিত ফসলের উপর অর্ধ-উশর ধার্য হবে। ইবরাহীম নাখাঈ ও মুজাহিদ (রাহঃ)-ও এই মত পোষণ করেন।
كتاب الزكاة
بَابُ: مَا يَجِبُ فِي الزَّكَاةِ
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا محمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي صَعْصَعَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ مِنَ التَّمْرِ صَدَقَةٌ، وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوَاقٍ مِنَ الْوَرِقِ صَدَقَةٌ، وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسٍ ذَوْدٍ مِنَ الإِبِلِ صَدَقَةٌ» ، قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، وَكَانَ أَبُو حَنِيفَةَ يَأْخُذُ بِذَلِكَ إِلا فِي خَصْلَةٍ وَاحِدَةٍ، فَإِنَّهُ، كَانَ يَقُولُ: فِيمَا أَخْرَجَتِ الأَرْضُ الْعُشْرُ مِنْ قَلِيلٍ أَوْ كَثِيرٍ إِنْ كَانَتْ تُشْرَبُ سَيْحًا أَوْ تَسْقِيهَا السَّمَاءُ، وَإِنْ كَانَتْ تُشْرَبُ بِغَرْبٍ أَوْ دَالِيَةٍ فَنِصْفُ عُشْرٍ، وَهُوَ قَوْلُ إِبْرَاهِيمَ النَّخَعَيِّ، وَمُجَاهِدٍ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** এক ওয়াসাক 'ষাট সা'। ইমাম আবু হানীফার মতে 'এক সা' আট রোতল; ইমাম শাফিঈ, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মতে ‘সোয়া পাঁচ রোতল'। এক সা' তিন সের নয় ছটাক। সুতরাং পাঁচ ওয়াসাকে ২৬ মণ ২৮ সের ৯ ছটাক। এক ‘উকিয়ায় ৪০ দিরহাম, পাঁচ উকিয়া আমাদের 'সাড়ে বায়ান্ন' তোলার সমান। পাঁচ যাওদ ১৫ থেকে ৫০টি উট। এখানে ২৪টি উট বুঝানো হয়েছে। বুখারীতে আনাস (রা)-র সূত্রে উল্লেখিত যাকাত সম্পর্কিত দীর্ঘ হাদীস থেকে তা জানা যায় ।
ইমাম শাফিঈ, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ও জমহুরের মতে, উৎপাদিত ফল ও ফসলে যাকাত ধার্য হওয়ার নিম্নতম পরিমাণ হচ্ছে পাঁচ ওয়াসাক। এর কম পরিমাণের উপর যাকাত ধার্য হবে না। বুখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে আবু সাঈদ, জাবের, ইবনে উমার, ইবনে হাযম প্রমুখ সাহাবীদের বর্ণিত হাদীস তাদের মতের সমর্থক। অপরদিকে ইমাম আবু হানীফা ও উমার ইবনে আবদুল আযীয (র)-এর মতে উৎপাদিত ফল ও ফসলের উপর যাকাত ধার্য হবে না, উশর (উৎপাদনের এক-দশমাংশ) বা অর্ধ উশর ধার্য হবে। উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণ পাঁচ ওয়াসাকের কম হলেও তার উপর উশর ধার্য হবে। কেননা বুখারীতে ইবনে উমারের সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “যে জমীনকে আকাশ অথবা প্রবহমান নহর পানি দান করে অথবা যা নালার পানিতে সিক্ত হয় তার উপর উশর ধার্য হবে। আর যে জমীন সেচের মাধ্যমে সিক্ত হয় তাতে অর্ধ উশর ধার্য হবে”। আবু দাউদে ইবনে উমার ও জাবের (রা)-র সূত্রে, মুসলিমে জাবেরের সূত্রে এবং ইবনে মাজায় মুআয (রা)-র সূত্রে বর্ণিত একই বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীসও এই মতের স্বপক্ষে দলীল। ইমাম আবু হানীফার মতে, স্বল্পস্থায়ী শস্য, যেমন শাকসবজি ইত্যাদির উপর উপর ধার্য হবে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ ও অপর ইমামদের মতে, শাকসবজির মতো স্বল্পস্থায়ী শস্যের উপর যাকাত ধার্য হবে না (অনুবাদক)।

হাদীসের ব্যাখ্যা:

নববী যুগে বিশেষ করে মদীনার আশেপাশে যারা ধনী ও অবস্থাসম্পন্ন ছিল, তাদের কাছে সম্পদ সাধারণতঃ তিন প্রকারের যে কোন এক প্রকার থাকত। হয়তো তাদের বাগানের উৎপাদিত ফসল খেজুরের আকারে, অথবা রূপার আকারে কিংবা উটের আকারে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ হাদীসে এ তিন প্রকার সম্পদেরই যাকাতের নেসাব বলে দিয়েছেন, অর্থাৎ, এসব জিনিসের কমপক্ষে কি পরিমাণে যাকাত ওয়াজিব হবে। খেজুরের বেলায় তিনি বলে দিয়েছেন যে, পাঁচ ওয়াসাকের কম হলে এতে যাকাত ওয়াজিব হবে না। এক ওয়াসাক প্রায় ৬ মণের সমান হয়। এ হিসাবে ৫ ওয়াসাক খেজুর প্রায় ৩০ মণ হবে। রূপার ব্যাপারে তিনি বলেছেন যে, ৫ উকিয়্যার কম হলে এতে যাকাত ওয়াজিব হবে না। এক উকিয়্যা রূপা ৪০ দেরহামের সমান হয়। এ হিসাবে ৫ উকিয়্যা ২০০ দেরহামের সমান হবে- যার ওজন প্রসিদ্ধ মত হিসাবে সাড়ে বায়ান্ন তোলা হয়। উটের ব্যাপারে তিনি বলে দিয়েছেন যে, সংখ্যায় পাঁচের কম হলে এতে যাকাত আসবে না। এ হাদীসে কেবল এ তিনটি জিনিসে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার ন্যূনতম পরিমাণ বলে দেওয়া হয়েছে।

হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহঃ) লিখেছেন যে, ৫ ওয়াসাক (৩০ মণ) খেজুর একটি ছোট পরিবারের সারা বছরের সংসার চলার জন্য যথেষ্ট হয়ে যেত। তদ্রপভাবে ২০০ দেরহামে সারা বছরের খরচ চলতে পারত, আর মূল্যমান বিবেচনায় ৫টি উট প্রায় এরই সমান হত। এ জন্য এ পরিমাণ সম্পদের মালিককে অবস্থাসম্পন্ন ও সম্পদশালী ধরে নিয়ে তার উপর যাকাত ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)