আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

৫- রোযার অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৪৮
- রোযার অধ্যায়
কোন সময় পানাহার হারাম হয়?
৩৪৮। যুহরী (রাহঃ)-ও সালেমের সূত্রে (আব্দুল্লাহ ইবনে উমারের) অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম (রাযিঃ)-কে যতোক্ষণ না বলা হতো, “ভোর হয়েছে”, ততোক্ষণ তিনি আযান দিতেন না।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, বিলাল (রাযিঃ) রমযান মাসে লোকদের সাহরী খেতে উঠানোর জন্য রাত থাকতে আযান দিতেন। আর আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম (রাযিঃ) সুবহে সাদেক উদয় হওয়ার পর ফজরের নামাযের জন্য আযান দিতেন। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “ইবনে উম্মে মাকতূমের আযান দেয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার করতে থাকো”।**
أبواب الصيام
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، حَدَّثَنَا الزُّهْرِيُّ، عَنْ سَالِمٍ، مِثْلَهُ، قَالَ: " وَكَانَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ لا يُنَادِي حَتَّى يُقَالَ لَهُ: قَدْ أَصْبَحْتَ "، قَالَ مُحَمَّدٌ: كَانَ بِلالٌ يُنَادِي بِلَيْلٍ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ لِسَحُورِ النَّاسِ، وَكَانَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ يُنَادِي لِلصَّلاةِ بَعْدَ طُلُوعِ الْفَجْرِ، فَلِذَلِكَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يُنَادِيَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** রমযানের রোযা দ্বিতীয় হিজরীতে ফরয হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে লোকদের মধ্যে ভোররাতে পানাহারের কোন প্রচলন ছিলো না। রোযা শুরু হওয়ার মুহূর্ত সম্পর্কেও তাদের পরিষ্কার ধারণা ছিলো না। কেউ মনে করতো, এশার নামাযের পর থেকেই পরবর্তী দিনের সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আবার কেউ মনে করতো, যতোক্ষণ সজাগ থাকা যায় ততোক্ষণ পানাহার নিষিদ্ধ হয় না, কিন্তু ঘুম থেকে জেগে উঠার পর আর পানাহার করা যাবে না। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করে সাহরী বা পানাহারের সর্বশেষ সময়সীমা নির্দ্ধারণ করে দিয়েছেনঃ

كلوا واشربوا حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود من الفجر

“রাতের কালো (অন্ধকার) রেখার বুক চিরে ভোরের শুভ্র রেখা উজ্জ্বল হয়ে উঠা পর্যন্ত তোমরা পানাহার করো” (সূরা বাকারাঃ ১৮৭)।
ইমাম আবু হানীফা, মালেক, শাফিঈ ও আহমাদ ইবনে হাম্বলসহ জমহূর আলেমদের মতে সুবহে সাদেক শুরু হওয়ার মুহূর্তই হচ্ছে পানাহার হারাম হওয়ার এবং রোযা শুরু হওয়ার সীমা। অপর একদল আলেম মনে করেন, প্রভাতের শুভ্র আলো পূর্ব দিগন্তে বিস্তৃত হওয়া পর্যন্ত সাহরী খাওয়া জায়েয। তৃতীয় একদল আলেমের মতে প্রভাত-লালিমা পূর্ব দিগন্তে ছড়িয়ে পড়া পর্যন্ত সাহরী খাওয়া জায়েয। বস্তুত সাহাবা ও তাবিঈদের যুগ থেকে পানাহারের সর্বশেষ সময়সীমা নিয়ে মতভেদ চলে আসছে। এখানে কয়েকজন ইমামের অভিমত উল্লেখ করা হলোঃ
আনোয়ার শাহ কাশমিরী (র) বলেন, প্রকৃতপক্ষে এই বিরোধের মূল হচ্ছে কুরআন মজীদের ‘তবায়্যানা' শব্দ । একদল বিশেষজ্ঞ আলেম এর অর্থ করেছেন, পরিপূর্ণ স্পষ্টতা, অপর দল এর অর্থ করেছেন, শুধু স্পষ্ট হওয়া (ফয়যুল বারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৭৫)। তিনি আরো বলেন, তাবায়্যানা শব্দ কি ভোরের পূর্ণাঙ্গ শুভ্রতা বুঝায় না শুধু ফজর উদয় হওয়া বুঝায়? যারা প্রথম অর্থ গ্রহণ করেছেন তারা ফজরের পরও সাহরী খাওয়া জায়েয মনে করেন। যেমন কাযীখান গ্রন্থে আছে, “ভুলে যাওয়া (ঘুমে বিভোর) ব্যক্তি যদি ফজরের পর আহার গ্রহণ করে তবে তার রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু বেশীরভাগ লোক দ্বিতীয় অর্থ গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে ফজরের পর আহার করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে (ঐ, ২খ, পৃ. ১৫৭)। তিনি আরো বলেন, ইমাম তাহাবী (র) দাবি করে বলেন যে, ফজর উদয় হওয়ার পরও সাহরী খাওয়া জায়েয। বুখারীর অন্যতম ব্যাখ্যাকার দাউদ মালিকীও এই মত পোষণ করেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (র) এই মতের জোরালো সমর্থন করেছেন এবং আবু বাকর (রা) থেকে দলীল পেশ করেছেন। কেননা তিনি ফজরের পর সাহরী খেয়েছেন। হুযায়ফা (রা) থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে (১৬৯৫ নং হাদীস)। একাদিক্রমে বিভিন্ন ফিকহ গ্রন্থে ফজর উদয় হওয়ার পর সাহরী খাওয়া জায়েয বলে বর্ণিত আছে। তবে এ সময় পানাহার না করাই অধিক সতর্কতামূলক কাজ (ঐ, পৃ. ১৭৪)।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “তোমরা পানাহার করো, দিগন্তে প্রসারিত শুভ্র আলোকরশ্মি যেন তোমাদেরকে পানাহার থেকে বিরত না রাখে। তোমরা পানাহার করো যতোক্ষণ পর্যন্ত প্রভাত লালিমা তোমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে না উঠে” (তিরমিযী, হাদীস নং ৬৫৫)। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম তিরমিযী লিখেছেন, প্রভাত লালিমা (পূর্ব দিগন্তে) ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত না হওয়া পর্যন্ত রোযাদারের জন্য পানাহার হারাম হয় না। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ আলেম এই মত ব্যক্ত করেছেন (তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৮)। ফয়যুল বারীর টীকায় লেখা আছে, ইমাম তিরমিযী সংকলিত একটি হাদীস প্রভাত-ললিমা উদয় হওয়া পর্যন্ত রোযাদারের জন্য পানাহার জায়েয প্রমাণিত করে। আর প্রভাক্ত-লালিমা (আত্মার) ফজরের (সুবহে সাদেক) পরই দেখা দেয় (৩য় খণ্ড, পৃ. ১৫৭)। ইমাম ইবনে হাজারের আলোচনা তাঁর ফাতহুল বারী গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডে, ১১০ নং পৃষ্ঠায় এবং আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী লিখিত ফাতহুল মুলহিম গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডে, ১২০ নং পৃষ্ঠায় দেখা যেতে পারে ।
আল্লামা মোল্লা আলী কারী বলেন, জমহূরের মতে ফজরের সূচনা বিন্দুই (রোযা শুরু হওয়ার) নির্ভরযোগ্য সময়। অপর এক দলের মতে ভোরের আলো ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়া পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সময়। এই শেষোক্ত মতটি হযরত উছমান (রা), হুযায়ফা (রা), তলক ইবনে আলী (রা), আতা ইবনে আবু রাবাহ ও আমাশ (র) থেকে বর্ণিত হয়েছে (শারহু নিকায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৬৮)। আল্লামা ইবনে রুশদ মালেকী লিখেছেন, 'জমহুরের মতে সার্ত্রীর সর্বশেষ সময়সীমা হচ্ছে সুবহে সাদেকের সূচনা বিন্দু। আর তা হচ্ছে (পূর্ব) দিগন্তে ছড়িয়ে পড়া শুভ্র আলোকচ্ছটা। আলেমদের একটি ক্ষুদ্র দলের মতে, শুভ্র আলোকচ্ছটার পর যে রংগিন আভা উদিত হয় তা-ই হচ্ছে সার্ত্রীর সর্বশেষ সীমা। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) ও হুযায়ফা (রা) থেকেও অনুরূপ কথা বর্ণিত হয়েছে (বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৮৮–৮৯)।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “তোমাদের কেউ যদি সাহরীর পাত্র তার হাতে (আহাররত) থাকা অবস্থায় আযান শুনতে পায়, তবে সে যেন পাত্র রেখে না দেয়, বরং তা থেকে প্রয়োজনমত খেয়ে নেয়" (আবু দাউদ, কিতাবুস সিয়াম, বাব আর-রাজুল ইয়াসমাউন-নিদা ওয়াল-ইনাউ আলা ইয়াদিহী)। এ হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মাওলানা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী (র) লিখেছেন, মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহ্ইয়া সাহেব তার শায়খ মাওলানা রশীদ আহ্লাদ গাঙ্গুহী (র)-এর একটি বক্তৃতা লিপিবদ্ধ করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, উল্লেখিত হাদীস এবং “হাত্তা ইয়াতাবায়্যানা....." আয়াতের ভিত্তিতে একদল আলেম বলেছেন, তাবায়্যানা শব্দের অর্থ “ভোরের শুভ্রতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া, কেবল ফজর উদয় হওয়াই নয়”। শরীআতী আইনের সহজতা বিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণ লোকদের অবস্থা বিবেচনা করলে এই মত গ্রহণ করাই উত্তম। কেননা ফজরের ঠিক প্রারম্ভ নির্ধারণে বিশেষ যোগ্যতার অধিকারী লোকেরাও অপারগ, সাধারণ মানুষের তো প্রশ্নই উঠে না। অতএব ফজরের ওয়াক্তের সূচনা বিন্দুর সাথে সাহরী খাওয়ার বৈধতা-অবৈধতাকে সম্পৃক্ত করা ত্রুটি, অসুবিধা ও কঠোরতা থেকে মুক্ত নয় (বাযলুল মাজহূদ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪০)।
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (র) বিলাল (র) ও ইবনে উম্মে মাকতূম (রা)-র আযান সম্পর্কিত হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসংগে লিখেছেন, 'আসবাহতা' (তুমি ভোরে উপনীত হয়েছো) শব্দটি তার প্রত্যক্ষ (হাকীকী) অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে বরং রূপক (মাজাযী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ ফজরের সময় ঘনিয়ে এসেছে। অতএব ইবনে উম্মে মাকতূমের আযান ছিলো ফজর শুরু হওয়ার সময়ে, আর পানাহারের শেষ সময়সীমা ছিল ফজর উদয় হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে। অপরদিকে 'আসবাহতা' শব্দটি প্রত্যক্ষ অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। এক্ষেত্রে উল্লেখিত হাদীস থেকে ফজর হওয়ার পরও পানাহারের বৈধতা সাব্যস্ত হয়। ফিকহবিদদের একটি মত অনুসারে তাতে রোযার কোন ক্ষতি হয় না। কেননা আমাদের সাথীরা (হানাফী আলেমগণ) এই সীমা নির্ধারণ করতে গিয়ে মতভেদ করেছেনঃ এ সীমা কি ফজর শুরু হওয়ার ঠিক মুহূর্ত না ভোরের শুভ্রতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়া পর্যন্ত? খিযানাতুল ফাতাওয়া গ্রন্থের আলোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ আলেম দ্বিতীয় মত গ্রহণ করেছেন (বুখারীর শারহ উমদাতুল কারী, আযান অনুচ্ছেদ, পৃ. ৭০)। এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলো দ্রষ্টব্যঃ ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ২০৬; শামী, ২য় খণ্ড, পৃ. ১১০; হিদায়ার ভাষ্যগ্রন্থ ইনায়া, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৫৩; খিযানাতুল ফাতাওয়া এবং আল-মুহীত (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান