আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৬২- চিকিৎসা - তদবীরের অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৩০৫
আন্তর্জাতিক নং: ৫৭১৪
- চিকিৎসা - তদবীরের অধ্যায়
৩০২২. রোগীর মুখের ভিতর ঔষধ ঢেলে দেয়া
৫৩০৫। বিশর ইবনে মুহাম্মাদ (রাহঃ) ......... নবী করীম (ﷺ) -এর সহধর্মিণী ‘আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর রোগ-যন্ত্রণা বেড়ে গেল এবং তীব্র আকার ধারণ করল, তখন তিনি তার সহধর্মিণীগণের কাছে অনুমতি চাইলেন যে, তিনি যেন আমার গৃহে অসুস্থকালীন সময় অবস্থান করতে পারেন। এরপর তাঁরা অনুমতি দিলে তিনি দু’ব্যক্তি অর্থাৎ ‘আব্বাস (রাযিঃ) ও আরেকজনের সাহায্যে এভাবে বেরিয়ে আসলেন যে, যমীনের উপর তাঁর দু’পা হেঁচড়াতে ছিলেন। আমি ইবনে ‘আব্বাস (রাযিঃ) কে হাদীসটি অবহিত করলে তিনি বলেনঃ আপনি কি জানেন আরেক ব্যক্তি যার নাম ‘আয়েশা (রাযিঃ) উল্লেখ করেননি, তিনি কে ছিলেন? আমি উত্তর দিলামঃ না। তিনি বললেনঃ ‘আলী (রাযিঃ)।

আয়েশা (রাযিঃ) বলেনঃ যখন তাঁর রোগ-যন্ত্রণা আরো তীব্র হল তখন তিনি বললেন, যে সব মশকের মুখ এখনো খোলা হয়নি এমন সাত মশক পানি আমার গায়ের উপর ঢেলে দাও। আমি লোকজনের কাছে কিছু অসীয়ত করে আসার ইচ্ছা পোষণ করছি। তিনি বলেন, তখন আমরা তাকে তার সহধর্মিণী হাফসা (রাযিঃ) -এর একটি কাপড় কাচার জায়গায় নিয়ে গিয়ে বসালাম। এরপর তার গায়ের উপর সেই মশকগুলো থেকে পানি ঢালতে লাগলাম। অবশেষে তিনি আমাদের দিকে ইশারা দিলেন যে, তোমরা কাজ সমাধা করেছ। তিনি বলেনঃ এরপর লোকজনের দিকে বেরিয়ে গেলেন। আর তাদের নিরে নামায আদায় করলেন এবং তাদের সামনে খুতবা দিলেন।
كتاب الطب
بَابُ اللَّدُودِ
5714 - حَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ مُحَمَّدٍ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ، وَيُونُسُ: قَالَ الزُّهْرِيُّ: أَخْبَرَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ: أَنَّ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، زَوْجَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ: لَمَّا ثَقُلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاشْتَدَّ وَجَعُهُ، اسْتَأْذَنَ أَزْوَاجَهُ فِي أَنْ يُمَرَّضَ فِي بَيْتِي، فَأَذِنَّ لَهُ، فَخَرَجَ بَيْنَ رَجُلَيْنِ تَخُطُّ رِجْلاَهُ فِي الأَرْضِ، بَيْنَ عَبَّاسٍ وَآخَرَ، فَأَخْبَرْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ، قَالَ: هَلْ تَدْرِي مَنِ الرَّجُلُ الآخَرُ الَّذِي لَمْ تُسَمِّ عَائِشَةُ؟ قُلْتُ: لاَ، قَالَ: هُوَ عَلِيٌّ، قَالَتْ عَائِشَةُ: فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ مَا دَخَلَ بَيْتَهَا، وَاشْتَدَّ بِهِ وَجَعُهُ: «هَرِيقُوا عَلَيَّ مِنْ سَبْعِ قِرَبٍ لَمْ تُحْلَلْ أَوْكِيَتُهُنَّ، لَعَلِّي أَعْهَدُ إِلَى النَّاسِ» قَالَتْ: فَأَجْلَسْنَاهُ فِي مِخْضَبٍ لِحَفْصَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ طَفِقْنَا نَصُبُّ عَلَيْهِ مِنْ تِلْكَ القِرَبِ، حَتَّى جَعَلَ يُشِيرُ إِلَيْنَا: «أَنْ قَدْ فَعَلْتُنَّ» قَالَتْ: وَخَرَجَ إِلَى النَّاسِ، فَصَلَّى لَهُمْ وَخَطَبَهُمْ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসের বিষয়বস্তুটি সঠিকভাবে বুঝার জন্য এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, হুযুর (ﷺ)-এর নয়জন স্ত্রী ছিলেন, যাঁদের হুজরাসমূহ পৃথক পৃথক ছিল। হুযুর (ﷺ)-এর অভ্যাস ও রীতি এই ছিল যে, ইনসাফের স্বার্থে তিনি পালাক্রমে সবার ঘরে এক এক রাত অবস্থান করতেন। তিনি এ নীতির এভাবে অনুসরণ করতেন যে, কোন কোন আলেম এ থেকে এই বুঝেছেন যে, এমনটি করা তাঁর বেলায় ফরয ও ওয়াজিব ছিল। যাহোক, সফর মাসের কোন এক তারিখে (যার ব্যাপারে রিওয়ায়াত বিভিন্ন ধরনের রয়েছে।) তাঁর এ অসুস্থতার সূচনা হল, যার সমাপ্তি ওফাতের উপরই হয়। বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, এ দিন হুযুর (ﷺ)-এর অবস্থান ছিল হযরত মায়মূনা রাযি.-এর ঘরে। পরের দিন যে স্ত্রীর ঘরে তাঁর অবস্থান নির্ধারিত ছিল, তিনি তাঁর ঘরে স্থানান্তরিত হয়ে গেলেন এবং এ অসুস্থতার অবস্থায়ই কয়েক দিন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকল যে, যে দিন যে স্ত্রীর ঘরে অবস্থান নির্ধারিত থাকত, সেদিন তিনি সেখানে স্থানান্তরিত হয়ে যেতেন। অসুস্থ অবস্থায় প্রতিদিন এক ঘর থেকে অন্য ঘরে স্থানান্তরিত হওয়া তাঁর জন্য খুবই কষ্টের কারণ হয়ে গিয়েছিল। তাই তাঁর বাসনা ছিল যে, তিনি একই ঘরে অবস্থান করবেন এবং বিভিন্ন কারণে তাঁর অন্তরে হযরত আয়েশার ঘরের প্রাধান্য ছিল। হাদীসের শব্দমালার বাহ্যিক অর্থ এটাই যে, হুযুর (ﷺ) স্বয়ং স্ত্রীদের কাছে এ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং তাঁদের নিকট এর অনুমতি চাইলেন, কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে এ হাদীসেরই ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, ইবনে সাদ বিশুদ্ধ সনদে ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উম্মাহাতুল মু'মিনীন থেকে এ অনুমতি হুযুর (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয়তমা কন্যা হযরত ফাতেমা রাযি. নিয়েছিলেন। যাহোক, সমস্ত আযওয়াজে মুতাহহারাত এতে সম্মত হয়ে গেলেন এবং হুযুর (ﷺ)-কে হযরত আয়েশার হুজরায় পৌঁছে দেওয়া হল। স্বয়ং হযরত আয়েশার বর্ণনা যে, এ দিনটা ছিল সোমবার অর্থাৎ, ওফাতের ঠিক এক সপ্তাহ পূর্বে। হুযুর (ﷺ) অসুস্থতার কারণে যখন এমন দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি নিজে চলাফেরা করতে পারতেন না; বরং দু'ব্যক্তি এভাবে তাঁকে আনছিল যে, তাঁর পা মুবারক মাটিতে হেঁচড়ে চলছিল। হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ দু'ব্যক্তির মধ্যে হুযুর (ﷺ)-এর চাচা হযরত আব্বাস রাযি.-এর নাম তো উল্লেখ করেছেন, কিন্তু অপরজনের নাম বলেননি। হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ এর কারণ এই লিখেছেন যে, হযরত আব্বাস তো এক দিকে সারাক্ষণ একাই ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু অপরদিকে লোক পরিবর্তন হচ্ছিল। কখনো হযরত আলী, কখনো হযরত আব্বাস রাযি.-এর পুত্র ফজল ইবনে আব্বাস এবং কখনো হযরত উসামা ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। যাহোক, এভাবে হুযুর (ﷺ)-কে হযরত আয়েশার হুজরায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হল, যে স্থানটি সর্বদার জন্য তাঁর শয়ন ও বিশ্রামস্থল হিসাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বেই নির্ধারিত ছিল। আর আগেই যেমন বলা হয়েছে যে, এ দিনটি ছিল সোমবার।

সামনে হযরত আয়েশা রাযি. যে বলেছেন, আমার ঘরে আসার পর হুযুর (ﷺ)-এর অসুখ বেড়ে গেল এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে গোসল করানো হল এবং সাত মশক পানি ঢালা হল- যার ফলে তাঁর অবস্থা ভাল ও হালকা হয়ে গেল। তারপর তিনি মসজিদে গেলেন, নামায পড়ালেন এবং নামাযের পর ভাষণ দিলেন, এ ঘটনাটি ঐ দিনকার নয়, যেদিন তিনি হযরত আয়েশার ঘরে এসেছিলেন; বরং এটা তিন দিন পরের বৃহস্পতিবারের ঘটনা, যেমন অন্যান্য বর্ণনায় এটা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আর এটা ছিল যোহরের নামায এবং এটা হুযুর (ﷺ)-এর জীবনের শেষ নামায ছিল, যা তিনি মসজিদে পড়িয়েছিলেন এবং এটাই তাঁর জীবনের শেষ ভাষণ ছিল।

এটা যোহরের ওয়াক্ত ছিল এবং হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর পেছনে নামায শুরু হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় হুযুর (ﷺ) একটু স্বস্তি ও আরামবোধ করলেন এবং দু'ব্যক্তির সাহায্যে মসজিদে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। হযরত আবু বকরের দৃষ্টি হুযুর (ﷺ)-এর প্রতি পড়লে তিনি নিজ স্থান থেকে পেছনে সরে আসতে লাগলেন। হুযুর (ﷺ) তখন ইশারা করলেন যে, পেছনে সরে আসবে না, নিজের স্থানে থাক। আর যে দু' ব্যক্তি হুযুর (ﷺ)-কে মসজিদে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাদেরকে বললেন যে, আমাকে আবু বকরের বরাবরই বসিয়ে দাও। তারা তাই করল এবং এখন আসল ইমাম তিনিই হয়ে গেলেন এবং আবু বকর হয়ে গেলেন মুক্তাদী।

এ জাতীয় বিভিন্ন রিওয়ায়াত সামনে রাখার পর ঘটনাসমূহের ক্রমপর্যায় এই জানা যায় যে, ওফাতের পাঁচ দিন পূর্বে বৃহস্পতিবার যোহরের আগে এক সময় হুযুর (ﷺ)-এর রোগ ও কষ্ট বেড়ে গেল। এ সময় তিনি ওসিয়্যত হিসাবে কিছু লিখানোর ইচ্ছা করেন, লিখন সামগ্রী আনতে বললেন। এরপর তাঁর মত পরিবর্তন হয়ে গেল। কিন্তু তাঁর অন্তরে এ আকাঙ্খা রইল যে, ওসিয়্যত হিসাবে কিছু জরুরী কথা সাহাবায়ে কেরামকে বলে দেওয়া হোক। তাই যখন যোহরের নামাযের ওয়াক্ত আসল, তখন তিনি স্ত্রীদেরকে বললেন যে, আমাকে গোসল করাও এবং এমন সাত মশক পানি ঢেলে দাও, যেগুলোর মুখ খোলা হয়নি। নির্দেশ অনুযায়ী আযওয়াজে মুতাহহারাত তাঁকে একটি পানির টবে বসিয়ে গোসল করালেন।

এর ফলে তিনি কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন এবং দু'জন মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে গেলেন এবং আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে- নামাযও পড়ালেন। তারপর মিম্বরে উঠে ভাষণও দিলেন। ঐ বক্তব্যে তিনি সবচেয়ে গুরুত্ব সহকারে উম্মতের মধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন এবং এ কথাও উচ্চারণ করেছেন যে, উম্মতের মাঝে যে মর্যাদা আবু বকরের রয়েছে তা অন্য কারো নেই। আর নিজের জায়গায় নামাযের ইমাম তো তাকে আগেই বানিয়ে নিয়েছিলেন। এসব বিষয় সামনে রেখে চিন্তা করলে এক পর্যায়ের ইয়াকীন ও বিশ্বাস হয়ে যায় যে, তিনি ঐ দিনই যোহরের পূর্বে রোগের প্রচন্ড কষ্টের সময় ওসিয়্যত হিসাবে কিছু লিখবার যে ইচ্ছা করেছিলেন, সেটা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-এর খেলাফত ও ইমামতের ব্যাপারেই ছিল- যদিও পরে স্বয়ং তাঁর মত লিখার পক্ষে থাকেনি। কিন্তু হুযুর (ﷺ) তাঁকে নামাযের ইমাম বানিয়ে মসজিদে নববীর এ শেষ ভাষণে উম্মতের মাঝে তাঁর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবস্থান বর্ণনা করে তাঁর খেলাফতের ব্যাপারটির দিকে পূর্ণ দিক নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরামের জন্য এ পথনির্দেশ যথেষ্ট হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)