ফিকহুস সুনান ওয়াল আসার

১- সামগ্রিক মূলনীতিসমূহ

হাদীস নং: ১০
- সামগ্রিক মূলনীতিসমূহ
সাহাবি ও সালফে সালিহীনের অনুসরণ
(১০) ইবন আমর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমার উম্মাত ৭৩ ‘ফিরকা' বা ধর্মীয় উপদল বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হবে, তন্মধ্যে একটিমাত্র দল ব্যতীত সকলেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে । সাহাবিগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই মুক্তিপ্রাপ্ত দলটি কারা? তিনি বলেন, যে কর্ম ও মতের উপর আমি ও আমার সাহাবিগণ রয়েছি (সেই কর্ম ও মতের অনুসারীগণ)।
كتاب الجامع
عن ابن عمرو مرفوعا: تفترق أمتي على ثلاث وسبعين ملة كلهم في النار إلا ملة واحدة قالوا: ومن هي يا رسول الله؟ قال: ما أنا عليه وأصحابي

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

(তিরমিযি । তিনি হাদীসটিকে 'হাসান' বা গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন)। [সুনান তিরমিযি, হাদীস-২৬৪১; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস-৪৪৪]

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু বলেছেন, তা কেবল এক ভবিষ্যতবাণী নয় বরং উম্মতের জন্য অনেক বড় সংবাদ। উদ্দেশ্য এই যে, উম্মত সেই আকাইদ ও চিন্তাধারা এবং সেই পথে দৃঢ় থাকার প্রতি চিন্তা ও লক্ষ্য রাখবে যার ওপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবা কিরাম ছিলেন। নাজাত ও জান্নাত তাঁদেরই জন্যে।
এই শ্রেণী নিজেদের জন্য أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ -এর শিরোনাম গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবা জামা'আতের তরীকার সাথে সম্পৃক্তকারীগণ।

দ্বিতীয়ত আলোচ্য হাদীসে যে বাহাত্তর ফির্কা সম্বন্ধে বলা হয়েছে كُلُّهُمْ فِي النَّارِ নির্দিষ্টভাবে সবাইকে চিহ্নিত করা যায় না। বস্তুত যাদের দীনী চিন্তাধারা ও আকীদাগত পথ হচ্ছে مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي এর সাথে মৌলিক ভাবে ভিন্ন, তারা ঐ সব ফিরক্বার অন্তর্ভুক্ত। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যেমন যায়দিয়া, মু'তাযিলা, জাহমিয়া। আর আমাদের যুগের হাদীস অস্বীকারকারীগণ এবং সেই বিদ'আতীগণ যাদের আকীদার অনিষ্টতা কুফর পর্যন্ত পৌছেনি।

এস্থলে এ কথা প্রণিধানযোগ্য যে, সে সব ব্যক্তি এরূপ আকীদা গ্রহণ করেছে যার ফলে তারা ইসলামের গণ্ডি থেকেই বের হয়ে গেছে, যেমন অতীতে মুসাইলমা কায্যাব ইত্যাদি নবুওতের দাবিদারদেরকে নবী স্বীকৃতি দানকারীরা কিংবা আমাদের যুগের কাদিয়ানী সম্প্রদায়। সুতরাং এরূপ লোক উম্মতের গণ্ডি থেকেই বের হয়ে গেছে। এজন্য তারা এই বাহাত্তর ফিরক্বার অন্তর্ভুক্ত নয়। এই বাহাত্তর ফিরক্বার অন্তর্ভুক্ত তারা যারা উম্মতের গণ্ডির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তারা مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي এর পথ থেকে সরে আকীদাগত ভিন্ন মতবাদ ও দীনী চিন্তা ধারা গ্রহণ করেছে। তবে দীনের আবশ্যকীয় বিষয়ালির মধ্যে কোন বিষয় অস্বীকার কিংবা এমন কোন আকীদা গ্রহণ করেনি, যে কারণে ইসলাম ও উম্মতের গণ্ডি থেকেই নির্গত হয়ে গেছে। তাদের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে كُلُّهُمْ فِي النار (তারা সবাই জাহান্নামে যাবে) এর উদ্দেশ্য এই যে, আকীদার ভ্রষ্টতা ও গোমরাহীর কারণে জাহান্নামের শাস্তির যোগ্য হবে। এভাবে مَا أَنا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي এর সাথে সম্পৃক্ততা রক্ষাকারীগণ তিহাত্তরতম ফিরকার জান্নাতী হওয়ার অর্থ এই যে, তাঁরা নিজেদের আকীদাগত দৃঢ়তার কারণে নাজাত ও জান্নাতের যোগ্য হবে। বস্তুত হাদীসে যে تفرق (বিভিন্ন ফিরক্কায় বিভক্ত হওয়ার) উল্লেখ করা হয়েছে আমলের পাপপুণ্য ও ভাল মন্দের সাথে এর সম্পর্ক নেই। ফিরকাবাজীর সম্পর্ক আকাইদ ও চিন্তাধারার সাথে। আমলের কারণে সওয়াব কিংবা আযাবের যোগ্য হওয়াও সত্য। তবে এর সাথে আলোচ্য হাদীসের কোন সম্পর্ক নেই।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান