ফিকহুস সুনান ওয়াল আসার

৬. হজ্ব - উমরার অধ্যায়

হাদীস নং: ১৩৭৭
হজ্ব - উমরার অধ্যায়
কোন দিনে সফর মুসতাহাব এবং সফরে বেরোনোর সময় কী বলবে
(১৩৭৭) ইবন উমার রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন ভ্রমণে (সফরে) বের হওয়ার জন্য তাঁর উটের পিঠে সমাসীন হতেন তখন তিনবার তাকবীর (আল্লাহু আকবার) বলতেন । এরপর বলতেন, ‘পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এদেরকে বশ করতে**। হে আল্লাহ, আমরা আমাদের এই সফরে আপনার কাছে চাই কল্যাণকর্ম ও আল্লাহ-ভীতি, এবং আপনি যে কর্ম পছন্দ করেন সেই কর্ম । হে আল্লাহ, আমাদের এই সফরকে আমাদের জন্য সহজ করে দিন এবং আমাদের থেকে এর দূরত্ব গুটিয়ে নিন (সংক্ষিপ্ত করে দিন)। হে আল্লাহ, আপনিই সফরে আমাদের সঙ্গী এবং রেখে আসা পরিবার-পরিজনের মধ্যে আমাদের প্রতিনিধি। হে আল্লাহ, আমি আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি সফরের কষ্ট-কাঠিন্য থেকে, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া থেকে এবং পরিবারের মধ্যে বা সম্পদের মধ্যে খারাপভাবে প্রত্যাবর্তন করা থেকে। যখন তিনি ফিরে আসতেন তখনও এই কথাগুলো বলতেন এবং অতিরক্তি বলতেন, 'আমরা প্রত্যাবর্তন করছি, ফিরে আসছি এবং আমাদের প্রভু-প্রতিপালকের প্রশংসা করছি'।
كتاب الحج
عن ابن عمر رضي الله عنهما أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان إذا استوى على بعيره خارجا إلى سفر كبر ثلاثا ثم قال: سبحان الذي سخر لنا هذا وما كنا له مقرنين وإنا إلى ربنا لمنقلبون اللهم إنا نسألك في سفرنا هذا البر والتقوى ومن العمل ما ترضى اللهم هون علينا سفرنا هذا واطو عنا بعده اللهم أنت الصاحب في السفر والخليفة في الأهل اللهم إني أعوذ بك من وعثاء السفر وكآبة المنظر وسوء المنقلب في المال والأهل وإذا رجع قالهن وزاد فيه: آيبون تائبون عابدون لربنا حامدون

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

[সহীহ মুসলিম, হাদীস-১৩৪২; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৫৯৯; সুনান তিরমিযি, হাদীস-৩৪৪৭]

সূরা: [৪৩] যুফ, আয়াত: ১৩।

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ দু'আটির প্রতিটি অংশ তার মধ্যে বিরাট ভাব ও অর্থ ধারণ করছে।

প্রথম যে কথাটি হাদীসে বলা হয়েছে, তা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ উটে আরোহণ করেই সর্বপ্রথম তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলতেন। সে যুগে বিশেষত উটের মত বাহনে আরোহণের পর আরোহীর মনে একটা অহমিকা ও আত্মম্ভরিতার ওসওয়াসা উদ্রেক হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। দর্শকের মনেও তার সম্পর্কে একটা উচ্চ ধারণা ও সমীহবোধ জেগে উঠতে পারতো। (কেননা, উট ছিল তখনকার অভিজাত বাহন ও মর্যাদার প্রতীক।) রাসূলুল্লাহ ﷺ তিনবার 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিয়ে তার উপর তিনটি কার্যকরী আঘাত করতেন। নিজের মনকে এবং দর্শকদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তারপর তিনি বলতেন:

سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ

"পবিত্র ও মহান সেই সত্তা, যিনি এ বাহনকে আমাদের জন্যে বশীভূত করে দিয়েছেন; নতুবা আমাদের সাধ্য ছিল না যে, এতবড় একটা প্রাণীকে বশীভূত করে ফেলি এবং নিজ খেয়াল-খুশি মত যেদিকে ইচ্ছে চালিয়ে নেই। এ বাক্যটির মধ্যে একথার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি রয়েছে যে, এ বাহনটিকে আমাদের বশীভূত ও নিয়ন্ত্রণাধীন করে দেয়াটা একান্তই তাঁরই দয়া ও দান। এটা আমাদের নিজেদের কোন কৃতিত্ব নয়। তারপর তিনি বলতেন:

وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ

অর্থাৎ যেভাবে আজ এ সফরে যাত্রা করছি, তেমনি একদিন এ দুনিয়া থেকেও সফর করে আমাদেরকে আমাদের মহান প্রভু পরোয়ারদিগারের পানে যাত্রা করে চলে যেতে হবে যা আমাদের আসল মকসুদ এবং চরম মঞ্জিলে মকসুদ। সে সফরটাই হবে আসল সফর এবং সে চিন্তা-ভাবনা থেকে বান্দার কখনো গাফেল বা উদাসীন থাকা উচিত নয়।
তারপর সর্বপ্রথম তিনি দু'আ করতেন:
“হে আল্লাহ! এ সফরে আমাকে তুমি এমন নেকি ও পরহেজগারীপূর্ণ আমলের তাওফীক দান করো, যা তোমার সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে।"
নিঃসন্দেহে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী মানুষের সবচাইতে বড় চাওয়া পাওয়া এটাই। এজন্যে তার সর্বপ্রথম দু'আ এটা হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তারপর তিনি সফর সহজসাধ্য ও সংক্ষিপ্ত হওয়ার দু'আ করতেন। তারপর আল্লাহর দরবারে আরয করতেনঃ

اَللّٰهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ وَالْمَالِ

“হে আল্লাহ! তুমিই সফরে আমার প্রকৃত সাথী এবং তোমার মদদ ও সাহচর্যের উপর আমার ভরসা। আর বাড়িতে যে পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদ আমি রেখে লাচ্ছি, তার দেখা-শোনা ও রক্ষার ব্যাপারেও আমি একান্তই তোমারই প্রতি নির্ভরশীল।

এসব ইতিবাচক প্রার্থনার পর তিনি সফরের ক্লেশ-কাতরতা এবং সফরে বা প্রত্যাবর্তনকালে কোন অবাঞ্ছিত দৃশ্য দর্শন থেকে আল্লাহর দরবারে পানাহ চাইতেন যার মোদ্দা কথা হচ্ছে, হে আল্লাহ! আমার এ সফরেও যেন আমি তোমার রহমত ও আনুকূল্য লাভ করি আর ফিরে এসেও যেন সবকিছু ঠিকঠাক দেখতে পাই।

হাদীসের শেষাংশে আছে, যখন বাড়িতে ফেরৎ আসার জন্যে তিনি আবার যাত্রা শুরু করতেন, তখন আল্লাহর দরবারে পুনরায় তিনি উক্ত দু'আটি করতেন। সাথে সাথে আরো বলতেন:

آئِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ

অর্থাৎ “এবার আমরা ফিরে চলেছি। নিজেদের ভুল-ভ্রান্তি-অপরাধ থেকে তওবা করছি। আমরা আমাদের মালিক ও প্রভু-পরোয়ারদিগারের ইবাদত এবং স্তব-স্তুতি করছি।" একটু ভেবে দেখুন তো, সফরের সময় সওয়ারীতে আরোহণকালেই যেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়-মনের এ অবস্থা হতো, যা এ শব্দমালার আকারে তাঁর যবান মুবারকে জারী থাকতো, সেখানে নির্জনে নিভৃতে তাঁর অবস্থাটা কী হতে পারে।

কত ভাগ্যবান সে উম্মত, যাদের কাছে তাদের নবীর উত্তরাধিকাররূপে এমন অমূল্য রত্নভাণ্ডার সংরক্ষিত রয়েছে। আর কতই না দুর্ভাবনার কারণ সে উম্মতের ভাগ্যবিড়ম্বনা ও বঞ্চনা, যার শতকরা ৯৯ জন বা তার চাইতেও অধিক সংখ্যক লোক সে সম্পর্কে কোন খবরই রাখে না বা তা দ্বারা উপকৃত হওয়া থেকে বঞ্চিতই থাকে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)