আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৬৪- আদব - শিষ্টাচারের অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৭৫২
আন্তর্জাতিক নং: ৬১৮৫
- আদব - শিষ্টাচারের অধ্যায়
৩২৬৬. কোন ব্যক্তির এ কথা বলা যে, আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি কুরবান করুন। আবু বকর (রাযিঃ) নবী (ﷺ) কে বললেনঃ আমরা আমাদের পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান করলাম।
৫৭৫২। আলী ইবনে আব্দুল্লাহ (রাহঃ) ......... আনাস ইবনে মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, একবার নবী (ﷺ) এর সঙ্গে তিনি ও আবু তালহা (রাযিঃ) (মদীনায়) আসছিলেন। তখন নবী (ﷺ) এর সঙ্গে সাফিয়্যা (রাযিঃ) তার উটের পেছনে বসাছিলেন। পথে এক জায়গায় উটের পা পিছলে যায় এবং নবী (ﷺ) ও তার স্ত্রী পড়ে যান। তখন আবু তালহা (রাযিঃ)ও তার উট থেকে লাফ দিয়ে নামলেন এবং নবী (ﷺ) এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেনঃ ইয়া নবী আল্লাহ! আপনার কি কোন আঘাত লেগেছে? আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি কুরবান করুন। তিনি বললেনঃ না। তবে স্ত্রী লোকটির খবর নাও। তখন আবু তালহা (রাযিঃ) তার কাপড় দিয়ে চেহারা ঢেকে তার দিকে অগ্রসর হলেন এবং তার উপরও একখানা কাপড় ফেলে দিলেন। তখন স্ত্রীলোকটি উঠে দাঁড়ালেন। এরপর আবু তালহা (রাযিঃ) তাদের হাওদাটি উটের উপর কষে বেধে দিলেন। তারা উভয়ে সওয়ার হলেন এবং সবাই আবার রওয়ানা হলেন। অবশেষে যখন তারা মদীনার নিকটে পৌছলেন, তখন নবী (ﷺ) বলতে লাগলেনঃ আমরা তাওবাকারী, ইবাদতকারী এবং একমাত্র স্বীয় প্রতিপালকের প্রশংসাকারী। তিনি মদীনায় প্রবেশ করা পর্যন্ত এ কথাগুলো বলছিলেন।
كتاب الأدب
بَابُ قَوْلِ الرَّجُلِ: جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاكَ وَقَالَ أَبُو بَكْرٍ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَدَيْنَاكَ بِآبَائِنَا وَأُمَّهَاتِنَا»
6185 - حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ المُفَضَّلِ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَبِي إِسْحَاقَ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ: أَنَّهُ أَقْبَلَ هُوَ وَأَبُو طَلْحَةَ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَفِيَّةُ، مُرْدِفُهَا عَلَى رَاحِلَتِهِ، فَلَمَّا كَانُوا بِبَعْضِ الطَّرِيقِ عَثَرَتِ النَّاقَةُ، فَصُرِعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالمَرْأَةُ، وَأَنَّ أَبَا طَلْحَةَ - قَالَ: أَحْسِبُ - اقْتَحَمَ عَنْ بَعِيرِهِ، فَأَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاكَ، هَلْ أَصَابَكَ مِنْ شَيْءٍ؟ قَالَ: «لاَ، وَلَكِنْ عَلَيْكَ بِالْمَرْأَةِ» فَأَلْقَى أَبُو طَلْحَةَ ثَوْبَهُ عَلَى وَجْهِهِ فَقَصَدَ قَصْدَهَا، فَأَلْقَى ثَوْبَهُ عَلَيْهَا، فَقَامَتِ المَرْأَةُ، فَشَدَّ لَهُمَا عَلَى رَاحِلَتِهِمَا فَرَكِبَا، فَسَارُوا حَتَّى إِذَا كَانُوا بِظَهْرِ المَدِينَةِ - أَوْ قَالَ: أَشْرَفُوا عَلَى المَدِينَةِ - قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ، لِرَبِّنَا حَامِدُونَ» فَلَمْ يَزَلْ يَقُولُهَا حَتَّى دَخَلَ المَدِينَةَ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটি দ্বারা আমরা জানতে পারছি যে, সফর থেকে ফিরে আসার সময় যখন নিজ এলাকা চোখে পড়ে, তখন আল্লাহ তা'আলার দিকে রুজ হয়ে সফরকালীন ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য তাওবা করা এবং ফিরে আসা পর্যন্ত সমগ্র সফরে যেসব নি'আমত লাভ হয়েছে তার জন্য শোকর আদায় করা উচিত। এসবের জন্য হাদীছটিতে একটি সংক্ষিপ্ত দুআ বর্ণিত হয়েছে। এ দুআটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে পড়তেন। যখন মদীনা শহর চোখে পড়ত, তখন থেকে তিনি এটি পড়া শুরু করতেন এবং অনবরত পড়তে থাকতেন, যতক্ষণ না শহরে পৌঁছান। দু'আটিতে চারটি শব্দ আছে। آيبُونَ (আমরা প্রত্যাবর্তনকারী)। تَابوْنَ (তাওবাকারী)। عَابِدُونَ (ইবাদতকারী)। لِرَبِّنا حَامِدُونَ (আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী)। এ কথাগুলোর ভেতর দিয়ে আল্লাহ তা'আলার প্রতি বান্দার বন্দেগীসুলভ বিনয়, আত্মনিবেদন ও শোকরগুযারীর অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে। বোঝানো হচ্ছে, আমরা আল্লাহ তা'আলার দয়া-অনুগ্রহেই সফর থেকে আপন ঠিকানায় ফিরে আসতে পেরেছি। এ সফরকালে না জানি আমাদের দ্বারা কত অন্যায়-অনুচিত কাজ হয়ে গেছে। সেজন্য আমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে তাওবা করছি, যেন তিনি নিজ দয়ায় সেসব ক্ষমা করে দেন। আর আমাদের কাজই হলো আল্লাহ তা'আলার ইবাদত-বন্দেগী করা, তা ঘরে থাকি বা বাইরে। তাঁর ইবাদত করার জন্যই তো আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই আমাদেরকে এর প্রতি বিশেষ মনোযোগী থাকতে হবে। আমরা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নি'আমত ও অনুগ্রহ ভোগ করে থাকি। এই মুহূর্তে তাঁর এক বিশেষ নি'আমত হলো নিরাপদে সফর সম্পন্ন করার পর সহি-সালামতে বাড়িতে ফিরে আসা। সেজন্য আমরা তাঁরই প্রশংসা করছি, তাঁরই শোকর আদায় করছি। আমরা কেনই বা তাঁর শোকর আদায় করব না? নিজ শহর ও নিজ বাড়ি প্রত্যেকের স্বস্তি ও শান্তির ঠিকানা। এ ঠিকানার সঙ্গে প্রত্যেকের প্রাণের সম্পর্ক। স্বভাবগতভাবেই প্রত্যেকে এ ঠিকানাকে ভালোবাসে। তাই তো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, তিনি তাঁর প্রিয় ঠিকানা মদীনা মুনাউওয়ারাকে খুবই ভালোবাসতেন। সফর থেকে ফেরার কালে তাঁর সে ভালোবাসা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত। হযরত আনাস রাযি. বর্ণনা করেন-

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ إِذَا قَدِمَ مِنْ سَفَرٍ، فَنَظَرَ إِلَى جُدُرَاتِ الْمَدِينَةِ، أَوْضَعَ رَاحِلَتَهُ وَإِنْ كَانَ عَلَى دَابَّةٍ حَرَّكَهَا مِنْ حُبِّهَا.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর থেকে প্রত্যাগমনকালে যখন মদীনার ঘর-বাড়ি দেখতে পেতেন, তখন তাঁর উটনী দ্রুত হাঁকাতেন। আর যদি গাধা বা ঘোড়ার পিঠে থাকতেন, সেটিকে তাড়া দিতেন- মদীনার ভালোবাসায়। (সহীহ বুখারী: ১৮০২, ১৮৮৬; জামে তিরমিযী: ৩৪৪১; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৪২২৩৪; সহীহ ইবন হিব্বান : ২৭১০; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা : ১০৩৭৬; বাগাৰী, শারহুস সুন্নাহ: ২০১২)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সফর থেকে ফেরার সময় নিজ এলাকা যখন চোখে পড়বে, তখন আমরা দুআ পড়তে থাকব-

آيبُونَ ، تَائِبُونَ، عَابِدُونَ، لِرَبِّنَا حَامِدُونَ.

খ. আমাদেরকে সর্বদা আল্লাহ তা'আলার অভিমুখী থাকতে হবে এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে। সফর অবস্থায়ও এবং সফর থেকে ফেরার পরও।

গ. সফরে হয়ে যাওয়া ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য তাওবা-ইস্তিগফার করা জরুরি।

ঘ. সহি-সালামতে সফর সম্পন্ন করা ও সহি-সালামতে ফিরে আসাটা আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় অনুগ্রহ। এর জন্য তাঁর শোকর আদায় করা জরুরি।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)