রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

ভূমিকা অধ্যায়

হাদীস নং: ৬০
ভূমিকা অধ্যায়
মুরাকাবার অর্থ, ব্যাখ্যা ও গুরুত্ব
'মুরাকাবা' অর্থ অন্তরে এই ধ্যান করা যে, আল্লাহ তাআলা আমার প্রতিটি কথা শোনেন, প্রতিটি কাজ দেখেন এবং আমার অন্তরের যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা ও আকীদা-বিশ্বাস জানেন। এটা 'ইহসান'-এর একটি স্তর। ইহসান সম্পর্কে সামনে এ অধ্যায়ের প্রথম হাদীছে আলোচনা আসছে।
এমনিতে তো প্রত্যেক মুমিনের এ বিশ্বাস আছে যে, মানুষের প্রকাশ্য-গুপ্ত কোনও কাজই আল্লাহর অগোচরে থাকে না। সে যখন যেখানে থাকে, আল্লাহ তার সংগে থাকেন। অর্থাৎ তার প্রতি দৃষ্টি রাখেন ও তার সম্পর্কে জ্ঞাত থাকেন। সে চোরাচোখে কী দেখছে তাও তিনি দেখেন। মনের গভীরে কী কল্পনা করছে তাও জানেন। দু'জনে পরস্পর কী কানাকানি করছে তাও শোনেন। কারও পক্ষেই তাঁর থেকে কোনও কিছু লুকানো সম্ভব নয়। তাঁর অগোচরে কিছু করবে সে সাধ্য কারও নেই। তিনি যখন সব শোনেন ও জানেন, তখন বান্দার কোনও কিছুই তিনি বৃথা যেতে দেবেন না। তিনি সর্বশক্তিমান। সকলকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। যেদিন সকলে তাঁর সামনে হাজির হবে, সেদিন তিনি প্রত্যেককে তার যাবতীয় কাজ দেখিয়ে দেবেন। সবকিছুর হিসাব নেবেন। প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজের জন্য তাঁর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তখন আপন আপন কাজের জন্য যার যা প্রাপ্য, তিনি তা পুরোপুরি দান করবেন। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার দেবেন ও মন্দ কাজের বিনিময়ে শাস্তিদান করবেন। এ বিশ্বাস তো প্রত্যেকের আছে, কিন্তু সর্বদা তা অন্তরে জাগ্রত থাকে না। তার মন পড়ে থাকে ইহজাগতিক নানা দৌড়ঝাপ ও ব্যতিব্যস্ততার দিকে। তার পরলৌকিক বিশ্বাস চাপা পড়ে থাকে সেই চিন্তা-ভাবনার নিচে। ফলে তার পক্ষে তার জাগতিক কর্মকাণ্ড পারলৌকিক বিশ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় সে হয়ে পড়ে নিজ খেয়াল-খুশির অধীন। হয়ে যায় ইন্দ্রিয়পরবশ। এতে তার পরকালীন জীবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ইহজীবনও নষ্ট-ভ্রষ্ট হয়ে যায়। সে এক অপূরণীয় ক্ষতি। সে ক্ষতি থেকে বাঁচার লক্ষ্যেই মুরাকাবার ব্যবস্থা। বান্দা যদি প্রতিটি কথায় ও কাজে আল্লাহর প্রতি ধ্যান রাখে আর চিন্তা করে- আমি কী বলছি তিনি শুনছেন এবং কী করছি তা তিনি দেখছেন, তবে সে অবশ্যই শরীআতের গণ্ডির ভেতর থাকার চেষ্টা করবে। কেবল সেই কথাই বলবে, যা আল্লাহর মর্জি মোতাবেক হয় এবং এমন কাজই করবে, যা দ্বারা তাঁর সন্তষ্টি লাভ হয়।
মুরাকাবার প্রয়োজন যেমন শরীআতের গণ্ডির ভেতর থাকার জন্য, তেমনি প্রয়োজন শরীআত মোতাবেক কাজে ইখলাস আনয়নের জন্য। অর্থাৎ পাপ কাজ থেকে বাঁচা ও নেকীর কাজকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা, উভয়ের জন্যই মুরাকাবা দরকার। যখন যেই কথা ও কাজ সামনে আসে, তখন অন্তরে আল্লাহর ধ্যান থাকলে একদিকে এই চেষ্টা করা সম্ভব হয় যে, সে কথায় ও কাজে যাতে কোনও পাপ না হয়। সে কথা ও কাজটি পাপের হয়ে থাকলে আল্লাহর ভয়ই তাকে তা থেকে বিরত রাখে। এভাবে মুরাকাবা দ্বারা পাপ থেকে বাঁচা যায়। তেমনি যখন কোনও নেক কাজ করা হয়, তা নামায-রোয়া দান- সদাকা যাই হোক না কেন, মুরাকাবার সাথে করলে তা ইখলাসের সংগে করা হয়। কারণ বান্দা যখন চিন্তা করবে, আমার নামায আল্লাহ তাআলা দেখছেন, যেমন জাহের দেখছেন তেমনি এর বাতেনও দেখছেন, তখন সে অন্তর থেকে রিয়া ও লোকদেখানোর মানসিকতা ঝেড়ে ফেলবে। কারণ মনের ভেতর রিয়া থাকলে তাও তো আল্লাহ দেখেন। এ অবস্থায় সে নামায আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। কাজেই আল্লাহর কাছে যাতে কবুল হয়, সেই লক্ষ্যে সে মানুষকে দেখানো ও সুনাম-সুখ্যাতি অর্জনের চিন্তা বাদ দিয়ে কেবল আল্লাহ তাআলাকে খুশি করার জন্যই নামায পড়বে। সেইসংগে নামায পড়বে পরম যত্নের সাথে, যাতে ফরয-ওয়াজিব তো অবশ্যই, সেইসংগে সুন্নত-মুস্তাহাবও যেন যথাযথভাবে আদায় হয়। সে ভাড়াহুড়া করবে না। দায়সারাগোছে নামায পড়বে না। বরং যথাসাধ্য সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে নামায আদায়ের চেষ্টা করবে। এমনিভাবে অন্যান্য ইবাদতও সে ইখলাসের সংগে সুন্নত সম্মতভাবে আঞ্জাম দেবে। এমনকি দুনিয়ারী কাজকর্মও সুন্নত তরিকায় করতে সচেষ্ট থাকবে। ফলে তার জাগতিক কাজকর্মও ইবাদতে পরিণত হয়ে যাবে। এটা মুরাকাবার সুফল যে, এর মাধ্যমে বান্দার গোটা জীবনই বন্দেগীর জীবন হয়ে যায়। তার বাহ্যিক ও আত্মিক এবং ব্যবহারিক ও নৈতিক সবরকম উৎকর্ষ এর মাধ্যমে সাধিত হয়।
সুতরাং জীবনে শুদ্ধতা ও সুস্থতা আনয়নের জন্য মুরাকাবা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও হাদীসে এর প্রতি বিশেষ তাকীদ এসেছে। ইমাম নববী রহ. এ অধ্যায়ে এ সম্পর্কিত কিছু আয়াত ও হাদীছ উল্লেখ করেছেন। আমরা নিচে যথাক্রমে তার অর্থ ও ব্যাখ্যা পেশ করছি।

মুরাকাবা সম্পর্কিত আয়াতসমূহ
এক নং আয়াত
{الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ (218) وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ (219)} [الشعراء: 218، 219]
অর্থঃ যিনি তোমাকে দেখেন যখন তুমি (ইবাদতের জন্য) দাঁড়াও। এবং দেখেন সিজদাকারীদের মধ্যে তোমার যাতায়াতকেও। শুআরাঃ ২১৮-১৯

ব্যাখ্যা
এ আয়াতের আগের আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি আাসাল্লামকে তাঁর প্রতি নির্ভরশীল থাকার হুকুম দিয়েছেন। তারপর বলছেন- তিনি তোমাকে দেখেন যখন তুমি দাঁড়াও। এখানে দাঁড়ানোর এক অর্থ হতে পারে মানুষকে তাওহীদের দিকে ডাকা ও আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য বের হওয়া। সেই হিসেবে এর দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্বস্ত করা উদ্দেশ্য যে, দাওয়াত ও জিহাদী তৎপরতায় বিরুদ্ধবাদীদের বিরোধিতাকে আপনি পরোয়া করবেন না। আল্লাহ আপনার প্রতি লক্ষ রাখছেন। তিনি আপনাকে সাহায্য করবেন এবং শত্রুদের শত্রুতা থেকে আপনাকে রক্ষা করবেন।
দাঁড়ানোর আরেক অর্থ হতে পারে নামাযে দাঁড়ানো। অর্থাৎ যখন আপনি নামাযে দাঁড়ান, তখন তিনি আপনার প্রতি লক্ষ রাখেন। অর্থাৎ আপনার প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বাপেক্ষা প্রিয় আমল ছিল নামায। তিনি যখন নামাযে দাঁড়াতেন, তখন নিজ দেহমন তথা গোটা অস্তিত্বকে আল্লাহর অভিমুখী ও তাঁর জন্য নিবেদন করতেন। আল্লাহর ইবাদতের হক আদায় তো কারও পক্ষেই সম্ভব নয়, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে নিষ্ঠা ও অভিনিবেশের যতটা উচ্চতায় পৌঁছা সম্ভব, সেখানে পৌঁছা কেবল প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। প্রিয় হাবীবের প্রিয় ইবাদতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সে অভিনিবেশকালে আল্লাহ তা'আলার কী রহমত দৃষ্টি তাঁর উপর পড়েছিল, তা আমাদের পক্ষে কতটুকুই বা অনুমান করা সম্ভব?
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে একথা বলার দ্বারা তাঁর উম্মতকেও বোঝানো হতে পারে যে, তারা যখন নামাযে দাঁড়ায়, তিনি লক্ষ রাখেন। তিনি লক্ষ রাখেন, তারা কেমন নামায পড়ছে, তাতে কতটুকু ইখলাস আছে এবং তা কতটা বিশুদ্ধ ও সুন্দরভাবে আদায় করছে। লক্ষ রাখার এক অর্থ কবুল করাও হতে পারে। অর্থাৎ বান্দা যখन নামায পড়ে, আল্লাহ তা দেখেন, তার মূল্য দেন ও তা গ্রহণ করে নেন।
পরের আয়াতে বলা হয়েছে–এবং দেখেন সিজদাকারীদের মধ্যে তোমার উঠাবসা। সিজদাকারী বলতে নামাযী বোঝানো হয়েছে। দাঁড়ানো, রুকু করা ও সিজদা দেওয়া নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাই এর প্রত্যেকটি দ্বারা সম্পূর্ণ নামায বোঝানো হয়ে থাকে।
আগের আয়াতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একাকী নামাযের কথা হয়েছিল যে, আল্লাহ তা'আলা তা দেখেন। খুব সম্ভব তা দ্বারা নফল নামায বিশেষত তাহাজ্জুদের নামায বোঝানো হয়েছে। আর এ আয়াতে সিজদাকারীদের সাথে তার নামায অর্থাৎ জামাতে ফরয নামায আদায়ের কথা বোঝানো হয়েছে। এর দ্বারা বিশেষভাবে জামাতে নামায আদায়ের গুরুত্ব বোঝা যায়। ফরয নামায জামাতে আদায় করা জরুরি। কুরআন মাজীদে ফরয নামায আদায়ের বিষয়টা যেভাবে ব্যক্ত হয়েছে, তা দ্বারা কেবল জামাতবদ্ধ নামাযই বোঝা যায়। অর্থাৎ কুরআন মাজীদের ভাষায় প্রকৃষ্ট ফরয নামায যেন সেটাই, যা জামাতের সাথে আদায় করা হয়। তো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে যে জামাতের সাথে নামায পড়তেন, এ আয়াত বলছে আল্লাহ তা দেখেন। অর্থাৎ তিনি তাতে খুশি হন ও সমাদরে গ্রহণ করেন।
সহীহ হাদীছ দ্বারা জানা যায়, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাতে নামায পড়ার সময় আল্লাহ তাআলার কুদরতে পেছন দিকেও দেখতে পেতেন। সাহাবায়ে কিরাম কে কিভাবে নামায পড়ছেন, তাঁরা নামাযে কতটুকু 'খুশু-খুযু' রক্ষা করছেন তা তাঁর নজরে আসত। কারও কারও মতে এ আয়াতে সে কথাই বলা হয়েছে যে, সালাতরত মুসল্লীদের প্রতি আপনার ইতস্তত দৃষ্টি নিক্ষেপ আল্লাহ তা'আলা দেখেন। অর্থাৎ নামায অবস্থায়ও যে আপনি তাদের তদারকি করেন এবং নবুওয়াতী দায়িত্ব পালনে সর্বাবস্থায় সচেতন ও যত্নবান থাকেন, তা আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্টির সাথে লক্ষ রাখেন।
যাহোক এ আয়াত দ্বারা মুরাকাবার শিক্ষা পাওয়া যায়। ইবাদত-বন্দেগীতে যেমন বান্দার এই ধ্যান রাখা কর্তব্য যে, আল্লাহ তা'আলা আমার মনের অবস্থাও দেখছেন এবং আমলের বাহ্যিক রূপও লক্ষ রাখছেন, তেমনি জীবনের যাবতীয় কাজকর্মে অন্তরে এই ধ্যান জাগ্রত রাখা উচিত। তাহলে তার যাবতীয় কাজ শরীআতের সীমারেখার ভেতর থাকবে। এ ধ্যান তাকে সবরকম পাপকর্ম থেকে বিরত রাখবে। যে-কোনও কাজেই সে অন্তরে ইখলাস বজায় রাখতে পারবে। অর্থাৎ সে যা-কিছুই করবে তাতে কেবল আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিই হবে তার লক্ষ্যবস্তু।

দুই নং আয়াত
{وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (4)} [الحديد: 4]
“তোমরা যেখানেই থাক, তিনি তোমাদের সাথে আছেন। হাদীদঃ ৪

ব্যাখ্যা
অর্থাৎ তোমরা জলে-স্থলে, আলোতে- অন্ধকারে, প্রকাশ্যে-গোপনে যখন যেখানে যে অবস্থায়ই থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সংগে থাকেন। অর্থাৎ তোমরা তার ক্ষমতার মধ্যে থাক। তাঁর ব্যবস্থাপনার মধ্যে থাক। তাঁর দৃষ্টির ভেতর থাক। এবং থাক তাঁর জ্ঞানগোচর। ফলে তোমরা কী কর ও বল, সে সম্পর্কে তিনি সদা অবহিত থাকেন, যেমন ইরশাদ হয়েছে-
{وَأَسِرُّوا قَوْلَكُمْ أَوِ اجْهَرُوا بِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (13) أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ (14)} [الملك: 13، 14]
অর্থ : তোমরা তোমাদের কথা গোপনে বল বা প্রকাশ্যে বল (সবই তাঁর জানা। কেননা) তিনি তো অন্তর্যামী। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি জানবেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক জ্ঞাত!
তো তিনি যখন নিজ জ্ঞানশক্তির মাধ্যমে সর্বক্ষণ বান্দার সংগে থাকেন, তখন বান্দার কর্তব্য, যে-কোনও কথা ও কাজের বেলায় সেদিকে ধ্যান রাখা। অতি গোপনে কোনও কথা বলা বা কাজ করার সময় এ চিন্তা রাখা যে, আল্লাহ তো আমার সংগে আছেন। তিনি দেখছেন আমি কী করছি। যেমন ইরশাদ হয়েছে-
{أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ (7)} [المجادلة: 7]
অর্থ : তুমি কি দেখনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে তা আল্লাহ জানেন? কখনও তিনজনের মধ্যে এমন কোনও গোপন কথা হয় না, যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন এবং কখনও পাঁচজনের মধ্যে এমন কোনও গোপন কথা হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন। এমনিভাবে তারা এর কম হোক বা বেশি, তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাআলা তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে অবহিত করবেন তারা যা-কিছু করত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। মুজাদালাঃ ৭
এ আয়াতে ধমক দেওয়া হয়েছে, কেউ দেখছে না মনে করে কোনও অন্যায়- অপকর্ম করলে আল্লাহর কাছে তা থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে না। তিনি কিয়ামতের দিন অপরাধীকে তা দেখিয়ে দেবেন এবং তার উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করবেন। সুতরাং যাই করো না কেন, আল্লাহ তা'আলাকে হাজির-নাজির জেনে কর। সেক্ষেত্রে তোমরা শাস্তি থেকে বাঁচতে পারবে এবং তাকে তোমাদের সংগে পাবে ও পদে পদে তাঁর সাহায্য লাভ করবে, যেমন ইরশাদ হয়েছে-
{إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُمْ مُحْسِنُونَ (128)} [النحل: 128]
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরই সাথী, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ইহসানের অধিকারী হয়। নাহলঃ ১২৮
এ আয়াত দ্বারাও মুরাকাবার শিক্ষা পাওয়া যায়। বোঝানো হচ্ছে, আল্লাহ যখন তোমাদের সংগে থাকেন তখন তোমাদের কর্তব্য পাপকাজের ক্ষেত্রে অন্তরে তাঁর শাস্তির ভয় এবং সৎকাজের ক্ষেত্রে তাঁর সাহায্য ও পুরস্কারের আশা রাখা। অন্তরে এই ধ্যান থাকলে সহজে পাপকাজ থেকে বাঁচতে পারবে এবং নেককাজের অনুপ্রেরণা পাবে।

তিন নং আয়াত
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَخْفَى عَلَيْهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ (5) هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (6)} [آل عمران: 5، 6]
অর্থ : নিশ্চিত জেনে রেখ, আল্লাহর কাছে কোনও জিনিস গোপন থাকতে পারেনা- পৃথিবীতেও নয় এবং আকাশেও নয়। আলু ইমরানঃ ৫

ব্যাখ্যা
আল্লাহ তাআলার কাছে আসমান-যমীনের কোনওকিছুই গোপন থাকে না এবং তা থাকতে পারে না। কেননা জগতের মৌলিক ও খুঁটিনাটি সবকিছুই তাঁর জ্ঞানের ভেতর বিদ্যমান। তাঁর অজানা নেই কোনওকিছুই। যে যত গোপনেই কিছু করুক না কেন, প্রকাশ্য কাজের মতই সমানভাবে তিনি তা জানেন। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-
{يَسْتَخْفُونَ مِنَ النَّاسِ وَلَا يَسْتَخْفُونَ مِنَ اللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمْ إِذْ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرْضَى مِنَ الْقَوْلِ وَكَانَ اللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطًا (108)} [النساء: 108]
অর্থ : তারা মানুষের সাথে তো লজ্জা করে, কিন্তু আল্লাহর সাথে লজ্জা করে না, অথচ তারা রাতের বেলা যখন আল্লাহর অপসন্দনীয় কথা বলে তখনও তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন। তারা যা-কিছু করছে তা সবই আল্লাহর আয়ত্তে।" নিসাঃ ১০৮
আল্লাহর কাছে যখন কোনওকিছুই গোপন থাকে না, তখন বান্দার প্রতিটি কাজের বেলায় শরীআতের সীমারেখা লক্ষ রাখা চাই, যাতে আল্লাহর মর্জিবিরোধী কোনও কাজ না হয়ে যায়। এমনকি নিজ অন্তরেরও পর্যবেক্ষণ করা উচিত, যাতে কোনও কাজ
রিয়া ও লোকদেখানোর মানসিকতায় করা না হয়; বরং একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তষ্টিই লক্ষ্যবস্তু হয়। এ আয়াতও আমাদেরকে মুরাকাবার শিক্ষা দিচ্ছে।

চার নং আয়াত
{إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ (14)} [الفجر: 14]
অর্থ : নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সকলের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। ফাজরঃ ৪

ব্যাখ্যা
এটা সূরা ফাজরের আয়াত। এর আগে আল্লাহ তাআলা আদ জাতি, ছামুদ জাতি ও ফিরআওনের বৃত্তান্ত উল্লেখ করেছেন। জানানো হয়েছে যে, এ তিনও জাতি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত ছিল। নবীর কথায় কর্ণপাত না করে সীমালঙ্ঘনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। শেষপর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাদের ধ্বংস করে দেন। তাদের সে ধ্বংসকাহিনী উল্লেখ করার পর তিনি বলছেন- তোমার প্রতিপালক তোমাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। কে কী করছে, কেন করছে তা লক্ষ রাখছেন। অতীতে যেমন চরম সীমালঙ্ঘনকারীকে কঠিন শাস্তিদান করেছেন, তেমনি তোমরাও যদি তাঁর অবাধ্যতায় সীমা ছাড়িয়ে যাও, তবে তাদের মত তোমাদেরও কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। সুতরাং যা-কিছুই কর না কেন, সীমার মধ্যে থেকে কর। তিনি তোমাদেরকে কুরআন দিয়েছেন। কুরআনের মাধ্যমে কর্তব্যকর্ম জানিয়ে দিয়েছেন। নবীর মাধ্যমে হিদায়াতের পথ খুলাসা করে দিয়েছেন। সেই হিদায়াতের পথে চলতে থাক। তাহলে আল্লাহর কাছে পুরস্কার পাবে। গোমরাহীর পথে চলো না। আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ো না। তাহলে তোমাদের উপর তাঁর শাস্তি নেমে আসবে।
এ আয়াত শিক্ষা দিচ্ছে, আল্লাহ যখন তোমাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন, তখন তোমাদেরও কর্তব্য, অন্তরে সেই ধ্যান জাগ্রত রেখে নিজ কাজের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং নিজ উদ্দেশ্য ও নিয়তের তদারকি করা। এটাই আল্লাহর শাস্তি থেকে আত্মরক্ষা ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র উপায়।

পাঁচ নং আয়াত
{يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ (19)} [غافر: 19]
অর্থ : আল্লাহ জানেন চোখের অসাধুতা এবং সেইসব বিষয়ও, যা বক্ষদেশ লুকিয়ে রাখে। গাফিরঃ ১৯

ব্যাখ্যা
যে দেখা অন্যায় ও খেয়ানত
চোখের অসাধুতা বলতে অন্যায় দেখা বোঝানো উদ্দেশ্য। শরীআত যা দেখার অনুমতি দেয় না তা দেখা বা যেভাবে দেখার অনুমতি দেয় না সেভাবে দেখাই অসাধু ও অন্যায় দেখা, যেমন পরনারীর দিকে তাকানো। তা সরাসরি তাকানো হোক বা চোরাচোখে দেখা হোক, উভয়ই নাজায়েয। দৃষ্টিশক্তি আল্লাহর দান। বান্দার পক্ষে এ আল্লাহর আমানত। এ শক্তির সঠিক ব্যবহার করলে আমানতের হেফাজত হয়। অন্যায় ব্যবহার করলে হয় খেয়ানত। এ আয়াতেও খেয়ানত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যা দেখা নিষিদ্ধ তা দেখলে দৃষ্টিশক্তির অপব্যবহার ও আমানতের খেয়ানত হয়। সুতরাং পরনারীর দিকে তাকানো এক প্রকার খেয়ানত। খেয়ানত করা নাজায়েয এবং এটা মুনাফিকের স্বভাব।
যে বস্তু ভোগ করা হালাল নয়, লোভের দৃষ্টিতে সেদিকে তাকানোও চোখের খেয়ানত। অন্যের সম্পদ দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া ও ঈর্ষার দৃষ্টিতে সেদিকে তাকানোও খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত ও অসাধু দেখা। এর থেকে বিরত থাকা উচিত।
আল্লাহ তা'আলা যাকে যেই নি'আমত দিয়েছেন, প্রত্যেকের উচিত তাতে সন্তুষ্ট থাকা। অনেক সময় এতে ভুল হয়ে যায়। অন্যের কী কী বেশি আছে সেদিকে তাকানো হয়। অন্যের স্বাস্থ্য, অন্যের রূপ ও সৌন্দর্য, অন্যের সম্পদ, অন্যের সুখ্যাতি, অন্যের পদমর্যাদা, অন্যের ক্ষমতা ও যোগ্যতা ইত্যাদি দেখে মনে করা হয় তারা আমার চেয়ে অনেক বেশি সুখী। আমি তাদের চেয়ে পিছিয়ে আছি। এর ফলে অন্তরে ঈর্ষার জন্ম নেয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা হল পার্থিব বিষয়ে নিজের চেয়ে যারা উপরে তাদের দিকে না তাকানো। কিন্তু আমরা তাকাই এবং ঈর্ষান্বিত হই। এরফলে হতাশ ও ক্ষতিগ্রস্ত হই। এতে দীন-দুনিয়ার অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। সে ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য এ অন্যায় তাকানো পরিহার করা উচিত।
অন্যায় তাকানোর একটা দিক হল তাকানোর ভঙ্গি। অন্যের প্রতি কটাক্ষ করা, চোখ কুচকিয়ে তাকানো, চোখ বাঁকিয়ে তাকানো, রক্তচোখে তাকানো এবং এরকম আরও যত অনুচিত ভঙ্গি আছে তা অবলম্বন করাও একরকম অসাধুতা ও দৃষ্টিশক্তির খেয়ানত। এসব ভঙ্গি আড়ালে অবলম্বন করা হয়। অর্থাৎ যাকে লক্ষ্য করে তাকানো হয় তার আড়ালে, সে যাতে বুঝতে না পারে। উদ্দেশ্য থাকে অন্যের সামনে তাকে খাটো করা ও মনের খেদ মেটানো। তো যাকে কটাক্ষ করা হয় সে নাই দেখুক, আল্লাহ তা'আলা ঠিকই দেখছেন। এ আয়াত সতর্ক করছে- তোমরা চোখের যত রকম খেয়ানত কর, যত রকমের অসৎ ও অসাধু দৃষ্টিদান কর, তা আর কেউ না দেখুক আল্লাহ তা'আলা ঠিকই দেখছেন। সেই চিন্তা মাথায় রেখে দৃষ্টিশক্তির ব্যবহার করো।
আয়াতের শেষে বলা হয়েছে- তিনি তোমাদের মনের গোপন করাও জানেন। তোমরা মনে কি কল্পনা কর, সৎ কল্পনা না অসৎ কল্পনা, সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পুরোপুরি অবহিত। সুতরাং ইচ্ছা, কল্পনা ও সংকল্প করার ক্ষেত্রে অন্তরে এই ধ্যান রেখো যে, আল্লাহ তা জানেন । তাহলে অসৎ চিন্তা-ভাবনা থেকে বাঁচতে পারবে এবং সৎ চিন্তা ও সৎ সংকল্পের তাওফীক লাভ হবে।
মোটকথা এ আয়াতও মুরাকাবা ও ধ্যানের প্রেরণা যোগায়। এর দ্বারা শিক্ষা লাভ হয় যে, কেবল প্রকাশ্য কাজই নয়, গুপ্ত কাজও এমনকি মনের গোপন ইচ্ছাও যেহেতু আল্লাহ তাআলা জানেন, তাই সতর্ক থাকা উচিত যাতে অন্যায় ও অসৎ চিন্তা মনে ঠাঁই না পায়। যদি কখনও কোনও অসৎ চিন্তা অন্তরে জাগ্রত হয়, তবে আল্লাহর ধরপাকড়ের ভয়ে সংগে সংগেই তা অন্তর থেকে ঝেড়ে ফেলে তাওবা-ইস্তিগফারে রত হওয়া চাই। আল্লাহ তা'আলা আমাদের তাওফীক দান করুন।
৬০। মুরাকাবা সংক্রান্ত হাদীছসমূহ; ইসলাম, ঈমান ও ইহসানের পরিচয় এবং কিয়ামতের আলামত:

অর্থ : হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় এক লোক আমাদের সামনে আবির্ভূত হল। লোকটির পোশাক ধবধবে সাদা। তার চুল গাঢ় কালো। তার শরীরে সফরের কোনও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। তাকে আমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি চিনতেও পারছে না। সে এগিয়ে আসতে থাকল এবং নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এসে বসল। তারপর সে তার দুই হাঁটু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাঁটুর সাথে মিলিয়ে দিল এবং নিজের দুই হাত তাঁর দুই উরুর উপর রাখল। তারপর বলল, হে মুহাম্মাদ। আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইসলাম এই যে, তুমি সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ ছাড়া কোনও মা'বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, রমযানের রোযা রাখবে এবং বায়তুল্লাহ'য় যাওয়ার সামর্থ্য থাকলে হজ্জ করবে। সে বলল, আপনি সত্য বলেছেন। আমরা তার প্রতি বিস্ময়বোধ করলাম যে, সে নিজেই তাঁকে প্রশ্ন করছে আবার তাঁর উত্তর সঠিক বলে মন্তব্যও করছে।
তারপর সে বলল, আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন। তিনি বললেন, ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহ, তাঁর ফিরিশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ, শেষদিবস এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখবে। সে বলল, আপনি সত্য বলেছেন।
সে (আবার) বলল, আমাকে ইহসান সম্পর্কে অবহিত করুন। তিনি বললেন, ইহসান এই যে, তুমি আল্লাহর 'ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি তুমি তাঁকে নাও দেখ, তবে তিনি তো তোমাকে অবশ্যই দেখছেন।
তারপর সে বলল, আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে অবহিত করুন। তিনি বললেন, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসাকারী অপেক্ষা অধিক জানে না। সে বলল, তবে তার আলামতসমূহ আমাকে বলে দিন। তিনি বললেন- (ক) দাসী তার কর্ত্রীকে জন্ম দেবে এবং (খ) খালি পা ও নগ্ন শরীরের অভাবী মেষ রাখালদের দেখতে পাবে (একসময়) উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণে পরস্পর প্রতিযোগিতা করছে। তারপর সে চলে গেল। তারপর আমি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উমর! তুমি কি জান প্রশ্নকারী কে? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, তিনি তো জিবরাঈল আঃ। তিনি তোমাদের কাছে এসেছিলেন তোমাদেরকে দীন শিক্ষা দিতে - মুসলিম। (হাদীসঃ ৮)
‘দাসী তার কর্ত্রীকে জন্ম দেবে' এ কথার অর্থ দাসীদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটবে। ফলে দাসীর গর্ভে তার মনিবের কন্যাসন্তান জন্ম নেবে। মনিবের কন্যা মনিবতুল্য বটে (সেই হিসেবে দাসীর গর্ভে তার কর্ত্রী ও মনীবেরই জন্ম হল)। এর এছাড়া আরও ব্যাখ্যা আছে। العالة (শব্দটি عائل -এর বহুবচন) অর্থ অভাবগ্রস্ত। مليا - এর অর্থ দীর্ঘ সময়। আর তা ছিল তিন দিন।
مقدمة الامام النووي
5 - باب المراقبة
60 - وأما الأحاديث، فالأول: عن عمر بن الخطاب - رضي الله عنه - قَالَ: بَيْنَما نَحْنُ جُلُوسٌ عِنْدَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - ذَاتَ يَومٍ، إذْ طَلَعَ عَلَينا رَجُلٌ شَديدُ بَياضِ الثِّيابِ، شَديدُ سَوَادِ الشَّعْرِ، لا يُرَى عَلَيهِ أثَرُ السَّفَرِ، وَلا يَعْرِفُهُ مِنَّا أحَدٌ، حَتَّى جَلَسَ إِلَى النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - فَأَسْنَدَ رُكْبَتَيهِ إِلَى رُكْبتَيهِ، وَوَضعَ كَفَّيهِ عَلَى فَخِذَيهِ (1)، وَقالَ: يَا مُحَمَّدُ، أخْبرني عَنِ الإسلامِ، فَقَالَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم: «الإسلامُ: أَنْ تَشْهدَ أَنْ لا إلهَ إلاَّ الله (2) وأنَّ مُحمَّدًا رسولُ الله، وتُقيمَ الصَّلاةَ، وَتُؤتِيَ الزَّكَاةَ، وَتَصومَ رَمَضَانَ، وَتَحُجَّ البَيتَ إن اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبيلًا». قَالَ: صَدَقْتَ. فَعَجِبْنَا لَهُ يَسْأَلُهُ وَيُصَدِّقهُ! قَالَ: فَأَخْبرنِي عَنِ الإِيمَانِ. قَالَ: «أنْ تُؤمِنَ باللهِ، وَمَلائِكَتِهِ، وَكُتُبهِ، وَرُسُلِهِ، وَاليَوْمِ الآخِر، وتُؤْمِنَ بالقَدَرِ خَيرِهِ وَشَرِّهِ». قَالَ: صَدقت. قَالَ: فأَخْبرني عَنِ الإحْسَانِ. قَالَ: «أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأنَّكَ تَرَاهُ، فإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فإنَّهُ يَرَاكَ». قَالَ: فَأَخْبِرنِي عَنِ السَّاعَةِ. قَالَ: «مَا المَسْؤُولُ عَنْهَا بأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ». قَالَ: فأخبِرني عَنْ أَمَاراتِهَا. قَالَ: «أنْ تَلِدَ الأَمَةُ رَبَّتَهَا، وأنْ تَرَى [ص:39] الحُفَاةَ العُرَاةَ العَالَةَ رِعَاءَ الشَّاءِ يَتَطَاوَلُونَ في البُنْيَانِ». ثُمَّ انْطَلقَ فَلَبِثْتُ مَلِيًّا، ثُمَّ قَالَ: «يَا عُمَرُ، أَتَدْرِي مَنِ السَّائِلُ؟» قُلْتُ: اللهُ ورسُولُهُ أعْلَمُ. قَالَ: «فإِنَّهُ جِبْريلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمُكُمْ أَمْرَ دِينكُمْ» (3). رواه مسلم. (4)
ومعنى «تَلِدُ الأَمَةُ رَبَّتَهَا» أيْ سَيِّدَتَهَا؛ ومعناهُ: أَنْ تَكْثُرَ السَّراري حَتَّى تَلِدَ الأَمَةُ السُّرِّيَّةُ بِنْتًا لِسَيِّدِهَا وبنْتُ السَّيِّدِ في مَعنَى السَّيِّدِ وَقيلَ غَيْرُ ذلِكَ. وَ «العَالَةُ»: الفُقَراءُ. وقولُهُ: «مَلِيًّا» أَيْ زَمَنًا طَويلًا وَكانَ ذلِكَ ثَلاثًا.

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) قال العلماء: وضع كفيه على فخذي نفسه لا على فخذي النبي - صلى الله عليه وسلم - وذلك من كمال الأدب في جلسة المتعلم أمام المعلم، بأن يجلس بأدب، واستعداد لما يسمع مما يقال من الحديث. شرح رياض الصالحين لابن عثيمين 1/ 182.
(2) أي: لا معبود بحق إلا الله.
(3) فيه أنه ينبغي للعالم والمفتي وغيرهما إذا سئل عما لا يعلم أن يقول: لا أعلم. وليس فيه دليل على إباحة بيع أمهات الأولاد، ولا منع بيعهن، وفيه أن أهل الحاجة والفقر تبسط لهم الدنيا حتى يتباهون في البنيان، وفيه أن الإيمان والإسلام والإحسان تسمى كلها دينًا. وأن هذا الحديث يجمع أنواعًا من العلوم والمعارف والآداب واللطائف بل هو أصل الإسلام. شرح صحيح مسلم للنووي 1/ 148.
(4) أخرجه: مسلم 1/ 28 (8) (1).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক হাদীছ। এর ভেতর রয়েছে সমগ্র দ্বীনের ব্যাখ্যা। ঈমান, ইসলাম ও ইহসান- এ তিনটি দ্বীনের প্রধান শাখা। এ হাদীছে এ শাখা তিনটির ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। বান্দার যাবতীয় প্রকাশ্য ও গুপ্ত আমল এর মধ্যে এসে গেছে। অন্তরের আমল ‘আকীদা-বিশ্বাস ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল 'ইবাদত-বন্দেগী সবই এ তিনটির অন্তর্ভুক্ত। নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে সহীহ-শুদ্ধ করা এবং আখলাক-চরিত্র পরিশুদ্ধ করাও এর আওতাভুক্ত। সমস্ত আমলকে রিয়া ও লোকদেখানোর মানসিকতা থেকে মুক্ত রাখা এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে আত্মরক্ষার বিষয়টাও এর অন্তর্ভুক্ত। শরী'আতের যাবতীয় 'ইলম এরই সাথে সম্পৃক্ত। ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, এ হাদীছটি ‘উম্মুস-সুন্নাহ' (সমস্ত হাদীছ ও সুন্নাহ’র মূল) নামে অভিহিত হওয়ার উপযুক্ত, যেহেতু হাদীছ ও সুন্নাহ সম্পর্কিত সমগ্র ইলমের সারসংক্ষেপ এর মধ্যে এসে গেছে। বলা যায় এটা সমগ্র দীনেরই সারসংক্ষেপ।

এ হাদীছে দ্বীনের ব্যাখ্যা দান করা হয়েছে প্রশ্নোত্তরের পন্থায়। হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেছেন এবং তিনি তার উত্তর দিয়েছেন। শেষে আছে, তিনি আগমন করেছিলেন সাহাবায়ে কিরামকে দীনের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। এর দ্বারা তাঁর সে উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয়েছে। তাই এ হাদীছটি ‘হাদীছে জিবরীল' নামে পরিচিত।

হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামের আগমনের কারণ
সাহাবায়ে কিরাম নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেন। তিনিও তাঁদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে সে সকল প্রশ্নের উত্তর দিতেন। তাঁর সঙ্গে সাহাবায়ে কিরামের ছিল অত্যন্ত গভীর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। কোনও বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করতে তাদের কুণ্ঠাবোধ হত না। এ কারণে কমনও কখনও তাদের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্নও এসে যেত, যা জানার বিশেষ প্রয়োজন নেই। কিংবা দ্বীনের সংগে তার বিশেষ সম্পর্ক নেই। অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অপ্রাসঙ্গিক কোনও প্রশ্নের কারণে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং তাদেরকে প্রশ্ন করতে নিষেধ করে দেন। কুরআন মাজীদেরও আয়াত নাযিল হয়

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِنْ تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ

"হে মুমিনগণ! তোমরা এমন সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা প্রকাশ করা হলে। তোমাদের কাছে অপ্রীতিকর মনে হবে।”

সুতরাং সাহাবায়ে কিরাম প্রশ্ন করা একেবারেই ছেড়ে দিলেন। এতে তাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হল। কেননা অনেক সময় এমন জরুরি বিষয়ও দেখা দেয়, যে সম্পর্কে জিজ্ঞেস না করলে তার সমাধান সম্ভব হয় না। একদিকে জিজ্ঞেস করলে অনুচিত বিষয়ে প্রশ্ন হয়ে যাওয়ার আশংকা, অন্যদিকে জিজ্ঞেস না করলে সমস্যার সমাধান না হওয়ার বিড়ম্বনা। তাঁরা এ উভয় সংকটের মধ্যে পড়ে গেলেন। এ জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামকে পাঠালেন। তিনি এসে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করে সাহাবায়ে কিরামের দীন শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিলেন। সেইসংগে এর মাধ্যমে তাঁরা এই শিক্ষাও পেয়ে গেলেন যে, নবীকে দীন সম্পর্কে কী ধরনের প্রশ্ন করা উচিত এবং কী ধরনের প্রশ্ন করা উচিত না।

হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামের অবাক করা যত আচরণ
হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামের বেশভূষা, আচরণ ও কথাবার্তা ছিল অবাক করার মত। তিনি এসেছিলেন পরিপাটি বেশভূষায়। ধবধবে সাদা পোশাক, কালো পরিপাটি মাথার চুল। দেখলে মনে হয় খুব কাছাকাছি দূরত্ব থেকে কেতাদুরস্ত হয়ে আসা কোনও ভদ্রলোক। কাছের কোনও বাসিন্দা হলে সকলের চেনার কথা। কিন্তু কেউ তাঁকে চিনতে পারছে না, এ আগুন্তুক কে। সেই হিসেবে ধরে নিতে হয় ইনি দূরবর্তী কোনও এলাকার বাসিন্দা। কিন্তু তাই যদি হয়, তবে তো সফরের চিহ্ন থাকার কথা। পোশাক হবে ধুলোমলিন, মাথার চুল হবে ধূসর আলুথালু। কিন্তু সেরকম সফরের কোনও চিহ্ন তো তাঁর মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। তার অর্থ দাঁড়ায় তিনি দূর থেকে আসেননি। দূরেরও মন কাছেরও নন, এ কেমন অবাক ব্যাপার। যাহোক মজলিসে প্রবেশের পর তিনি আস্তে আস্তে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এগিয়ে আসলেন। কোনও কোনও বর্ণনায় আছে, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে মুহাম্মাদ! কাছে আসব? তিনি বললেন, কাছে আসুন। তিনি কাছে এসে বসলেন। নিজ হাঁটু তাঁর হাঁটুর সাথে মিলিয়ে দিলেন এবং দু'হাত তাঁর উরুর উপর রাখলেন।

মুহাম্মাদ বলে সম্বোধন করা সাহাবায়ে কিরামের অভ্যাস ছিল না। এটা আদবের পরিপন্থী। তাঁরা তাঁকে রাসূলুল্লাহ বা নাবিয়্যুল্লাহ বলে সম্বোধন করতেন। কিন্তু এ আগুন্তক তাঁর নাম নিয়েই সম্বোধন করছে। তাদের পক্ষে এটাও হতচকিত করার মত ব্যাপার। তারপর আবার নিজের হাঁটু তাঁর হাঁটুর সংগে মিলিয়ে রাখছেন। এও এক অদ্ভুত আচরণ! বড়র সংগে ছোটর বিশেষত নবীর সংগে এ জাতীয় আচরণ কোনও আদবকেতার আওতায় পড়ে না। তারপর নিজের হাত তাঁর উরুর উপর রাখলেন। কার উরুর উপর? কোনও বর্ণনায় আছে নিজ ঊরুর উপর। আবার কোনও বর্ণনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের উরুর উপর। হয়তো প্রথমে নিজ উরুর উপর রেখেছিলেন, পরে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের উরুর উপর রাখেন। এটা আরও বেশি অদ্ভুত আচরণ! নবী-রাসূলের সংগে উম্মতের কোনও সদস্যের এ জাতীয় আচরণ কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু এ আগুম্ভক এ সবই করলেন।

আরও অবাক করার মত বিষয় হল নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি উত্তরের পর তিনি মন্তব্য করছেন- আপনি সঠিক বলেছেন। কী আশ্চর্য! একদিকে জিজ্ঞেস করছেন। তার মানে যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করছেন সে বিষয়ে তিনি অজ্ঞ। তাঁর তা জানা নেই। আবার উত্তর পাওয়ার পর বলছেন, আপনি সঠিক বলছেন। তার মানে সে বিষয়ে তাঁর জানা আছে। জানা আছে বলেই উত্তর সঠিক হয়েছে কি না বুঝতে পারছেন। তা যদি জানাই থাকে, তবে জিজ্ঞেস করবেন কেন? আর যদি জানা না থাকে, তবে সঠিক হয়েছে বলে মন্তব্য করবেন কেন? এ দুইয়ের মধ্যে কোনও সংগতি নেই। এ অসংগতিও সাহাবায়ে কিরামকে অবাক করেছে। কোনও কোনও রিওয়ায়েতে আছে, তারা বলে উঠেছেন- দেখ, সে জিজ্ঞেসও করছে আবার সঠিক বলে মন্তব্যও করছে। যেন সে তাঁরচে' বেশি জানে! অন্য বর্ণনায় আছে, আমরা তার মত লোক দেখিনি। যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শেখাচ্ছে! তাই বলছে, সঠিক বলেছেন, সঠিক বলেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম এসব অবাক করা কাণ্ড কেন করলেন? আসলে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সাহাবায়ে কিরামের মনোযোগ আকর্ষণ করা। তিনি যেহেতু তাঁদেরকে দ্বীনের শিক্ষাদান করার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন, আর সেজন্য প্রশ্নোত্তরের পন্থা বেছে নিয়েছিলেন, তাই চাচ্ছিলেন তাদেরকে কৌতূহলী করে তুলে প্রশ্নকারী ও উত্তরদাতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি পুরোপুরি মনোযোগী করে রাখতে। চোখ-কান, দেহ-মন, চিন্তা ও ধ্যান সবদিক থেকে ভালে তাঁদের প্রতি অভিনিবিষ্ট ও একপ্রচিত্ত করে রাখতে। সেজন্যই তিনি এসব অবা করেছেন। বলা বাহুল্য তাঁর সে উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। সাহাবায়ে কিরাম পূর্ণ সাথে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামের প্রশ্ন ও নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তর শুনেছেন এবং দীনের সুস্পষ্ট শিক্ষা অর্জন করেছেন।

হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামের প্রথম প্রশ্ন ও তার উত্তর
হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম প্রথম প্রশ্ন করলেন ইসলাম সম্পর্কে ইসলাম কী? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইসলাম এই যে, তুমি সা দেবে আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল। আর নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, রমযানের রোযা রাখবে এবং বায়তুল্লাহ য় যাওয়ার সামর্থ্য থাকলে হজ্জ করবে। এতে তিনি ইসলামের ব্যাখ্যা করেছেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাহ্যিক কাজকর্ম দ্বারা। প্রথম হচ্ছে এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। এটা মুখের কাজ। আর নামায কায়েম করা, যাকাত দেওয়া, রোযা রাখা ও হজ্জ করা অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ। এগুলো তিনভাগে বিভক্ত। শারীরিক, যেমন নামায পড়া ও রোযা রাখা। অর্থ সম্পদ সম্পর্কিত, যেমন যাকাত দেওয়া। তৃতীয়ত শারীরিক ও আর্থিক উভয় সংক্রান্ত, যেমন হজ্জ করা।

এখানে কেবল ইসলামের মৌলিক কার্যাবলীর উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন ও হাদীছের বিভিন্ন স্থানে ইতিবাচক ও নেতিবাচক বহু কাজের উল্লেখ আছে। তা সবই ইসলামের শাখা-প্রশাখা। বস্তুত বাহ্যিক কার্যাবলীর সবই ইসলামের আওতাধীন। বিভিন্ন হাদীছ দ্বারাই তা প্রমাণিত, যেমন এক হাদীছে বর্ণিত হয়েছে

المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده

‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।
অপর এক হাদীছে আছে, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, ইসলামের কোন্ আমল শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন «تطعم الطعام وتقرأ السلام على من عرفت ومن لم تعرف» ইসলামের শ্রেষ্ঠ আমল যে, তুমি মানুষকে অন্ন করবে এবং পরিচিত-অপরিচিত সকলকে সালাম দিবে।'
মোটকথা, কুরআন ও হাদীছে যা-কিছু করার হুকুম দেওয়া হয়েছে তা সব করা এবং যা-কিছু করতে নিষেধ করা হয়েছে সেসব থেকে বিরত থাকার দ্বারা এক ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হতে পারে। এ হাদীছে ইসলামের কেবল মৌলিক কাজসমূহই উল্লেখ করা হয়েছে। শরীর, সম্পদ ও যৌথভাবে উভয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত ইতিবাচক ও নেতিবাচক যাবতীয় কাজই এর আওতাধীন।

জিবরীল আলাইহিস সালামের দ্বিতীয় প্রশ্ন তার উত্তর
জিবরীল আলাইহিস-সালামের দ্বিতীয় প্রশ্ন ঈমান সম্পর্কে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিয়েছেন, ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহ,তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তার কিতাবসমুহ, তাঁর রাসূলগণ, শেষদিবস এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখবে।

লক্ষ্য করা যাচ্ছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানের ব্যাখ্যায় ৬টি বিষয় উল্লেখ করেছেন, যার প্রত্যেকটিরই সম্পর্ক বিশ্বাসের সাথে। এই ছয়টি ঈমানের প্রধানতম অঙ্গ। মু'মিন হবার জন্য এর প্রত্যেকটিতে বিশ্বাস রাখা জরুরি। এর যে-কোনও একটিত অবিশ্বাস করলে মু'মিন থাকে না। এর প্রত্যেকটিরও আবার ব্যাখ্যা আছে। কুরআন-সুন্নাহ’য় সে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যেকটিতে বিশ্বাস রাখতে হবে সেই ব্যাখ্যা মোতাবেক। যেমনঃ আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই, এর দ্বারা তাওহীদের বিশ্বাস বোঝানো হয়েছে। তাওহীদ মানে একথা বিশ্বাস করা,এ বিশ্ব জগতের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। বিশ্বজগত সৃষ্টিতে তার কোনও শরীক নেই। তাঁর কোনও শুরু ও শেষ নেই। তিনি সদা ছিলেন, সদা থাকবেন। তিনি সকলের রক্ষাকর্তা। তিনি সর্বশক্তিমান সর্বজ্ঞ। তাঁর সত্তায় কোনও শরীক নেই, তেমনি তাঁর গুণাবলীতেও কোনও অংশীদার নেই। সৃষ্টির ইষ্ট অনিষ্টের তিনি একচ্ছত্র মালিক। তিনি কারও কোনও উপকার করতে চাইলে কেউ তা রদ করতে পারে না এবং কারও ক্ষতি করতে চাইলে কেউ তা ঠেকাতে না। তো তিনি একাই যখন সমস্ত উপকার-ক্ষতির মালিক, তখন মা'বৃদও কেবল তিনি একাই হতে পারেন। 'ইবাদত কেবল তাঁর একারই করা যেতে পারে। ‘ইবাদতে অন্য শরীক করার কোনও বৈধতা নেই।

এমনিভাবে রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাসের মানে- আল্লাহ 'তাআলা মানুষের হিদায়াতের জন্য হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত বহু নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাদের সকলকেই নবী হিসেবে বিশ্বাস করা জরুরি। যে যুগে যে নবী আসেন, সে যুগের মানুষের কর্তব্য তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য করা এবং তাঁর আনীত বা প্রচারিত শরী'আত মেনে চলা।এ ধারার সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এখন কিয়ামত পর্যন্ত সারা জাহানের সমস্ত মানুষের কর্তব্য তাঁর প্রতি ঈমান আনা ও তাঁর আনীত শরী'আতের পাবন্দী করা। রাসূলগণের প্রতি এ ব্যাখ্যার সাথেই বিশ্বাস স্থাপন জরুরি। এছাড়া তাঁদের প্রতি বিশ্বাস যথার্থ বিশ্বাস বলে গণ্য হবে না।

এভাবেই ঈমানের বাকি চারটি মূল অঙ্গের প্রতিও কুরআন ও সুন্নাহ’য় প্রদত্ত ব্যাখ্যা অনুসারে বিশ্বাস রাখা অবশ্যকর্তব্য। মনগড়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর কোনও একটি অঙ্গে বিশ্বাস আনয়ন করলে তা সত্যিকারের ঈমান বলে গৃহীত হবে না।

প্রকাশ থাকে যে, এ হাদীছে যে ঈমান ও ইসলামের আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তা কেবলই শাব্দিক, পারিভাষিক ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ব্যবহারিক দিক থেকে নয়। তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে ঈমান হচ্ছে অন্তরের কাজ। অর্থাৎ যে সকল বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস রাখা জরুরি, আন্তরিকভাবে তা বিশ্বাস করা ও মেনে নেওয়া। আর ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর কাছে বান্দার আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যস্বীকার, যা বাহ্যিক কাজের দ্বারাই সম্ভব। তাই এক রেওয়ায়েতে আছে, ইসলাম হল প্রকাশ্য বিষয় আর ঈমান অন্তরের গুপ্ত বিষয়। অর্থাৎ ইসলাম বাহ্যিক কার্যাবলীর নাম, যা প্রকাশ্যে করা হয়ে থাকে। আর ঈমান তো বিশ্বাস, তা প্রকাশ পায় না, অন্তরে গোপন থাকে।

যে সকল হাদীছে ঈমান ও ইসলাম পাশাপাশি এসেছে, যেমন এই হাদীছে জিবরীলে, তাতে ঈমান ও ইসলামের এ তাত্ত্বিক দিকই বিবেচনায় রাখা হয়েছে এবং সেই হিসেবে উভয়টির মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। কিন্তু যেসব হাদীছে ঈমান ও ইসলাম আলাদা আলাদাভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতে উভয়টির ব্যবহারিক দিকই বিবেচিত হয়েছে। ব্যবহারিক দিক থেকে উভয়ের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই। ব্যবহারিক দিক থেকে যা ঈমান তাই ইসলাম। এবং যে ব্যক্তি মু'মিন সেই মুসলিম। কেউ যদি উপরে বর্ণিত ছয়টি বিষয়ে বিশ্বাস রাখে কিন্তু নামায না পড়ে, যাকাত না দেয় দীনের বাহ্যিক কার্যাবলী পালন না করে, তবে তাত্ত্বিক বিচারে তাকে মু'মিন বলা হবে বটে, কিন্তু ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে সে মু'মিন নামের উপযুক্ত থাকে না। এ শ্রেণীর লোককে ফাসিক বলা হয়ে থাকে। অনুরূপ যে বাহ্যিক কার্যাবলী যথাযথভাবে আঞ্জাম দেয় কিন্তু বিশ্বাসের মধ্যে ঘাটতি রয়েছে, তাকেও তাত্ত্বিক বিচারে মুসলিম বলা হবে বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে মুসিলম নয়। পরিভাষায় এরূপ লোককে মুনাফিক ও যিনদীক বলা হয়ে থাকে। প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য শরী'আতের অনুসরণ তথা বাহ্যিক কার্যাবলী আঞ্জাম দেওয়ার সাথে সাথে যথার্থ ‘আকীদা-বিশ্বাসেরও অধিকারী হতে হবে।

এমনিভাবে প্রকৃত মুমিন হতে হলে আকীদা-বিশ্বাস ঠিক রাখার পাশাপাশি শরী'আতেরও অনুসরণ করতে হবে।

কুরআন-হাদীছের ব্যাপক ব্যবহারের প্রতি লক্ষ করলে উপলব্ধি করা যায়, আল্লাহ তাআলা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম ও পূর্ণাঙ্গ মুমিনই কাম্য। অর্থাৎ প্রত্যেকেই যেন বিশুদ্ধ 'আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করার পাশাপাশি বাহ্যিক কার্যাবলী তথ্য শরী'আতেরও অনুসরণ করে। কিংবা বলুন শরী'আতের অনুসরণ করার সাথে সাথে বিশুদ্ধ ‘আকীদা-বিশ্বাসেরও অধিকারী হয়। সেজন্যই দেখা যায় । বাহ্যিক কার্যাবলীর জন্য যেমন ইসলাম শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি কোথাও কোথাও এর জন্য ঈমান শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে। আলোচ্য হাদীছে যে সকল বিষয়কে ইসলাম শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে, 'ওয়াফদু আব্দিল কায়স' শীর্ষক হাদীছে হুবহু এ বিষয়গুলোকেই সমান বলা হয়েছে। ঈমানের শাখা-প্রশাখা বিষয়ক সুপ্রসিদ্ধ হাদীছে আছে

الإيمانُ بضعٌ وسبعون شعبةً ، أعلاها قولُ لا إله إلا اللهُ ، وأدناها إماطةُ الأذى عن الطريقِ والْحَياءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإيمانِ.

‘ঈমানের সত্তরটিরও বেশি শাখা আছে। তার মধ্যে সর্বোচ্চ শাখা হল এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও মা'বুদ নেই। আর সর্বনিম্ন শাখা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেওয়া। এবং লজ্জাশীলতা ঈমানের (গুরুত্বপূর্ণ) শাখা।” “এ হাদীছেও বাহ্যিক কার্যাবলীকে ঈমান নামে অভিহিত করা হয়েছে।

একবার এক যুদ্ধে শত্রুপক্ষের একজন বলে উঠল, আমি মুসলিম। তা সত্ত্বেও তাকে জনৈক সাহাবী হত্যা করলেন। তা জানতে পেরে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত নাখোশ হলেন এবং বললেন, কোনও মু'মিন ব্যক্তিকে হত্যা করতে আল্লাহ আমাকে নিষেধ করে দিয়েছেন। এখানে দেখা যাচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম বলেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মু'মিন নামে অভিহিত করেছেন। এর আরও বহু দৃষ্টান্ত আছে। সারকথা এই যে, কুরআন-হাদীছের সাধারণ ব্যবহারে ঈমান দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ঈমান অর্থাৎ বিশ্বাসের সাথে কর্ম এবং ইসলাম দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম তথা কর্মের সাথে বিশ্বাসও বোঝানো হয়। সুতরাং সাধারণ ব্যবহারে বিশ্বাস ও কর্মের সমন্বিত রূপ তথা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম ও পূর্ণাঙ্গ ঈমানের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।

হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামের তৃতীয় প্রশ্ন ও তার উত্তর
হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামের তৃতীয় প্রশ্ন ছিল ইহসান সম্পর্কে। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন- ইহসান এই যে, তুমি আল্লাহর "ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তুমি তাকে দেখছ। আর যদি তুমি তাকে নাও দেখো,তবে তিনি তো তোমাকে অবশ্যই দেখছেন।

'ইহসান’-এর শাব্দিক অর্থ কোনও কাজ সুন্দরভাবে করা। এটা 'আদল'-এর উপরের স্তর। আদল হচ্ছে কোনও কাজ যথাযথ নিয়ম রক্ষা করে করা। তাতে কোনও ত্রুটি না রাখা। আর ইহসান হচ্ছে সে কাজ সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন করেই ক্ষান্ত না হওয়া, বরং তাতে আরও বাড়তি সৌন্দর্য আরোপ করা। কারও সাথে লেনদেন দ্বারা এ উদাহরণ দেওয়া যায় যে, শাহেদ হাশেমের কাছে যা পাবে, শাহেদ তা পুরোপুরি আদায় করে নিল। আর হাশেম তার কাছে যা পাবে তা পুরোপুরি পরিশোধ করল, এটা আদল। কেননা এ লেনদেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে, কোনও ত্রুটি রাখা হয়নি। কিন্তু এতে বাড়তি কোনও সৌন্দর্য পাওয়া যায় না। কোনও মহানুভবতা লক্ষ করা যায়। না। তাই একে ইহসান বলা যাবে না। ইহসান হবে তখন, যখন হাশেম শাহেদকে তার প্রাপ্যের চেয়েও বেশি দেবে এবং সে তার কাছে যা পাবে তারচে' কম নেবে।

এ হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহসানের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে এই বাড়তি সৌন্দর্যের ব্যাপারটা আছে। কেবল ফরয, ওয়াজিব আদায় করে ক্ষান্ত হলে যে 'ইবাদত হবে, তা হবে আদলের পর্যায়ে। ইহুসান হবে যখন সে ইবাদত করা হবে এ মনোভাবের সাথে, যেন ইবাদতকারী আল্লাহ তা'আলাকে দেখছে। এটা ইহসানের প্রথম স্তর। একে 'মুশাহাদা' বা আল্লাহদর্শন বলে। আমি আল্লাহ তা'আলাকে দেখছি, আমি তাঁর কাছে তিনি আমার সামনে অন্তরে এই ধ্যান থাকলে আল্লাহর ভয়, শ্রদ্ধাভক্তি এবং খুশূ'-হুযু' বেড়ে যাবে। ফলে ‘ইবাদতে বাড়তি যত্ন নেওয়া হবে এবং তাকে যতটা সম্ভব সুন্দর ও সুচারু করে তোলার চেষ্টা করা হবে। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে এরকম মনোভাবের সাথে ইবাদত-বন্দেগী করার হুকুম দিতেন। এবং সাধারণত সাহাবায়ে কিরাম এভাবেই ইবাদত-বন্দেগী করতেন। তাঁরা কেবল নামাযই নয়, অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী এমনকি পার্থিব কাজকর্মও এমনভাবে আঞ্জাম দিতেন, যেন আল্লাহ সামনে আছেন এবং তাঁরা তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন।

অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি তুমি তাঁকে নাও দেখ, তবে তিনি তো তোমাকে অবশ্যই দেখছেন। এ বাক্যের দু'রকম ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।
এক ব্যাখ্যা অনুযায়ী এটা ইহসানের দ্বিতীয় স্তর। একে মুরাকাবা বলে। এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, যার পক্ষে ইহসানের প্রথম স্তরে উঠা অর্থাৎ মুশাহাদা বা আল্লাহদর্শন কঠিন মনে হয় সে ইহসানের দ্বিতীয় স্তর তথা মুরাকাবার সাথে ইবাদত করবে। সে চিন্তা করবে আল্লাহ আমাকে দেখছেন। তিনি আমার ভেতর-বাহির সবকিছু সম্পর্কে অবগত। এর দ্বারাও মূল উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ এই ধ্যানের সাথে ইবাদত করলে সুন্দর ও সুচারুরূপে ইবাদত করা সম্ভব হবে। বুযুর্গানে দীন বলেন, তুমি আল্লাহকে ভয় কর তোমার প্রতি আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা অনুপাতে এবং তাঁকে লজ্জা কর তোমার কাছে তাঁর নৈকট্য অনুসারে।

ইহসানের এ স্তরকে ইখলাসের মাকাম ও বলা হয়। যে ব্যক্তি এই ভাবনার সাথে ইবাদত করবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখছেন, তিনি তার কাছে আছেন এবং তিনি তার সম্পর্কে পূর্ণ অবগত, তখন তার ধ্যান গায়রুল্লাহ থেকে ছিন্ন হয়ে আল্লাহর প্রতি নিবেদিত থাকবে। তার লক্ষ্য মাখলুক থেকে সরে গিয়ে মা'বুদেরই অভিমুখী থাকবে। এরূপ ব্যক্তিকে বলা হয় মুখলিস।

ইবন হাজার আসকালানী রহ বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূলত এখানে ইহসানের দুটি স্তর উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে উচ্চতর স্তর হচ্ছে মুশাহাদা অর্থাৎ বান্দা এ মনোভাবের সাথে ইবাদত করবে, যেন সে নিজ চোখে তাকে দেখতে পাচ্ছে। প্রথম বাক্যে এই স্তর বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় বাক্যে বর্ণিত হয়েছে মুরাকাবার স্তর। অর্থাৎ সে চিন্তা করবে আল্লাহ তা'আলা তার সম্পর্কে পূর্ণ অবগত এবং তিনি তার কর্ম দেখছেন। আল্লাহ তা'আলার মা'রিফাত ও পরিচয় এবং তাঁর খাশয়াত ও ভীতির দ্বারা ইহসানের এই স্তরদু'টি অর্জিত হয়ে থাকে।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী 'তুমি তাঁকে দেখছ'- এ কথাটি দ্বারা ইহসানের দ্বিতীয় স্তর (মুরাকাবা) বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং এটি প্রথম বাক্যে বর্ণিত মুশাহাদার কারণস্বরূপ । অর্থাৎ বান্দাকে যখন হুকুম দেওয়া হল সে ইবাদতের ভেতর আল্লাহ তা'আলার মুরাকাবা করবে এবং তাঁকে নিজের সামনে হাজির বলে চিন্তা করবে, যেন সে তাঁকে দেখতে পাচ্ছে, তখন তার কাছে মনে হতে পারে ব্যাপারটা তো অনেক কঠিন। আমার মত দুর্বল বান্দার পক্ষে এমন কঠিন ধ্যান কিভাবে সম্ভব? এ বাক্যে বলে দেওয়া হয়েছে ব্যাপারটা খুব কঠিন নয়। কেননা তোমার তো ঈমান আছে যে, তিনি তোমাকে দেখছেন। তিনি তোমার ভেতর ও বাহির সম্পর্কে অবহিত। তোমার প্রকাশ্য ও গুপ্ত সবকিছুই জানেন। তাঁর কাছে তোমার কিছুই গোপন থাকে না। তো তুমি তোমার বিশ্বাসের এই স্তরটি যদি ধ্যান করতে থাক, তবে একপর্যায়ে তোমার পক্ষে পরবর্তী স্তরে আরোহন সহজ হয়ে যাবে। তখন তুমি এ ধ্যানও করতে পারবে যে, আল্লাহ আমার সামনে আছেন, আমি যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছি।

ইমাম নববী রহ. বলেন, আমদের কেউ যদি ইবাদত অবস্থায় এ চিন্তা করে যে, সে তার প্রতিপালককে দেখছে, তবে সে যথাসম্ভব খুশু-খুযু' রক্ষা করবে, সুন্দর ও সুচারুরূপে ইবাদত করবে, বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিখুঁতভাবে কাজে লাগাবে, পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী থাকবে এবং সর্বোতপ্রকারে তার ইবাদত পরিপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করবে। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন- তুমি সর্বাবস্থায় আল্লাহর ইবাদত কর তাঁকে নিজ চোখে দেখে ইবাদত করার মত। নিজ চোখে দেখা অবস্থায় ইবাদতে পূর্ণতা আসে এ কারণে যে, বান্দা জানে আল্লাহ তা'আলা তার সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। আর তা জানে বলেই এ অবস্থায় সে কোনও ত্রুটি করে না। আর এ ব্যাপারটা তো ওই অবস্থায়ও বিদ্যমান থাকে, যখন সে তাঁকে দেখতে পায় না কিছু এ বিশ্বাস আছে যে, তিনি তাকে দেখেন। বস্তুত হাদীছের উদ্দেশ্য হচ্ছে বান্দাকে তার ইবাদতে ইখলাস ও মুরাকাবায় উদ্বুদ্ধ করা, যাতে তার ইবাদতে খুশু খুযু ইত্যাদি পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান থাকে। ইহসানের সাথে ইবাদত করলে তা অবশ্যই থাকবে। কেননা বুযুর্গানে দীন সালিহীনের সাহচর্য অবলম্বন করতে বলে থাকেন তো এ কারণেই যে, তা অন্যায়-অপরাধে লিপ্ত হওয়ার পথে বাধা হয়। তা বাধা হয় তাদের প্রতি ইহুতিরাম ও শ্রদ্ধাবোধের কারণে এবং তাদের লজ্জায়। সালিহীনের সম্মান রক্ষা তাদের লজ্জার কারণে যদি মানুষ অন্যায়-অনাচার থেকে দূরে থাকে, তাহলে যে আল্লাহ মানুষের ভেতর-বাহির সবকিছু সম্পর্কে অবগত এবং তার প্রকাশ্য-গুপ্ত সবকিছু জানেন তাঁর ধ্যান কেন ভুল-ত্রুটি করার পক্ষে বাধা হবে না? মোটকথা হাদীছ বোঝাচ্ছে, তুমি যখন আল্লাহ তা'আলাকে দেখছ বলে মনে কর, তখন তো ইবাদতের যাবতীয় আদর রক্ষা কর কেবল এ কারণে যে, তিনি তোমাকে দেখছেন। কেবল তুমি তাঁকে দেখছ- এ কারণে নয়। তো তিনি সর্বদাই তোমাকে দেখছেন। সুতরাং তাঁর ইবাদত সুন্দরভাবে। আদায় কর, যদিও তুমি তাঁকে দেখতে না পাও। সংক্ষেপ কথা- তুমি সর্বদা আল্লাহর ইবাদত সুন্দর ও সুচারুরূপে আদায় করতে থাক, কেননা তিনি তোমায় দেখছেন।

হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামের চতুর্থ প্রশ্ন ও তার উত্তর
হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামের চতুর্থ প্রশ্ন ছিল কিয়ামত সম্পর্কে যে, তা কবে সংঘটিত হবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বলেছেন, এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসাকারী অপেক্ষা বেশি জানে না। অর্থাৎ কিয়ামত কবে হবে সে সম্পর্কে সমস্ত মাখলুকের ‘ইলম একই পর্যায়ের। অর্থাৎ তারা কেউ তা জানে না। এ কারণেই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে এ কথা বলেননি যে, এ সম্পর্কে আমি আপনার চেয়ে বেশি জানি না। বাহ্যত সেরকম বলারই কথা ছিল। তা না বলে এরকম ব্যাপকতার সাথে বলেছেন এদিকে ইঙ্গিত করার জন্য যে, কিয়ামতের আগ পর্যন্ত এ প্রশ্ন যাকেই করা হবে সে কেবল অজ্ঞতাই প্রকাশ করতে পারবে। কারও পক্ষেই বলা সম্ভব হবে না যে, কিয়ামত কবে হবে। কোনও কালেই এ সম্পর্কে কোনও জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসাকারী অপেক্ষা বেশি জানার প্রমাণ দিতে পারবে না। বস্তুত এ সম্পর্কিত জ্ঞান আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এটা ওই পাঁচ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তারপর তিনি পাঠ করেনঃ
إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

অর্থঃ নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই কেয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। কেউ জানে না আগামীকল্য সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন দেশে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।

কিয়ামতের আলামত
সবশেষে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম কিয়ামতের আলামত জানতে চাইলেন। উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- (ক) দাসী তার কর্ত্রীকে জন্ম দেবে এবং (খ) খালি পা ও নগ্ন শরীরের অভাবী মেষ রাখালদের দেখতে পাবে। (একসময়) উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণে পরস্পর প্রতিযোগিতা করছে।

এখানে কিয়ামতের দু'টি আলামত বর্ণিত হয়েছে। (ক) দাসী দ্বারা তার কর্ত্রীর জন্ম দেওয়া। দাসী কিভাবে কর্ত্রীকে জন্ম দেবে, উলামায়ে কিরাম তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন। তার মধ্যে একটি এই- ছেলেমেয়ে তার মায়ের সাথে দাসীর মত আচরণ করবে। মনিব দাস-দাসীকে হুকুম দেয়। দাস-দাসী তা পালন করে। পালন না করলে। মেক দেওয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে শাস্তি দেওয়া হয়। এর বিপরীত হয় না। দাস-দাসী মনিবকে হুকুম দেয় না। হুকুম দেওয়ার সাহস করে না। পিতামাতা ও সন্তানের। ব্যাপারটাও কিয়ামতের আগে এরকমই হবে। সন্তান পিতামাতাকে দাস-দাসীর মত হুকুম করবে। ধমক দিয়ে কথা বলবে। আরও বেশি হতভাগা হলে নির্যাতনও করবে। পিতামাতা সন্তানকে কোনও হুকুম দেওয়ার সাহস করবে না। ধমক দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। এককথায় কিয়ামতের আগে ব্যাপকভাবে পিতামাতার অবাধ্যতা করা হবে। সে কাল কি এসে গেল?

(খ) জুতা ও জামা-কাপড় নেই এমন অভাবী রাখালদের উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া। এর মানে নিম্ন শ্রেণীর লোকের উপরে উঠে যাওয়া। তারা হবে দেশের নেতা, প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক হয়ে যাবে এবং কে কার চেয়ে শানদার বাড়ি বানাতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়বে। হযরত হুযায়ফা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে, ততদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতদিন না দুনিয়ায় সর্বাপেক্ষা বিত্তবান হবে নিম্ন শ্রেণীর মানুষ। হযরত আবূ যর্র রাযি. বর্ণিত হাদীছে আছে, নিম্ন শ্রেণীর মানুষ প্রভাবশালী হয়ে যাবে। হযরত আনাস রাগি, বর্ণিত হাদীছে আছে, নির্বোধ শ্রণীর মানুষ সমষ্টিগত বিষয়ে কথা বলবে। এক বর্ণনায় আছে, ফাসিক লোকে জনসাধারণের বিষয়ে কথা বলবে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন 'আমর রা. বর্ণিত হাদীছে আছে, শ্রেষ্ঠ মানুষদের নিচে ফেলে রাখা হবে আর মন্দ লোকদের উপরে উঠে হবে। এক বর্ণনায় আছে, প্রত্যেক গোত্রের নেতৃত্ব দেবে মুনাফিক শ্রেণীর লোক। সবগুলো বর্ণনার সারমর্ম হল কিয়ামতের আগে অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টে যাবে। জাহেল ও ফাসিক শ্রেণীর লোক বিপুল অর্থের মালিক হবে এবং সমাজের নেতৃত্ব দান করবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীছে সংক্ষেপে বলেছেন

إذا وسد الأمر إلى غير أهله فالنظر الساعة

'যখন অযোগ্য লোকের উপর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অর্পণ করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কর।"

হতদরিদ্র রাখালের ইলম ও আদব-কায়দা শেখার অবকাশ কোথায়? হঠাৎ করেই এরা যখন বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যাবে এবং দেশের নেতৃত্ব লাভ করবে, তখন তাদের আচার-আচরণ কেমন হবে সহজেই অনুমেয়। তারা হালাল-হারাম নির্বিচারে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকবে। মানুষের হক আদায় তো করবেই না, উল্টো তাদের উপর জুলুম-নির্যাতন চালাবে। এ শ্রেণীর মানুষের কাছে দীনদার ও চরিত্রবান লোকের কোনও মর্যাদা থাকবে না। তারা তাকওয়া-পরহেযগারীর মূল্য দেবে না। সর্বদা অসৎ ও দুর্বৃত্তপরায়ণ লোকই তাদের ঘিরে রাখবে। তাদেরকে তারা বেশি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে। তাদের উৎপাতে সমাজের শান্তি-শৃংখলা ধ্বংস হবে। সুশিক্ষা ও তালীম তরবিয়াতের মেহনত বন্ধ হয়ে যাবে। সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের পরিবেশ থাকবে না। ফলে মানুষের আখলাক-চরিত্রের ব্যাপক অবক্ষয় ঘটবে। সর্বত্র অন্যায়-অনাচার ছড়িয়ে পড়বে। সারা জাহান পাপাচারে পঙ্কিল হয়ে যাবে। এহেন পাপ পঙ্কিল জগতকে বাকি রাখার প্রয়োজন আল্লাহ তা'আলার থাকবে না। অচিরেই কিয়ামত হয়ে যাবে।

এ হাদীছে কিয়ামতের আলামত হিসেবে বিশেষভাবে উঁচু ভবন নির্মাণে প্রতিযোগিতার কথা বলা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যমানায় উঁচু দালান-কোঠা নির্মাণের রেওয়াজ ছিল না। তখন বাড়ি-ঘর হত নিচু। কেবল প্রয়োজন পরিমাণ। উম্মাহাতুল মু'মিনীন (নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ) এর ঘর কেমন ছিল? কতটুকু উঁচু ছিল? হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, আমি হযরত ‘উছমান রাযি.-এর আমলে তাঁদের ঘরে প্রবেশ করতাম। আমি উপরে হাত তুলে দেখেছি আমার হাত ছাদে লেগে যায়। উঁচু ঘর করার রেওয়াজ হয়েছে পরবর্তীকালে। যখন ইরান ও রোম পরাজিত হয়, তাদের দেশ মুসলমানদের অধিকারে আসে, তখন তাদের দেখাদেখি মুসলিমগণও বিশেষত মুসলিম রাজা-বাদশাগণ উঁচু অট্টালিকা নির্মাণে মনোযোগী হয়ে পড়ে। অধঃপতনের শুরু তখন থেকেই।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. এ হাদীছ দ্বারা ইহসান ও মুরাকাবার শিক্ষা পাওয়া যায়। সুন্দর আমল ও আদর্শ জীবন গড়ার লক্ষ্যে মুরাকাবার কোনও বিকল্প নেই। জীবনের প্রতিটি কাজেই 'আল্লাহ দেখছেন এ ধ্যান অন্তরে জাগ্রত রাখা উচিত।

খ. অজানা বিষয়ে প্রশ্ন করা জ্ঞান অর্জনের একটি উৎকৃষ্ট পন্থা।

গ. অন্যদের শিক্ষাদান করারও একটি ভালো উপায় তাদের সামনে 'আলেম ও জ্ঞানীজনকে প্রশ্ন করা।

ঘ. যে বিষয়ে জানা নেই, সে বিষয়ে কেউ জিজ্ঞেস করলে স্পষ্ট বলে দেওয়া উচিত আমি জানি না।

ঙ. নিজ বাসগৃহ প্রয়োজনের অতিরিক্ত বড় ও উঁচু করা পসন্দনীয় নয়।

এ হাদীছে এছাড়া আরও বহু শিক্ষা আছে। মনোযোগী পাঠকের পক্ষে সহজেই তা উপলব্ধি করা সম্ভব।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)