রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ৯৯৭
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত: যা প্রকৃত ঈর্ষণীয়
৯৯৭. হযরত ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দুই ব্যক্তির বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে হাসাদ করতে নেই। এক হলো ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তা'আলা কুরআন দিয়েছেন এবং সে দিবারাত্রের মুহূর্তগুলোতে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর দ্বিতীয় হলো ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ অর্থসম্পদ দিয়েছেন এবং সে দিবারাত্রের সময়গুলোতে তা (আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে) ব্যয় করতে থাকে। -বুখারী ও মুসলিম (সহীহ বুখারী: ৫০২৫; সহীহ মুসলিম: ৮১৫; জামে তিরমিযী: ১৯৩৬; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৮০১৮; সুনানে ইবন মাজাহ: ৪২০৯; মুসনাদে আহমাদ: ৪৯২৩; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩০২৮১; মুসনাদুল হুমায়দী: ৬২৯; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৫৯৭৪; মুসনাদুল বাযযার: ১৮৯০)
كتاب الفضائل
باب فضل قراءة القرآن
997 - وعن ابن عمر رضي اللهُ عنهما، عن النَّبيِّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «لاَ حَسَدَ إِلاَّ في اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ القُرْآنَ، فَهُوَ يَقُومُ بِهِ آنَاء اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللهُ مَالًا، فَهُوَ يُنْفِقُهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ». متفقٌ عَلَيْهِ. (1)
«والآنَاءُ»: السَّاعَاتُ.

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) انظر الحديث (571).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

لَا حَسَدَ الا في اثنتين (দুই ব্যক্তির বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে হাসাদ করতে নেই)। 'হাসাদ' অর্থ হিংসা। অর্থাৎ কারও মধ্যে ভালো কিছু দেখলে এই কামনা করা যে, তার থেকে তা লোপ পেয়ে যাক, আমি তা পাই বা না-ই পাই, কিন্তু তার না থাকুক, একে হাসাদ বলে। যেমন এক ব্যক্তি স্বাস্থ্যবান বা সম্পদশালী অথবা ক্ষমতাবান কিংবা খ্যাতিমান। তা দেখে অপর এক ব্যক্তি মনে মনে জ্বলে আর কামনা করে, ওই ব্যক্তির স্বাস্থ্য, সম্পদ, ক্ষমতা বা সুখ্যাতি নষ্ট হয়ে যাক। এটা একটা আত্মিক দোষ ও মানসিক রোগ। বিষয়টা যদি কেবল মনের মধ্যেই থাকে, কিন্তু সেই অনুযায়ী কোনও প্রতিক্রিয়া না দেখায়, তবে তাতে কোনও গুনাহ নেই। অর্থাৎ অন্যের ভালো দেখে যদি মনে মনে খারাপ লাগে, কিন্তু সেই ভালোটা দূর হয়ে যাওয়ার কামনা না করে বা সে ব্যক্তির সঙ্গে হিংসাত্মক কোনও আচরণ না করে, তবে কোনও গুনাহ হয় না। পক্ষান্তরে যদি কামনা করে যে, ওই ব্যক্তি থেকে তা লোপ পেয়ে যাক, তবে কঠিন গুনাহ হবে। হিংসাত্মক আচরণ করলে সে গুনাহ হবে আরও ভয়ানক। অবশ্য এরূপ কিছু না করলে গুনাহ হবে না বটে এবং মনের এ অবস্থাকে হাসাদও বলা হবে না, কিন্তু মনের জ্বালা বাড়তে থাকলে তা গুনাহের পর্যায়ে চলেও যেতে পারে। তাই অন্যের ভালো কিছু দেখলে যদি মনে মনে খারাপ লাগে, তবে এ খারাপ লাগাকে নিজের একটা দোষ মনে করতে হবে এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআও করতে হবে যেন অন্তর থেকে তা দূর হয়ে যায়।

হাসাদ ও গিবতার পার্থক্য
যা হোক, বোঝা গেল হাসাদ করা গুনাহ। কিন্তু আলোচ্য হাদীছে তো দেখা যাচ্ছে দুই ব্যক্তির প্রতি হাসাদ করার অবকাশ রাখা হয়েছে কিংবা বলা যায় উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এর কী জবাব?

এর জবাব হলো হাদীছে দুই ব্যক্তির বেলায় যে 'হাসাদ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা দ্বারা হাসাদের প্রকৃত অর্থ বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। বরং এর দ্বারা ভালো কিছু পাওয়ার কামনা ও অভিলাষ বোঝানো উদ্দেশ্য। আরবীতে এর জন্য ‘গিবতা’ (غبطة) শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কারও ভালো কিছু নজরে আসলে তার থেকে তা লোপ পাওয়ার কামনা ব্যতীত নিজের জন্য তা কামনা করাকে গিবতা বলা হয়। অনেক সময় মনের সে অভিলাষের তীব্রতা বোঝানোর জন্য 'গিবতা'-এর স্থলে 'হাসাদ' শব্দটিও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আলোচ্য হাদীছেও তা-ই হয়েছে। আলোচ্য হাদীছটির অপর এক পাঠ দ্বারা বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়। যেমন হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لاَ حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ عَلَّمَهُ اللَّهُ القُرْآنَ، فَهُوَ يَتْلُوهُ آنَاءَ اللَّيْلِ، وَآنَاءَ النَّهَارِ، فَسَمِعَهُ جَارٌ لَهُ، فَقَالَ: لَيْتَنِي أُوتِيتُ مِثْلَ مَا أُوتِيَ فُلاَنٌ، فَعَمِلْتُ مِثْلَ مَا يَعْمَلُ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَهُوَ يُهْلِكُهُ فِي الحَقِّ، فَقَالَ رَجُلٌ: لَيْتَنِي أُوتِيتُ مِثْلَ مَا أُوتِيَ فُلاَنٌ، فَعَمِلْتُ مِثْلَ مَا يَعْمَلُ "

'দুই ব্যক্তির অবস্থা ছাড়া অন্য কারও প্রতি হাসাদ করতে নেই। এক হলো ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তা'আলা কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন আর সে তা দিবারাত্রের মুহূর্তগুলোতে তিলাওয়াত করে। তার এক প্রতিবেশী তা শুনতে পেয়ে বলল, আহা, তাকে যেমনটা দেওয়া হয়েছে অনুরূপ আমাকেও যদি দেওয়া হতো, তবে আমিও করতাম, যেমনটা সে করে। আর দ্বিতীয় হলো ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তা'আলা সম্পদ দিয়েছেন আর সে তা ন্যায়ের পথে বিলায়। (তা দেখে) এক ব্যক্তি বলল, আহা, তাকে যেমনটা দেওয়া হয়েছে অনুরূপ আমাকেও যদি দেওয়া হতো, তবে আমিও করতাম, যেমনটা সে করে। '(সহীহ বুখারী: ৫০২৬)

হাদীছটির এ বর্ণনায় প্রতিবেশী লোকটির যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা হয়েছে, তার জন্য 'হাসাদ' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, অথচ সে কুরআনওয়ালার বা সম্পদশালী ব্যক্তির প্রাপ্ত নি'আমতের বিলোপ কামনা করেনি। বোঝা গেল এ হাসাদ প্রকৃত অর্থের হাসাদ নয়; বরং গিবতা। গিবতা দূষণীয় নয়; বরং মুবাহ বিষয়ের ক্ষেত্রে জায়েয আর ফযীলতের বিষয়ে কাম্য ও প্রশংসনীয়। সেজন্যই আলোচ্য হাদীছে দুই ব্যক্তির প্রতি গিবতা করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন হলো-

رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ الْقُرْآنَ (এক হলো ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তা'আলা কুরআন দিয়েছেন)। এর বিভিন্ন স্তর আছে। যেমন সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করতে পারা, কুরআন মাজীদ মুখস্থ করা, কুরআন মাজীদের অর্থ ও ব্যাখ্যা ভালোভাবে জানা, কুরআন মাজীদের বিধি-বিধান ও অন্যান্য শিক্ষা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা। এর প্রত্যেকটি স্তর সম্পর্কেই হাদীছের বাক্যটি প্রযোজ্য। সুতরাং কারী, হাফেজ, মুফাসসির ও ফকীহ- এদের সকলেই এর অন্তর্ভুক্ত। আপন আপন স্তর অনুযায়ী এদের প্রত্যেকেই কুরআনওয়ালা। এদের একেক শ্রেণিকে আল্লাহ তা'আলা একেক পর্যায়ে কুরআনের শিক্ষাদান করেছেন।

আলেমের কুরআন কেন্দ্রিক ব্যস্ততা
فَهُوَ يَقُوْمُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ (এবং সে দিবারাত্রের মুহূর্তগুলোতে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে)। অর্থাৎ সকালে, দুপুরে, বিকেলে, সন্ধ্যায়, রাতে যার যখন সুযোগ হয় ও যে পরিমাণে সুযোগ হয় কুরআন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কুরআন নিয়ে ব্যস্ত থাকা বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন নামাযের ভেতর কুরআন তিলাওয়াত করা। আল্লাহ তা'আলার এমন অনেক বান্দা আছে, যারা নামাযে বিপুল পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত করে। দিনে-রাতে যখনই সুযোগ পায় নামাযের ভেতর কুরআন পড়তে থাকে। কেউ তিন দিনে, কেউ সাত দিনে, কেউ দশ দিনে, কেউ বা মাসে নামাযের ভেতর কুরআন খতম করে থাকে। আল্লাহর কোনও কোনও বান্দা এমনও আছে, যারা প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় নামাযের ভেতর এক খতম কুরআন পড়ে। যারা হাফেজ নয় তাদের অনেকেও নিয়মিত দেখে দেখে কুরআন পড়ে এবং এভাবে একের পর এক কুরআন খতম করতে থাকে। হযরত উছমান রাযি. প্রতিদিন একবার কুরআন খতম করতেন। ইমাম শাফি'ঈ রহ. রমাযান মাসে নামাযের বাইরেই ষাটবার কুরআন খতম করতেন। বিখ্যাত তাবি'ঈ আসওয়াদ রহ. রমাযানের প্রতি দুই রাতে একবার কুরআন খতম করতেন। ইমাম কাতাদা রহ. সারা বছর প্রতি সাত দিনে এক খতম কুরআন পড়তেন। আর রমাযানে প্রতি তিন দিনে এক খতম করতেন। রমাযানের শেষ দশকে প্রতিরাতে এক খতম পড়তেন।

কুরআন নিয়ে ব্যস্ত থাকার আরেক অর্থ কুরআন শেখানোর কাজে ব্যস্ত থাকা। এক হলো কুরআনের পাঠ শেখানো, যা কারী সাহেবগণ করে থাকেন। আরেক হলো কুরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা শেখানো, যা দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উসতাযগণ করে থাকেন। তাছাড়া বিভিন্ন মসজিদে বা মসজিদের বাইরে কোনও জায়গায় শ্রোতাদের সামনে যে ধারাবাহিকভাবে কুরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা হয় তাও এর অন্তর্ভুক্ত।

যারা কুরআনের শিক্ষা প্রচারে ব্যস্ত থাকে, মানুষের মধ্যে কুরআনের তথা শরীয়তের বিধি-বিধান প্রচার করে, কুরআনের পারিবারিক শিক্ষা, সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করে এবং মানুষকে এ সকল বিষয়ে কুরআনের হিদায়াত গ্রহণের আহ্বান জানায়, তাদের এসব কার্যক্রমও কুরআন ভিত্তিক কর্মব্যস্ততার গুরুত্বপূর্ণ দিক। বলাবাহুল্য, এ সকল কাজ মৌখিকভাবে করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রচনা সংকলন আকারে করাটাও সমান গুরুত্ব রাখে।

উল্লিখিত যাবতীয় কার্যক্রম কুরআন সংশ্লিষ্ট কর্মব্যস্ততার বিভিন্ন দিক। এর প্রত্যেকটিই অতীব মূল্যবান। এসব এমনই মর্যাদাকর কাজ, যার প্রতি প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির ঈর্ষান্বিত হওয়ারই কথা। একজন খাঁটি মুমিনের গভীর আগ্রহ থাকা উচিত যে, সে কুরআন কেন্দ্রিক এসব কাজের কোনও না কোনওটিতে অবশ্যই জড়িত থাকবে।

যে মুমিন অর্থসম্পদের সঠিক ব্যবহার করে, তার মর্যাদা
وَرَجُلٌ آتَاهُ اللهُ مَالًا (আর দ্বিতীয় হলো ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ অর্থসম্পদ দিয়েছেন)। 'আল্লাহ দিয়েছেন' বলার ভেতর ইশারা রয়েছে যে, যে-কোনও উপায়ে অর্থসম্পদ কুড়ালে তা এ হাদীছের অন্তর্ভুক্ত হবে না। বরং উপার্জন হতে হবে বৈধ পন্থায়। অবৈধ পন্থায় উপার্জিত সম্পদ যেহেতু হালাল নয়, তাই আল্লাহ তা'আলার কাছে তা গ্রহণযোগ্যও নয়। এরূপ সম্পদ যত বেশিই দান-খয়রাত করা হোক না কেন, কোনও মুমিনের পক্ষে তা মোটেই ঈর্ষণীয় কাজ হতে পারে না; বরং তার প্রতি ঘৃণা প্রকাশই ঈমানের দাবি। দান-খয়রাত করার প্রতি প্রত্যেক ঈমানদারের অবশ্যই আগ্রহ থাকবে, তবে সে লক্ষ্যে তার কর্তব্য হবে বৈধ পন্থায় উপার্জন করা।

فَهُوَ يُنْفِقُهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ (এবং সে দিবারাত্রের সময়গুলোতে তা ব্যয় করতে থাকে'। অর্থাৎ সে ব্যয় করতে কোনও কার্পণ্য করে না। দিনে-রাতে যখনই সুযোগ হয়, তখনই ব্যয় করে। বলাবাহুল্য, সে ব্যয় হতে হবে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষকে দেখানো, তবে তা আল্লাহ তা'আলার কাছে কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। লোকদেখানো অর্থব্যয় আখিরাতে কোনও কাজে আসবে না। তাই এরূপ অর্থব্যয় কোনও মুমিন ব্যক্তির কাছে ঈর্ষণীয় হতে পারে না।

মুমিনের কাছে ঈর্ষণীয় হওয়ার জন্য এটাও শর্ত যে, সে ব্যয় হবে বৈধ খাতে, কোনও অন্য কাজে নয়। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় আছে- فَهُوَ يُنْفِقُهُ فِي الْحَقِّ (সে তা ব্যয় করে ন্যায় খাতে)। (মুসনাদে আহমাদ: ৪৫৫০) কাজেই অন্যায় কাজে অর্থব্যয় করলে তা কোনও প্রশংসনীয় বিষয় হবে না। বরং তাতে নিন্দা জানানোই কর্তব্য। যদিও আজকাল মানুষ এমন বহু কাজে অর্থব্যয় করে মানুষের প্রশংসা কুড়াচ্ছে ,যা আদৌ শরীয়তসম্মত নয়। যেমন জন্মদিন পালন, মৃত্যুদিবস পালন, বিবাহের ওয়ালিমা ছাড়া অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থব্যয় করা, ওয়ালিমার ক্ষেত্রেও আলোকসজ্জাসহ নানা বেহুদা কাজে অর্থব্যয় করা। তাছাড়া খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ হাজারও অন্যায়-অনুচিত কাজে অর্থের অপচয় তো আছেই।

ঈর্ষণীয় অর্থব্যয় সেটাই, যা বৈধ ও ফযীলতপূর্ণ খাতসমূহে ব্যয় করা হয়। যেমন নিজের ও পারিবারিক প্রয়োজনীয় খরচসমূহ, আত্মীয়স্বজনের সাহায্য-সহযোগিতা, গরিব-দুঃখীর মাঝে অর্থব্যয়, মসজিদ-মাদরাসার সহযোগিতা, রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণ, দাতব্য চিকিৎসা দীনী বই-পুস্তক প্রচারসহ অন্যান্য দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা, প্রকৃত ইসলামী জিহাদে আর্থিক অনুদান ইত্যাদি।

উল্লেখ্য, যাকাত দেওয়াটা অর্থব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে আল্লাহর পথে অর্থব্যয় এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেকে যাকাতের অর্থ অল্প অল্প করে দীনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিতরণ করেই ক্ষান্ত হয়ে যায় আর মনে করে আল্লাহর পথে অর্থব্যয়ের দায়িত্ব এর দ্বারাই শেষ হয়ে গেছে। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। হাদীছে স্পষ্ট বলা হয়েছে-

إِنَّ فِي الْمَالِ لَحَقًّا سِوَى الزَّكَاةِ.

'নিশ্চয়ই সম্পদে যাকাত ছাড়াও হক আছে। (জামে' তিরমিযী: ৬৫৯; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৫৯২)

সুতরাং ফরয যাকাত আদায় করার পরও বিত্তবানদের কর্তব্য গরিব-দুঃখীর প্রয়োজন পূরণ এবং দীনের জরুরি সকল ক্ষেত্রে সাধ্যমতো অর্থব্যয় অব্যাহত রাখা। আর সে অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রেও কেবল ফরয পরিমাণ করেই ক্ষান্ত হওয়া উচিত নয়; বরং আখিরাতের জন্য যা করা হবে, সেটাকেই নিজের আসল সম্পদ গণ্য করে সে লক্ষ্যে যত বেশি সম্ভব ব্যয় করতে থাকা। এর জন্য যদি দুনিয়াবী বৈধ ক্ষেত্রে অর্থব্যয়কে সঙ্কুচিত করতে হয়, তাও করা উচিত। উত্তম হলো দুনিয়াবী ব্যয় পরিমিত রেখে পরকালীন ব্যয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া।

উল্লেখ্য, আলোচ্য হাদীছে বিশেষভাবে দুই ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তাদের কাজের প্রতি ঈর্ষাবোধ করা যায়। অর্থাৎ তাদের মতো আমল করার প্রতি তীব্র আগ্রহ যে-কোনও মুসলিম ব্যক্তিরই থাকতে পারে। এমনিতে তো হাসাদ বা ঈর্ষা করা জায়েয নয়। কিন্তু এ দুই ব্যক্তির কাজ এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, তার প্রতি অন্যদের

অন্তরে তীব আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য হাদীছে 'ঈর্ষা' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। বোঝানো উদ্দেশ্য তীব্র আগ্রহ। কাজদু'টি যেহেতু উম্মতের পক্ষে অনেক বেশি উপকারী, তাই হাদীছে বিশেষভাবে এ দু'টির কথা বলা হয়েছে। নয়তো যেসব কাজে ছাওয়াব আছে এবং যা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভ হয় এমন যে-কোনও কাজের প্রতিই মুসলিম ব্যক্তির আগ্রহ বোধ করা উচিত। যারা সেরকম কাজে মশগুল থাকে, তাদের দেখে অন্যরা যাতে অনুপ্রাণিত হয় সেটাই মূলত এ হাদীছের বার্তা। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرت

'তোমরা পুণ্যের কাজে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৪৮)


হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কারও ভালো কিছু দেখে হাসাদ করতে নেই।

খ. গিবতা করা জায়েয। দীনের ক্ষেত্রে তা কাম্য।

গ. সম্পদ আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত। ন্যায় খাতে তা খরচ করতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়। এ হাদীছ খরচ করতে উৎসাহ জোগায়।

ঘ. সম্পদহীন ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির খাতে ব্যয় করার লক্ষ্যে সম্পদ কামনা করলে তা দূষণীয় নয়।

ঙ. কুরআন পড়তে পারা আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত। যার এ নি'আমত হাসিল হয়েছে, তার উচিত অন্যকে শেখানো এবং নিজে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা, তা দিবারাত্র যখনই সুযোগ হয়।

চ. যে ব্যক্তি কুরআন পড়তে পারে না, অবিলম্বে তার শিখে নেওয়া উচিত যাতে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত অর্জন করতে পারে।

ছ. কুরআনের ইলম মানুষের জন্য আল্লাহ তা'আলার সবচে' বড় দান। আল্লাহ তা'আলার এ মহাদান প্রত্যেকেরই অর্জন করার আগ্রহ থাকা উচিত।

জ. কুরআনের ইলম যার আছে তার সে ইলম অনুযায়ী আমল করার পাশাপাশি অন্যদের মধ্যে সে ইলম বিতরণের চেষ্টা অব্যাহত রাখা একান্ত কর্তব্য।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
রিয়াযুস সালিহীন - হাদীস নং ৯৯৭ | মুসলিম বাংলা