রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ
৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
হাদীস নং: ৯৯৮
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত: হযরত উসায়দ ইবন হুযায়র রাযি.-এর কুরআন পাঠ ও সাকীনা নাযিলের ঘটনা
৯৯৮. হযরত বারা ইবন আযিব রাযি. বলেন, এক ব্যক্তি সূরা কাহফ পড়ছিল। তার কাছে দু'টি রশি দিয়ে একটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। এ অবস্থায় এক খণ্ড মেঘ তার উপর ছেয়ে গেল। মেঘখণ্ডটি ক্রমে তার কাছাকাছি চলে আসছিল আর তাতে তার ঘোড়াটি লাফালাফি করছিল। ভোর হলে সেই ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসল এবং বিষয়টা তাঁর কাছে উল্লেখ করল। তিনি বললেন, তা ছিল সাকীনা, যা কুরআনের কারণে নেমে এসেছিল। -বুখারী ও মুসলিম (সহীহ বুখারী: ৫০১১; সহীহ মুসলিম: ৭৯৫; জামে তিরমিযী: ২৮৮৫; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ১১৪৩৯; মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ৭৪৯; সহীহ ইবন হিব্বান : ৭৬৯; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৫৬৪; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান : ২২১৭: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১২০৬)
كتاب الفضائل
باب فضل قراءة القرآن
998 - وعن البراءِ بن عازِبٍ رضي اللهُ عنهما، قَالَ: كَانَ رَجُلٌ يَقْرَأُ سُورَةَ الْكَهْفِ، وَعِنْدَهُ فَرَسٌ مَرْبُوطٌ بِشَطَنَيْنِ، فَتَغَشَّتْهُ سَحَابَةٌ فَجَعَلَتْ تَدْنُو، وَجَعَلَ فَرَسُه يَنْفِرُ مِنْهَا، فَلَمَّا أصْبَحَ أتَى النَّبيَّ - صلى الله عليه وسلم - فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ، فَقَالَ: «تِلْكَ السَّكِينَةُ تَنَزَّلَتْ لِلقُرْآنِ». متفقٌ عَلَيْهِ. (1)
«الشَّطَنُ» بفتحِ الشينِ المعجمة والطاءِ المهملة: الحَبْلُ.
«الشَّطَنُ» بفتحِ الشينِ المعجمة والطاءِ المهملة: الحَبْلُ.
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
__________
(1) أخرجه: البخاري 6/ 232 (5011)، ومسلم 2/ 193 (795) (240).
হাদীসের ব্যাখ্যা:
হযরত বারা ইবন আযিব রাযি. বর্ণিত এ হাদীছটিতে যে সাহাবীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তাঁর নাম এখানে উল্লেখ করা হয়নি। অন্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায় তিনি ছিলেন হযরত উসায়দ ইবন হুযায়র রাযি.। হাদীছের বিভিন্ন কিতাবে হযরত উসায়দ ইবন হযায়রের ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে- তিনি এক রাতে সূরা বাকারা পড়ছিলেন। কাছেই তাঁর ঘোড়াটি বাঁধা ছিল। হঠাৎ ঘোড়াটি ছটফট করে ওঠে। তিনি চুপ করলেন। ঘোডাটিও ক্ষান্ত হলো। তিনি আবার পড়তে শুরু করলেন। ঘোড়াটি ও ছটফট করতে থাকল। তিনি চুপ করলেন। ঘোডাটিও ক্ষান্ত হলো। তিনি আবারও পড়তে শুরু করলেন। আবারও ঘোড়াটি ছটফট করতে থাকল। শেষে তিনি উঠে গেলেন। তাঁর পুত্র ইয়াহইয়া ঘোড়াটির কাছেই ছিল। তাঁর ভয় হলো ঘোড়াটি তাকে আঘাত করতে পারে। তিনি পুত্রকে তুলে নিয়ে আসলেন। এ সময় আকাশের দিকে তাকালেন এবং শামিয়ানার মতো কিছু দেখতে পেলেন। তার মধ্যে রয়েছে বহু প্রদীপ। অতঃপর সেটি উপরে উঠে চোখের আড়াল হয়ে গেল।
ভোরবেলা তিনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে এ বৃত্তান্ত তাঁকে জানালেন। তিনি বললেন, পড়ো হে ইবন হুযায়র! পড়ো হে ইবন হুযায়র। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ভয় পেলাম ঘোড়াটি ইয়াহইয়াকে পিষ্ট করবে। সে ঘোড়াটির কাছেই ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি জান তা কী ছিল? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা ছিল ফিরিশতা। তোমার পড়ার আওয়াজ শুনে কাছে চলে এসেছিল। তুমি যদি পড়া অব্যাহত রাখতে, তবে ভোরবেলা মানুষ তা দেখতে পেত; তাদের চোখের আড়াল হতো না। (সহীহ বুখারী: ৫০১৮; সহীহ মুসলিম: ৭৯৬)
হযরত ছাবিত ইবন কায়স রাযি. সম্পর্কেও এ জাতীয় ঘটনা বর্ণিত আছে। তবে এসব বর্ণনায় সূরা বাকারা পড়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে আলোচ্য হাদীছটিতে সূরা কাহফ পড়ার কথা আছে। মূলত এসব বর্ণনার মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। ঘটনা একাধিক। সব সূরাই কুরআন মাজীদের অংশ। সবই আল্লাহ তা'আলার কালাম। কাজেই যে-কোনও সূরা পাঠ করার ক্ষেত্রেই আল্লাহ তা'আলার কুদরত ও রহমতের এ জাতীয় ঘটনা ঘটতে পারে।
হাদীছটিতে বলা হয়েছে যে, এক সাহাবী যখন সূরা কাহফ পাঠ করছিলেন, তখন এক খণ্ড মেঘ তাঁর উপর ছেয়ে যায় এবং তা ক্রমে তাঁর কাছাকাছি নেমে আসতে থাকে। ফলে তাঁর বেঁধে রাখা ঘোড়াটি লাফালাফি করতে থাকে।
সাকীনা বলতে কী বোঝায়
সে মেঘখণ্ডটি আসলে কী ছিল? কুরআন তিলাওয়াতকালে কেনই বা তা নিচে নেমে এসেছিল? আর কেনই বা তাতে ঘোড়াটি অস্থিরতা প্রকাশ করছিল? সেই সাহাবী অর্থাৎ হযরত উসায়দ ইবন হুযায়র রাযি.-এর তা বুঝে আসছিল না। তাই ভোরবেলা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলেন এবং রাতের এ ঘটনা তাঁর কাছে খুলে বললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
تِلْكَ السَّكِينَةُ تَنَزَّلَتْ لِلْقُرْآنِ (তা ছিল সাকীনা, যা কুরআনের কারণে নেমে এসেছিল)। উপরে বর্ণিত হযরত উসায়দ ইবন হুযায়র রাযি.-এর ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তা ছিল ফিরিশতা, যারা কুরআন তিলাওয়াতের শব্দে কাছে নেমে এসেছিল। এর দ্বারা বোঝা যায় আলোচ্য হাদীছে ফিরিশতাকেই সাকীনা বলা হয়েছে।
কুরআন ও হাদীছে সাকীনা শব্দটির বহুল ব্যবহার রয়েছে। এর মূল অর্থ শান্তি, মনের স্থিরতা এবং রহমত ও দয়া। মানুষের মনে বিভিন্ন কারণে যে ভয়-ভীতি, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দেখা দেয়, তা দূর করার জন্য আল্লাহ তা'আলা যে বিশেষ রহমত নাযিল করেন, তাকে সাকীনা বলা হয়। যখন সে রহমত নাযিল হয়, তখন বান্দার মনে সাহস জন্মায়। ফলে সব দুশ্চিন্তা ও ভয়-ভীতি কেটে গিয়ে বান্দার মন সম্পূর্ণ শান্ত ও স্থির হয়ে যায়। যেমন হিজরতের সময় ছাওর পাহাড়ের গুহায় থাকাকালে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. শত্রুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাণনাশের আশঙ্কায় তিনি অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ভয় করো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। সেই ভীতিকর অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি যে বিশেষ রহমত নাযিল করেন, সে সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-
فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ
সুতরাং আল্লাহ তার প্রতি নিজের পক্ষ থেকে সাকীনা (প্রশান্তি) বর্ষণ করলেন। (সূরা তাওবা, আয়াত ৪০)
যা হোক, সাকীনা এর প্রকৃত অর্থ প্রশান্তি, স্থিরতা এবং রহমত ও দয়া। আল্লাহ তা'আলা অনেক সময় তাঁর রহমত নাযিল করেন ফিরিশতাদের মাধ্যমে। তাই রহমতের বাহক ফিরিশতাদেরকেও সাকীনা বলা হয়। আলোচ্য হাদীছেও সাকীনা দ্বারা ফিরিশতা বোঝানো হয়েছে। এটা কুরআন মাজীদের এক বৈশিষ্ট্য যে, কুরআন তিলাওয়াতকালে ফিরিশতা হাজির হয় এবং মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত শুনতে থাকে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا
স্মরণ রেখো, ফজরের তিলাওয়াতে ঘটে থাকে সমাবেশ। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৭৮)
সমাবেশ দ্বারা ফিরিশতাদের সমাবেশ বোঝানো হয়েছে। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ يَتلُونَ كِتَابَ اللهِ، وَيَتَدَارَسُونَهُ بينهم، إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَحَفَّتْهُمُ المَلاَئِكَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَه
কোনও লোকসমষ্টি আল্লাহর ঘরসমূহের মধ্যে কোনও একটি ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত এবং নিজেদের মধ্যে তার পঠন-পাঠনে মশগুল থাকলে তাদের উপর সাকীনা নাযিল হয়, রহমত তাদেরকে ঢেকে নেয়, ফিরিশতাগণ তাদেরকে ঘিরে রাখেন এবং আল্লাহ তার কাছে উপস্থিত (ফিরিশতা)-দের মধ্যে তাদের উল্লেখ করেন। (সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯; জামে তিরমিযী: ২৯৪৫; বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ১০৭৩৭; আল-মাদখাল ইলা সুনানিল কুবরা ৩৪৬; আল-আদাব ৯২; সুনানে ইবন মাজাহ: ২২৫; বাগাবী, শারহুস্সুন্নাহ: ১২৭; মুসনাদে আহমাদ: ৭৪২৭)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সূরা কাহফ পড়ার বিশেষ ফযীলত রয়েছে।
খ. কুরআন পাঠকালে আল্লাহ তা'আলার বিশেষ রহমত নাযিল হয়।
গ. কুরআন পাঠকালে বিশেষ রহমতের ফিরিশতা নেমে আসে।
ঘ. ফিরিশতাদের উপস্থিতি মানুষ টের না পেলেও অন্যান্য জীবজন্তু ঠিকই টের পায়।
ঙ. অসাধারণ বা অলৌকিক কোনও বিষয় অনুভব করতে পারলে সে বিষয়ে নিজে নিজে কোনও ফয়সালা না নিয়ে কোনও মুত্তাকী অভিজ্ঞ আলেমের কাছ থেকে তার ব্যাখ্যা জেনে নেওয়া উচিত।
চ. পোষা প্রাণী ও যে-কোনও সম্পদ ভালোভাবে হেফাজত করা উচিত।
ভোরবেলা তিনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে এ বৃত্তান্ত তাঁকে জানালেন। তিনি বললেন, পড়ো হে ইবন হুযায়র! পড়ো হে ইবন হুযায়র। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ভয় পেলাম ঘোড়াটি ইয়াহইয়াকে পিষ্ট করবে। সে ঘোড়াটির কাছেই ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি জান তা কী ছিল? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা ছিল ফিরিশতা। তোমার পড়ার আওয়াজ শুনে কাছে চলে এসেছিল। তুমি যদি পড়া অব্যাহত রাখতে, তবে ভোরবেলা মানুষ তা দেখতে পেত; তাদের চোখের আড়াল হতো না। (সহীহ বুখারী: ৫০১৮; সহীহ মুসলিম: ৭৯৬)
হযরত ছাবিত ইবন কায়স রাযি. সম্পর্কেও এ জাতীয় ঘটনা বর্ণিত আছে। তবে এসব বর্ণনায় সূরা বাকারা পড়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে আলোচ্য হাদীছটিতে সূরা কাহফ পড়ার কথা আছে। মূলত এসব বর্ণনার মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। ঘটনা একাধিক। সব সূরাই কুরআন মাজীদের অংশ। সবই আল্লাহ তা'আলার কালাম। কাজেই যে-কোনও সূরা পাঠ করার ক্ষেত্রেই আল্লাহ তা'আলার কুদরত ও রহমতের এ জাতীয় ঘটনা ঘটতে পারে।
হাদীছটিতে বলা হয়েছে যে, এক সাহাবী যখন সূরা কাহফ পাঠ করছিলেন, তখন এক খণ্ড মেঘ তাঁর উপর ছেয়ে যায় এবং তা ক্রমে তাঁর কাছাকাছি নেমে আসতে থাকে। ফলে তাঁর বেঁধে রাখা ঘোড়াটি লাফালাফি করতে থাকে।
সাকীনা বলতে কী বোঝায়
সে মেঘখণ্ডটি আসলে কী ছিল? কুরআন তিলাওয়াতকালে কেনই বা তা নিচে নেমে এসেছিল? আর কেনই বা তাতে ঘোড়াটি অস্থিরতা প্রকাশ করছিল? সেই সাহাবী অর্থাৎ হযরত উসায়দ ইবন হুযায়র রাযি.-এর তা বুঝে আসছিল না। তাই ভোরবেলা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলেন এবং রাতের এ ঘটনা তাঁর কাছে খুলে বললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
تِلْكَ السَّكِينَةُ تَنَزَّلَتْ لِلْقُرْآنِ (তা ছিল সাকীনা, যা কুরআনের কারণে নেমে এসেছিল)। উপরে বর্ণিত হযরত উসায়দ ইবন হুযায়র রাযি.-এর ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তা ছিল ফিরিশতা, যারা কুরআন তিলাওয়াতের শব্দে কাছে নেমে এসেছিল। এর দ্বারা বোঝা যায় আলোচ্য হাদীছে ফিরিশতাকেই সাকীনা বলা হয়েছে।
কুরআন ও হাদীছে সাকীনা শব্দটির বহুল ব্যবহার রয়েছে। এর মূল অর্থ শান্তি, মনের স্থিরতা এবং রহমত ও দয়া। মানুষের মনে বিভিন্ন কারণে যে ভয়-ভীতি, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দেখা দেয়, তা দূর করার জন্য আল্লাহ তা'আলা যে বিশেষ রহমত নাযিল করেন, তাকে সাকীনা বলা হয়। যখন সে রহমত নাযিল হয়, তখন বান্দার মনে সাহস জন্মায়। ফলে সব দুশ্চিন্তা ও ভয়-ভীতি কেটে গিয়ে বান্দার মন সম্পূর্ণ শান্ত ও স্থির হয়ে যায়। যেমন হিজরতের সময় ছাওর পাহাড়ের গুহায় থাকাকালে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. শত্রুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাণনাশের আশঙ্কায় তিনি অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ভয় করো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। সেই ভীতিকর অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি যে বিশেষ রহমত নাযিল করেন, সে সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-
فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ
সুতরাং আল্লাহ তার প্রতি নিজের পক্ষ থেকে সাকীনা (প্রশান্তি) বর্ষণ করলেন। (সূরা তাওবা, আয়াত ৪০)
যা হোক, সাকীনা এর প্রকৃত অর্থ প্রশান্তি, স্থিরতা এবং রহমত ও দয়া। আল্লাহ তা'আলা অনেক সময় তাঁর রহমত নাযিল করেন ফিরিশতাদের মাধ্যমে। তাই রহমতের বাহক ফিরিশতাদেরকেও সাকীনা বলা হয়। আলোচ্য হাদীছেও সাকীনা দ্বারা ফিরিশতা বোঝানো হয়েছে। এটা কুরআন মাজীদের এক বৈশিষ্ট্য যে, কুরআন তিলাওয়াতকালে ফিরিশতা হাজির হয় এবং মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত শুনতে থাকে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا
স্মরণ রেখো, ফজরের তিলাওয়াতে ঘটে থাকে সমাবেশ। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৭৮)
সমাবেশ দ্বারা ফিরিশতাদের সমাবেশ বোঝানো হয়েছে। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ يَتلُونَ كِتَابَ اللهِ، وَيَتَدَارَسُونَهُ بينهم، إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَحَفَّتْهُمُ المَلاَئِكَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَه
কোনও লোকসমষ্টি আল্লাহর ঘরসমূহের মধ্যে কোনও একটি ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত এবং নিজেদের মধ্যে তার পঠন-পাঠনে মশগুল থাকলে তাদের উপর সাকীনা নাযিল হয়, রহমত তাদেরকে ঢেকে নেয়, ফিরিশতাগণ তাদেরকে ঘিরে রাখেন এবং আল্লাহ তার কাছে উপস্থিত (ফিরিশতা)-দের মধ্যে তাদের উল্লেখ করেন। (সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯; জামে তিরমিযী: ২৯৪৫; বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ১০৭৩৭; আল-মাদখাল ইলা সুনানিল কুবরা ৩৪৬; আল-আদাব ৯২; সুনানে ইবন মাজাহ: ২২৫; বাগাবী, শারহুস্সুন্নাহ: ১২৭; মুসনাদে আহমাদ: ৭৪২৭)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সূরা কাহফ পড়ার বিশেষ ফযীলত রয়েছে।
খ. কুরআন পাঠকালে আল্লাহ তা'আলার বিশেষ রহমত নাযিল হয়।
গ. কুরআন পাঠকালে বিশেষ রহমতের ফিরিশতা নেমে আসে।
ঘ. ফিরিশতাদের উপস্থিতি মানুষ টের না পেলেও অন্যান্য জীবজন্তু ঠিকই টের পায়।
ঙ. অসাধারণ বা অলৌকিক কোনও বিষয় অনুভব করতে পারলে সে বিষয়ে নিজে নিজে কোনও ফয়সালা না নিয়ে কোনও মুত্তাকী অভিজ্ঞ আলেমের কাছ থেকে তার ব্যাখ্যা জেনে নেওয়া উচিত।
চ. পোষা প্রাণী ও যে-কোনও সম্পদ ভালোভাবে হেফাজত করা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)