আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৬৭- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৯৮৩
আন্তর্জাতিক নং: ৬৪২৬
- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়
৩৪১৯. দুনিয়ার জাঁকজমক ও দুনিয়ার প্রতি আসক্তি থেকে সতর্কতা।
৫৯৮৩। কুতায়বা (রাহঃ) ......... উকবা ইবনে আমির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বের হলেন এবং উহুদের শহীদদের উপর নামায আদায় করলেন, যেমন তিনি মাইয়্যেতের উপর নামায আদায় করে থাকেন। তারপর মিম্বরে আরোহণ করে বললেন, আমি তোমাদের অগ্রনী। আমি তোমাদের সাক্ষী হব। আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই আমি আমার ‘হাওয’ কে এখন দেখছি। আমাকে তো যমীনের ধনভাণ্ডারের চাবিসমূহ অথবা যমীনের চাবিসমূহ দেয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের উপর এ আশঙ্কা করছি না যে, তোমরা আমার পরে মুশরিক হয়ে যাবে, তবে আমি আশঙ্কা করছি যে, তোমরা দুনিয়ার ধন-সম্পদে আসক্ত হয়ে যাবে।
كتاب الرقاق
باب مَا يُحْذَرُ مِنْ زَهْرَةِ الدُّنْيَا وَالتَّنَافُسِ فِيهَا
6426 - حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ يَزِيدَ بْنِ أَبِي حَبِيبٍ، عَنْ أَبِي الخَيْرِ، عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ [ص:91] يَوْمًا، فَصَلَّى عَلَى أَهْلِ أُحُدٍ صَلاَتَهُ عَلَى المَيِّتِ، ثُمَّ انْصَرَفَ إِلَى المِنْبَرِ، فَقَالَ: «إِنِّي فَرَطُكُمْ، وَأَنَا شَهِيدٌ عَلَيْكُمْ، وَإِنِّي وَاللَّهِ لَأَنْظُرُ إِلَى حَوْضِي الآنَ، وَإِنِّي قَدْ أُعْطِيتُ مَفَاتِيحَ خَزَائِنِ الأَرْضِ - أَوْ مَفَاتِيحَ الأَرْضِ - وَإِنِّي وَاللَّهِ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا بَعْدِي، وَلَكِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تَنَافَسُوا فِيهَا»

হাদীসের ব্যাখ্যা:

ঘটনা এই যে, উহুদযুদ্ধে যেসব সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন, (যাদের মধ্যে হুযূর (ﷺ)-এর প্রিয় ও সম্মানিত চাচা হযরত হামযা রাযি.ও ছিলেন।) তাঁদের জানাযার নামায পড়া হয়নি; বরং জানাযা ছাড়াই দাফন করা হয়েছিল। এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, যখন আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে হুযুর (ﷺ)-কে আভাস দেওয়া হল যে, আপনার আখেরাতের সফর নিকটবর্তী হয়ে এসেছে, তখন একদিন তিনি উহুদের শহীদদের কবরস্থানে গেলেন এবং তাঁদের উপর জানাযার নামায পড়লেন। বুখারী শরীফের জানাযা অধ্যায়ে এ হাদীসেরই বর্ণনা রয়েছে: صَلَّى عَلَى أَهْلِ أُحُدٍ صَلاَتَهُ عَلَى المَيِّتِ এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, হুযুর (ﷺ) আট বছর পূর্বে শাহাদত বরণকারী ও দাফন হয়ে যাওয়া সাহাবীদের উপর ঐভাবে নামায পড়লেন, যেভাবে মৃত ব্যক্তির জানাযা পড়া হয়। সামনে হাদীসের রাবী উকবা ইবনে আমেরের শব্দমালা এই: كَالْمُوَدِّعِ لِلأَحْيَاءِ وَالأَمْوَات মর্ম এই যে, এ নামাযে হুযুর (ﷺ)-এর অবস্থা ঐ ছিল, যা জীবিত-মৃত সবাইকে বিদায়দানকারী কোন ব্যক্তির হয়ে থাকে।

সামনে হাদীসে বলা হয়েছে যে, তারপর সেখান থেকে তিনি মসজিদে নববীতে তাশরীফ আনলেন। (সম্ভবতঃ নামাযের সময় ছিল এবং লোকেরা মসজিদে জামাআতের সাথে নামায আদায় করার জন্য সমবেত ছিল। তিনি মিম্বরে তাশরীফ আনলেন এবং বিশেষ গুরুত্বের সাথে এ কয়েকটি কথা বললেন। প্রথম কথা এই যে, আমি তোমাদের পূর্বে আখেরাতের জগতের দিকে 'ফারাত' এর ন্যায় যাচ্ছি। আরবের রীতি ছিল যে, যখন কোন দিকে যাত্রা করত, তখন একজন বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি সামনের মনযিলের দিকে পূর্বেই রওয়ানা হয়ে যেত, যেন কাফেলার পূর্বে মনযিলে পৌঁছে কাফেলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করে নিত, তাকেই ফারাত' বলা হত। এ বাণীতে হুযুর (ﷺ) নিজের আখেরাতের সফর সন্নিকটবর্তী হওয়ার দিকে ইশারা করার সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরামকে সান্ত্বনা দিলেন যে, তোমাদের পূর্বে আমার চলে যাওয়া তোমাদের জন্য কল্যাণের কারণ হবে। আমি আগে গিয়ে তোমাদের জন্য তাই করব, যা একজন 'ফারাত' (তথা অগ্রবর্তী যাত্রী) করে থাকে এবং যেভাবে কাফেলা রওয়ানা হওয়ার পর নির্ধারিত মনযিলে পৌঁছে অগ্রবর্তী দল নেতার সাথে মিলিত হয়ে যায়, তোমরাও আমার সাথে এসে মিলে যাবে। সামনে তিনি বলেছেন, আমি তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষ্যদান করব যে, তোমরা ঈমান এনেছিলে, তোমরা আমার অনুসরণ করেছিলে এবং দ্বীনের পথে আমার সাথী হয়েছিলে। সামনে বলেছেন, সেখানে হাউযে কাউসারে আমার সাথে সাক্ষাত হবে। তিনি একথাও বলেছেন যে, ঐ হাউযে কাউসার। আমি এখন আমার নিজ স্থান থেকে দেখতে পাচ্ছি। (আল্লাহ্ তা'আলা সকল পর্দা উঠিয়ে দিয়ে আখেরাতের হাউযে কাউসার আমার সামনে করে দিয়েছেন।) এর সাথে তিনি একথাও বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এ দুনিয়ার ভাণ্ডারসমূহের চাবি আমাকে প্রদান করা হয়েছে। (এটা ছিল সুসংবাদ যে, পৃথিবীর ভাণ্ডার সমূহের চাবি এ উম্মতকে প্রদান করার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে। (আর বাস্তবে সাহাবীদের যুগেই এটা বাস্তবায়িত হয়ে গিয়েছে।)

এ ভাষণের শেষে তিনি বললেন যে, আমার তো এ আশংকা নেই যে, তোমরা আবার মুশরিক হয়ে যাবে; কিন্তু এ আশংকা অবশ্যই রয়েছে যে, তোমাদের আকর্ষণ ও চাহিদা দুনিয়ার সুখ-সৌন্দর্য ও আরাম-আয়েশের দিকে হয়ে যাবে। অথচ মু'মিনের জন্য আকর্ষণ ও চাহিদার বস্তু কেবল জান্নাত ও জান্নাতের নেয়ামতসমূহই হওয়া চাই। আল্লাহ্ তা'আলা এগুলোর ব্যাপারেই বলেছেন: وَفِیۡ ذٰلِکَ فَلۡیَتَنَافَسِ الۡمُتَنَافِسُوۡنَ (এ বিষয়েই প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)