মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

৬. পবিত্রতা অর্জন

হাদীস নং: ২০৩
পবিত্রতা অর্জন
(৩) পরিচ্ছেদ: ওযু ও ওযুর পরে সালাত আদায়ের ফযীলত প্রসঙ্গে
(২০৩) হযরত উকবাহ ইবন আমির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা নিজেরাই নিজেদের কাজকর্ম করতাম। আমরা নিজেরা পালা করে উট চরাতাম। এভাবে একবার আমার উট চরানোর পালা আসলো। আমি বিকালে উটগুলি ফিরিয়ে নিয়ে আসলাম। (উটের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে) আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে দেখলাম, তিনি দাঁড়িয়ে মানুষদের সাথে কথা বলছেন। আমি এসে তাঁকে বলতে শুনলামঃ তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ওযু করে এবং তা পূর্ণরূপে সম্পন্ন করে অতঃপর সে দাঁড়িয়ে তার মুখ ও মনের পরিপূর্ণ একাগ্রতাও মনোযোগ দিয়ে দুই রাক'আত সালাত আদায় করে, তাহলে তার জন্য জান্নাত নির্ধারিত করা এবং তার গুনাহ ক্ষমা 'করা হবে। তখন আমি তাঁকে বললাম, এটি কত সুন্দর। তখন আমার সামনে থেকে একজন বললেন, হে উকবাহ! এর আগে যা বলেছেন তা আরো সুন্দর। তখন আমি দেখলাম তিনি হলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব। আমি বললামঃ হে আবু হাফস! তা কি? তিনি বললেন, আপনার আসার আগে তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ওযু করে এবং পরিপূর্ণরূপে তা সম্পন্ন করে অতঃপর সে বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা'বুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও বার্তাবাহক, তাহলে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হবে, সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে।
(মুসলিম ও অন্যান্য)
كتاب الطهارة
(3) باب ما جاء في فضل الوضوء والصلاة عقبه
(203) وعنه أيضا قال كنا نخدم أنفسنا وكنا نتداول 1 رعية الإبل بيننا فأصابني رعية الإبل فروحتها بعشي فأدركت رسول الله صلى الله عليه وسلم وهو قائم يحدث الناس فأدركت من حديثه وهو يقول ما منكم من أحد يتوضأ فيسبغ الوضوء ثم يقوم فيركع ركعتين يقبل عليهما بقلبه 2 ووجهه إلا وجبت له الجنة وغفر له، قال فقلت له ما أجود هذا 3 قال فقال قائل بين يدي كانت قبلها يا عقبة أجود منها فنظرت فإذا عمر بن الخطاب قال فقلت وما هي يا أبا حفص؟ قال إنه قال قبل أن تأتي ما منكم من أحد يتوضأ فيسبغ الوضوء ثم يقول أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأن محمدا عبده ورسوله
إلا فتحت له أبواب الجنة الثمانية يدخل من أيها شاء

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. উযূ করায় সাধারণত বাহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরিচ্ছন্ন হয়। তাই মু'মিন ব্যক্তি যখন উযূ করে তখন সে মূলতঃ আল্লাহর নির্দেশ পালন করে এবং বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জন করে। কিন্তু প্রকৃত আবর্জনা ও মালিন্য হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতা, নিষ্ঠার ঘাটতি এবং মন্দ কাজের জঞ্জাল। এ অনুভূতিকে সামনে রেখে ঈমানকে নতুন করার লক্ষ্যে, আল্লাহর ইবাদতে নিষ্ঠার পরিচয় দিতে এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পূর্ণ অনুসরণ করতে কালেমা শাহাদাত পাঠ করে যেন নতুন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। এর ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠকের জন্য মাগফিরাতের পূর্ণ ফয়সালা হয়ে যায়। তাই হাদীসে বলা হয়েছে যে, তার জন্য জান্নাতের সকল দরজা উন্মুক্ত।

ইমাম মুসলিম (র) অন্যত্র কালেমা শাহাদাতের নিম্নোক্ত শব্দগুচ্ছও বর্ণনা করেছেন- أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই। তিনি একক তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।"
ইমাম তিরমিযী (র) এ হাদীস বর্ণনায় নিম্নোক্ত শব্দগুচ্ছও উল্লেখ করেছেন: اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَجَعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ "হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর এবং আমাকে পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের মধ্যে শামিল কর।"

২. এ হাদীছের মূল বিষয়বস্তু তিনটি- সুন্দরভাবে ওযূ করা, ওযূর পর ওযূর দু'আ পড়া এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে এ আমলের পুরস্কার। সুন্দরভাবে ওযূ করা সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُبْلِغُ - أَوْ فَيُسْبِغُ - الْوَضُوءَ (তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই ওযূ করে এবং সে ওযূ করে পরিপূর্ণরূপে)। অর্থাৎ প্রয়োজন পরিমাণ পানি ব্যবহার করে, প্রত্যেক অঙ্গ ভালোভাবে ধৌত করে এবং ওযূর ফরযসমূহ আদায়ের পর সুন্নত ও মুস্তাহাবসমূহও পূরণ করে। এভাবে ওযূ করলে সে ওযূ হয় পরিপূর্ণ। তারপর কী দু'আ পড়তে হবে, সে সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُ

(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই। এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল)। তিরমিযী শরীফের বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে-

اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ (হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন)। সুতরাং তিরমিযী শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী দু'আটির পরিপূর্ণ রূপ হলো-

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُ اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ

দু'আটির প্রথম অংশ হলো কালেমায়ে শাহাদাত। এর দ্বারা ওযূকারী আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে নিজ ঈমানের ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে সে নিজ ঈমান তাজা করে এবং ঈমানকে শক্তিশালী করে তোলে।

দু'আটির দ্বিতীয় অংশে আছে আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'টি প্রার্থনা। এক প্রার্থনা হলো তাওবা সম্পর্কে, যেন আল্লাহ তা'আলা তাকে বেশি বেশি তাওবা করার তাওফীক দেন, যাতে ওযূর মাধ্যমে যেমন তার দৈহিক পবিত্রতা অর্জিত হয়, তেমনি তাওবা দ্বারা গুনাহমাফির মাধ্যমে আত্মিক পবিত্রতাও অর্জিত হয়।

দ্বিতীয় প্রার্থনা হলো সাধারণভাবে পাক-পবিত্রতা সম্পর্কে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তা'আলা যেন তাকে সর্বপ্রকার পবিত্রতা অর্জনে সচেষ্ট রাখেন। জাহিরী ও বাতেনী সর্বপ্রকার পবিত্রতা রক্ষায় মনোযোগী থাকার তাওফীক দান করেন। ওযূ-গোসল, তাওবা-ইস্তিগফার, তাকওয়া-পরহেযগারি, ইখলাস ও আল্লাহমুখিতা সবই এ সাধারণ পবিত্রতার অন্তর্ভুক্ত।

উল্লেখ্য, এখানে হাদীছটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিস্তারিত বর্ণনা খুবই চমৎকার ও হৃদয়গ্রাহী। বিস্তারিত সে বর্ণনা নিম্নরূপ।

হযরত উকবা ইবন আমি রাযি. বর্ণনা করেন, আমরা নিজেরা নিজেদের কাজ করতাম। পালাক্রমে উট চরাতাম। একবারকার কথা। আমার উট চরানোর পালা আসল। আমি উট চরাতে থাকলাম। সন্ধ্যাবেলা আমি সেগুলো নিয়ে ফিরে আসলাম। এসে দেখি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে মানুষের সামনে বক্তব্য রাখছেন। আমি তাঁর বক্তব্যের যে অংশ পেয়েছিলাম, তা ছিল এরকম যে, তিনি বলছিলেন-

مَا مِنكُمْ مِنْ أَحَدٍ يَتَوَضَّأَ ، فَيَبْلُغُ الْوُضُوءَ، ثُمَّ يَقُومُ فَيَرْكَعُ رَكْعَتَيْنِ يُقْبِلُ عَلَيْهِمَا بِقَلْبِهِ وَوَجْهِهِ إِلَّا وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ وَغُفِرَ لَهُ.

'তোমাদের মধ্যে যে-কেউ পরিপূর্ণরূপে ওযূ করে, তারপর উঠে দু'রাকাত নামায গড়ে, যে নামাযে সে শরীর-মনে অভিনিবিষ্ট থাকে, তার জন্য জান্নাত নিশ্চিত হয়ে যায় এবং তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।'

হযরত উকবা রাযি. বলেন, আমি বলে উঠলাম- مَا أَجْوَدَ هَذَا؟ (কী উত্তম কথা!) আমার এ মন্তব্য শুনে সামনের এক ব্যক্তি বলল, হে উকবা! এর আগের কথাটি ছিল আরও বেশি সুন্দর।

উকবা রাযি. বলেন, আমি লক্ষ করে দেখলাম তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব। বললাম, হে আবু হাফস (এটি হযরত উমর রাযি.-এর উপনাম)। সে কথাটি কী? তিনি বললেন, তুমি আসার আগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

ما مِنكُمْ من أَحَدٌ يَتَوَضَّأُ فَيَبْلُغُ الْوُضُوءَ فَيَقُولُ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ، إِلَّا فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ الثَّمَانِيَةُ يَدْخُلُ مِنْ أَيُّهَا شَاءَ.

'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই ওযূ করে এবং সে ওযূ করে পরিপূর্ণরূপে, তারপর أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই। এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটও দরজা খুলে দেওয়া হয়। সে তার যেটি দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে। (সুনানে আবু দাউদ: ১৬৯: বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ২৪৯৮)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. ওযূ করতে হবে খুব যত্নের সঙ্গে পরিপূর্ণরূপে।

খ. ওযূর পর হাদীছে বর্ণিত দু'আটি মনোযোগের সঙ্গে পড়তে হবে। দু'আটির অর্থও জেনে নেওয়া চাই।

গ. জান্নাতের আটটি দরজা আছে। উত্তমরূপে ওযূ করা এবং তারপর এ দু'আটি পড়ার দ্বারা তার যে-কোনও দরজা দিয়ে প্রবেশ করার এখতিয়ার লাভ হবে।

ঘ. তাওবা করা অত্যন্ত জরুরি আমল। যতবেশি সম্ভব এটা করা উচিত।

ঙ. দৈহিক ও আত্মিক উভয় রকম পাক-পবিত্রতা অর্জনে সচেষ্ট থাকা দীনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
১. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.) ২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান