মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

৭. নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১১৫৮
নামাযের অধ্যায়
সফরের সালাতের বৈশিষ্ট্য ও তার যিকির ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী সম্পৃক্ত অনুচ্ছেদসমূহ

(১) অনুচ্ছেদ: সফরের ফযীলত সফরের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার কতিপয় নিয়ম-নীতি প্রসঙ্গে
(১১৫৪) সুহাইল থেকে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে তার পিতা আবু হুরাইরা (রা) থেকে বলেছেন, যখন তোমরা সুজলা-সুফলা ভূমিতে সফর করবে তখন উটকে তার প্রাপ্য দিবে আর যখন শুষ্ক মরু অঞ্চলে সফর করবে তখন দ্রুত পথ চলবে। আর যখন রাত্রিবেলা যাত্রা বিরতি দিয়ে বিশ্রামের নিয়াত করবে তখন রাস্তায় যাত্রা বিরতি দিবে না।
(উক্ত সুহাইল থেকে দ্বিতীয় সূত্রেও অনুরূপ অর্থবোধক হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেখানে রয়েছে) যখন তোমরা রাত্রিবেলায় বিশ্রামের জন্য বিরতি দিবে তখন পথ এড়িয়ে বিশ্রাম নিবে, কেননা তা রাত্রিতে প্রাণীদের পথ এবং কীটপতঙ্গের আবাসস্থল।
(মুসলিম, মুয়াত্তা মালিক, আবু দাউদ ও তিরমিযী।)
كتاب الصلاة
أبواب صلاة السفر وآدابه وأذكاره وما يتعلق به

(1) باب فضل السفر والحث عليه وشيء من آدابه
(1158) عن سهيل عن أبيه عن أبى هريرة أنَّ رسول الله صلى الله عليه وسلم قال إذا سافرتم في الخصب فأعطوا الإبل حظَّها، وإذا سافرتم فى الجدب فأسرعوا السَّير، وإذا أردتم التَّعربس فتنكبوا الطَّريق (وعنه من
طريق ثان بنحوه وفيه) وإذا عرستم فاجتنبوا الطُّرق فإنَّها طرق الدَّوابِّ ومأوى الهوامِّ باللَّيل

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটিতে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসাফিরকে গুরুত্বপূর্ণ দু'টি বিষয়ে দিকনির্দেশনা দান করেছেন। তার একটি হলো বাহনজন্তু সম্পর্কে এবং আরেকটি হলো রাত্রিযাপনের স্থান সম্পর্কে। বাহনজন্তু সম্পর্কে পরামর্শ দিতে গিয়ে ইরশাদ করেন-

إِذَا سَافَرْتُمْ فِي الْخِصْبِ (তোমরা যখন উর্বর ভূমিতে সফর করবে)। الْخِصْبُ শব্দটি মূলত ক্রিয়ামূল (মাসদার)। এর অর্থ জমিতে ঘাস ও তৃণাদি জন্ম নেওয়া। জমি উর্বর হলে তখনই তাতে ঘাস ও ফল-ফসল জন্মায়। তাই শব্দটি 'উর্বর ভূমি' অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর দ্বারা এমন ঋতুও বোঝানো হয়, যে ঋতুতে বৃষ্টি হয়, ফলে জমিতে ফল-ফসল ও তৃণলতা জন্ম নেয়।

فَأَعْطُوا الْإِبِلَ حَظَّهَا مِنْ الْأَرْضِ (তখন উটকে ভূমি থেকে তার অংশ দেবে)। অর্থাৎ এরূপ ভূমিতে বিরতি দিয়ে দিয়ে পথ চলবে এবং বাহনজন্তুটিকে ঘাস খাওয়ার সুযোগ দেবে। حَظٌّ এর অর্থ নসীব, অংশ। অর্থাৎ তৃণভূমিতে গবাদি পশুর নসীব ও অংশ রয়েছে। তার ঘাসপাতা পশুর খাদ্য। প্রকৃতিগতভাবেই আল্লাহ তা'আলা এসবকে তার খাদ্য বানিয়েছেন। সুতরাং তা খেতে পারাটা পশুর অধিকার। তাকে তার সে অধিকার দিতে হবে। হাদীছটির কোনও কোনও বর্ণনায় আছে حَقَّهَا (তার হক ও অধিকার)। সুনানে আবু দাউদ: ২৫৭০; মুসনাদুল বাযযার ৬৫২১; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২৬৮৪

وَإِذَا سَافَرْتُمْ فِي الْجَدْبِ (আর যখন অনুর্বর ভূমিতে সফর করবে)। الجدب এর অর্থ বৃষ্টি না হওয়া ও জমি শুকিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ খরার মৌসুম। শব্দটি দ্বারা যেমন এরূপ মৌসুমকে বোঝানো হয়, তেমনি অনুর্বর ভূমিও বোঝানো হয়ে থাকে।

فَأَسْرِعُوا عَلَيْهَا السَّيْرَ، وَبَادِرُوا بِهَا يَقْيَهَا
(তখন তার ওপর দিয়ে চলার গতি বেগবান করবে এবং সেটি ক্লান্ত হয়ে পড়ার আগে আগে গন্তব্যস্থলে পৌঁছার চেষ্টা করবে)। অর্থাৎ ভূমিতে ঘাস ও তৃণলতা না থাকায় চলার পথে বাহনজন্ত তার খাদ্য পাবে না।

এ অবস্থায় যদি ধীরে ধীরে চলা হয়, তবে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। ফলে পশুকে দীর্ঘ সময় অনাহারে থাকতে হবে। এতে করে তার শরীর শুকিয়ে যাবে এবং সেটি দুর্বল ও ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়বে। এমনিই সেটি না খেয়ে দুর্বল, তার উপর সে যাত্রী ও তার মালামাল বয়ে চলছে। এতে তার কষ্টের উপর কষ্ট বাড়বে। তারচে' যদি দ্রুত চলা হয়, তবে অল্প সময়েই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে। সেখানে পৌঁছার পর পশুটি বিশ্রাম নিতে পারবে এবং মালিকের পক্ষ হতে তার খাবারের ব্যবস্থাও হবে। এভাবে সেটি তার দুর্বলতা কাটাতে পারবে ও শক্তি ফিরে পাবে।

نَقِيٌّ এর অর্থ, হাড়ের শাঁস বা মগজ। শাঁসপূর্ণ হাড়কেও نَقِيٌّ বলা হয়। তবে এ হাদীছে এ نَقِيٌّ দ্বারা শাঁসই বোঝানো উদ্দেশ্য। বলা হয়েছে- بَادِرُوا بِهَا يَقْيَهَا (তোমরা ঊষর ভূমিতে দ্রুত চলো তার অর্থাৎ উটের হাড়ের শাঁসের আগে আগে)। অর্থাৎ তার হাড়ে শাঁস বাকি থাকতে থাকতে এবং তা শুকিয়ে যাওয়ার আগে আগে। শাঁস বাকি থাকা দ্বারা শক্তি অবশিষ্ট থাকা এবং শাঁস শুকিয়ে যাওয়ার দ্বারা শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাওয়া বোঝানো হয়েছে। খাদ্য না পেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তা দুর্বল হয়

খাদ্য থেকে পুষ্টি না পাওয়ার কারণে। পুষ্টি না পেলে হাড়ের শাঁস শুকিয়ে যায় আর তাতে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। সুতরাং হাদীছটিতে বোঝানো উদ্দেশ্য, উটের শক্তি অবশিষ্ট থাকতে থাকতে তোমরা উষর ভূমি পার হয়ে যাও। কেননা তা না হলে কেবল উটই দুর্বল হবে না, তোমরা নিজেরাও বিপদে পড়বে। উট তোমাদের বাহন। বাহন যদি দুর্বল হয় বা মারা যায়, তখন তোমাদের পথচলা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কাজেই এ বাক্যটি দ্বারা মানুষ ও জীবজন্তুর প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গভীর মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়।

إِذَا عَرَّسْتُمْ، فَاجْتَنِبُوا الطَّرِيقِ (যখন রাতে বিশ্রাম করবে, তখন রাস্তা থেকে সরে যাবে)। অর্থাৎ রাতের বেলা যাত্রাবিরতি দিয়ে বিশ্রাম করতে চাইলে রাস্তা থেকে সরে ডানে-বামে কোথাও বিশ্রাম নেবে। ঠিক রাস্তার উপর বিশ্রাম করবে না। কেন রাস্তার উপর বিশ্রাম করবে না? কেননা হাদীসে আছে,

فَإِنَّهَا طُرُقُ الدَّوَابِّ وَمَأْوَى الْهَوَامِّ بِاللَّيْلِ (কেননা রাতে তা জীবজন্তুর চলাচলপথ ও কীটপতঙ্গের আবাস)। الدَّوَابِّ শব্দটি دَابّةٌ এর বহুবচন। ভূমিতে চলাচলকারী যে-কোনও জীবজন্তুকে যা বলা হয়। তবে সাধারণত মানুষের বেলায় শব্দটি ব্যবহৃত হয় না। অবশ্য কুরআন মাজীদের কোথাও কোথাও কাফের ও অবিশ্বাসীদের জন্য শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে জলজ প্রাণীর ক্ষেত্রেও এ শব্দটির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। হাদীছে বোঝানো হচ্ছে, রাতের বেলা সাধারণত রাস্তার উপর দিয়ে বন্য জীবজন্তু চলাফেরা করে। তার মধ্যে হিংস্র প্রাণীও রয়েছে। তাছাড়া মুসাফিরদের বাহনজন্তুও রাস্তার উপর দিয়ে চলে। কাজেই রাস্তার উপর বিশ্রাম নেওয়াটা খুবই বিপজ্জনক। বাহনজন্ত দ্বারা পদপিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভয় আছে হিংস্র প্রাণীর শিকারেও পরিণত হওয়ার। তাই রাতের বেলা কিছুতেই রাস্তার উপর বিশ্রাম নিতে নেই।

الهوام শব্দটি هَامَّةٌ এর বহুবচন। এর অর্থ পোকামাকড় ও সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদি বিষাক্ত প্রাণী। রাতের বেলা এরা খাদ্যের সন্ধানে আশপাশের বন-জঙ্গল ছেড়ে রাস্তায় চলে আসে। অনেক সময় পথচারীদের থেকে খাদ্যবস্তু রাস্তায় পড়ে যায়। তারা ইচ্ছাকৃতও ফলের খোসা ও খাদ্যাবশেষ রাস্তায় ফেলে দেয়। তাই রাতের বেলা কীটপতঙ্গ ও সাপ-বিচ্ছুরা তা খাওয়ার জন্য রাস্তায় চলে আসে। কাজেই রাস্তায় বিশ্রাম নিলে এসব প্রাণী দ্বারা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এমনকি থাকে প্রাণনাশের ভয়ও। তাই মানুষের দরদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসাফিরদেরকে রাস্তায় বিশ্রাম নিতে নিষেধ করেছেন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. গবাদি পশু বিশেষত বাহনপশুর প্রতি সদয় আচরণ করতে হবে।

খ. পালিত পশুদের ঠিকভাবে পানাহার করানো ও তাদের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া একান্ত কর্তব্য। তারা যাতে ক্ষুধায় কষ্ট না পায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

গ. সফরকালে বাহনপশুর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা কর্তব্য। যান্ত্রিক বাহনেরও বিশেষ যত্ন নেওয়া চাই।

ঘ. রাস্তাঘাটে বিশ্রাম নেওয়া উচিত নয়, বিশেষত রাতের বেলা।

ঙ. নিজ প্রাণ ও স্বাস্থ্যরক্ষার বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান