মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)
৭. নামাযের অধ্যায়
হাদীস নং: ১১৬৩
নামাযের অধ্যায়
(২) অনুচ্ছেদ: সফরের জন্য সর্বোত্তম দিবস, মুসাফিরকে বিদায়ী সম্ভাষণ জানানো, তাকে উপদেশ দেয়া এবং তার জন্য দু'আ করা ইত্যাদি প্রসঙ্গে
(১৯৫৯) আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সফরের ইচ্ছা পোষণকারী এক ব্যক্তি রাসূলের (সা) এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে উপদেশ দিন। আল্লাহর রাসূল (সা) বললেন, তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি আল্লাহভীতি অবলম্বন করবে এবং প্রত্যেক উঁচু স্থানে উঠবার সময় اللَّهُ أَكْبَر বলবে। অতঃপর যখন লোকটি চলে গেল নবী (সা) বললেন, হে আল্লাহ! যমীনকে তার জন্য সংক্ষিপ্ত করে দাও এবং সফরকে সহজ করে দাও।
(হাদীসটি তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, হাদীসটি হাসান।)
(হাদীসটি তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, হাদীসটি হাসান।)
كتاب الصلاة
(2) باب أفضل الأيام للسفر وتوديع المسافر وايصاله والدعاء له
(1163) عن أبى هريرة رضى الله عنه قال جاء رجل إلى النَّبيِّ صلى الله عليه وسلم يريد سفرًا فقال يا رسول الله أوصنى، قال أوصيك بتقوى الله والتَّكبير على كلِّ شرف فلمَّ ولَّى الرَّجل قال النَّبيُّ صلَّى الله عليه وعلى آله وصحبه وسلَّم اللَّهمَّ ازوله الأرض وهوِّن عليه السَّفر
হাদীসের ব্যাখ্যা:
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. জানান যে, জনৈক ব্যক্তি সফরে বের হওয়ার ইচ্ছা করেছিল। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল-
يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أَسَافِرَ فَأَوْصِنِي (ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি সফর করব বলে ইচ্ছা করেছি। আপনি আমাকে উপদেশ দিন)। বলাবাহুল্য, সে ব্যক্তি তো সাহাবীই ছিলেন। সাহাবীগণ আমাদের আদর্শ। তিনি সফরে বের হওয়ার আগে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপদেশগ্রহণের জন্য এসেছেন। বোঝা গেল সফরে বের হওয়ার আগে অনুসরণীয় কোনও ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হয়ে তার কাছে উপদেশ চাওয়া মুস্তাহাব। সফরে নানা পরিবেশ-পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। সেক্ষেত্রে নিজের দীন ও ঈমানের দিক থেকে কঠিন কঠিন পরীক্ষাও সামনে এসে পড়ে। আগে থেকে মানসিক প্রস্তুতি থাকলে তখন পরীক্ষায় উতরে যাওয়া সহজ হয়। বুযুর্গানে দীনের নসীহত দ্বারা মানসিক প্রস্তুতি লাভ হয়। তা অন্তরে শক্তি জোগায়। পথে আলো দান করে। তাই সফরে নিজ খেয়ালমতো বের না হয়ে প্রথমে কোনও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হওয়া এবং তার উপদেশ গ্রহণ করা উচিত। এটা দীনী সতর্কতার পরিচায়ক। সাহাবী সেই সতর্কতারই পরিচয় দিয়েছেন।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দু'টি উপদেশ দিলেন। প্রথমে বললেন - عَلَيْكَ بِتَقْوَى اللَّهِ (তুমি অবশ্যই তাকওয়া অবলম্বন করবে)। অর্থাৎ সফরের পুরোটা সময় অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত রাখবে এবং প্রতিটি কাজ সে অনুসারে সম্পন্ন করবে। এমনিতে তো তাকওয়া অবলম্বন করা এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত রাখা সর্বাবস্থায়ই জরুরি। সুতরাং এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُ مَا كُنْتَ.
'যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় করো। (জামে' তিরমিযী: ১৯৮৭; মুসনাদে আহমাদ: ২১৩৯২; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১৭৮। মুসনাদুল বাযযার: ৪০২২; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ৭৬৬০)
তাকওয়া এক অদৃশ্য দুর্গ। এটা অবলম্বন করলে শয়তান ও নফসের প্ররোচনা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। তখন যে-কোনও পরিবেশ-পরিস্থিতিতে নিজের দীন ও ঈমান রক্ষা করা সহজ হয় এবং শরীয়তের আদেশ-নিষেধ পালনের ইচ্ছা ও মনোবল বজায় রাখা সম্ভব হয়।
সফর অবস্থায় দেহমনে ক্লান্তি, পরিবেশ-পরিস্থিতিতে নতুনত্ব ও নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাবের দরুন আমল-আখলাকে শৈথিল্য দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই তাকওয়া অবলম্বন সর্বাবস্থায়ই জরুরি হলেও সফর অবস্থায় তার জরুরত তুলনামূলক বেশি। কাজেই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে গমনেচ্ছু সাহাবীকে বিশেষভাবে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দান করেছেন।
দ্বিতীয় উপদেশ দান করেছেন- وَالتَّكْبِيرِ عَلَى كُلِّ شَرَفٍ (প্রত্যেক উঁচু স্থানে তাকবীর বলবে)। অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলবে। নিচে নামতে তাসবীহ অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ পড়তে হয়। অন্য হাদীছে আছে:
فَكُنَّا إِذَا أَشْرَفْنَا عَلَى وَادٍ، هَلَّلْنَا وَكَبَّرْنَا ارْتَفَعَتْ أَصْوَاتُنَا
(তখন আমরা যখনই কোনও উপত্যকায় পৌঁছতাম, তখন বলতাম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। তাতে আমাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে যেত)। বস্তুত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরামও আল্লাহ তা'আলার যিকির ও স্মরণকে তাঁদের প্রাণের খোরাক বানিয়ে নিয়েছিলেন। সর্বাবস্থায় তাঁরা যিকির করতে ভালোবাসতেন। এর মধ্যে তাঁরা শান্তি পেতেন এবং পেতেন দেহমনে শক্তি। তাই তো সফরের কষ্টকর চলার ভেতরও তাঁরা আল্লাহর যিকির জারি রাখতেন। এমনকি যিকিরের আনন্দ ও উদ্দীপনায় তাঁরা পথচলার কষ্টও ভুলে যেতেন। ফলে যিকির করতে গিয়ে তাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে যেত। তাঁরা উচ্চশব্দে বলতে থাকতেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। এতে যদিও পথচলার কষ্ট লাঘব হতো, কিন্তু অবিরাম উচ্চ আওয়াজ শরীরের পক্ষে ক্লান্তিকর বটে। কায়িক শ্রমের মতো উচ্চ আওয়াজ করতে থাকার মধ্যেও যথেষ্ট কষ্ট-ক্লেশ হয়ে থাকে। পরম মমতাশীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় সাহাবীদের সে কষ্ট নিবারণ করতে চাইলেন। তিনি তাদের লক্ষ্য করে বললেন-
يا أَيُّها النَّاسُ، إِرْبَعُوْا عَلَى أَنْفُسِكُمْ (হে লোকসকল! নিজেদের প্রতি সদয় হও)। অর্থাৎ তোমরা আওয়াজ উঁচু করো না। এভাবে আওয়াজ উঁচু করতে থাকলে তোমাদের কষ্ট হবে। শরীর ক্লান্ত হবে। তাতে তোমাদের সফরের চলা অব্যাহত রাখা কঠিন হবে। তাছাড়া তোমাদের আরও কত কাজ রয়েছে। উচ্চ আওয়াজ করে যদি শরীর ক্লান্ত করে ফেল, তবে সেসব কাজ কীভাবে আঞ্জাম দেবে? সুতরাং নিজেদের প্রতি সদয় হও এবং আওয়াজ উঁচু করা থেকে ক্ষান্ত হও।
তারা আওয়াজ উঁচু করছিলেন আল্লাহ তা'আলার যিকিরে। যিকির করার উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ তা'আলাকে শোনানো ও তাঁকে দেখানো। এটা বান্দার মনের আকুতি যে, আল্লাহ দেখুন তাঁর বান্দা কীভাবে তাঁকে স্মরণ করছে। বলাবাহুল্য, যিকিরের এ উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য আওয়াজ উঁচু করার দরকার হয় না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
فَإِنَّكُمْ لاَ تَدْعُونَ أَصَمَّ وَلاَ غَائِبًا، إِنَّهُ مَعَكُمْ إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ (তোমরা তো কোনও বধির ও অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না। তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন। তিনি সবকিছু শোনেন, তিনি নিকটবর্তী)। অর্থাৎ তোমরা যিকির দ্বারা যাকে ডাকছ সেই আল্লাহ বধির তো ননই; বরং তিনি সর্বশ্রোতা, সবকিছু শোনেন। যত ক্ষীণ আওয়াজই হোক না কেন, তা শুনতে তাঁর কোনও অসুবিধা হয় না। মসৃণ পাথরের উপর পিঁপড়ের পা ফেলায় যে আওয়াজ হয়, তাও তিনি শুনতে পান। কাজেই তোমরা উচ্চ আওয়াজে যিকির করলে যেমন তিনি শোনেন, তেমনি যত ক্ষীণ আওয়াজেই যিকির কর না কেন, তাও তিনি শুনবেন। এ অবস্থায় অহেতুক আওয়াজ উঁচু করা কেন?
এমনিভাবে উচ্চ আওয়াজের অঙ্গভঙ্গি তোমরা তাঁকে দেখাতে চাও? তাঁর দৃষ্টিশক্তি মাখলুকের মতো নাকি যে, তা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই কাজ করবে? তিনি যেমন সবকিছু শোনেন, তেমনি দেখেনও সবকিছুই। গভীর অন্ধকারের মধ্যে যা-কিছু ঘটে, তাও তিনি সূর্যালোকে করা কাজকর্মের মতোই দেখেন।
তোমরা কি ভাবছ যে তিনি অনেক দূরে রয়েছেন, তাই আওয়াজ উচ্চ করে তাঁকে দেখাতে ও শোনাতে হবে? না, তিনি তোমাদের কাছেই। সারা জাহানের সমস্ত মাখলুক তাঁর সামনে রয়েছে। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি সবকিছু পরিবেষ্টন করে রেখেছে। বড় থেকে বড় কোনও প্রতিবন্ধকও তাঁর থেকে কোনও মাখলুককে আড়াল করতে পারে না। কোনওরকম বাধা তাঁর শ্রবণশক্তির সামনে অন্তরায় হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَاِذَا سَاَلَکَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ
(হে নবী!) আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি তাদেরকে বলুন যে,) আমি এত নিকটবর্তী যে, কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)
وَمَا تَکُوۡنُ فِیۡ شَاۡنٍ وَّمَا تَتۡلُوۡا مِنۡہُ مِنۡ قُرۡاٰنٍ وَّلَا تَعۡمَلُوۡنَ مِنۡ عَمَلٍ اِلَّا کُنَّا عَلَیۡکُمۡ شُہُوۡدًا اِذۡ تُفِیۡضُوۡنَ فِیۡہِ
(হে নবী!) তুমি যে-অবস্থায়ই থাক এবং কুরআনের যে-অংশই তিলাওয়াত কর এবং (হে মানুষ!) তোমরা যে-কাজই কর, তোমরা যখন তাতে লিপ্ত থাক, তখন আমি তোমাদের দেখতে থাকি। (সূরা ইউনুস, আয়াত ৬১)
মোটকথা আল্লাহ তা'আলা সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। তাই যিকিরে আওয়াজ উচ্চ করার প্রয়োজন নেই। বিশেষ প্রয়োজনীয় স্থান ছাড়া সাধারণ অবস্থায় যিকির নিম্নস্বরে করাই বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
ااُدۡعُوۡا رَبَّکُمۡ تَضَرُّعًا وَّخُفۡیَۃً ؕ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ ۚ
তোমরা বিনীতভাবে ও চুপিসারে নিজেদের প্রতিপালককে ডাকো। নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত ৫৫)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সর্বাবস্থায় যিকিরের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
খ. নিয়ম হলো উপরে ওঠার সময় তাকবীর বলা।
গ. যিকির নিম্ন আওয়াজে করা উত্তম।
ঘ. ইবাদত-বন্দেগীতে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট-ক্লেশ করা বাঞ্ছনীয় নয়।
ঙ. শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দু'টি গুণ এবং এ গুণদু'টিও তাঁর অন্যান্য গুণের মতো অসীম।
يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أَسَافِرَ فَأَوْصِنِي (ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি সফর করব বলে ইচ্ছা করেছি। আপনি আমাকে উপদেশ দিন)। বলাবাহুল্য, সে ব্যক্তি তো সাহাবীই ছিলেন। সাহাবীগণ আমাদের আদর্শ। তিনি সফরে বের হওয়ার আগে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপদেশগ্রহণের জন্য এসেছেন। বোঝা গেল সফরে বের হওয়ার আগে অনুসরণীয় কোনও ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হয়ে তার কাছে উপদেশ চাওয়া মুস্তাহাব। সফরে নানা পরিবেশ-পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। সেক্ষেত্রে নিজের দীন ও ঈমানের দিক থেকে কঠিন কঠিন পরীক্ষাও সামনে এসে পড়ে। আগে থেকে মানসিক প্রস্তুতি থাকলে তখন পরীক্ষায় উতরে যাওয়া সহজ হয়। বুযুর্গানে দীনের নসীহত দ্বারা মানসিক প্রস্তুতি লাভ হয়। তা অন্তরে শক্তি জোগায়। পথে আলো দান করে। তাই সফরে নিজ খেয়ালমতো বের না হয়ে প্রথমে কোনও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হওয়া এবং তার উপদেশ গ্রহণ করা উচিত। এটা দীনী সতর্কতার পরিচায়ক। সাহাবী সেই সতর্কতারই পরিচয় দিয়েছেন।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দু'টি উপদেশ দিলেন। প্রথমে বললেন - عَلَيْكَ بِتَقْوَى اللَّهِ (তুমি অবশ্যই তাকওয়া অবলম্বন করবে)। অর্থাৎ সফরের পুরোটা সময় অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত রাখবে এবং প্রতিটি কাজ সে অনুসারে সম্পন্ন করবে। এমনিতে তো তাকওয়া অবলম্বন করা এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত রাখা সর্বাবস্থায়ই জরুরি। সুতরাং এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُ مَا كُنْتَ.
'যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় করো। (জামে' তিরমিযী: ১৯৮৭; মুসনাদে আহমাদ: ২১৩৯২; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১৭৮। মুসনাদুল বাযযার: ৪০২২; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ৭৬৬০)
তাকওয়া এক অদৃশ্য দুর্গ। এটা অবলম্বন করলে শয়তান ও নফসের প্ররোচনা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। তখন যে-কোনও পরিবেশ-পরিস্থিতিতে নিজের দীন ও ঈমান রক্ষা করা সহজ হয় এবং শরীয়তের আদেশ-নিষেধ পালনের ইচ্ছা ও মনোবল বজায় রাখা সম্ভব হয়।
সফর অবস্থায় দেহমনে ক্লান্তি, পরিবেশ-পরিস্থিতিতে নতুনত্ব ও নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাবের দরুন আমল-আখলাকে শৈথিল্য দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই তাকওয়া অবলম্বন সর্বাবস্থায়ই জরুরি হলেও সফর অবস্থায় তার জরুরত তুলনামূলক বেশি। কাজেই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে গমনেচ্ছু সাহাবীকে বিশেষভাবে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দান করেছেন।
দ্বিতীয় উপদেশ দান করেছেন- وَالتَّكْبِيرِ عَلَى كُلِّ شَرَفٍ (প্রত্যেক উঁচু স্থানে তাকবীর বলবে)। অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলবে। নিচে নামতে তাসবীহ অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ পড়তে হয়। অন্য হাদীছে আছে:
فَكُنَّا إِذَا أَشْرَفْنَا عَلَى وَادٍ، هَلَّلْنَا وَكَبَّرْنَا ارْتَفَعَتْ أَصْوَاتُنَا
(তখন আমরা যখনই কোনও উপত্যকায় পৌঁছতাম, তখন বলতাম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। তাতে আমাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে যেত)। বস্তুত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরামও আল্লাহ তা'আলার যিকির ও স্মরণকে তাঁদের প্রাণের খোরাক বানিয়ে নিয়েছিলেন। সর্বাবস্থায় তাঁরা যিকির করতে ভালোবাসতেন। এর মধ্যে তাঁরা শান্তি পেতেন এবং পেতেন দেহমনে শক্তি। তাই তো সফরের কষ্টকর চলার ভেতরও তাঁরা আল্লাহর যিকির জারি রাখতেন। এমনকি যিকিরের আনন্দ ও উদ্দীপনায় তাঁরা পথচলার কষ্টও ভুলে যেতেন। ফলে যিকির করতে গিয়ে তাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে যেত। তাঁরা উচ্চশব্দে বলতে থাকতেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। এতে যদিও পথচলার কষ্ট লাঘব হতো, কিন্তু অবিরাম উচ্চ আওয়াজ শরীরের পক্ষে ক্লান্তিকর বটে। কায়িক শ্রমের মতো উচ্চ আওয়াজ করতে থাকার মধ্যেও যথেষ্ট কষ্ট-ক্লেশ হয়ে থাকে। পরম মমতাশীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় সাহাবীদের সে কষ্ট নিবারণ করতে চাইলেন। তিনি তাদের লক্ষ্য করে বললেন-
يا أَيُّها النَّاسُ، إِرْبَعُوْا عَلَى أَنْفُسِكُمْ (হে লোকসকল! নিজেদের প্রতি সদয় হও)। অর্থাৎ তোমরা আওয়াজ উঁচু করো না। এভাবে আওয়াজ উঁচু করতে থাকলে তোমাদের কষ্ট হবে। শরীর ক্লান্ত হবে। তাতে তোমাদের সফরের চলা অব্যাহত রাখা কঠিন হবে। তাছাড়া তোমাদের আরও কত কাজ রয়েছে। উচ্চ আওয়াজ করে যদি শরীর ক্লান্ত করে ফেল, তবে সেসব কাজ কীভাবে আঞ্জাম দেবে? সুতরাং নিজেদের প্রতি সদয় হও এবং আওয়াজ উঁচু করা থেকে ক্ষান্ত হও।
তারা আওয়াজ উঁচু করছিলেন আল্লাহ তা'আলার যিকিরে। যিকির করার উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ তা'আলাকে শোনানো ও তাঁকে দেখানো। এটা বান্দার মনের আকুতি যে, আল্লাহ দেখুন তাঁর বান্দা কীভাবে তাঁকে স্মরণ করছে। বলাবাহুল্য, যিকিরের এ উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য আওয়াজ উঁচু করার দরকার হয় না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
فَإِنَّكُمْ لاَ تَدْعُونَ أَصَمَّ وَلاَ غَائِبًا، إِنَّهُ مَعَكُمْ إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ (তোমরা তো কোনও বধির ও অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না। তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন। তিনি সবকিছু শোনেন, তিনি নিকটবর্তী)। অর্থাৎ তোমরা যিকির দ্বারা যাকে ডাকছ সেই আল্লাহ বধির তো ননই; বরং তিনি সর্বশ্রোতা, সবকিছু শোনেন। যত ক্ষীণ আওয়াজই হোক না কেন, তা শুনতে তাঁর কোনও অসুবিধা হয় না। মসৃণ পাথরের উপর পিঁপড়ের পা ফেলায় যে আওয়াজ হয়, তাও তিনি শুনতে পান। কাজেই তোমরা উচ্চ আওয়াজে যিকির করলে যেমন তিনি শোনেন, তেমনি যত ক্ষীণ আওয়াজেই যিকির কর না কেন, তাও তিনি শুনবেন। এ অবস্থায় অহেতুক আওয়াজ উঁচু করা কেন?
এমনিভাবে উচ্চ আওয়াজের অঙ্গভঙ্গি তোমরা তাঁকে দেখাতে চাও? তাঁর দৃষ্টিশক্তি মাখলুকের মতো নাকি যে, তা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই কাজ করবে? তিনি যেমন সবকিছু শোনেন, তেমনি দেখেনও সবকিছুই। গভীর অন্ধকারের মধ্যে যা-কিছু ঘটে, তাও তিনি সূর্যালোকে করা কাজকর্মের মতোই দেখেন।
তোমরা কি ভাবছ যে তিনি অনেক দূরে রয়েছেন, তাই আওয়াজ উচ্চ করে তাঁকে দেখাতে ও শোনাতে হবে? না, তিনি তোমাদের কাছেই। সারা জাহানের সমস্ত মাখলুক তাঁর সামনে রয়েছে। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি সবকিছু পরিবেষ্টন করে রেখেছে। বড় থেকে বড় কোনও প্রতিবন্ধকও তাঁর থেকে কোনও মাখলুককে আড়াল করতে পারে না। কোনওরকম বাধা তাঁর শ্রবণশক্তির সামনে অন্তরায় হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَاِذَا سَاَلَکَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ
(হে নবী!) আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি তাদেরকে বলুন যে,) আমি এত নিকটবর্তী যে, কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)
وَمَا تَکُوۡنُ فِیۡ شَاۡنٍ وَّمَا تَتۡلُوۡا مِنۡہُ مِنۡ قُرۡاٰنٍ وَّلَا تَعۡمَلُوۡنَ مِنۡ عَمَلٍ اِلَّا کُنَّا عَلَیۡکُمۡ شُہُوۡدًا اِذۡ تُفِیۡضُوۡنَ فِیۡہِ
(হে নবী!) তুমি যে-অবস্থায়ই থাক এবং কুরআনের যে-অংশই তিলাওয়াত কর এবং (হে মানুষ!) তোমরা যে-কাজই কর, তোমরা যখন তাতে লিপ্ত থাক, তখন আমি তোমাদের দেখতে থাকি। (সূরা ইউনুস, আয়াত ৬১)
মোটকথা আল্লাহ তা'আলা সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। তাই যিকিরে আওয়াজ উচ্চ করার প্রয়োজন নেই। বিশেষ প্রয়োজনীয় স্থান ছাড়া সাধারণ অবস্থায় যিকির নিম্নস্বরে করাই বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
ااُدۡعُوۡا رَبَّکُمۡ تَضَرُّعًا وَّخُفۡیَۃً ؕ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ ۚ
তোমরা বিনীতভাবে ও চুপিসারে নিজেদের প্রতিপালককে ডাকো। নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত ৫৫)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সর্বাবস্থায় যিকিরের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
খ. নিয়ম হলো উপরে ওঠার সময় তাকবীর বলা।
গ. যিকির নিম্ন আওয়াজে করা উত্তম।
ঘ. ইবাদত-বন্দেগীতে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট-ক্লেশ করা বাঞ্ছনীয় নয়।
ঙ. শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দু'টি গুণ এবং এ গুণদু'টিও তাঁর অন্যান্য গুণের মতো অসীম।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)