মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)
৭. নামাযের অধ্যায়
হাদীস নং: ১১৭১
নামাযের অধ্যায়
(৪) অনুচ্ছেদঃ মুসাফির বাহনে উঠবার সময় এবং বাহন হোঁচট খেলে কি বলবে? এবং বাহনের পিছনে বসার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস প্রসঙ্গে
(১১৬৭) আলী ইবন রাবী'আ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আলী (রা)-কে দেখেছি তার আরোহণের জন্য একটি চতুষ্পদ জন্তু আনা হল অতঃপর তিনি যখন পাদুকাদানীতে তার পা রাখলেন তখন বললেন بِسْمِ اللَّه অতঃপর যখন তাতে উপবেশন করলেন তখন বললেন الحَمْدُ لِلَّه অতঃপর এ দু'আ পড়লেন - سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ (পবিত্র তিনি যিনি এদেরকে বশীভূত বহর দিয়েছেন এবং আমরা এদেরকে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আমরা অবশ্যই তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করব।) অতঃপর তিনি তিনবার الحَمْدُ لِلَّه বললেন, পুনরায় তিনবার اللَّهُ أَكْبَر বললেন অতঃপর বললেন- سُبْحَانَكَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ قَدْ ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي
(তোমারই পবিত্রতা, তুমি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। আমি আমার নিজের উপর জুলুম করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা কর।) এরপর তিনি হেসে দিলেন। আমি বললাম, হে আমিরুল মু'মিনীন আপনি হেসে দিলেন কেন? তিনি বললেন, আমি যেমনটি করলাম রাসূল (সা)-কেও এমনটি করতে দেখেছি। এরপর তিনি হেসে দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল। আপনি হেসে দিলেন কেন? তিনি বললেন বান্দা যখন বলে, হে আমার রব আমাকে ক্ষমা করে দিন, তখন তিনি বিস্মিত হয়ে যান এবং বলেন, আমার বান্দা তো জানেই যে আমি ব্যতীত কেউ কোন পাপরাশি ক্ষমা করতে পারে না।
(আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী। শেষোক্তজন বলেন, হাদীসটি হাসান এবং কোন কোন পাণ্ডুলিপিতে আছে হাসান সহীহ।)
(তোমারই পবিত্রতা, তুমি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। আমি আমার নিজের উপর জুলুম করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা কর।) এরপর তিনি হেসে দিলেন। আমি বললাম, হে আমিরুল মু'মিনীন আপনি হেসে দিলেন কেন? তিনি বললেন, আমি যেমনটি করলাম রাসূল (সা)-কেও এমনটি করতে দেখেছি। এরপর তিনি হেসে দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল। আপনি হেসে দিলেন কেন? তিনি বললেন বান্দা যখন বলে, হে আমার রব আমাকে ক্ষমা করে দিন, তখন তিনি বিস্মিত হয়ে যান এবং বলেন, আমার বান্দা তো জানেই যে আমি ব্যতীত কেউ কোন পাপরাশি ক্ষমা করতে পারে না।
(আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী। শেষোক্তজন বলেন, হাদীসটি হাসান এবং কোন কোন পাণ্ডুলিপিতে আছে হাসান সহীহ।)
كتاب الصلاة
(4) باب ما يقوله المسافر عند ركوب دابته وعند عثرتها وما جاء فى الارتداف
(1171) عن علىِّ بن ربيعة قال رأيت عليًّا رضي الله عنه أتي بدابَّة ليركبها فلمَّا وضع رجله في الرِّكاب قال بسم الله، فلمَّا استوى عليها قال الحمد لله، سبحان الَّذى سخَّر لنا هذا وما كنَّا له مقرنين وإنَّا إلى ربِّنا لمنقلبون، ثمَّ حمد الله ثلاثًا، ثمَّ قال سبحانك لا إله إلاَّ أنت قد ظلمت نفسي
فاغفر لي ثمَّ ضحك، فقلت ممَّ ضحكت يا أمير المؤمنين؟ قال رأيت رسول الله صلَّى الله عليه وعلى آله وصحبه وسلَّم فعل مثل ما فعلت، ثمَّ ضحك فقلت ممَّ ضحكت يا رسول الله؟ قال يعجب الرَّب من عبده إذا قال ربِّ اغفر لى، ويقول علم عبدى أنَّه لا يغفر الذُّنوب غيرى
فاغفر لي ثمَّ ضحك، فقلت ممَّ ضحكت يا أمير المؤمنين؟ قال رأيت رسول الله صلَّى الله عليه وعلى آله وصحبه وسلَّم فعل مثل ما فعلت، ثمَّ ضحك فقلت ممَّ ضحكت يا رسول الله؟ قال يعجب الرَّب من عبده إذا قال ربِّ اغفر لى، ويقول علم عبدى أنَّه لا يغفر الذُّنوب غيرى
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীছটিতে যানবাহনে আরোহণের দুআ ছাড়াও অতিরিক্ত কিছু দুআ বর্ণিত হয়েছে। হযরত আলী রাযি. নিজ আমল দ্বারা দেখিয়েছেন দুআগুলো কখন কীভাবে পড়তে হয়। হযরত আলী রাযি. তখন আমীরুল মুমিনীন। মুসলিম জাহানের খলীফা। আলী ইবন রাবী'আ তাঁর শিষ্য এবং একজন বিখ্যাত তাবি'ঈ। তিনি জানান, একদিন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী রাযি.-এর কাছে তাঁর আরোহণের জন্য একটি পশু আনা হলো। دابة এর অর্থ ভূমির উপর চলাফেরা করে এমন প্রাণী। এর দ্বারা সাধারণত চতুষ্পদ জন্তু বোঝানো হয়। বিশেষত ঘোড়া, খচ্চর, উট ও গাধা। হযরত আলী রাযি. আরোহণের জন্য যখন পশুটির পাদানিতে পা রাখলেন, তখন বললেন بسم الله (আল্লাহর নামে আরোহণ করছি)। যানবাহন আল্লাহ তা'আলার দান। তাঁর দেওয়া নি'আমত তাঁর নাম নিয়েই ভোগ ও ব্যবহার করা উচিত। এটা নি'আমতের শোকর।
হাদীছটির শেষদিকে আছে, হযরত আলী রাযি. এ সময় যা-কিছু করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও অনুরূপ করতে দেখেছেন। অর্থাৎ তিনি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণেই এসব কাজ করেছেন। বোঝা গেল যানবাহনে আরোহণের শুরুতে بسم الله বলা সুন্নত। যে-কোনও বৈধ কাজই بسم الله দ্বারা শুরু করতে হয়। এটা সুন্নত।
হযরত আলী রাযি. তাঁর বাহনজন্তুটির পিঠে যখন সোজা হয়ে বসলেন, তখন পড়লেন- سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ (পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)।
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ (পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)। এটা যানবাহনে চড়ার দুআ। এর মর্মকথা হলো, আল্লাহ তা'আলা এসব জন্তু ও জাহাজ আমাদেরই জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নিজের এসবের কোনও প্রয়োজন নেই। তিনি সর্বশক্তিমান। কোনওকিছুর প্রতি তাঁর কোনওরূপ মুখাপেক্ষিতা নেই। তিনি সকল দুর্বলতা ও সকল মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। কাজেই তিনি নিজ প্রয়োজনে নয়; বরং আমাদেরই কল্যাণার্থে এসব বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং এসবকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। তিনি বশীভূত না করলে আমাদের পক্ষে এগুলোকে নিজেদের কাজে লাগানো ও এদেরকে দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব ছিল না। আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী উটকে কীভাবে আমরা ব্যবহার করতে সক্ষম হতাম? কীভাবেই বা ভারী ভারী নৌযান পানিতে ভাসাতাম বা ভারী ভারী উড়োজাহাজ বায়ুমণ্ডলে পরিচালনা করতাম?
দু'আটির শেষে বলা হয়েছে- وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ (নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। এর দ্বারা আখিরাতের সফরের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ দুআটি পড়া হয় দুনিয়াবী সফরকালে। দুনিয়ার সফরও সফর বটে, কিন্তু সত্যিকারের সফর আখিরাতের সফরই। মানুষ সর্বক্ষণ সে সফরের মধ্যেই থাকে। দুনিয়াবী সফর কখনও করা হয়, কখনও করা হয় না। কিন্তু আখিরাতের সফর চলতেই থাকে। জন্মের পর থেকেই সে সফর শুরু হয়ে যায়। মৃত্যুতে শেষ হয়। দুনিয়াবী সফরে মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনের কোনও ফায়দা হাসিল করা উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু যে সফরের সঙ্গে তার আখিরাতের অনন্ত জীবনের লাভ-লোকসান যুক্ত, সে সফর জারি থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ গাফিলতির ঘুমে রয়েছে। তার যে সময় বয়ে যাচ্ছে, সে আখিরাতের দিকে এগিয়ে চলছে, অথচ সে জীবনের জন্য কোনও প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে না। এভাবেই চরম উদাসীনতার ভেতর তার জীবন কাটে। অথচ ওই জীবনের সফলতা অর্জনের জন্যই তাকে এ ক্ষণস্থায়ী জীবন দেওয়া হয়েছে। ক্ষণস্থায়ী জীবন নিয়েই সে ব্যস্ত আর আসল জীবন সম্পর্কে গাফেল। এ দুআর ভেতর দিয়ে বান্দার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হচ্ছে, ক্ষণস্থায়ী জীবনে এই যে সফর করছি, এর পাশাপাশি আমাদের আখিরাতের সফরও অব্যাহত রয়েছে। সেই সফরের শেষ গন্তব্য আমাদের প্রতিপালকের দরবার। একদিন আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাব। আমাদেরকে সে বিষয়ে গাফেল হলে চলবে না। বরং সেখানকার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাই হবে আমাদের আসল কাজ।
হযরত আলী রাযি. উল্লিখিত দুআটি পাঠ করার পর তিনবার الْحَمْدُ لِلَّهِ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর) বললেন। এর দ্বারা তিনি আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করলেন। চলাফেরা ও আরোহণ করার জন্য শক্তিধর পশুকে মানুষের বশীভূত করে দেওয়াটা আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত। এ নি'আমত না হলে মানুষের অনেক কষ্ট হতো। বর্তমানকালে যান্ত্রিক যানবাহন তার বিকল্প। এগুলোও আল্লাহর দান। এসব না হলে মানুষের কষ্টের সীমা থাকত না। তাই খুব গুরুত্বের সঙ্গে এর জন্য শোকর আদায় করা দরকার। তিনবার الْحَمْدُ لله বলার দ্বারা সে গুরুত্বই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
তারপর তিনবার الله أكبر (আল্লাহ মহত্তম) বললেন। এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এই বিশাল বিস্তৃত পৃথিবী আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি। এখানে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে তাঁর খলীফা বানিয়ে পাঠিয়েছেন। ছোট-বড় অগণিত সৃষ্টিকে মানুষের বশীভূত করে দিয়েছেন। মানুষ এসব মাখলুকের উপর নিজ আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এর দ্বারা নিজের বিভিন্ন প্রয়োজন সমাধা করে। বড় বড় পশুর পিঠে চড়ে সে দূর-দূরান্তের সফর করে। একদিকে তার আল্লাহপ্রদত্ত এরূপ ক্ষমতা যে, বড় বড় পশুকেও নিজ ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারছে। অন্যদিকে তার অশেষ অক্ষমতা। এ সকল মাখলুকসহ আরও যে আসবাব-উপকরণ আছে, তার ব্যবহার ছাড়া সে তার কোনও প্রয়োজন সমাধা করতে পারে না। যে মহান আল্লাহ তার এ অক্ষমতার প্রতিকারকল্পে দুনিয়ার মাখলুকসমূহকে তার বশীভূত করে দিয়েছেন, তাঁর নিজের কিন্তু কোনও আসবাব-উপকরণের প্রয়োজন হয় না। তাঁর আরশ আছে। তিনি আরশের অধিপতি। সে আরশ মহাবিশ্বে তাঁর রাজত্ব ও কর্তৃত্বের প্রতীক। মানুষের যেমন আরোহণের প্রয়োজন হয়, আরশের উপর তাঁর সেরকম আরোহণের প্রয়োজন নেই। কোনওকিছুর প্রতিই তাঁর কোনও মুখাপেক্ষিতা নেই। তিনি স্থান-কালের গণ্ডির ঊর্ধ্বে। যানবাহনে আরোহণকালে আল্লাহর পরিচয় লাভকারী বান্দা একদিকে যেমন নিজ অক্ষমতার অনুভূতির পাশাপাশি অন্যসব মাখলুকের উপর নিজ শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পায়, তেমনি অন্যদিকে সে তার সৃষ্টিকর্তা মহাবিশ্বের মালিকের গৌরব ও বড়ত্বও অনুভব করতে পারে। তাই সে গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধার সঙ্গে বলে ওঠে- الله أكبر (আল্লাহ মহত্তম)।
তারপর হযরত আলী রাযি. উচ্চারণ করেন- سُبْحَانَكَ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ (হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া আর কেউ পাপ ক্ষমা করতে পারে না)। এতক্ষণ আল্লাহ তা'আলার গুণগান করা হয়েছিল। মানুষের উপর তাঁর অনুগ্রহ ও তাঁর প্রতিপালকত্বের স্বীকৃতি, তাঁর শোকর আদায় এবং তাঁর গৌরব ও মহিমার প্রকাশ দ্বারা তাঁর তারিফ ও স্তুতি জ্ঞাপন করা হয়েছিল। সে হিসেবে এটা প্রার্থনার স্থান। প্রার্থনার ভেতরও বান্দার সর্বাপেক্ষা কাঙ্ক্ষিত বিষয় হলো গুনাহের মাগফিরাত। এ দুআর ভেতর সেটাই করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার কাছে নিজের যাবতীয় গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়েছে।
দু'আটির ভেতর যে বলা হয়েছে إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي (আমি নিজের উপর জুলুম করেছি), এর দ্বারা শোকর আদায়ে গাফিলতিসহ নিজ যাবতীয় পাপকর্মের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এক পাপকর্ম হলো আল্লাহ তা'আলার হক আদায়ে ত্রুটি, আরেক পাপকর্ম হলো মাখলুকের হক আদায়ে ত্রুটি। উভয়প্রকার পাপকর্ম দ্বারা মূলত বান্দার নিজের উপরই জুলুম করা হয়। কেননা তাতে ক্ষতি হয় নিজেরই। নিজ দুনিয়া ও আখিরাত সবই বরবাদ হয়। দুনিয়ায় ভোগ করতে হয় নানারকম অশান্তি। আর আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি। সুতরাং গুনাহ করা তথা আল্লাহর হক ও বান্দার হক আদায়ে অবহেলা করাটা নিজের উপর জুলুম করারই নামান্তর।
উল্লিখিত দুআসমূহ পাঠ করার পর হযরত আলী রাযি. হেসে দেন এবং বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও এতক্ষণ আমি যা করলাম অনুরূপ করার পর হাসতে দেখেছি। আমি তাঁকে হাসির কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন-
إِنَّ رَبَّكَ تَعَالَى يَعْجَبُ مِنْ عَبْدِهِ إِذَا قَالَ: اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي، يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ غَيْرِي
'তোমার পবিত্র ও মহান প্রতিপালক নিজ বান্দার প্রতি খুশি হন, যখন সে বলে- হে আল্লাহ! আমার পাপরাশি ক্ষমা করুন। (আল্লাহ বলেন,) সে জানে আমি ছাড়া তার পাপরাশি আর কেউ ক্ষমা করতে পারে না'। يَعْجَبُ এর আসল অর্থ বিস্মিত হওয়া, মুগ্ধ হওয়া। আল্লাহ তা'আলার শানে এ অর্থে শব্দটি খাটে না। কারণ কোনও জিনিস দেখে বা শুনে আশ্চর্যবোধ হয় কেবল তারই, যার তা আগে থেকে জানা থাকে না। আল্লাহ তা'আলা দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছুর পরিপূর্ণ জ্ঞাতা। কাজেই শব্দটি দ্বারা এর আক্ষরিক নয়; বরং ভাবার্থ বোঝানো উদ্দেশ্য। আর তা হলো খুশি হওয়া ও পুরস্কৃত করা। আল্লাহ তা'আলা বান্দার ক্ষমাপ্রার্থনায় খুব খুশি হন। যেমন হযরত আলী রাযি, থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন-
مِنْ أَحَبِّ الْكَلِمِ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَقُولَ الْعَبْدُ وَهُوَ سَاجِدٌ : ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي
'আল্লাহ তা'আলার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় একটি কথা হলো সিজদারত অবস্থায় বান্দার এই বলা যে, আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৯২৩২))
নিজ গুনাহের জন্য বান্দার ক্ষমাপ্রার্থনায় আল্লাহ তা'আলা খুশি হয়ে বলেন যে, আমার বান্দা জানে আমি ছাড়া তাকে ক্ষমা করার আর কেউ নেই। এক রেওয়ায়েতে আছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন-
عَبْدِي عَرَفَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ وَيُعَاقِبُ.
'আমার বান্দা জেনেছে যে, তার একজন প্রতিপালক আছেন, যিনি ক্ষমা করেন ও শাস্তি দেন। (হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২৪৮২)
আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিলাভই বান্দার পরম লক্ষ্য। তিনি সন্তুষ্ট হলেই বান্দা তার গুনাহের ক্ষমা পাবে এবং আখিরাতে নাজাত লাভ করতে পারবে। কাজেই আল্লাহ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে বান্দার উচিত নিজ গুনাহের জন্য বেশি বেশি তাওবা করা, বেশি বেশি তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা।
যা হোক, হাদীছটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাসির কারণ বলা হয়েছে এই যে, বান্দার ইস্তিগফার আল্লাহ তা'আলার পছন্দ। তাতে তিনি খুশি হন। তার মানে তিনি খুশি হয়ে বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে বান্দার প্রতি বিশেষ দয়া-অনুগ্রহ। অর্থাৎ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাসি ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এ দয়া ও অনুগ্রহের কারণে আনন্দের অভিব্যক্তি। বোঝা গেল আল্লাহ তা'আলার আযাব ও গজবের আলোচনায় যেমন ভীতি প্রকাশ ও ক্রন্দন করা বা ক্রন্দনের ভাব দেখানো কাম্য, তেমনি তাঁর রহমত ও দয়ার প্রকাশের ক্ষেত্রেও আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা বাঞ্ছনীয়।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. যানবাহনে আরোহণকালে بسم الله বলা সুন্নত।
খ. যানবাহনে স্থির হয়ে বসার পর বলতে হবে-
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هُذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ.
গ. তারপর তিনবার الحمد الله বলবে।
ঘ. তারপর তিনবার বলবে الله أكبر।
ঙ. সবশেষে বলবে-
سُبْحَانَكَ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
চ. বান্দার ইস্তিগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনায় আল্লাহ তা'আলা খুশি হন। তাই বেশি বেশি ইস্তিগফার করা উচিত।
ছ. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে দীনী বা দুনিয়াবী যে-কোনওরকম দয়া ও রহমতের প্রকাশ জানতে পারলে সেজন্য আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। এটাও বন্দেগীসুলভআচরণ।
হাদীছটির শেষদিকে আছে, হযরত আলী রাযি. এ সময় যা-কিছু করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও অনুরূপ করতে দেখেছেন। অর্থাৎ তিনি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণেই এসব কাজ করেছেন। বোঝা গেল যানবাহনে আরোহণের শুরুতে بسم الله বলা সুন্নত। যে-কোনও বৈধ কাজই بسم الله দ্বারা শুরু করতে হয়। এটা সুন্নত।
হযরত আলী রাযি. তাঁর বাহনজন্তুটির পিঠে যখন সোজা হয়ে বসলেন, তখন পড়লেন- سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ (পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)।
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ (পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)। এটা যানবাহনে চড়ার দুআ। এর মর্মকথা হলো, আল্লাহ তা'আলা এসব জন্তু ও জাহাজ আমাদেরই জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নিজের এসবের কোনও প্রয়োজন নেই। তিনি সর্বশক্তিমান। কোনওকিছুর প্রতি তাঁর কোনওরূপ মুখাপেক্ষিতা নেই। তিনি সকল দুর্বলতা ও সকল মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। কাজেই তিনি নিজ প্রয়োজনে নয়; বরং আমাদেরই কল্যাণার্থে এসব বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং এসবকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। তিনি বশীভূত না করলে আমাদের পক্ষে এগুলোকে নিজেদের কাজে লাগানো ও এদেরকে দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব ছিল না। আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী উটকে কীভাবে আমরা ব্যবহার করতে সক্ষম হতাম? কীভাবেই বা ভারী ভারী নৌযান পানিতে ভাসাতাম বা ভারী ভারী উড়োজাহাজ বায়ুমণ্ডলে পরিচালনা করতাম?
দু'আটির শেষে বলা হয়েছে- وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ (নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। এর দ্বারা আখিরাতের সফরের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ দুআটি পড়া হয় দুনিয়াবী সফরকালে। দুনিয়ার সফরও সফর বটে, কিন্তু সত্যিকারের সফর আখিরাতের সফরই। মানুষ সর্বক্ষণ সে সফরের মধ্যেই থাকে। দুনিয়াবী সফর কখনও করা হয়, কখনও করা হয় না। কিন্তু আখিরাতের সফর চলতেই থাকে। জন্মের পর থেকেই সে সফর শুরু হয়ে যায়। মৃত্যুতে শেষ হয়। দুনিয়াবী সফরে মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনের কোনও ফায়দা হাসিল করা উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু যে সফরের সঙ্গে তার আখিরাতের অনন্ত জীবনের লাভ-লোকসান যুক্ত, সে সফর জারি থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ গাফিলতির ঘুমে রয়েছে। তার যে সময় বয়ে যাচ্ছে, সে আখিরাতের দিকে এগিয়ে চলছে, অথচ সে জীবনের জন্য কোনও প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে না। এভাবেই চরম উদাসীনতার ভেতর তার জীবন কাটে। অথচ ওই জীবনের সফলতা অর্জনের জন্যই তাকে এ ক্ষণস্থায়ী জীবন দেওয়া হয়েছে। ক্ষণস্থায়ী জীবন নিয়েই সে ব্যস্ত আর আসল জীবন সম্পর্কে গাফেল। এ দুআর ভেতর দিয়ে বান্দার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হচ্ছে, ক্ষণস্থায়ী জীবনে এই যে সফর করছি, এর পাশাপাশি আমাদের আখিরাতের সফরও অব্যাহত রয়েছে। সেই সফরের শেষ গন্তব্য আমাদের প্রতিপালকের দরবার। একদিন আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাব। আমাদেরকে সে বিষয়ে গাফেল হলে চলবে না। বরং সেখানকার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাই হবে আমাদের আসল কাজ।
হযরত আলী রাযি. উল্লিখিত দুআটি পাঠ করার পর তিনবার الْحَمْدُ لِلَّهِ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর) বললেন। এর দ্বারা তিনি আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করলেন। চলাফেরা ও আরোহণ করার জন্য শক্তিধর পশুকে মানুষের বশীভূত করে দেওয়াটা আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত। এ নি'আমত না হলে মানুষের অনেক কষ্ট হতো। বর্তমানকালে যান্ত্রিক যানবাহন তার বিকল্প। এগুলোও আল্লাহর দান। এসব না হলে মানুষের কষ্টের সীমা থাকত না। তাই খুব গুরুত্বের সঙ্গে এর জন্য শোকর আদায় করা দরকার। তিনবার الْحَمْدُ لله বলার দ্বারা সে গুরুত্বই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
তারপর তিনবার الله أكبر (আল্লাহ মহত্তম) বললেন। এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এই বিশাল বিস্তৃত পৃথিবী আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি। এখানে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে তাঁর খলীফা বানিয়ে পাঠিয়েছেন। ছোট-বড় অগণিত সৃষ্টিকে মানুষের বশীভূত করে দিয়েছেন। মানুষ এসব মাখলুকের উপর নিজ আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এর দ্বারা নিজের বিভিন্ন প্রয়োজন সমাধা করে। বড় বড় পশুর পিঠে চড়ে সে দূর-দূরান্তের সফর করে। একদিকে তার আল্লাহপ্রদত্ত এরূপ ক্ষমতা যে, বড় বড় পশুকেও নিজ ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারছে। অন্যদিকে তার অশেষ অক্ষমতা। এ সকল মাখলুকসহ আরও যে আসবাব-উপকরণ আছে, তার ব্যবহার ছাড়া সে তার কোনও প্রয়োজন সমাধা করতে পারে না। যে মহান আল্লাহ তার এ অক্ষমতার প্রতিকারকল্পে দুনিয়ার মাখলুকসমূহকে তার বশীভূত করে দিয়েছেন, তাঁর নিজের কিন্তু কোনও আসবাব-উপকরণের প্রয়োজন হয় না। তাঁর আরশ আছে। তিনি আরশের অধিপতি। সে আরশ মহাবিশ্বে তাঁর রাজত্ব ও কর্তৃত্বের প্রতীক। মানুষের যেমন আরোহণের প্রয়োজন হয়, আরশের উপর তাঁর সেরকম আরোহণের প্রয়োজন নেই। কোনওকিছুর প্রতিই তাঁর কোনও মুখাপেক্ষিতা নেই। তিনি স্থান-কালের গণ্ডির ঊর্ধ্বে। যানবাহনে আরোহণকালে আল্লাহর পরিচয় লাভকারী বান্দা একদিকে যেমন নিজ অক্ষমতার অনুভূতির পাশাপাশি অন্যসব মাখলুকের উপর নিজ শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পায়, তেমনি অন্যদিকে সে তার সৃষ্টিকর্তা মহাবিশ্বের মালিকের গৌরব ও বড়ত্বও অনুভব করতে পারে। তাই সে গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধার সঙ্গে বলে ওঠে- الله أكبر (আল্লাহ মহত্তম)।
তারপর হযরত আলী রাযি. উচ্চারণ করেন- سُبْحَانَكَ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ (হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান। আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া আর কেউ পাপ ক্ষমা করতে পারে না)। এতক্ষণ আল্লাহ তা'আলার গুণগান করা হয়েছিল। মানুষের উপর তাঁর অনুগ্রহ ও তাঁর প্রতিপালকত্বের স্বীকৃতি, তাঁর শোকর আদায় এবং তাঁর গৌরব ও মহিমার প্রকাশ দ্বারা তাঁর তারিফ ও স্তুতি জ্ঞাপন করা হয়েছিল। সে হিসেবে এটা প্রার্থনার স্থান। প্রার্থনার ভেতরও বান্দার সর্বাপেক্ষা কাঙ্ক্ষিত বিষয় হলো গুনাহের মাগফিরাত। এ দুআর ভেতর সেটাই করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার কাছে নিজের যাবতীয় গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়েছে।
দু'আটির ভেতর যে বলা হয়েছে إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي (আমি নিজের উপর জুলুম করেছি), এর দ্বারা শোকর আদায়ে গাফিলতিসহ নিজ যাবতীয় পাপকর্মের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এক পাপকর্ম হলো আল্লাহ তা'আলার হক আদায়ে ত্রুটি, আরেক পাপকর্ম হলো মাখলুকের হক আদায়ে ত্রুটি। উভয়প্রকার পাপকর্ম দ্বারা মূলত বান্দার নিজের উপরই জুলুম করা হয়। কেননা তাতে ক্ষতি হয় নিজেরই। নিজ দুনিয়া ও আখিরাত সবই বরবাদ হয়। দুনিয়ায় ভোগ করতে হয় নানারকম অশান্তি। আর আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি। সুতরাং গুনাহ করা তথা আল্লাহর হক ও বান্দার হক আদায়ে অবহেলা করাটা নিজের উপর জুলুম করারই নামান্তর।
উল্লিখিত দুআসমূহ পাঠ করার পর হযরত আলী রাযি. হেসে দেন এবং বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও এতক্ষণ আমি যা করলাম অনুরূপ করার পর হাসতে দেখেছি। আমি তাঁকে হাসির কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন-
إِنَّ رَبَّكَ تَعَالَى يَعْجَبُ مِنْ عَبْدِهِ إِذَا قَالَ: اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي، يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ غَيْرِي
'তোমার পবিত্র ও মহান প্রতিপালক নিজ বান্দার প্রতি খুশি হন, যখন সে বলে- হে আল্লাহ! আমার পাপরাশি ক্ষমা করুন। (আল্লাহ বলেন,) সে জানে আমি ছাড়া তার পাপরাশি আর কেউ ক্ষমা করতে পারে না'। يَعْجَبُ এর আসল অর্থ বিস্মিত হওয়া, মুগ্ধ হওয়া। আল্লাহ তা'আলার শানে এ অর্থে শব্দটি খাটে না। কারণ কোনও জিনিস দেখে বা শুনে আশ্চর্যবোধ হয় কেবল তারই, যার তা আগে থেকে জানা থাকে না। আল্লাহ তা'আলা দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছুর পরিপূর্ণ জ্ঞাতা। কাজেই শব্দটি দ্বারা এর আক্ষরিক নয়; বরং ভাবার্থ বোঝানো উদ্দেশ্য। আর তা হলো খুশি হওয়া ও পুরস্কৃত করা। আল্লাহ তা'আলা বান্দার ক্ষমাপ্রার্থনায় খুব খুশি হন। যেমন হযরত আলী রাযি, থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন-
مِنْ أَحَبِّ الْكَلِمِ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَقُولَ الْعَبْدُ وَهُوَ سَاجِدٌ : ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي
'আল্লাহ তা'আলার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় একটি কথা হলো সিজদারত অবস্থায় বান্দার এই বলা যে, আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৯২৩২))
নিজ গুনাহের জন্য বান্দার ক্ষমাপ্রার্থনায় আল্লাহ তা'আলা খুশি হয়ে বলেন যে, আমার বান্দা জানে আমি ছাড়া তাকে ক্ষমা করার আর কেউ নেই। এক রেওয়ায়েতে আছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন-
عَبْدِي عَرَفَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ وَيُعَاقِبُ.
'আমার বান্দা জেনেছে যে, তার একজন প্রতিপালক আছেন, যিনি ক্ষমা করেন ও শাস্তি দেন। (হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২৪৮২)
আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিলাভই বান্দার পরম লক্ষ্য। তিনি সন্তুষ্ট হলেই বান্দা তার গুনাহের ক্ষমা পাবে এবং আখিরাতে নাজাত লাভ করতে পারবে। কাজেই আল্লাহ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে বান্দার উচিত নিজ গুনাহের জন্য বেশি বেশি তাওবা করা, বেশি বেশি তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা।
যা হোক, হাদীছটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাসির কারণ বলা হয়েছে এই যে, বান্দার ইস্তিগফার আল্লাহ তা'আলার পছন্দ। তাতে তিনি খুশি হন। তার মানে তিনি খুশি হয়ে বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে বান্দার প্রতি বিশেষ দয়া-অনুগ্রহ। অর্থাৎ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাসি ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এ দয়া ও অনুগ্রহের কারণে আনন্দের অভিব্যক্তি। বোঝা গেল আল্লাহ তা'আলার আযাব ও গজবের আলোচনায় যেমন ভীতি প্রকাশ ও ক্রন্দন করা বা ক্রন্দনের ভাব দেখানো কাম্য, তেমনি তাঁর রহমত ও দয়ার প্রকাশের ক্ষেত্রেও আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা বাঞ্ছনীয়।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. যানবাহনে আরোহণকালে بسم الله বলা সুন্নত।
খ. যানবাহনে স্থির হয়ে বসার পর বলতে হবে-
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هُذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ.
গ. তারপর তিনবার الحمد الله বলবে।
ঘ. তারপর তিনবার বলবে الله أكبر।
ঙ. সবশেষে বলবে-
سُبْحَانَكَ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
চ. বান্দার ইস্তিগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনায় আল্লাহ তা'আলা খুশি হন। তাই বেশি বেশি ইস্তিগফার করা উচিত।
ছ. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে দীনী বা দুনিয়াবী যে-কোনওরকম দয়া ও রহমতের প্রকাশ জানতে পারলে সেজন্য আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। এটাও বন্দেগীসুলভআচরণ।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)