শহুরে মানুষ গ্রামে গেলে মুসাফির না মুকিম?
প্রশ্নঃ ১৪৯৭৪৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, উস্তাদ, আমার দুজন cousin রয়েছে যাদের বিধান মুসাফির না মুক্বীম তা বিস্তারিত জানতে চাচ্ছিলাম
প্রথমজন,
যার ফেনীর সোনাগাজীতে বাড়ি আছে (ভিটেমাটি যা তার দাদার কাছ থেকে তার বাবা পেয়ে সেই জায়গাতে বাড়ি করেছে, মাঝে মধ্যে এসে ঈদে-চাঁদে ঘুরে যায়), তবে তার জন্মস্থান-বেড়ে ওঠা ঢাকাতে, তবে ভাড়া বাসায় থাকে...ফেনীতে আসলে সদরেই নানাবাড়িতে ঘুরতে আসে, সোনাগাজী নিজের বাড়ি যায় কিন্তু কম, তার বাবা-মা ছুটিতে সদরে ও থাকে কিছুদিন-আবার গ্রামে সোনাগাজীতেও গিয়ে থাকে কিছুদিন ঘুরতে, আবার এদিকে ভিটেমাটির মালিকানাধীন তার বাবা এখনো, আর উনারও থাকা হয় না সচরাচর, আসেই শুধু ঈদে-চাঁদের বা এমন ছুটির মৌসুমে,-কারণ উনার ও কর্মক্ষেত্র-থাকা সব স্থায়ীভাবে ঢাকা কেন্দ্রিক-ই, এদিকে ফেনী আসলেও ১৫দিনের চেয়ে থাকা হয় কম, আর তার সব কিছুই (আমার cousin) (পড়াশোনা, তার বাবার কর্মক্ষেত্র সব) ঢাকা কেন্দ্রিক, ভবিষ্যতেও যে নিজের নীড়ে ফিরে এসে স্থায়ী হয়ে থাকবে তার ও সম্ভাবনা নেই বললেই চলে অথবা একদম-ই কম, এক্ষেত্রে সে কি মুসাফির না মুক্বীম গণ্য হবে?
আমার দ্বিতীয় cousin এর মাস'আলা হলোঃ
সে ফেনীতেই জন্ম, ক্লাস টেন শেষ করেই কলেজ লাইফ থেকেই স্ব-পরিবারের সবাই ঢাকায় শিফট হয়, পরিবার ঢাকায় ভাড়া বাসায় থাকে, ফেনীতেও ভাড়া বাসায়-ই থাকতো, তবে তার বাবার যত মূল কাজ সব ফেনী কেন্দ্রিক-ই, যার দরুন বাবা থাকেন ফেনী ভাড়া বাসায়, গ্রামের বাড়ি ফেনীর ফরহাদনগর, ওখানে পৈত্রিকসূত্রে জায়গায় নিজের টাকায় বাড়ি করে-কিছু অংশ তার ভাইদের (অর্থাৎ আমার cousin-এর চাচা) ও ছিলো, ফেনী ক্যডেটের ঐদিকেও একটি জায়গা তার বাবার আছে, বাকি গ্রামের বাড়িটিতে ভবিষ্যতে থাকা হবে কিনা অনিশ্চিত, এখন আমার cousin-এর যত থাকা-শিক্ষাজীবন সব বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রিক, ফেনী আসলে সদরেই নানাবাড়ি ঘুরতে-থাকতে আসে- ঈদে ছুটিতে ঘুরে যায় ১৫দিনের কম বা বেশি, এখন তার ক্ষেত্রে ফেনীতে আসলে কি হবে-মুক্বীম না মুসাফির?
বিস্তারিত জানিয়ে উপকৃত করবেন,
جزاك الله خيرا
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
মুসাফির/মুকিম হওয়ার বিধানের সাথে শরঈ কয়েকটি পরিভাষা সম্পৃক্ত। তন্মধ্যে একটি শব্দ হলো, الوطن الأصلي স্থায়ী বাসস্থান।
দ্বিতীয়টি হলো,- وطن الإقامة সাময়িক বাসস্থান।
(যাকে الوطن الحادث এবং الوطن المستعار-ও বলা হয়)
الوطن الأصلي স্থায়ী বাসস্থানের সংজ্ঞা ও বিধান:
ফোকাহায়ে কেরাম 'ওয়াতানে আসলি' বা স্থায়ী বাসস্থানের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন যে—সেটি এমন জায়গা যাকে মানুষ জন্মসূত্রে বাসস্থান হিসেবে মেনে নিয়েছে, অথবা যেখানে সে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে থাকার নিয়ত (ইচ্ছা) করে নিয়েছে, অথবা অন্য কোনো জায়গা যাতে স্থায়ীভাবে থাকার নিয়ত করে নিয়েছে।
অর্থাৎ মানুষের বাসস্থানের তিনটি ধরণ হতে পারে।
এক. মানুষের জন্মসূত্রে পাওয়া বাসস্থান যেখানে সে বসবাস করে।
দুই. বৈবাহিক সূত্রে পাওয়া বাসস্থান যেখানে সে বসবাস করে।
তিন. নিজের প্রয়োজনে অন্য কোনো স্থানকে বাসস্থান বানিয়ে নেওয়া।
এই সংজ্ঞা আলোকে একজন ব্যক্তির একাধিক, এমনকি তিন চারটি বাস্থানও থাকতে পারে। সুতারাং যদি কোনো ব্যক্তির দুই বা ততোধিক স্থানে জীবন অতিবাহিত করার/বসবাস করার নিয়ত থাকে যে—কখনো এক জায়গায় থাকবে আবার কখনো অন্য জায়গায়, ব্যস্ততার সময় শহরে থাকবে, আর অবসরের সময় গ্রামে থাকবে; কিন্তু সেসব স্থান থেকে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার (ত্যাগ করার) নিয়ত না থাকে, অর্থাৎ ওই জায়গা থেকে নিজের বাসস্থান তুলে নেওয়ার ইচ্ছা না থাকে তাহেল এই সবকটি স্থানই তার জন্য 'ওয়াতানে আসলি' বা স্থায়ী নিবাস হিসেবে গণ্য হবে।
স্থায়ী নিবাসের বিধান:
সেখানে কেউ যদি একমূহুর্তও থাকে তাহলে সেখানে মুকিম হিসেবে গণ্য হবে। সকল নামাজ পূর্ণ করতে হবে।
وطن الإقامة সাময়িক বাসস্থানের সংজ্ঞা ও বিধান:
وطن الإقامة সাময়িক বাসস্থান বলা হয় এমন স্থান যেখানে কেউ ১৫ দিন অথবা তারচে বেশী সময় অবস্থানের নিয়ত করে। যেমন সফর করে আসা আত্মীয়স্বজনের বাড়ী, পর্যটন কেন্দ্রের হোটেল-মোটেল, হ্জ উমরার সফরে মক্কা-মদিনার হোটেল ইত্যাদি। এগুলোকে الوطن الحادث এবং الوطن المستعار-ও বলা হয়।
এজাতীয় বাসস্থানের বিধান হলো যদি কেউ সফর করে এসে এগুলোতে ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত করে তাহলে তিনি এগুলোতে কসর করবেন। কিন্তু যদি ১৫ দিন বা তারচেয়ে বেশি সময় থাকার নিয়ত করে তাহলে সে মুকিম হিসবে গণ্য হবে।
প্রিয় দ্বীনী ভাই!
আপনি আপনার কাজিনদের যেই বিরণর দিয়েছেন সেটা এবং বাসস্থানের উপরিউক্ত সংজ্ঞার আলোকে উভয়ের ব্যাপারেই বিধান হলো, তারা যদি প্রথমে সফর করে (ঢাকা থেকে) নিজ বাড়ীতে যায় তাহলে মুকিম হিসেবেই গণ্য হবে। কেননা তাদের সবকিছু ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও তাদের ফেনীর বাসস্থান বাতিল হয়ে যায়নি। যদিও তারা কালেভদ্রে সেখানে গিয়ে দুচারদিন থাকে অথবা হাঁটা দিয়েই চলে আসে! তাছাড়া তারা যখন সেখানে যায় নিজেদের স্থায়ী বাসস্থানে যায় বলেই জ্ঞান করে। কাজেই তারা সেখানে মুকিমই থাকবে। মুসাফির হবে না।
بدائع الصنائع :
"ثم الوطن الأصلي یجوز أن یکون واحداً أو أکثر بأن كان له أهل و دار في بلدتین و أکثر ولم یكن من نیة أهله الخروج منها و إن كان هو ینتقل من أهل إلى أهل في السنة."
(كتاب الصلاة، فصل بيان ما يصير المسافر به مقيما، 1/ 103، ط: سعيد)
البحر الرائق :
"(قوله ويبطل الوطن الأصلي بمثله لا السفر ووطن الإقامة بمثله والسفر والأصلي) ؛ لأن الشيء يبطل بما هو مثله لا بما هو دونه فلا يصلح مبطلا له وروي أن عثمان - رضي الله عنه - كان حاجا يصلي بعرفات أربعا فاتبعوه فاعتذر، وقال: إني تأهلت بمكة وقال النبي - صلى الله عليه وسلم - «من تأهل ببلدة فهو منها» والوطن الأصلي هو وطن الإنسان في بلدته أو بلدة أخرى اتخذها دارا وتوطن بها مع أهله وولده، وليس من قصده الارتحال عنها بل التعيش بها وهذا الوطن يبطل بمثله لا غير، وهو أن يتوطن في بلدة أخرى وينقل الأهل إليها فيخرج الأول من أن يكون وطنا أصليا حتى لو دخله مسافرا لا يتم قيدنا بكونه انتقل عن الأول بأهله؛ لأنه لو لم ينتقل بهم، ولكنه استحدث أهلا في بلدة أخرى فإن الأول لم يبطل ويتم فيهما وقيد بقوله بمثله؛ لأنه لو باع داره ونقل عياله وخرج يريد أن يتوطن بلدة أخرى ثم بدا له أن لا يتوطن ما قصده أولا ويتوطن بلدة غيرها فمر ببلده الأول فإنه يصلي أربعا؛ لأنه لم يتوطن غيره، وفي المحيط، ولو كان له أهل بالكوفة، وأهل بالبصرة فمات أهله بالبصرة وبقي له دور وعقار بالبصرة قيل البصرة لا تبقى وطنا له؛ لأنها إنما كانت وطنا بالأهل لا بالعقار، ألا ترى أنه لو تأهل ببلدة لم يكن له فيها عقار صارت وطنا له، وقيل تبقى وطنا له؛ لأنها كانت وطنا له بالأهل والدار جميعا فبزوال أحدهما لا يرتفع الوطن كوطن الإقامة يبقى ببقاء الثقل وإن أقام بموضع آخر اهـ.
وفي المجتبى نقل القولين فيما إذا نقل أهله ومتاعه وبقي له دور وعقار ثم قال وهذا جواب واقعة ابتلينا بها وكثير من المسلمين المتوطنين في البلاد، ولهم دور وعقار في القرى البعيدة منها يصيفون بها بأهلهم ومتاعهم فلا بد من حفظها أنهما وطنان له لا يبطل أحدهما بالآخر."
(كتاب الصلاة، باب صلاة المسافر، 2/ 147، ط: دار الكتاب الإسلامي بيروت)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
সাম্প্রতিক প্রশ্নোত্তর
প্রত্যেক রোগের জন্য ওষুধ আছে : হাদিসের ব্যাখ্যা ও শিক্ষা
বড় বোনকে নাম ধরে ডাকা, এটা কি শরিয়তসম্মত?
কম্পিউটার ল্যাপটপ ডেক্সটপ প্রিন্টার সেল ও সার্ভিস এর পার্টনারশিপ ব্যবসা
কোনো ব্যক্তি নারীদের পোশাক, অলংকার ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি বিক্রি করলে, কোনো বেপর্দা নারী তা ক্রয় করে পরিধান করলে বা এসব উপহার হিসেবে কোনো বেপর্দা নারীকে দিলে, সে ব্যক্তি কি গুনাহের ভাগীদার হবে?
উত্তম ঋণ পরিশোধকারী