ইসলামে ধর্ষনের শাস্তি কি?
প্রশ্নঃ ১৫৪৮৫৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ইসলামে ধর্ষনের শাস্তি কি? ধর্ষণে কখনোই ৪ জন সাক্ষী আনা সম্ভব হয়না,এইক্ষেত্রে ইসলামের শরীয়ত কি?
২৪ মে, ২০২৬
৭৫৬ ৪২ Uppsala
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
ইসলামে জিনা এবং ধর্ষণ উভয়টি মারাত্মক অপরাধ।
জিনা হলো এমন যৌন সম্পর্ক যা বিবাহের বাইরে উভয় পক্ষের স্বেচ্ছা সম্মতিতে সংঘটিত হয়।
অন্যদিকে ধর্ষণ (ইগতিসাব) হলো জবরদস্তি, বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত যৌন অপরাধ।
অর্থাৎ ধর্ষণের মধ্যে অবৈধ যৌন সংসর্গের পাশাপাশি সহিংসতা, আক্রমণ এবং ভুক্তভোগীর অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এ কারণেই জমহুর ফকিহরা (সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনবিদ) ধর্ষণকে সাধারণ জিনার তুলনায় ভিন্ন এবং অধিকতর গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফিকহি পরিভাষায় একে ‘ইগতিসাব’ (জবরদখল) বা ‘জিনা বিল জবর’ বলা হয়।
ইমাম মালিক (রহ.) ধর্ষণকে ‘হিরাবাহ’ (সন্ত্রাসবাদ বা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা) হিসেবে গণ্য করেছেন, যার শাস্তি সাধারণ জেনার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর (আল-মুন্তাকা: ৫/২৬৮)
মূলত ধর্ষণ একটি বহু মাত্রিক অপরাধ। যার মধ্যে কমপক্ষে তিনটি অপরাধ সংঘটিত হয়। তাহলো : ক. ব্যভিচার, খ. বল প্রয়োগ ও ভীতি প্রদর্শন, গ. সম্ভ্রম লুণ্ঠন।
ইসলামী আইনে এই তিনটি বিষয়ই পৃথকভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর ধর্ষণে যেহেতু এই তিনটি অপরাধের সমন্বয় ঘটে, তাই ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ।
ইসলামী আইনে ধর্ষকের শাস্তি কী হবে তা নির্ভর করে তার অপরাধের মাত্রা ও স্তরের ওপর। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো—
১. ব্যভিচারের শাস্তি : বেশির ভাগ আলেম বলেন, ধর্ষক যদি প্রাণঘাতী অস্ত্রের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন না করে শুধু বল প্রয়োগ করে, তবে সে ব্যভিচারের শাস্তি ভোগ করবে। ইসলামী আইনে ব্যচিভারের শাস্তি হলো—ক. ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তি অবিবাহিত হলে এক শ কশাঘাত।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে এক শ কশাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও; মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২)
খ. ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তি বিবাহিত হলে তার শাস্তি প্রস্তারাঘাতে মৃত্যু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন বিবাহিত নারী ও পুরুষ ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মৃত্যু (নিশ্চিত হওয়া) পর্যন্ত পাথর নিক্ষেপ করো।’
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫৫৩)
২. মুহারিবের শাস্তি : ধর্ষক যদি অস্ত্রধারণ করে অথবা অন্য কোনো উপায়ে ধর্ষিতাকে জীবনের হুমকি দেয়, তবে তার ওপর মুহারিবের শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। মুহারিব হলো, যে ব্যক্তি ত্রাস সৃষ্টি করে কোনো কিছু কেড়ে নেয়। চাই ত্রাস সৃষ্টিকারী অস্ত্র ব্যবহার করুক বা না করুক। মুহারিবের শাস্তি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হচ্ছে—তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে বা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে কিংবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা, আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩৩)
৩. উঁচু স্থান থেকে ফেলে হত্যা : ধর্ষক যদি বলাৎকার করে, তখনো তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এই শাস্তি কিভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে তা নিয়ে ফিকহের ইমামদের মতভিন্নতা আছে। তাহলো : ক. তাকে প্রস্তারাঘাতে হত্যা করা হবে, খ. তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে, গ. তাকে উঁচু স্থান থেকে ফেলে দেওয়া হবে এবং ওপর থেকে তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করা হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ একদল সাহাবি শেষোক্ত পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
(আস সিয়াসাতুশ শরইয়্যা, পৃষ্ঠা-১৩৮)
৪. মৃত্যুদণ্ড : ধর্ষক যদি কোনো শিশুকে ধর্ষণ করে এবং এতে তার মৃত্যু হয়, তবে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একইভাবে কোনো নারীকে ধর্ষণের আগে বা পরে যদি তাকে হত্যা করা হয়, তবে হত্যাকারী ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। বেশির ভাগ ফকিহের মতে, এমন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড তরবারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ তোমাদের সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করলে তোমরাও তার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৪;
তাফসিরে কুরতুবি : ২/৩৫৮)
ফিকহের আলোচনায় দেখা যায়, ধর্ষণের মামলায় বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ বিবেচনা করা হয়েছে। যেমন-
অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি
ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য
শারীরিক আঘাতের চিহ্ন
ধস্তাধস্তি বা প্রতিরোধের আলামত
ঘটনাস্থলের পরিস্থিতিগত প্রমাণ
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষ্য
মালিকি ফিকহে বিশেষভাবে পরিস্থিতিগত আলামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আলোচনা পাওয়া যায়। প্রখ্যাত আলেম ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর আত-তুরুক আল-হুকমিয়্যাহ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তিশালী আলামত ও পরিস্থিতিগত প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সুতরাং ধর্ষণের বিচারে চারজন সাক্ষী যে বাধ্যতামূলক ছিল না, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বিচারিক নজির। এক নারী রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে অভিযোগ করেন যে একজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে। তদন্তের পর প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হলে রাসুল (স.) নারীর ওপর কোনো শাস্তি আরোপ করেননি; কিন্তু অপরাধীর বিরুদ্ধে শাস্তি কার্যকর করেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৭৯; জামে তিরমিজি: ১৪৫৪)
এই ঘটনায় চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর উল্লেখ নেই। তবুও অপরাধীর বিচার হয়েছে এবং ভুক্তভোগীকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে।
এটি দেখায় যে ধর্ষণের বিচারকে কেবল জিনার হদ্দ-সংক্রান্ত সাক্ষ্যবিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়নি।
ফলে ‘চারজন সাক্ষী না থাকলে ধর্ষণের বিচারই হবে না’—এ দাবি ইসলামি আইনশাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।
দালিলিক পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয় যে-
ধর্ষণের বিচারে চারজন সাক্ষী বাধ্যতামূলক নয়।
চার সাক্ষীর বিধান মূলত জিনা ও মিথ্যা অপবাদ (কযফ) সংক্রান্ত।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বিচারিক নজিরে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হয়নি; অপরাধীকেই দণ্ডিত করা হয়েছে।
ইসলামি ফিকহে ধর্ষণের প্রমাণ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের আলামত, সাক্ষ্য ও পরিস্থিতিগত প্রমাণ গ্রহণের আলোচনা রয়েছে।
আধুনিক ফরেনসিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণও অনেক সমসাময়িক আলেম গ্রহণযোগ্য মনে করেন।
অতএব আধুনিক যুগে ধর্ষণের তদন্তে ডিএনএ বিশ্লেষণ, মেডিকেল রিপোর্ট, ফরেনসিক পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল তথ্য এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ফুকাহায়ে কেরাম এসব প্রমাণকে ‘কারাইন’ (শক্তিশালী আলামত)-এর আধুনিক রূপ হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে আধুনিক বিচারব্যবস্থায় ফরেনসিক প্রমাণ ব্যবহার করা ইসলামি আইনের ন্যায়বিচারভিত্তিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
শফিকুল ইসলাম হাটহাজারী
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১