কবরের প্রশ্নোত্তর এবং কিয়ামতের হিসাব সহজের জন্য কুরআন-হাদিসে বর্ণিত কিছু আমল
প্রশ্নঃ ১৫৯৩৮৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মুফতি সাহেব, অনেক দিন ধরে একটি বিষয় আমাকে ভাবাচ্ছে। জানতে চাই, কোন কোন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে এবং কোন কোন আমল করলে ইনশাআল্লাহ কবরের প্রশ্নোত্তর সহজ হবে এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সামনে হিসাব-নিকাশ সহজ হবে? অনুগ্রহ করে জানালে উপকৃত হব। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
২৯ জুন, ২০২৬
ওয়েস্ট বেঙ্গল ৭০০১২১
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
কবরের প্রশ্নোত্তর এবং কিয়ামতের কঠিন ময়দানে হিসাব-নিকাশ সহজ হওয়া প্রতিটি মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা।
কবরের প্রশ্নোত্তর এবং কিয়ামতের কঠিন ময়দানে হিসাব-নিকাশ সহজ হওয়া মূলত আল্লাহ তাআলার রহমতের ওপর নির্ভরশীল। তবে কুরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কিছু আমল ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশনা এসেছে, যা আল্লাহ তাআলার রহমত লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। নিচে সেগুলোর কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :
১) সূরা আল-মুলক নিয়মিত তিলাওয়াত করা:
হাদীসে এসেছে,
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ عَبَّاسٍ الْجُشَمِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: «إِنَّ سُورَةً مِنَ الْقُرْآنِ ثَلَاثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتَّى غُفِرَ لَهُ، وَهِيَ سُورَةُ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ.»
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, "ত্রিশ আয়াত বিশিষ্ট কুরআনের একটি সূরা (পাঠ করার কারণে) একজন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করবে, ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সেই সূরাটি হলো, ‘তাবারাকাল্লাযী বিইয়াদিহিল মুলক’।"
[জামে' তিরমিযী, হাদীস নং: ২৮৯১]
হাদীসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/32536
২) বিশুদ্ধ ঈমানের ওপর অবিচল থাকা এবং শিরক, কুফর ও নিফাক থেকে দূরে থাকা:
হাদীসে এসেছে—
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارِ بْنِ عُثْمَانَ الْعَبْدِيُّ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ مَرْثَدٍ، عَنْ سَعْدِ بْنِ عُبَيْدَةَ، عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " ( يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ) قَالَ " نَزَلَتْ فِي عَذَابِ الْقَبْرِ فَيُقَالُ لَهُ مَنْ رَبُّكَ فَيَقُولُ رَبِّيَ اللَّهُ وَنَبِيِّيَ مُحَمَّدٌ صلى الله عليه وسلم . فَذَلِكَ قَوْلُهُ عَزَّ وَجَلَّ ( يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ) " .
অর্থ: হযরত বারা’ ইবনে আযিব (রাযি.) থেকে বর্ণিত। নবী (ﷺ) আল্লাহর বাণী: يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ "যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত (অবিচল) রাখবেন"—এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, "এটি কবরের আযাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কবরে তাকে প্রশ্ন করা হয়, তোমার রব কে? সে বলে, আমার রব আল্লাহ এবং আমার নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)। এটাই আল্লাহর এই বাণীর বাস্তবায়ন—'যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে আল্লাহ ইহজগতে ও পরজগতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন'।"
[সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৮৭১]
হাদীসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/14004
তাই বিশুদ্ধ ঈমানের ওপর অটল থাকার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি বেশি দুআ করা উচিত।
৩) পাঁচ ওয়াক্ত নামায যথা সময়ে পড়া:
হাদীসে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلاَتُهُ فَإِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ أَفْلَحَ وَأَنْجَحَ وَإِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ فَإِنِ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيضَتِهِ شَيْءٌ قَالَ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ انْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّعٍ فَيُكَمَّلَ بِهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الْفَرِيضَةِ ثُمَّ يَكُونُ سَائِرُ عَمَلِهِ عَلَى ذَلِكَ " .
অর্থ: আমি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, "কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে নামাযের। যদি তা সঠিক বলে গণ্য হয়, তবে সে হবে কল্যাণপ্রাপ্ত ও সফলকাম। আর যদি তা সঠিক বলে গণ্য না হয়, তবে সে হবে অসফল ও ক্ষতিগ্রস্ত। ফরযের মধ্যে যদি কোনো ত্রুটি দেখা যায়, তবে মহান প্রভু বলবেন—'লক্ষ্য করো, আমার বান্দার কোনো নফল আমল আছে কি?' তা দিয়ে তার ফরযের যতটুকু ত্রুটি আছে তা পূরণ করে দাও। পরে এতদনুসারেই হবে অন্যান্য সব আমলের অবস্থা।"
[সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৪১৩]
পরিপূর্ণ হাদীসটি এই লিংক থেকে দেখতে পারেন: https://muslimbangla.com/hadith/30045
৪) প্রস্রাবের ছিটা থেকে বেঁচে থাকা এবং চোগলখোরী পরিহার করা:
হাদীসে এসেছে, রাসূল (ﷺ) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, "এরা দুজন শাস্তি পাচ্ছে। একজন প্রস্রাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করত না, আর অন্যজন চোগলখোরী করত।" [সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২১৮]
পরিপূর্ণ হাদীসটি এই লিংক থেকে দেখতে পারেন: https://muslimbangla.com/hadith/218
৫) বান্দার হক নষ্ট না করা এবং কারও ওপর জুলুম-অত্যাচার না করা:
কারও ওপর জুলুম বা খারাপ ব্যবহার করে ফেললে দুনিয়াতেই তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া আবশ্যক। হাদীসে এসেছে,
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "তোমরা কি বলতে পারো, দরিদ্র (দেউলিয়া) কে?" তারা বললেন, "আমাদের মধ্যে যার দিরহাম (টাকা-কড়ি) ও আসবাবপত্র (ধন-সম্পদ) নেই, সেই তো দরিদ্র।" তখন তিনি বললেন, "আমার উম্মতের মধ্যে সেই প্রকৃত অভাবগ্রস্ত, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এই অবস্থায় আসবে যে, একে গালি দিয়েছে, একে অপবাদ দিয়েছে, এর সম্পদ ভোগ করেছে, একে হত্যা করেছে ও একে মেরেছে। এরপর একে তার নেক আমল থেকে দেওয়া হবে, ওকে নেক আমল থেকে দেওয়া হবে। এরপর তার কাছে (পাওনাদারের) প্রাপ্য তার নেক আমল থেকে পূরণ করা না গেলে, ঋণের বিনিময়ে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।"
[সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫৮১]
হাদীসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/13392
এ সংক্রান্ত অপর আরেকটি হাদীসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/2287
৬) নিয়মিত বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
فَقُلۡتُ اسۡتَغۡفِرُوۡا رَبَّکُمۡ ؕ اِنَّہٗ کَانَ غَفَّارًا
অর্থ: "আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল।" [সূরা নূহ, আয়াত: ১০]
আর হাদীসে আছে, রাসূল (ﷺ) নিজেও দিনে সত্তর বারের অধিক ইস্তিগফার করতেন।
এ সংক্রান্ত হাদীসটির লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/5868
৭) পরকালের হিসাব সহজ হওয়ার জন্য দুআ করা:
রাসূল (ﷺ) এই দুআটি করতেন:
اللَّهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَابًا يَسِيرًا
(হে আল্লাহ! আমার হিসাব সহজ করে নিন।)
হাদীসটি হলো,
«عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ فِي بَعْضِ صَلَاتِهِ: " اللهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَابًا يَسِيرًا ". فَلَمَّا انْصَرَفَ، قُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللهِ، مَا الْحِسَابُ الْيَسِيرُ؟ قَالَ: " أَنْ يَنْظُرَ فِي كِتَابِهِ، فَيَتَجَاوَزَ عَنْهُ، إِنَّهُ مَنْ نُوقِشَ الْحِسَابَ يَوْمَئِذٍ يَا عَائِشَةُ، هَلَكَ، وَكُلُ— مَا يُصِيبُ الْمُؤْمِنَ يُكَفِّرُ اللهُ عز وجل بِهِ عَنْهُ حَتَّى الشَّوْكَةُ تَشُوكُهُ»
অর্থ: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি নামাযে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দুআ করতে শুনেছি—'اللَّهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَابًا يَسِيرًا' (হে আল্লাহ! আমার কাছ থেকে সহজ হিসাব নিও)। আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! সহজ হিসাব কী? তিনি (ﷺ) বললেন, 'আল্লাহ তাঁর বান্দার আমলনামার প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন মাত্র, অতঃপর তাকে ক্ষমা করে দেবেন। হে আয়েশা! জেনে রাখো, সেদিন যার হিসাব যাচাই-বাছাই করা হবে, সে নিঃসন্দেহে ধ্বংস হবে। আর মুমিন ব্যক্তির যে কষ্টই হোক না কেন, আল্লাহ তাআলা তার বিনিময়ে তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন, এমনকি তার গায়ে একটি কাঁটা ফুটলেও'।" [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৪২১৫]
সারকথা:
আল্লাহ তাআলার ফরজ বিধানগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। কোনো সময় গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে তাওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে।
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"...আমার বান্দা আমার নির্ধারিত ফরজ কাজগুলোর চেয়ে অন্য কোনো প্রিয় মাধ্যম দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না..."
[সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৫০২]
পূর্ণ হাদীসটির লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/6058
অপর হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:
"...আমি যখন তোমাদের কোনো বিষয়ে আদেশ করি, তখন তোমরা তা সাধ্যানুযায়ী পালন করো। আর যা থেকে নিষেধ করি, তা বর্জন করো।" [সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৭২৮৮]
হাদীসটির লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/6790
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী আবু সাঈদ
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১