সাইবার ক্যাফের ব্যবসা কি না জায়েজ?
প্রশ্নঃ ১৬০৪১৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, সাইবার ক্যাফের ব্যাবসা জায়েজ? কম্পিউটার ভাড়া দেওয়া। এখন ব্যাক্তি গেম খেললে আমি গুনাহগার হবো?
৮ জুলাই, ২০২৬
নাগরপুর
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
এক.
শরীয়তের মূলনীতি অনুসারে যেসকল বস্তু সত্ত্বাগতভাবে দ্বারা হারাম নয় (বরং সেগুলো ব্যবহার করে ভাল-মন্দ উভয় কাজই করা যায়) সেগুলোর ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ। যেমন মোবাইলফোন এবং কম্পিউটার সত্তাগতভাবে এগুলো বৈধ বস্তু। তাই এগুলোর ক্রয় বিক্রয়, সেবা দান গ্রহন সবই জায়েজ। এগুলো ক্রয় করে কিংবা গ্রহন করে যদি কেউ গুনাহের কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তার দায়ভার ব্যবহারকারীকেই নিতে হবে। বিক্রেতা কিংবা দাতা এর থেকে মুক্ত থাকবে।
সেই হিসেবে সাইবার ক্যাফের ব্যবসাও জায়েজ। কেননা সেখানে থাকা কম্পিউটার ব্যবহার করেও হালাল-হারাম সকল কাজই করা সম্ভব। তাই সত্তাগতভাবে এই ব্যবসা জায়েজ। কোনো গ্রাহক যদি সাইবার ক্যাফেতে গুনাহের কাজ করে, তাহলে এর জন্য ব্যবহারকরী নিজেই গুনাহগার হবে।
أن كل ما فيه منفعة تحل شرعاً، فإن بيعه يجوز، لأن الأعيان خلقت لمنفعة الإنسان بدليل قوله تعالى: {خلق لكم ما في الأرض جميعاً} [البقرة:29/ 2] (الفقه الإسلامي وأدلته، معالم النظام الاقتصادي في الاسلام، القسم الثالث العقود، المبحث الرابع-البيع الباطل والبيع الفاسد، المطلب الأول-أنواع البيع الباطل، بيع النجس والمتنجس-4/217)
وَمَا كَانَ الْغَالِبُ عَلَيْهِ الْحَرَامُ وَلَمْ يَجُزْ بَيْعُهُ وَلَا هِبَتُهُ (الفتاوى الهندية، كتاب البيوع، الْبَابُ التَّاسِعُ فِيمَا يَجُوزُ بَيْعُهُ وَمَا لَا يَجُوزُ وَفِيهِ عَشَرَةُ فُصُولٍ، الْفَصْلُ الْخَامِسُ فِي بَيْعِ الْمُحْرِمِ الصَّيْدَ وَفِي بَيْعِ الْمُحَرَّمَاتِ،-3/116)
তবে যদি কারো ব্যাপারে নিশ্চিত জানা যায় যে, লোকটি আপনার কম্পিউটার ব্যবহার করে শুধু গুনাহের কাজই করবে, তাহলে তার কাছে কম্পিউটার ভাড়া দেওয়া জায়েজ হবে না।
কাজেই আপনার ব্যবসা হালাল রাখতে নিচের পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।
এক. হালাল কাজে সহায়তা:
গ্রাহকরা যেন শিক্ষা, চাকরি খোঁজা, ফ্রিল্যান্সিং, টাইপিং বা অন্যান্য কোনো বৈধ কাজে কম্পিউটার ব্যবহার করেন তা নিশ্চিত করতে হবে।
দুই. পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীলতা রোধ:
আপনার কম্পিউটার ব্যবহার করে কেউ যেন অশ্লীল ওয়েবসাইট বা কনটেন্ট দেখার সুযোগ না পায় সেই ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। কেননা, ইসলামী আইন অনুযায়ী হারাম বা অনৈতিক কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া পাপের অংশীদার হওয়ার শামিল।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা:
কম্পিউটারগুলো যেন খোলামেলা স্থানে থাকে, যাতে কেউ গোপনে অনৈতিক কাজ করতে না পারে সেই ব্যাপারেও সতর্ক-সচেতন থাকতে হবে। ওপরিউক্ত কাজগুলো করলে আশা করা যায় আপনার ব্যবসা হারাম হবে না।
তাকওয়ার দাবি কী?
প্রিয় ভাই!
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ [٥:٢
সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা। {সূরা মায়িদা-২}
কাজেই তাকওয়া ও পরহেযগারী অবলম্বনকারী ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হলো গুনাহের সম্ভবনা কিংবা ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে এমন সকল জায়গা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। কেননা কোনো মানুষের মনে কি আছে সেটা তো আর আপনি জানেন না। কাজেই আপনাকে ব্যবহার করে যেন কেউ গুনাহে লিপ্ত হতে না পারে সেব্যাপারে আপনাকেই সতর্ক থাকতে হবে।
তাই তাকওয়ার দাবী হলো, এজাতীয় ব্যবসা না করা। বরং যেখানে গুনাহের সম্ভবনা না , সরাসরি হালাল বস্তু/সেবার আদান প্রদান হয় এমন ব্যবসা অবলম্বন করা।
নিচের হাদিসটি দেখুন:
عَنِ الْحَسَنِ، عَنِ الشَّعْبِيِّ، قَالَ: سَمِعْتُ النُّعْمَانَ، يَقُولُ عَلَى الْمِنْبَرِ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: «الْحَلَالُ بَيِّنٌ وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ، وَبَيْنَ ذَلِكَ أُمُورٌ مُشَبَّهَاتٌ، لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ، فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ»
হযরত শা'বী (রাহঃ) বলেন, আমি নুমানকে মিম্বরের উপর এটা বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, হালাল ও স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। এ দু'টোর মধ্যে অনেক সন্দেহজনক বস্তু রয়েছে, যেগুলো সম্বন্ধে অনেক লোক জানে না। সুতরাং যারা সন্দেহজনক বস্তু থেকে বেঁচে থাকে, তারা তাদের দীন ও মর্যাদা রক্ষা করল। মুসনাদে ইমাম আযম আবু হানীফা রহ. হাদীস নং- ৩২৫
হাদিসটির ব্যাখ্যা জানে নিচের লিংকে প্রবেশ করুন।
https://muslimbangla.com/hadith/53113?id=explanation
দুই.
ইসলামী শরিয়তে খেলাধুলার অবকাশ আছে। তবে তা তিনটি শর্তসাপেক্ষে।
(১) শারীরিক উপকার সাধন।
(২) ইসলামি শরিয়াতের কোনো বিধান লঙ্ঘন না হওয়া
(৩) আর্থিক ক্ষতিসাধন না হওয়া। এ তিনটি শর্ত যে খেলার মাঝে পাওয়া যাবে তা জায়েজ। আর যেখানে পাওয়া যাবে না সে সেই খেলা জায়েজ নয়।
কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই বর্তমান সময়ে প্রচলিত প্রায় সকল খেলাই এই তিন শর্তের সীমা অতিক্রম করে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অপতদৃষ্টিতে এসব খেলায় শারীরিক উপকার এবং চিত্তবিনোদন উদ্দেশ্য বলা হলেও বাস্তবে এগুলো এখন পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর পেছনে যে পরিমাণ সময়, মেধা, ও অর্থ বিনিয়োগ করা হয় তা বলা বাহুল্য।
হাশরের ময়দানে বান্দার প্রতিটি মূহুর্তের হিসাব দিতে হবে। সুরাতু আসরসহ কুরআনুল কারিমের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সময়ের প্রতি যত্নবান হতে নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই অনুসঙ্গিক ক্ষতিসমূহের সাথে সাথে এইসব খেলায় প্রচুর পরিমাণে সময় নষ্ট হয় যা কোনোভাবেই শরিয়তসম্মত নয়। এইসকল বিষয়ের প্রতি লক্ষ করে আমরা বলতে পারি ক্রিকেট, ফুটবল, মোবাইল-কম্পিটার গেমসহ প্রচলিত এসব খেলায় অংশগ্রহন করা কিংবা দর্শক হওয়া জায়েজ নাই। তবে যদি নিছক শরীর চর্চার উদ্দেশ্যে কোনো খেলা খেলে এবং সেখানে জয়-পরাজয়ের কোনো লক্ষ্য থাকে না তাহলে এজতীয় খেলার অবকাশ আছে।
বিভিন্ন সাইবার ক্যাফেতে গেইমিং পিসি/বড়বড় ডিভাইস রাখা হয়। এগুলো জায়েজ নাই।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১