ইসলামে মূল ঈদ কয়টি ও কী কী
প্রশ্নঃ ১৬৬৬০৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ইসলামি শরীয়তে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা ছাড়াও কি আরো ঈদ আছে? যদি এ দুইয়ের বাহিরে থেকে থাকে, তাহলে ছহীহ হাদিসের মাধ্যমে দলিল চাই। যেমন অনেকে ঈদে মিলাদুন নবী পালন করে, অনেকে আবার শুক্রবার কেও মুসলিম জাতির ঈদ বলে ইত্যাদি ইত্যাদি।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, বাৎসরিক আনন্দ-উৎসব ও বিশেষ নামাজের বিধানসংবলিত মূল ঈদ মাত্র দুটি: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।
তবে হাদিস শরিফে সম্মান, মর্যাদা ও উৎসবমুখরতার রূপক অর্থে জুমার দিন (শুক্রবার) এবং আরাফা ও তাশরীকের দিনগুলোকেও মুসলিম জাতির ‘ঈদ’ বলা হয়েছে। কিন্তু তথাকথিত ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ নামে কোনো ঈদ কুরআন বা সহিহ হাদিসে নেই।
সহিহ হাদিসের দলিলসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো,
১. ইসলামে বাৎসরিক মূল উৎসবের ঈদ মাত্র দুটি:
ইসলামে বাৎসরিক উৎসবের নির্ধারিত ঈদ কেবল দুটি। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) জাহেলি যুগের উৎসবসমূহ বাতিল করে এই দুটি দিন নির্ধারণ করে দেন।
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মদিনায় আসলেন, তখন দেখলেন মদিনাবাসীদের দুটি নির্দিষ্ট দিন রয়েছে যাতে তারা মেতে উঠত ও আনন্দ-উৎসব করত। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
«قَدْ أَبْدَلَكُمُ اللَّهُ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الأَضْحَى، وَيَوْمَ الْفِطْرِ»
আল্লাহ তাআলা তোমাদের সেই দিন দুটির পরিবর্তে তার চেয়েও উত্তম দুটি দিন দান করেছেন: ঈদুল আজহার দিন এবং ঈদুল ফিতরের দিন। (সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪; সুনানে নাসায়ী: ১৫৫৬)
২. সহিহ হাদিসের আলোকে অন্যান্য যেসব দিনকে ঈদ বলা হয়েছে:
সহিহ হাদিসে ঈদ (উৎসব/মিলনমেলা) শব্দ দিয়ে আরও দুটি বিষয়কে বোঝানো হয়েছে:
ক. জুমার দিন (সাপ্তাহিক ঈদ):
শুক্রবার বা জুমার দিনকে হাদিস শরিফে মুসলমানদের জন্য ‘সাপ্তাহিক ঈদের দিন’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন,
«إِنَّ هَذَا يَوْمُ عِيدٍ، جَعَلَهُ اللَّهُ لِلْمُسْلِمِينَ، فَمَنْ جَاءَ إِلَى الْجُمُعَةِ فَلْيَغْتَسِلْ، وَإِنْ كَانَ طِيبٌ فَلْيَمَسَّ مِنْهُ، وَعَلَيْكُمْ بِالسِّوَاكِ»
নিশ্চয়ই এই দিনটি (জুমা) একটি ঈদের দিন, যা আল্লাহ মুসলমানদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি জুমু’আয় আসবে সে যেন গোসল করে, সুগন্ধি থাকলে তা ব্যবহার করে এবং মেসওয়াক করাকে আবশ্যক করে নেয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১০৯৮)
এক ইহুদি খলিফা হযরত উমর (রা.)-কে বলেছিল, আপনাদের কুরআনে এমন একটি আয়াত আছে (সূরা মায়েদা: ৩, আজ আমি তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম), যা আমাদের কিতাবে নাজিল হলে আমরা সেই দিনটিকে ‘ঈদ’ বানিয়ে নিতাম। তখন উমর (রা.) বলেন, আমরা নিশ্চিত জানি এটি কোন দিনে ও কোন স্থানে নাজিল হয়েছিল; এটি জুমার দিনে আরাফার ময়দানে নাজিল হয়েছিল (আর এ দুটি দিনই আমাদের জন্য ঈদ)। (সহিহ বুখারি: ৪৫)
খ. আরাফা ও আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলো:
হজের দিনগুলো অর্থাৎ ৯ই জিলহজ (আরাফাহ) এবং ১১, ১২ ও ১৩ই জিলহজ (আইয়ামে তাশরীক)—এই দিনগুলোকেও হাদিসে ঈদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কারণ এ দিনগুলোতে রোজা রাখা নিষিদ্ধ এবং আল্লাহর জিকির ও পানাহারের নির্দেশ রয়েছে।
হযরত উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন,
«يَوْمُ عَرَفَةَ، وَيَوْمُ النَّحْرِ، وَأَيَّامُ التَّشْرِيقِ عِيدُنَا أَهْلَ الإِسْلاَمِ، وَهِيَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ»
আরাফার দিন, নহরের (কোরবানির) দিন এবং তাশরীকের দিনগুলো আমাদের মুসলিম জাতির ঈদের দিন; আর এগুলো হলো পানাহার ও আনন্দের দিন। (জামে তিরমিযী: ৭৭৩; সুনানে আবু দাউদ: ২৪১৯)
৩. ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সম্পর্কে শরিয়তের অবস্থান:
কুরআন, সহিহ হাদিস কিংবা সাহাবায়ে কেরামের যুগে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ নামে কোনো ঈদের অস্তিত্ব ছিল না।
১. নবীজির যুগে কোনো অস্তিত্ব ছিল না: রাসূলুল্লাহ (ﷺ), খোলাফায়ে রাশেদীন কিংবা চার ইমামের কেউই কখনো ১২ই রবিউল আউয়ালকে ‘ঈদ’ হিসেবে ঘোষণা করেননি বা এমন কোনো উৎসব পালন করেননি।
২. ঐতিহাসিক বাস্তবতা: হিজরি চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীর পর ফাতেমীয় শিয়াদের শাসনামলে সর্বপ্রথম এই প্রথাটির সূচনা হয়। পরবর্তীতে সুন্নি অঞ্চলের কোনো কোনো শাসক এতে যুক্ত হন।
৩. নবীজির জন্মদিন পালনের সুন্নাহ: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্ম নিয়ে আলোচনা করা এবং তাঁর প্রতি দরুদ ও মুহাব্বত রাখা সার্বক্ষণিক ঈমানি দায়িত্ব। তবে তাঁর জন্মবার পালনের সুন্নাহসম্মত নিয়ম হলো, রোজা রাখা।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সোমবার রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,
«ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ»
এই দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
অতএব, একে ‘ঈদ’ বানিয়ে জশনে জুলুস বা বার্ষিক উৎসব করা ইসলামি শরিয়তে একটি মনগড়া সংযোজন (বিদআত)।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন