নামাযে ও নামাযের বাইরে সিজদা করে দুআ করার শরয়ী বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৭৬০০. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমারা অনেক সময় নামাজের পর আলাদা একটি সিজদা দিয়ে দুয়া করি,আমি সেক্ষেত্রে নিজের ভাষায় দুয়া করি,এটি কি জায়েয? নাকি বিদায়াত? নফল নামাজের ক্ষেত্রে মনে মনে দুয়া করি,নিজের ভাষায়,এ সম্মন্ধে সমাধান দিলে উপকৃত হতাম
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সিজদা দোয়ার একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ
অর্থ: বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে সিজদার অবস্থায়। সুতরাং তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।
—সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৪৮২
(হাদীসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/8017)
আরেক হাদীসে এসেছে—
وَأَمَّا السُّجُودُ فَاجْتَهِدُوا فِي الدُّعَاءِ، فَقَمِنٌ أَنْ يُسْتَجَابَ لَكُمْ
অর্থ: “সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করার চেষ্টা করো। আশা করা যায়, তোমাদের দোয়া কবুল করা হবে।”
—সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৪৭৯
(হাদীসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/8008)
তবে নামাজের ভেতরের সিজদা এবং নামাজের বাইরের আলাদা সিজদার বিধান ভিন্ন ভিন্ন। নিচে প্রত্যেকটির হুকুম বর্ণনা করা হলো:
নফল নামাজের সিজদায় দোয়া করা:
নফল নামাজ চাই তা তাহাজ্জুদ হোক বা অন্য যেকোনো নফল নামাজ হোক, সিজদায় দোয়া করা জায়েজ। বরং সিজদা দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্থান হওয়ায় সেখানে দোয়া করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিজদায় বিভিন্ন দোয়া করেছেন। যেমন তিনি সিজদায় পড়তেন—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي كُلَّهُ، دِقَّهُ وَجِلَّهُ، وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ، وَعَلَانِيَتَهُ وَسِرَّهُ
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার সকল গুনাহ মাফ করে দিন। স্বল্প এবং অধিক, প্রথম এবং শেষ, প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য।
—সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৪৮৩
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/8018)
তবে নামাজের ভেতরে মুখে উচ্চারণ করে দোয়া অবশ্যই আরবি ভাষায় হতে হবে। বাংলা বা অন্য কোনো ভাষায় মুখে উচ্চারণ করে দোয়া করা জায়েজ নয়; এতে নামাজ ভেঙে যাবে।
নফল নামাজে কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত দোয়া, সেগুলোর অনুরূপ অর্থবোধক দোয়া এবং এমন বিষয় চাওয়া যা সাধারণত মানুষের কাছে চাওয়া সম্ভব নয়, এমন দোয়া করা যায়। তবে মানুষের সাধারণ কথাবার্তার মতো দোয়া করা যাবে না। যেমন: হে আল্লাহ! আমাকে কাপড় দাও, খাবার দাও, অমুককে বিয়ে করিয়ে দাও। নামাজের মধ্যে এ ধরনের দোয়া করলে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে।
হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةَ لَا يَصْلُحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ، إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ
অর্থ: নিশ্চয় এ নামাজ; এতে মানুষের মুখে প্রচলিত কথা বলা উচিত নয়। নিশ্চয় এটি তাসবিহ, তাকবির এবং কুরআন তিলাওয়াতের স্থান।
—সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৫৩৭
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/8132)
সিজদায় মুখে উচ্চারণ না করে মনে মনে দোয়া করা:
নামাজ ভঙ্গকারী কথা তখনই ধর্তব্য হয়, যখন মুখে অন্তত দুটি হরফ উচ্চারিত হয় বা একটি হরফ হলেও তা অর্থবোধক হয়। অর্থাৎ জিহ্বা নড়া ও শব্দ তৈরি হওয়া শর্ত।
তাই কেউ সিজদায় গিয়ে শুধু অন্তরে নিজের প্রয়োজনের কথা ভাবলে, মুখে উচ্চারণ না করলে নামাজ নষ্ট হবে না।
ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব আদ-দুররুল মুখতারে এসেছে,
(يُفْسِدُهَا التَّكَلُّمُ) هُوَ النُّطْقُ بِحَرْفَيْنِ أَوْ حَرْفٌ مُفْهِمٌ
অর্থ: কথা বলা নামাজকে নষ্ট করে দেয়। তা হলো, কমপক্ষে দুটি হরফ উচ্চারণ করা বা একটি অর্থবোধক হরফ উচ্চারণ করা।
—আদ-দুররুল মুখতার, ১/৬১৫
এমনকি সিজদায় তাসবিহ পড়ার সময়ও মুখে উচ্চারণ না করে, শুধু অন্তরে, অর্থাৎ জিহ্বা না নেড়ে ও শব্দ তৈরি না করে, নিজের ভাষায় দোয়া করার অবকাশ আছে। তবে এ সময় একেবারে চুপ থাকা যাবে না; বরং মুখে তাসবিহ চালু রাখতে হবে। উত্তম হলো, সিজদায় মুখে মাসনূন তাসবিহ ও দোয়া পড়া; আর নিজের ভাষায় দীর্ঘ মোনাজাত নামাজের বাইরের জন্য রাখা।
ফরজ নামাজের সিজদায় দোয়া করা:
ফরজ নামাজের সিজদায় দীর্ঘ দোয়া না করে মাসনূন তাসবিহ ও দোয়াগুলো পড়াই উত্তম ও নিরাপদ। ফরজ নামাজের সিজদায় শুধু মাসনূন তাসবিহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত দোয়া না পড়াই উচিত।
নামাজের বাইরে আলাদা সিজদা করে দোয়া করা:
নামাজের বাইরে আলাদা সিজদা করে দোয়াকে একেবারে নাজায়েজ বলা ঠিক নয়। বিশেষ প্রয়োজন, বিপদ-মুসিবত বা কঠিন পরিস্থিতিতে সিজদা করে আল্লাহর কাছে দোয়া করার অবকাশ রয়েছে।
বদরের দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নামাজের বাইরে সিজদারত অবস্থায় দোয়া করতে দেখা যাওয়ার বর্ণনা হাদীসে রয়েছে। হযরত আলী (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
فَجِئْتُ فَأَجِدُهُ وَهُوَ سَاجِدٌ يَقُولُ: يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ، لَا يَزِيدُ عَلَيْهَا
অর্থ: আমি এসে তাঁকে সিজদারত অবস্থায় দেখতে পেলাম। তিনি বলছিলেন: ‘হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী সত্তা!’—এর বেশি কিছু বলছিলেন না।
—সুনানে কুবরা নাসাঈ, ৬/১৫৭, হাদীস: ১০৪৪৭; মুস্তাদরাকে হাকেম, ১/৩৪৪, হাদীস: ৮০৯
তবে নামাজের পর নিয়মিত আলাদা সিজদা করা উচিত নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর নিয়ম করে আলাদা সিজদায় গিয়ে দোয়া করাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিয়মিত সুন্নত বা সাহাবায়ে কেরামের আমল হিসেবে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই নামাজের পর নিয়মিত “সিজদায়ে মোনাজাত” বা জামাতবদ্ধভাবে আলাদা সিজদার অভ্যাস করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
নামাজের বাইরে নিজের ভাষায় দোয়া করা:
নামাজের বাইরে দোয়া করার ক্ষেত্রে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে মনের কথা বলা সম্পূর্ণ জায়েজ। তাই কেউ যদি নিজের প্রয়োজন, কষ্ট বা আকাঙ্ক্ষা নিজের ভাষায় বলতে চান, তবে নামাজের বাইরে স্বাভাবিকভাবে হাত তুলে দোয়া করাই সবচেয়ে সহজ, উত্তম ও নিরাপদ পদ্ধতি। সম্ভব হলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে এরপর হাত তুলে নিজের ভাষায় দীর্ঘ দোয়া করা সর্বোত্তম।
সারকথা:
নামাজের পর নিয়মিত বা অধিকাংশ সময় আলাদা সিজদা করে দোয়া করা থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে মাঝেমধ্যে বিশেষ প্রয়োজন, বিপদ-আপদ বা কঠিন পরিস্থিতিতে আলাদা সিজদায় দোয়া করার অবকাশ রয়েছে।
নফল নামাজের সিজদায় আরবি ভাষায় এমন বিষয় চাওয়া যায় যা সাধারণত মানুষের কাছে চাওয়া সম্ভব নয়—যেমন: বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত, জান্নাত লাভ, জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও কেয়ামতের ভয়াবহতা থেকে পানাহ চাওয়াসহ সব ধরনের আখেরাত-সংক্রান্ত দোয়া।
যদি আরবি ভাষা ভালোভাবে জানা না থাকে বা মাসনূন দোয়া মুখস্থ না থাকে, তবে নামাজের বাইরে হাত তুলে আবেগপূর্ণভাবে নিজের ভাষায় মনের সব আকুতি জানানোই সর্বোত্তম পদ্ধতি।
প্রামান্য গ্রন্থাবলী:
وذكر في البحر عن المرغيناني ضابطا فقال الحاصل: أنه إذا دعا في الصلاة بما جاء في القرآن أو في المأثور لا تفسد صلاته وإن لم يكن في القرآن أو المأثور فإن استحال طلبه من العباد لا يفسد وإلا أفسد
حاشية الطحطاوي على مراقي الفلاح، 322
(يُفْسِدُهَا التَّكَلُّمُ) هُوَ النُّطْقُ بِحَرْفَيْنِ أَوْ حَرْفٌ مُفْهِمٌ .... (عَمْدُهُ وَسَهْوُهُ قَبْلَ قُعُودِهِ قَدْرَ التَّشَهُّدِ سِيَّانِ) وَسَوَاءٌ كَانَ نَاسِيًا أَوْ نَائِمًا أَوْ جَاهِلًا أَوْ مُخْطِئًا أَوْ مُكْرَهًا هُوَ الْمُخْتَارُ
الدر الختار مع رد المحتار : 1/615
"و" يفسدها "الدعاء بما يشبه كلامنا" نحو اللهم ألبسني ثوب كذا أو أطعمني كذا أو اقض ديني أو ارزقني فلانة على الصحيح لأنه يمكن تحصيله من العباد
مراقي الفلاح، 120
(قَوْلُهُ وَالدُّعَاءُ بِمَا يُشْبِهُ كَلَامَنَا) هُوَ مَا لَيْسَ فِي الْقُرْآنِ وَلَا فِي السُّنَّةِ وَلَا يَسْتَحِيلُ طَلَبُهُ مِنْ الْعِبَادِ، فَإِنْ وَرَدَ فِيهِمَا أَوْ اسْتَحَالَ طَلَبُهُ لَمْ يَفْسُدْ كَمَا فِي الْبَحْرِ عَنْ التَّجْنِيسِ
الدر الختار مع رد المحتار : 1/619
(قَوْلُهُ وَدَعَا بِمَا يُشْبِهُ أَلْفَاظَ الْقُرْآنِ وَالسُّنَّةِ لَا كَلَامَ النَّاسِ) أَيْ بِالدُّعَاءِ الْمَوْجُودِ فِي الْقُرْآنِ وَلَمْ يُرِدْ حَقِيقَةَ الْمُشَابَهَةِ إذْ الْقُرْآنُ مُعْجِزٌ لَا يُشَابِهُهُ شَيْءٌ وَلَكِنْ أَطْلَقَهَا لِإِرَادَتِهِ نَفْسَ الدُّعَاءِ لَا قِرَاءَةَ الْقُرْآنِ مِثْلَ {رَبَّنَا لا تُؤَاخِذْنَا} [البقرة: 286] {رَبَّنَا لا تُزِغْ قُلُوبَنَا} [آل عمران: 8] {رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ} [نوح: 28] {رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً} [البقرة: 201] إلَى آخِرِ كُلٍّ مِنْ الْآيَاتِ، وَقَوْلُهُ: وَالسُّنَّةُ، يَجُوزُ نَصْبُهُ عَطْفًا عَلَى أَلْفَاظٍ أَيْ دَعَا بِمَا يُشْبِهُ أَلْفَاظَ السُّنَّةِ وَهِيَ الْأَدْعِيَةُ الْمَأْثُورَةُ وَمِنْ أَحْسَنِهَا مَا فِي صَحِيحِ مُسْلِمٍ «اللَّهُمَّ إنِّي أَعُوذُ بِك مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ» وَيَجُوزُ جَرُّهُ عَطْفًا عَلَى الْقُرْآنِ أَوْ مَا أَيْ دَعَا بِمَا يُشْبِهُ أَلْفَاظَ السُّنَّةِ أَوْ دَعَا بِالسُّنَّةِ،
البحر الرائق، 1/349
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন