ভোগ এবং উপভোগের মধ্যে পার্থক্য
প্রশ্নঃ ১৭৩০৪৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ভোগ করা এবং উপভোগ করার মধ্যে পার্থক্য কি? দয়া করে বুঝিয়ে বলবেন, কেননা এটাই শিষ্টাচার, যেন ইসলামিক শিষ্টাচার শিক্ষা নিতে পারি, এবং বস্তুবাদী হওয়া থেকে বাঁচতে পারি।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
আপনার প্রশ্নের সাথে ইংরেজি দুটি শব্দ খুবই প্রাসঙ্গিক। প্রথম শব্দটি হলো, Consumption (ভোগ করা) এবং দ্বিতীয় শব্দটি হলো, Enjoyment (উপভোগ করা)। আরবিতে التَّمَتُّعُ ও التَّلَذُّذُ—শব্দ দুটি দিয়ে ভাবদ্বয় প্রকাশ করা হয়। তবে, আরবিতে التَّمَتُّعُ ও التَّلَذُّذُ—দুটিই ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয় প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়। যেমন বাংলায় ‘ভোগ’ সব সময় নেতিবাচক নয়, আর ‘উপভোগ’ সব সময় ইতিবাচক নয়। প্রেক্ষাপটই অর্থ নির্ধারণ করে।
এবার অপনার মূল প্রশ্নে আসি।
ভোগ করা: কোনো বস্তু নিজের প্রয়োজন, প্রবৃত্তি বা চাহিদা পূরণের জন্য ব্যবহার করাকে সাধারণত ভোগ করা বলা হয়। এখানে অনেক সময় মানুষের মনোযোগ থাকে বস্তুটি পাওয়া, ব্যবহার করা এবং তা থেকে নিজের চাহিদা পূরণ করার দিকে। সেক্ষেত্রে শরঈ বিধিনিষেধের তোয়াক্কা খুব কমই থাকে।
উপভোগ করা: কোনো বস্তুর প্রকৃত সৌন্দর্য, উপকারিতা ও আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে তার মূল্য উপলব্ধি করে তৃপ্তি লাভ করাকে উপভোগ করা বলা যায়। এবং এক্ষেত্রে বস্তুর মাঝে বিদ্যমান উপকার লাভের সাথে সাথে এর শরঈ বিধিবদ্ধতাও সামনে থাকে।
অর্থাৎ, ভোগের ক্ষেত্রে মানুষ অনেক সময় বস্তুর প্রতি কেন্দ্রীভূত হয়; আর উপভোগের ক্ষেত্রে মানুষ বস্তুর পাশাপাশি তার স্রষ্টার নিয়ামত, উদ্দেশ্য ও কৃতজ্ঞতার দিকেও মনোযোগ দেয়।
একটি উদাহরণ দিই।
ধরুন, আপনার সামনে একটি সুস্বাদু খাবার এলো। আপনি শুধু জিহ্বার স্বাদ, আর প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের জন্যই সেটি খেলেন। আপনার সামনে খাবারটাই মূখ্য ছিল। খাবারের সুন্নত, আদব কিছুই আপনি খেয়াল করেননি। খাবারটা হালাল না হারাম সেটা ভাববারও ফুরসত পাননি। গোগ্রাসে খেতে থাকলেন। এমনকি পেট ভরার পরও খেতেই থাকলেন। এটি প্রবৃত্তিনির্ভর ভোগের উদাহরণ।
পক্ষান্তরে অন্য একজন মানুষ। আগেই খাবারের শুদ্ধতা (হালাল-হারাম) যাচাই করে নিয়েছেন। তারপর খাবারের সামনে অত্যন্ত আদবের সাথে বসেছেন। যেমনিভাবে নবীজী সা. বসতেন। তিনি বলতেন- آكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ، وَأَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ. গোলাম যেভাবে খায় আমিও সেভাবে খাব। গোলাম যেভাবে বসে (খাওয়ার সময়) আমিও সেভাবেই বসব। -মুসনাদে আবু ইয়া‘লা, হাদীস ৪৯২০; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ১৪২১০; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৫৫৭২ ২৯.
তারপর তিনি আল্লাহর নিয়ামত উপলব্ধি করে, বিসমিল্লাহ বলে খাবার শুরু করলেন। খাবারের স্বাদ গ্রহণ করলেন।, পরিমিত আহার করে শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলে খাবার শেষ করলেন। এই খাবারকে তিনি আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের মাধ্যম, ইবাদতের সহায়ক হিসেবে গ্রহন করলেন। এটি সুন্দরভাবে উপভোগ করার উদাহরণ।
ফলাফল: দুজনই খাবার খেয়েছে। দুজনেরই পেট পুরেছে। চোখ শীতল হয়েছে। খুদা নিবারণ হয়েছে। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ এক নয়।
যেন এদিকে ইশারা করেই আল্লাহ তাআলা সুরা মুহাম্মাদ -এর ১২ নং আয়াতে ইরশাদ করেন,
اِنَّ اللّٰہَ یُدۡخِلُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا یَتَمَتَّعُوۡنَ وَیَاۡکُلُوۡنَ کَمَا تَاۡکُلُ الۡاَنۡعَامُ وَالنَّارُ مَثۡوًی لَّہُمۡ
অর্থঃ নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে আল্লাহ তাদেরকে দাখিল করবেন এমন উদ্যানে, যার তলদেশে নহর বহমান থাকবে। আর যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তারা (দুনিয়ায়) মজা লুটছে এবং চতুষ্পদ জন্তু যেভাবে খায়, সেভাবে খাচ্ছে। তাদের শেষ ঠিকানা জাহান্নাম।
আয়াতের লিংকঃ https://muslimbangla.com/sura/47/tafsir/12
হাদিস শরীফে নবী সা. ইরশাদ করেন, মু’মিন ব্যক্তি এক পেটে আহার করে আর কাফির সাত পেটে আহার করে। বুখারী, ৫৩৯৬।
https://muslimbangla.com/hadith/5004
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই/বোন!
ওপরের উদাহরণ থেকে আশা করছি আপনি ভোগ এবং উপভোগের একটা সরল সজ্ঞা এবং দৃষ্টান্ত পেয়ে গেছেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে ওপরের দুটি আচরণ কেমন? আসুন একটু পর্যালোচনা করি।
ইসলাম মানুষকে দুনিয়ার নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হতে বলে না; বরং নিয়ামতগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
অনুবাদ: হে আদমসন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক পরিধান করো, পানাহার করো এবং অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। —সুরা আল-আ‘রাফ: ৩১
এ আয়াত থেকে তিনটি শিক্ষা পাওয়া যায়:
০১. সুন্দর পোশাক পরা বৈধ ও স্বাভাবিক বিষয়।
০২. ভালো খাবার খাওয়া এবং পানাহার করা বৈধ।
০৩. কিন্তু নিয়ামত ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না।
অর্থাৎ, ইসলাম দুনিয়ার সৌন্দর্যকে অস্বীকার করে না; বরং সৌন্দর্যের সঙ্গে সংযম ও কৃতজ্ঞতা শেখায়।
বস্তুবাদী হওয়া আর নিয়ামত উপভোগ করার পার্থক্য
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে।
বস্তুবাদী মানুষ: যার চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা ও জীবনের লক্ষ্য প্রধানত বস্তুগত অর্জন, বস্তুগত উন্নতি, অগ্রগতি সম্পদ, বিলাসিতা ও বাহ্যিক মর্যাদাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বস্তুর বাইরে তিনি কিছুই বুঝতে চান না। কিছুকে অনুধাবন করলেও তিনি সেটাকে প্রকৃতির সৃষ্টি বলে চালিয়ে দেন। আল্লাহর সৃষ্টিশক্তিকে পাশ কাটিয়ে যান। বাস্তব জীবনে এজাতীয় মানুষ সাধারণত নাস্তিকতায় (আক্ষরিক অর্থে) বিশ্বাসী হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তারা ইসলাম বিরোধী।
বস্তুবাদী শ্লোগান: টাকাই আপন সবাই পর; যত পারিস টাকা ধর।
ইসলামের শিক্ষা: আখেরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন।
আল্লাহসচেতন মানুষ: যিনি দুনিয়ার সম্পদ ব্যবহার করেন, কিন্তু সম্পদকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানান না। তাঁর কাছে সম্পদ একটি মাধ্যম, উদ্দেশ্য নয়। তার আসল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআলার বিধান পালন, আল্লাহর সামনে নিজেকে সঁপে দেওয়া। এবং আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ، وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ
অর্থ: প্রকৃত ধনাঢ্যতা অধিক সম্পদের অধিকারী হওয়া নয়; বরং প্রকৃত ধনাঢ্যতা হলো অন্তরের ধনাঢ্যতা।—সহিহ বুখারি, ৬৪৪৬; সহিহ মুসলিম, ১০৫১।
এই হাদিস আমাদের শেখায়, সম্পদের পরিমাণ মানুষের প্রকৃত সুখ ও সমৃদ্ধির মাপকাঠি নয়। বরং অন্তরের তৃপ্তি, আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা এবং অল্পে সন্তুষ্ট থাকার গুণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজেকে প্রশ্ন করুন—
কোনো বস্তু কেনা, ব্যবহার করা কিংবা উপভোগ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন—
এটি কি আমার প্রয়োজন, নাকি শুধু প্রবৃত্তির চাহিদা? এটি কি আমার জন্য হালাল না কি হারাম? হালাল হলেও অপচয় বা অহংকার হচ্ছে না তো? এই নিয়ামতের কারণে কি আমি আল্লাহকে বেশি স্মরণ করছি, নাকি ভুলে যাচ্ছি? এই বস্তুটি না পেলেও কি আমি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে পারব? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হয়, তাহলে দুনিয়ার নিয়ামত ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দর হওয়ার আশা করা যায়। তখন সেটা হবে উপভোগ। কিন্তু যদি উত্তর নেতিবাচক হয় তাহলে সেটাই ভোগ। সেটাই প্রবৃত্তির দাসত্ব।
তবে কি দুনিয়া ছেড়ে দিতে হবে?
না দুনিয়া ছেড়ে দিতে হবে না। বরং দুনিয়াই হলো, আখেরাতের শস্যভূমি। শস্যভূমিতে মানুষ যেভাবে সারাক্ষণ থাকে না; বাড়িতে আহারের উদ্দেশ্যে সেখানে সাময়িক কায়িকশ্রম করে; তেমনি আখেরাতে উপভোগের জন্যই দুনিয়াতে উপার্জন, কিছুটা কায়িকশ্রম।
একজন মুমিন ভালো খাবার খাবেন, সুন্দর পোশাক পরবেন, সুন্দর ঘরে থাকবেন, পরিবার নিয়ে আনন্দ করবেন, ভ্রমণ করবেন—কিন্তু এসবের কোনোটিই যেন তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্য হয়ে না যায়। দুনিয়া থাকবে হাতে, কিন্তু আল্লাহর ভালোবাসা থাকবে অন্তরে। এই ভারসাম্যই একজন মুসলিমের সুন্দর জীবনবোধ ও ইসলামী শিষ্টাচারের অন্যতম শিক্ষা।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন