তাশাহুদের সুরতে বসাই মজলিসে বসার একমাত্র সুন্নত পদ্ধতি নয়
প্রশ্নঃ ১৭৩২৬৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমরা যে কোন মজলিসে বক্তাদেরকে বলতে শুনি সুন্নত তরিকায় বসার কথা আমি জানতে চাই আত্তাহিতুর শুরুতে যেয়ে বসা হয় সেটা কি যেকোনো মজলিসে বসার সুন্নত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত কিনা অথবা যে কোন মজলিসে বসার সুন্নত কি জানতে চাই
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
নামাজে আত্তাহিয়্যাতের সময় যেভাবে বসা হয়, সেটিকে সাধারণ মজলিসে বসার একমাত্র সুন্নত বলা ঠিক নয়। কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ সাধারণ মজলিসে সবসময় এভাবেই বসতেন, এমন কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিস নেই। বরং হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিভিন্নভাবে বসার কথা পাওয়া যায়।
হজরত হানজালা ইবনে হুযাইম (রা.) বলেন,
أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَرَأَيْتُهُ جَالِسًا مُتَرَبِّعًا
অর্থ: একদা আমি নবী করীম (ﷺ)-এর খেদমতে হাযির হইলাম। তিনি তখন চারজানু অবস্থায় বসা ছিলেন।
[আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং: ১১৮৭]
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/34799)
অতএব সাধারণ মজলিসে দুই পা ভাঁজ করে বসাও রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত। সুতরাং এভাবে মজলিসে বসতে কোনো সমস্যা নেই।
আবার হজরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِفِنَاءِ الكَعْبَةِ، مُحْتَبِيًا بِيَدِهِ
অর্থ : আমি একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে কা'বা শরীফের আঙ্গিনায় দু’হাঁটু খাড়া করে দু’হাত দিয়ে তা বেষ্টন করে এভাবে বসা অবস্থায় পেয়েছি।
[সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬২৭২]
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/5838)
সুতরাং সাধারণভাবে বসার জন্য শুধু আত্তাহিয়্যাতের মতো একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে ‘সুন্নত তরীকা’ বলা ঠিক নয়। বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রমাণিত বিভিন্ন বসার পদ্ধতির যেকোনোটি অনুসরণ করা যায়।
মজলিসে বসার গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও আদব
১. মজলিসে গিয়ে সালাম দেওয়া
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
إِذَا انْتَهَى أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَجْلِسِ فَلْيُسَلِّمْ، فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقُومَ فَلْيُسَلِّمْ
অর্থ: তোমাদের কেউ যখন কোনো মজলিসে পৌঁছবে, সে যেন সালাম দেয়। আর যখন উঠে যেতে চায়, তখনও যেন সালাম দেয়।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং : ৫২০৮; জামে তিরমিজি, হাদিস নং: ২৭০৬]
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/19465)
তবে মজলিসে আলোচনা চলতে থাকলে সেখানে গিয়ে সালাম না দিয়ে চুপ করে বসে পড়া।
২. যেখানে জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই বসা
মজলিসে এসে মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে বা অন্যদের কষ্ট দিয়ে সামনে গিয়ে বসা উচিত নয়। বরং যেখানে জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই বসা উচিত।
হজরত হিন্দ ইবনে আবি হালাহ (রা.) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মজলিসের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,
إِذَا انْتَهَى إِلَى قَوْمٍ جَلَسَ حَيْثُ يَنْتَهِي بِهِ الْمَجْلِسُ
অর্থ: রাসুলুল্লাহ ﷺ কোনো লোকদের মজলিসে গেলে মজলিস যেখানে শেষ হতো, সেখানেই বসতেন।
(শামায়েলে তিরমিজি)
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/52711)
৩. মজলিসে অন্যদের জন্য জায়গা করে দেওয়া
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قِيلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوا فِي الْمَجَالِسِ فَافْسَحُوا يَفْسَحِ اللَّهُ لَكُمْ
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! যখন তোমাদের বলা হয়, ‘মজলিসে জায়গা প্রশস্ত করে দাও’, তখন তোমরা জায়গা প্রশস্ত করে দাও। আল্লাহ তোমাদের জন্য প্রশস্ততা দান করবেন।
(সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত নং ১১)
৪. দুই ব্যক্তির মাঝখানে অনুমতি ছাড়া না বসা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَا يَجْلِسْ بَيْنَ رَجُلَيْنِ إِلَّا بِإِذْنِهِمَا
অর্থ: দুই ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তাদের মাঝখানে বসা উচিত নয়।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৮৪৪]
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/19116)
৫. কাউকে তার জায়গা থেকে উঠিয়ে সেখানে না বসা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَا يُقِيمُ الرَّجُلُ الرَّجُلَ مِنْ مَجْلِسِهِ ثُمَّ يَجْلِسُ فِيهِ
অর্থ: কোনো ব্যক্তি যেন অন্য ব্যক্তিকে তার জায়গা থেকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে নিজে না বসে।
[সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৬২৬৯]
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/5835)
৬. কেউ সাময়িকভাবে উঠে গেলে তার জায়গা দখল না করা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَنْ قَامَ مِنْ مَجْلِسِهِ ثُمَّ رَجَعَ إِلَيْهِ فَهُوَ أَحَقُّ بِهِ
অর্থ: কোনো ব্যক্তি তার জায়গা থেকে উঠে যাওয়ার পর আবার সেখানে ফিরে এলে, সে ওই জায়গার অধিক হকদার।
[সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২১৭৯]
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/12550)
৭. মজলিসে ভদ্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে বসা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
آكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْد، وَأَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْد، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدٌ
অর্থ: আমি খাই যেমন একজন গোলাম খায়, আর বসি যেমন একজন গোলাম বসে। কারণ আমি তো একজন বান্দাই (আল্লাহর গোলাম)।
[মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং 20599]
অর্থাৎ একজন বিনয়ী ও নম্র দাসের মতো, যে মালিকের সামনে অহংকার করে বসে না।
৮. মজলিসে অন্যকে কষ্ট না দেওয়া
মজলিসে এমনভাবে বসা বা চলাফেরা করা উচিত নয়, যাতে অন্যের কষ্ট হয়। মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে সামনে যাওয়া, অন্যের জায়গা সংকুচিত করা কিংবা অহংকারের সঙ্গে নিজের জন্য বিশেষ জায়গা দাবি করা মজলিসের আদবের পরিপন্থী।
৯. তিনজন থাকলে দুজনের মধ্যে গোপনে কথা না বলা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
إِذَا كَانُوا ثَلَاثَةً فَلَا يَتَنَاجَى اثْنَانِ دُونَ الثَّالِثِ
অর্থ: তিনজন থাকলে তৃতীয় ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে দুজন গোপনে কথা বলবে না।
[সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬২৮৮]
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/5851)
কারণ এতে তৃতীয় ব্যক্তির মনে কষ্ট বা সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে।
১০. মজলিসের কথা আমানত হিসেবে রাখা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
الْمَجَالِسُ بِالْأَمَانَةِ
অর্থ: মজলিসের কথাবার্তা আমানতস্বরূপ।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৮৬৯]
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/19140)
তাই কারও ব্যক্তিগত কথা বা মজলিসের গোপনীয় বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা উচিত নয়।
১১. মজলিস থেকে উঠার সময় সালাম দেওয়া
মজলিসে প্রবেশের সময় যেমন সালাম দেওয়া সুন্নত, তেমনি বিদায়ের সময়ও সালাম দেওয়া সুন্নত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
فَلَيْسَ الْأَوَّلَةُ بِأَحَقَّ مِنَ الْآخِرَةِ
অর্থ: প্রথম সালাম দ্বিতীয় সালামের চেয়ে বেশি হকদার নয়।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৫২০৮; জামে তিরমিজি, হাদিস নং: ২৭০৬)
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/19465)
১২. মজলিস শেষে দোয়া পড়া
মজলিসে অনর্থক বা ভুল কথাবার্তা হয়ে গেলে উঠে যাওয়ার আগে এই দোয়া পড়া সুন্নত:
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র, আপনারই প্রশংসা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাই এবং আপনার কাছে তাওবা করি।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মজলিসে অনেক অনর্থক কথাবার্তা হওয়ার পর এই দোয়া পড়ে, তার ওই মজলিসের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
(জামে তিরমিজি, হাদিস নং: ৩৪৩৩)
(হাদীসের লিংক : https://muslimbangla.com/hadith/1615291)
সারকথা:
সাধারণ মজলিসে নামাজের আত্তাহিয়্যাতের মতো বসাকেই নির্দিষ্ট ‘সুন্নত তরীকা’ বলা যথাযথ নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বিভিন্নভাবে বসেছেন। তাই শালীন ও স্বাভাবিকভাবে বসা এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রমাণিত বসার পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
আর মজলিসের অন্যান্য বিশেষ সুন্নত ও আদবগুলো বজায় রাখা।
অতএব, ‘সুন্নত তরীকায় বসা’ কথাটি শুনলে শুধু আত্তাহিয়্যাতের মতো বসাকেই বোঝায় না। বরং বসার সুন্নত এবং মজলিসের আদব, উভয় বিষয়ই বিবেচনায় রাখা উচিত।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন