সতীনের অধিকার খর্ব করে স্বামীকে একান্তে পেতে চাওয়ার বিধান
প্রশ্নঃ ১৭৩৪৫৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি জানতে চাচ্ছিলাম যে আমার স্বামী ৩ টা বিয়ে করছে, সে সবার প্রতি দায়িত্বশীল,কারো প্রতি অবিচার করে না,কিন্তুু আমি তার অন্য স্ত্রীদের কাছে গেলে আমার অনেক কস্ট হয়,আমি তাদের কাছে যাওয়া পছন্দ করি।এখন এটা কি আমার মধ্যে হিংসার কোন লক্ষ্মণ। এখন আমার কি কোন পাপ হবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত বোন,
স্বামীর অন্য স্ত্রীদের কাছে গেলে আপনার মনে কষ্ট হওয়া বা তাঁদের সঙ্গে স্বামীকে ভাগ করে নিতে মন না চাওয়া, এটুকুর কারণে আপনি গুনাহগার হবেন না। এটি মানুষের স্বাভাবিক আবেগ ও সহজাত অনুভূতির অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে মানুষের অনিচ্ছাকৃত মনের অনুভূতি এবং ইচ্ছাকৃত কাজকে এক করে দেখা হয় না।
আপনার মনের এই কষ্টের কারণ কি হিংসা? না স্বামীর ভালোবাসা?
যদি দ্বিতীয়টি হয় তাহলে—তা স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। এগুলো নিজে নিজে গুনাহ নয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا، مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরে উদিত হওয়া অনিচ্ছাকৃত চিন্তাগুলো ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা সে অনুযায়ী কাজ করে অথবা মুখে প্রকাশ করে।
—সহিহ বুখারি, হাদিস ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২৭।
অতএব, আপনার মনে কষ্ট, ঈর্ষা কিংবা মন খারাপের অনুভূতি আসার কারণে আল্লাহর কাছে আপনি গুনাহগার হবেন না।
হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত–
একবার রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অন্য একজন স্ত্রী খাবারের পাত্র পাঠালে হজরত আয়েশা রা. ঈর্ষাবশত পাত্রটি ভেঙে ফেলেন। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: غَارَتْ أُمُّكُمْ তোমাদের মা (আয়েশা) ঈর্ষান্বিত হয়েছেন। —সহিহ বুখারি, হাদিস ৫২২৫।
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, স্ত্রীর মধ্যে সতীনের প্রতি ঈর্ষা একটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। কিন্তু সেই ঈর্ষার কারণে অন্যের অধিকার নষ্ট করার অনুমতি পাওয়া যায় না।
তবে যদি হিংসা হয় এবং স্বামী তাদের হক নষ্ট করে একান্ত আপনার হয়ে যাক এই কামণা হয় তাহলে এটা গুনাহের কারণ। কেননা, এজাতীয় হিংসাকে কুরআন সুন্নাহে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تَسْأَلُ الْمَرْأَةُ طَلَاقَ أُخْتِهَا لِتَسْتَفْرِغَ صَحْفَتَهَا، وَلْتَنْكِحْ، فَإِنَّمَا لَهَا مَا قُدِّرَ لَهَا
অর্থ: কোনো নারী যেন তার সতীনের তালাক দাবি না করে, যাতে সে তার প্রাপ্য অংশটুকু নিজের জন্য এককভাবে নিয়ে নিতে পারে। বরং সে বিয়ে করুক (নিজের সংসার বজায় রাখুক); কেননা তার জন্য তাই রয়েছে, যা তার তাকদিরে নির্ধারিত হয়েছে। —সহিহ বুখারি, হাদিস ৫১৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪০৮।
এই হাদিসে একজন নারীকে তার সতীনের সংসার নষ্ট করে স্বামীর ভালোবাসা ও অধিকার এককভাবে নিজের করে নেওয়ার চেষ্টা করতে নিষেধ করা হয়েছে।
সতীনদের প্রতি আপনার আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
আপনার স্বামীর অন্য স্ত্রীদের প্রতি ইনসাফ করা যেমন জরুরি, তেমনি আপনার জন্যও তাঁদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা উত্তম।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ
অনুবাদ: আল্লাহ তোমাদের কাউকে কারও ওপর যে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, তোমরা তা কামনা করো না। —সূরা আন-নিসা, ৪:৩২।
আপনি তাঁদের ভালো থাকা দেখে নিজের জন্যও ভালোবাসা ও সুখ কামনা করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করা, তাঁদের ক্ষতি কামনা করা কিংবা স্বামীর কাছে তাঁদের বিরুদ্ধে অন্যায় অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকবেন। মনে রাখবেন হিংসা সকল প্রকারের নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয়।
পরামর্শ:
আপনার জন্য আমাদের পরামর্শ হলো, অন্য স্ত্রী/সতীনদের কল্যাণ কামনা করুন। নিজেকে সর্বদা স্বামীর সামনে তুলে ধরুন। তবে নিজের মনের ঈর্ষা/কষ্টকে অপরাধ মনে করার দরকার নাই। স্বামীর কাছে নিজের আবেগ ও ভালোবাসা প্রকাশ করুন। স্বামী, সংসার, সন্তান ও ইবাদতের প্রতি মনোযোগ দিন। আল্লাহ তাআলার কাছে স্বামীর ভালোবাসা, নিজের প্রশান্তি এবং সংসারে বরকত কামনা করুন।
নিয়মিত এই দোয়া পড়তে পারেন:
اللَّهُمَّ أَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِنَا، وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِنَا
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরগুলোর মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করুন এবং আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সুন্দর করে দিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন