বিবাহ নবায়ন পদ্ধতি, সর্বনিন্ম মোহর এবং অবৈধ উপার্জনের সম্পদ থেকে মুক্তির উপায়
প্রশ্নঃ ১৭৩৪৮৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, 1.বিবাহ নবায়ন কিভাবে করতে হয়? এর সঠিক নিয়ম কি? আর শরীয়ত মতে সর্বনিম্ন মোহর কত টাকা দিতে হয়? দয়া করে জানালে উপকৃত হতাম। 2.একজন হারাম টাকার মালিক যদি বলে, "তোমার জানা-অজানা যত হক আমার কাছে আছে, আমি মাফ চাই" - তাহলে তাকে মাফ করে দিলে কি তার ওই টাকা দিয়ে বানানো ঘর ব্যবহার করা এবং ওই টাকায় কেনা জমির ফসল খাওয়া জায়েজ হবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
বিবাহ নবায়নের নিয়ম
স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ শরিয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকলে শুধু সতর্কতা বা সন্দেহের কারণে বিবাহ নবায়ন করা জরুরি নয়। তবে কোনো কারণে সতর্কতামূলকভাবে বিবাহ নবায়ন করতে চাইলে তা করা জায়েয।
বিবাহ নবায়নের পদ্ধতি হলো, স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের সম্মতিতে কমপক্ষে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ বা এক পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুন করে ইজাব-কবুল করা। যেমন: স্বামী বলবে, ‘আমি তোমাকে পুনরায় বিবাহ করলাম।’ স্ত্রী বলবে, ‘আমি কবুল করলাম।’ এভাবে নতুন বিবাহের মতো ইজাব-কবুল সম্পন্ন করতে হবে।
সর্বনিম্ন মোহরের পরিমাণ
বিবাহের সর্বনিম্ন মহর দশ দিরহাম। অর্থাৎ দুই তোলা সাড়ে সাত মাশা বা ৩০.৬১৮ গ্রাম রূপা অথবা তার বাজারমূল্য।
হাদীসে এসেছে,
قال علىٌّ رضى اللَّه عنه: لا صَداقَ دونَ عَشَرَةِ دَراهِمَ
অর্থ: হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, ১০ দিরহামের কমে মহর হয় না।
[সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, হাদীস নং ১৪৫০৩]
তবে সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে উত্তম ও সম্মানজনক মোহর দেওয়া উচিত।
২য় প্রশ্নের উত্তর:
কারও সাথে ব্যক্তিগত কোনো কষ্ট, গিবত বা জুলুমের সম্পর্ক থাকলে তা ক্ষমা করে দিলে মাফ হয়ে যায়।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَوْمَ...
অর্থ: যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেয়, সেদিন আসার পূর্বে যেদিন তার কোনো দীনার বা দিরহাম থাকবে না। সেদিন তার কোনো সৎকর্ম থাকলে তার জুলুমের পরিমাণ তা তার নিকট থেকে নেওয়া হবে, আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ থেকে নিয়ে তা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।
[সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৪৪৯]
(হাদীসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/2287)
তবে যদি কেউ অন্যের টাকা চুরি, আত্মসাৎ, প্রতারণা বা জুলুমের মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকে, তাহলে প্রকৃত মালিককে সেই টাকা ফেরত দেওয়া আবশ্যক। মালিক বেঁচে না থাকলে তার ওয়ারিশদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
অর্থ: আর তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।
[সুরা বাকারা, আয়াত নং ১৮৮]
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
لا يَحِلُّ مالُ امرئٍ مُسلِمٍ إلا بطيبِ نَفسٍ مِنه
অর্থ: কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তার কোনো সম্পদ হালাল নয়।
[সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, হাদিস নং ১১৬৫৪]
তবে মালিক বা ওয়ারিশদের সন্ধান জানা না থাকলে এবং কোনোভাবেই তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব না হলে, তার পক্ষ থেকে গরিবদের মাঝে তা সদকা করে দিতে হবে।
সুতরাং, কেউ যদি বলে, ‘তোমার জানা-অজানা যত হক আমার কাছে আছে, আমি মাফ চাই’, আর প্রকৃত হকদার তার থেকে আত্মসাৎকৃত বা চুরি ও জুলুম করে নেওয়া পাওনা মন থেকে মাফ করে দেয় এবং তার কোনো দাবি না রাখে, তবে তার নিজের পাওনার ক্ষেত্রে সেই ক্ষমা কার্যকর হতে পারে। তখন তার ওই সম্পদ দিয়ে তৈরি করা বাড়িতে বসবাস বা জমির ফসল ভোগ করা বৈধ হবে।
কিন্তু এর দ্বারা অন্য কোনো মানুষের হক মাফ হয়ে যাবে না। যাদের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের হক পৃথকভাবে আদায় করতে হবে অথবা তাদের থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।
আর যদি সুদ, জুয়া বা হারাম ব্যবসার মাধ্যমে আয় করা সম্পদ হয়, যার নির্দিষ্ট কোনো মালিক নেই, তবে সে সম্পদের ক্ষেত্রে কারো থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার দ্বারা তা হালাল হয়ে যাবে না। বরং সে সম্পদ গরিবদের মাঝে দান করে দিতে হবে।
হাদীসে এসেছে, একটি বকরী মালিকের অনুমতি ছাড়া নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে খেতে দিলে তিনি তা না খেয়ে বললেন,
أَطْعِمِيهِ الأَسَارَى
অর্থ: এ গোশত বন্দীদের খাইয়ে দাও।
[সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৩৩২]
(হাদীসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/17646)
ফতোয়ায়ে শামীতে আছে,
وَعَلَى هَذَا قَالُوا لَوْ مَاتَ الرَّجُلُ وَكَسْبُهُ مِنْ بَيْعِ الْبَاذَقِ أَوْ الظُّلْمِ أَوْ أَخْذِ الرِّشْوَةِ يَتَوَرَّعُ الْوَرَثَةُ، وَلَا يَأْخُذُونَ مِنْهُ شَيْئًا وَهُوَ أَوْلَى بِهِمْ وَيَرُدُّونَهَا عَلَى أَرْبَابِهَا إنْ عَرَفُوهُمْ، وَإِلَّا تَصَدَّقُوا بِهَا لِأَنَّ سَبِيلَ الْكَسْبِ الْخَبِيثِ التَّصَدُّقُ إذَا تَعَذَّرَ الرَّدُّ عَلَى صَاحِبِهِ
অর্থ : আর এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি এমন অবস্থায় মারা যায় যে তার উপার্জন ছিল নিষিদ্ধ বিক্রয়ের মাধ্যমে, জুলুম বা ঘুস গ্রহণের মাধ্যমে, তবে তার উত্তরাধিকারীগণের উচিত হলো, এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা এবং এর থেকে কোনো কিছু গ্রহণ না করা। আর এটিই তাদের জন্য অধিক নিরাপদ ও শ্রেয়। তারা যেন ওই সম্পদ তার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয় যদি তারা তাদের চিনতে পারে। আর যদি মালিকদের চেনা না থাকে, তবে তারা যেন তা সদকা করে দেয়। কারণ, অবৈধ উপার্জনের উপায় হলো, প্রকৃত মালিকের কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া অসম্ভব হলে তা সদকা করে দেওয়া।
[রদ্দুল মুহতার, খণ্ড নং ৬, পৃষ্ঠা নং ৩৮৫]
সারকথা:
১. বিবাহ নবায়ন: স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ বহাল থাকলে কেবল সন্দেহের বশে বিবাহ নবায়ন করা জরুরি নয়। তবে সতর্কতামূলকভাবে করতে চাইলে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুন করে ইজাব-কবুল করে তা করা যেতে পারে।
আর শরিয়তের নির্ধারিত সর্বনিম্ন মোহর হলো ১০ দিরহাম (বর্তমান মান অনুযায়ী প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম রূপা বা তার সমপরিমাণ মূল্য)।
২. হারাম টাকা ও ক্ষমা চাওয়ার বিধান:
যদি কারো সুনির্দিষ্ট হক বা নির্দিষ্ট পাওনা (যেমন: জোরপূর্বক বা অন্যায়ভাবে নেওয়া টাকা) থাকে, আর পাওনাদার ব্যক্তি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও পূর্ণ সন্তুষ্টিতে তা মাফ করে দেন, তবে সে ক্ষেত্রে তা মাফ হয়ে যাবে এবং ঐ টাকায় গড়া বাড়িতে বসবাস বা ফসল খাওয়া জায়েজ হতে পারে।
কিন্তু সুদ, জুয়া বা অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ, যার কোনো নির্দিষ্ট সুনির্দিষ্ট পাওনাদার নেই, তা কেবল কারো সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে হালাল হয় না। বরং এ ধরনের হারাম সম্পদ সওয়াবের নিয়ত ছাড়াই গরিব দুঃখীদের মাঝে সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন