স্বামীর অনুমতি গ্রহণ ও দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বোঝাপড়া
প্রশ্নঃ ১৭৩৫৪৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার স্বামী বিদেশ থাকে ।আমি কারো কাছ থেকে দাওয়াত পেলে ,ছেলে-মেয়ের স্কুল ,কোচিং ভর্তি ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে আগে স্বামীকে জানাই ,তারপর জিঙ্গাসা করি কাজ করব কি না ? স্বামী যে সিদ্ধান্ত দেয় তা মেনে নেই ।যদি কোনো সিদ্ধান্ত আমার পছন্দ না হয় তবে স্বামীকে বুঝিয়ে যদি সে সম্মতি দেয় তবে করি নতুবা করি না ।এদিকে স্বামী বলতাছে ,আমি তার কাছ থেকে অনুমতি নেই না ,আমি শুধু স্বামীকে জানাই ।স্বামীকে জিঙ্গাসা করছি তার কাছে অনুমতি নেওয়া মানে কি? সে একবার বলে যদি স্বামী নিজ থেকে বলে অমুক কাজ কর ,তাহলে সেটা অনুমতি নেওয়া ।মেয়েকে নিয়ে স্কুলে গেলে আমি স্বামীর অনুমতি নেই না ।বাসার বাজার ,ছেলেমেয়ের প্রয়োজনীয় সব কাজ আমি করি ।বলছে আমি বাজার করতে গেলে জানায় যাই না ।ফোন কেটে দেয় ,আবার বলে সমস্যা নাই ।অনুমতি নেওয়ার কি আছে ।স্বাভাবিক জীবনযাপন করবা ।এই ব্যাপারে পরিষ্কার তার মতামত শুনতে চাওয়ার জন্য কথা বলতে চাইলে বলে ঘুমায় থাকবে ,কাজ থেকে আসছে ঘুমাবে ।কোন কাজ করার আগে জিঙ্গাসা করে তার ইচ্ছা অনুসারে কাজ করি ,এটা কি অনুমতি নেওয়া হলো না? কিংবা আমি কি স্বামীর সাথে কথা বলতে গেলে যুক্তি তর্ক করি -এতে কি গুনাহগার হবো? অনেক সময় হয় দুই দেশে থাকার কারণে জরুরি কোন কাজে তাকে জানানোর সময় ,সুযোগ না থাকলে অনুমতি নিতে পারি না ,আমার কি পাপ হয়?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
আপনার বিবরণ থেকে মৌলিকভাবে তিনটি প্রশ্ন বুঝতে পেরেছি। সে হিসেবে উত্তর প্রদান করছি।
১. স্বামীর কাছে জিজ্ঞাসা করে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করলে কি অনুমতি নেওয়া হয়?
হ্যাঁ, কোনো কাজ করার আগে স্বামীকে জানানো, তাঁর মতামত ও সম্মতি চাওয়া এবং তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করাকে অনুমতি গ্রহণই বলা হবে। অনুমতি গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট শব্দে ‘অনুমতি দিন’ বলা আবশ্যক নয়।
২. স্বামীর সঙ্গে যুক্তি-তর্ক বা মতবিনিময় করলে কি গুনাহ হবে?
স্বামীর সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনা করা, নিজের মতামত ও যুক্তি তুলে ধরা কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অনুরোধ করা গুনাহ নয়। তবে অযৌক্তিক তর্ক করা, অসম্মান করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে কষ্ট দেওয়া অনুচিত।
৩. জরুরি প্রয়োজনে স্বামীর অনুমতি নেওয়ার সুযোগ না হলে কি গুনাহ হবে?
স্বামী বিদেশে থাকার কারণে জরুরি প্রয়োজনে অনেক সময় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় কাজ করার জন্য স্ত্রী গুনাহগার হবেন না, ইনশাআল্লাহ। বিশেষত সন্তানদের দেখাশোনা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন অপরিহার্য কাজের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।
বিশেষ পরামর্শ ও করণীয়:
দাম্পত্য জীবন সুখময় ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়া, স্কুল-কোচিংয়ের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ, দৈনন্দিন বাজার-সদাই ও সংসারের নিয়মিত কাজগুলোর জন্য স্বামীর একবারেই অনুমতি দিয়ে রাখা উচিত। এতে প্রতিটি কাজের আগে অনুমতি নেওয়ার ঝামেলা ও উভয়ের অস্থিরতা দূর হবে। কারণ, প্রবাসে অবস্থানরত স্বামীর কাছ থেকে প্রতিটি কাজের জন্য তাৎক্ষণিক অনুমতি নেওয়া বাস্তবিকভাবেই কঠিন।
তাই বিষয়টি অযথা জটিল না করে, উভয়ে সুবিধাজনক সময়ে শান্তভাবে আলোচনা করে কোন কাজে আগে জানাতে হবে, কোন কাজে অনুমতি নিতে হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে- এসব বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানো উচিত। প্রয়োজনে স্ত্রীর নিরাপত্তা ও সহযোগিতার জন্য কোনো বিশ্বস্ত মাহরাম ব্যক্তির তত্ত্বাবধানও রাখা যেতে পারে।
স্বামীর যেমন স্ত্রীর ভরণপোষণ, নিরাপত্তা ও বৈধ অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকা উচিত, তেমনি স্ত্রীরও স্বামীর বৈধ বিষয়ে আনুগত্য, শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত। মনে রাখতে হবে, সংসার পরিচালনা কেবল অনুমতি নেওয়া বা দেওয়ার বিষয় নয়; বরং পারস্পরিক আস্থা, ভালোবাসা ও সহযোগিতার বিষয়।
আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন। বিশেষত কুরআনের এই দোয়াটি পড়তে পারেন-
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানান। (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪)
সেইসঙ্গে বেশি বেশি দরূদ শরীফ ও ইস্তিগফার পাঠ করুন। আল্লাহ তাআলা আপনাদের দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, শান্তি ও পারস্পরিক বোঝাপড়া দান করুন। আমীন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন