সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা আল আহ্‌যাব (الأحزاب) | জোট

মাদানী

মোট আয়াতঃ ৭৩

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اتَّقِ اللّٰہَ وَلَا تُطِعِ الۡکٰفِرِیۡنَ وَالۡمُنٰفِقِیۡنَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا ۙ ١

ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুত্তাকিল্লা-হা ওয়ালা তুতি‘ইল কা-ফিরীনা ওয়াল মুনা-ফিকীনা ইন্নাল্লা-হা কা-না ‘আলীমান হাকীমা।

হে নবী! আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং কাফের ও মুনাফেকদের আনুগত্য করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

১. কাফেরগণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের প্রস্তাব পেশ করত। বলত, আপনি যদি আমাদের এ কথাটা মেনে নেন, তবে আমরাও আপনার কথা মানব। মুনাফেকরাও তাদের সমর্থন করে বলত, এটা তো ভালো প্রস্তাব। এটা করলে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়বে ও শক্তি বৃদ্ধি পাবে। অথচ তাদের এ প্রস্তাব ছিল ঈমানের সম্পূর্ণ বিপরীত। ঈমানের সঙ্গে তার সহাবস্থান কখনওই সম্ভব নয়। এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্বস্ত করেন যে, আপনি যদি তাদের এসব প্রস্তাবে কান না দিয়ে নিজ কাজে লেগে থাকেন ও আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা রাখেন, তবে আল্লাহ তাআলা নিজেই সবকিছু ঠিকঠাক করে দেবেন। কেননা কর্মবিধায়ক হিসেবে তিনিই যথেষ্ট।

وَّاتَّبِعۡ مَا یُوۡحٰۤی اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرًا ۙ ٢

ওয়াত্তাবি‘ মা-ইঊহাইলাইকা মির রাব্বিকা ইন্নাল্লা-হা কা-না বিমা-তা‘মালূনা খাবীরা-।

তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যে ওহী পাঠানো হচ্ছে তার অনুসরণ কর। তোমরা যা-কিছু কর, আল্লাহ নিশ্চিতভাবে সে সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবগত।

وَّتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ وَکَفٰی بِاللّٰہِ وَکِیۡلًا ٣

ওয়া তাওয়াক্কাল ‘আলাল্লা-হি ওয়া কাফা-বিল্লা-হি ওয়াকীলা-।

এবং আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখ। কর্ম বিধানের জন্য আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট।

مَا جَعَلَ اللّٰہُ لِرَجُلٍ مِّنۡ قَلۡبَیۡنِ فِیۡ جَوۡفِہٖ ۚ وَمَا جَعَلَ اَزۡوَاجَکُمُ الّٰٓیِٴۡ تُظٰہِرُوۡنَ مِنۡہُنَّ اُمَّہٰتِکُمۡ ۚ وَمَا جَعَلَ اَدۡعِیَآءَکُمۡ اَبۡنَآءَکُمۡ ؕ ذٰلِکُمۡ قَوۡلُکُمۡ بِاَفۡوَاہِکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ یَقُوۡلُ الۡحَقَّ وَہُوَ یَہۡدِی السَّبِیۡلَ ٤

মা-জা‘আলাল্লা-হু লিরাজুলিম মিন কালবাইনি ফী জাওফিহী ওয়ামা-জা‘আলা আঝওয়াজাকুমুল লাঈ তুজা-হিরূনা মিনহুন্না উম্মাহা-তিকুম ওয়ামা-জা‘আলা আদ‘ইয়াআকুম আবনাআকুম যা-লিকুম কাওলুকুম বিআফওয়া-হিকুম ওয়াল্লাহু ইয়াকূলুল হাক্কা ওয়াহুওয়া ইয়াহদিছছাবীল।

আল্লাহ কারও অভ্যন্তরেই দু’টো হৃদয় সৃষ্টি করেননি। আর তোমরা তোমাদের যে স্ত্রীদেরকে মায়ের পিঠের সাথে তুলনা কর, তাদেরকে তোমাদের মা বানাননি। আর তোমাদের মুখের ডাকা পুত্রদেরকে তোমাদের প্রকৃত পুত্র সাব্যস্ত করেননি। এটা তো তোমাদের মুখের কথামাত্র। আল্লাহ সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।

তাফসীরঃ

২. স্ত্রীকে মায়ের পিঠের সাথে তুলনা করাকে পরিভাষায় জিহার বলা হয়। সামনে সূরা মুজাদালায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আসছে।

اُدۡعُوۡہُمۡ لِاٰبَآئِہِمۡ ہُوَ اَقۡسَطُ عِنۡدَ اللّٰہِ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ تَعۡلَمُوۡۤا اٰبَآءَہُمۡ فَاِخۡوَانُکُمۡ فِی الدِّیۡنِ وَمَوَالِیۡکُمۡ ؕ وَلَیۡسَ عَلَیۡکُمۡ جُنَاحٌ فِیۡمَاۤ اَخۡطَاۡتُمۡ بِہٖ ۙ وَلٰکِنۡ مَّا تَعَمَّدَتۡ قُلُوۡبُکُمۡ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ٥

উদ‘ঊহুম লিআ-বাইহিম হুওয়া আকছাতু‘ইনদাল্লা-হি ফাইল্লাম তা‘লামূআবাআহুম ফাইখওয়া-নুকুম ফিদ্দীনি ওয়া মাওয়া-লীকুম ওয়া লাইছা ‘আলাইকুম জুনাহুন ফীমাআখতাতুম বিহী ওয়ালা-কিম মা-তা‘আম্মাদাত কুলূবুকুম ওয়া কানাল্লা-হু গাফূরার রাহীমা-।

তোমরা তাদেরকে (পোষ্যপুত্রদেরকে) তাদের পিতৃ-পরিচয়ে ডাক। এ পদ্ধতিই আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ ন্যায়সঙ্গত। তোমরা যদি তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের দীনী ভাই ও তোমাদের বন্ধু। তোমাদের দ্বারা কোন ভুল হয়ে গেলে সেজন্য তোমাদের কোন গুনাহ হবে না। কিন্তু যে বিষয়ে তোমাদের অন্তর ইচ্ছা পোষণ করে (তা করলে তোমাদের গুনাহ হবে)। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

৪. অর্থাৎ পোষ্যপুত্রদেরকে যদি আপন পুত্রের মত মহব্বত কর ও সেই মত আচরণ তাদের সাথে কর, তাতে তো কোন দোষ নেই কিন্তু তাদের পিতৃ-পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে তখন নিজেদের পরিচয়ে পরিচিতি না করে বরং তাদের আপন আপন জন্মদাতার পরিচয়ই দান করবে।

اَلنَّبِیُّ اَوۡلٰی بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ مِنۡ اَنۡفُسِہِمۡ وَاَزۡوَاجُہٗۤ اُمَّہٰتُہُمۡ ؕ وَاُولُوا الۡاَرۡحَامِ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلٰی بِبَعۡضٍ فِیۡ کِتٰبِ اللّٰہِ مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُہٰجِرِیۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ تَفۡعَلُوۡۤا اِلٰۤی اَوۡلِیٰٓئِکُمۡ مَّعۡرُوۡفًا ؕ کَانَ ذٰلِکَ فِی الۡکِتٰبِ مَسۡطُوۡرًا ٦

আন্নাবিইয়ুআওলা-বিলমু’মিনীনা মিন আনফুছিহিম ওয়া আঝওয়া-জুহূ উম্মাহা-তুহুম ওয়া উলুল আরহা-মি বাদুহুম আওলা-ব্বিা‘দিন ফী কিতা-বিল্লা-হি মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুহা-জিরীনা ইল্লাআন তাফ‘আলূ ইলাআওলিয়াইকুম মা‘রূফান কা-না যা-লিকা ফিল কিতা-বি মাছতূরা-।

মুমিনদের পক্ষে নবী তাদের নিজেদের প্রাণ অপেক্ষাও বেশি ঘনিষ্ঠ। আর তাদের স্ত্রীগণ তাদের মা। তথাপি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী অন্যান্য মুমিন ও মুহাজিরগণ অপেক্ষা গর্ভ-সূত্রের আত্মীয়গণ (মীরাছের ব্যাপারে) একে অন্যের উপর অগ্রাধিকার রাখে। তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধু-বান্ধবের (পক্ষে কোন অসিয়ত করে তাদের) প্রতি সৌজন্য প্রদর্শন কর সেটা ভিন্ন কথা। একথা কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।

তাফসীরঃ

৭. এখানে আল্লাহ তাআলা এই বাস্তবতা তুলে ধরছেন যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও সমস্ত মুসলিমের কাছে তাদের নিজ প্রাণ অপেক্ষাও বেশি প্রিয় এবং তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণকে তারা নিজেদের মা’ গণ্য করে, কিন্তু তাই বলে মীরাছের ব্যাপারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর স্ত্রীগণ কোন মুসলিমের কাছে তার আত্মীয়বর্গের উপর অগ্রাধিকার রাখেন না। কাজেই কারও ইন্তিকাল হয়ে গেলে তার মীরাছ তার নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই বণ্টন করা হয়ে থাকে; মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণকে তা থেকে কোন অংশ দেওয়া হয় না, অথচ দীনী দৃষ্টিকোণ থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উম্মুল মুমিনীনগণের হক সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের উপরে। তো যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উম্মুল মুমিনীনগণকে তাদের দীনী সম্পর্ক সত্ত্বেও কারও মীরাছে শরীক রাখা হয়নি, তখন পোষ্যপুত্রকে কেবল মুখে পুত্র বলে দেওয়ার অজুহাতে কী করে মীরাছে অংশীদার বানানো যেতে পারে? হাঁ, তাদের প্রতি যদি সৌজন্য প্রদর্শনের ইচ্ছা হয়, তবে নিজের রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের ভেতর তাদের পক্ষে অসিয়ত করার সুযোগ আছে।

وَاِذۡ اَخَذۡنَا مِنَ النَّبِیّٖنَ مِیۡثَاقَہُمۡ وَمِنۡکَ وَمِنۡ نُّوۡحٍ وَّاِبۡرٰہِیۡمَ وَمُوۡسٰی وَعِیۡسَی ابۡنِ مَرۡیَمَ ۪  وَاَخَذۡنَا مِنۡہُمۡ مِّیۡثَاقًا غَلِیۡظًا ۙ ٧

ওয়া ইযআখাযনা-মিনান্নাবিইয়ীনা মীছা-কাহুম ওয়া মিনকা ওয়া মিন নূহিওঁ ওয়া ইবরাহীমা ওয়া মূছা-ওয়া ‘ঈছাব নি মারইয়ামা ওয়া আখাযনা-মিনহুম মীছা-কান গালীজা-।

এবং (হে রাসূল!) সেই সময়কে স্মরণ রাখ, যখন আমি সমস্ত নবী থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম এবং তোমার থেকেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা ইবনে মারয়াম থেকেও আর আমি তাদের থেকে নিয়েছিলাম অতি কঠিন প্রতিশ্রুতি,

তাফসীরঃ

৮. পেছনের আয়াতে বলা হয়েছিল নবী প্রত্যেক মুমিনের কাছে তার প্রাণ অপেক্ষাও বেশি ঘনিষ্ঠ ও প্রিয়। এ আয়াতে বলা হচ্ছে, নবীগণের দায়িত্বও অতি বড়, অনেক কঠিন। তাদের থেকে কঠিন প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিল, তারা যেন আল্লাহ তাআলার বিধানাবলী মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছিয়ে দেন এবং তাদের পথপ্রদর্শনের দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে আঞ্জাম দেন।

لِّیَسۡـَٔلَ الصّٰدِقِیۡنَ عَنۡ صِدۡقِہِمۡ ۚ  وَاَعَدَّ لِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابًا اَلِیۡمًا ٪ ٨

লিয়াছআলাসসা-দিকীনা ‘আন সিদকিহিম ওয়া আ‘আদ্দা লিলকা-ফিরীনা ‘আযা-বান আলীমা-।

সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য এবং কাফেরদের জন্য তো তিনি এক যন্ত্রণাময় শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।

তাফসীরঃ

৯. নবীগণের থেকে এ প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা হয়েছিল এজন্য, যাতে মানুষের কাছে আল্লাহ তাআলার বার্তা যথাযথভাবে পৌঁছে যায় এবং তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার প্রমাণ চূড়ান্ত হয়ে যায়, ফলে কারও একথা বলার সুযোগ না থাকে যে, আমরা তো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাইনি; তা পেলে আমরা ঠিকই ঈমান আনতাম। তাদের থেকে এ প্রতিশ্রুতি নেওয়ার ফলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মানুষকে জিজ্ঞেস করবেন, তারা কতটা সততার সাথে আল্লাহর তাআলার আনুগত্য করেছিল? নবীগণ যদি আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তাদের কাছে তাঁর পয়গাম যথাযথভাবে না পৌঁছাতেন, তবে তাদের প্রতি আল্লাহর প্রমাণ চূড়ান্ত হত না আর সেক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদও করতেন না। কেননা প্রমাণ চূড়ান্ত করা ছাড়া কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সেটা আল্লাহ তাআলার ইনসাফের পরিপন্থী হত।

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اذۡکُرُوۡا نِعۡمَۃَ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ اِذۡ جَآءَتۡکُمۡ جُنُوۡدٌ فَاَرۡسَلۡنَا عَلَیۡہِمۡ رِیۡحًا وَّجُنُوۡدًا لَّمۡ تَرَوۡہَا ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرًا ۚ ٩

ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুযকুরূনি‘মাতাল্লা-হি ‘আলাইকুম ইযজাআতকুম জুনূদুন ফাআরছালনা-‘আলাইহিম রীহাওঁ ওয়া জুনূদাল্লাম তারাওহা- ওয়া কা-নাল্লা-হু বিমাতা‘মালূনা বাসীরা-।

হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের প্রতি সেই সময় কীরূপ অনুগ্রহ করেছিলেন তা স্মরণ কর, যখন বহু সৈন্য তোমাদের প্রতি চড়াও হয়েছিল, তারপর আমি তাদের বিরুদ্ধে এক ঝড়ো হাওয়া পাঠাই এবং এক বাহিনী যা তোমরা দেখতে পাওনি। ১০ আর তোমরা যা-কিছু করছিলে আল্লাহ তা দেখছিলেন।

তাফসীরঃ

১০. এখান থেকে আহযাবের যুদ্ধ বর্ণিত হচ্ছে। ২৭ নং আয়াত পর্যন্ত এ যুদ্ধের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। যুদ্ধের ঘটনাটি সংক্ষেপে নিম্নরূপ- প্রসিদ্ধ ইয়াহুদী গোত্র বনু নাজীরের চক্রান্তে কুরাইশ পৌত্তলিকগণ সিদ্ধান্ত স্থির করেছিল যে, তারা আরবের বিভিন্ন গোত্রকে একাট্টা করে সকলে যৌথভাবে মদীনা মুনাওয়ারায় হামলা চালাবে। সেমতে কুরাইশ গোত্র ছাড়াও বনু গাতফান, বনু আসলাম, বনু মুররা, বনু আশজা, বনু কিনানা ও বনু ফাযারা এ গোত্রসমূহ সম্মিলিতভাবে এক বিশাল বাহিনী তৈরি করে ফেলল। তাদের সংখ্যা বার হাজার থেকে পনের হাজার পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়ে থাকে। এই বিপুল সশস্ত্র সেনাদল পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে মদীনা মুনাওয়ারার উদ্দেশে যাত্রা করল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ পাওয়া মাত্র সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শে বসলেন। হযরত সালমান ফারসী (রাযি.) পরামর্শ দিলেন, মদীনা মুনাওয়ারার উত্তর দিকে, যে দিক থেকে হানাদার বাহিনী আসতে পারে, একটি গভীর পরিখা খনন করা হোক, যাতে তারা নগরে প্রবেশ করতে সক্ষম না হয়। সুতরাং সমস্ত সাহাবী কাজে লেগে গেলেন। মাত্র ছয় দিনে তারা সাড়ে তিন মাইল দীর্ঘ ও পাঁচ গজ গভীর একটি পরিখা খনন করে ফেললেন। মুসলিমদের পক্ষে এ যুদ্ধটি পূর্ববর্তী সকল যুদ্ধ অপেক্ষা বেশি কঠিন ছিল। শত্রু সৈন্য ছিল তাদের চার গুণেরও বেশি। আবার গোদের উপর বিষফোঁড়া স্বরূপ কুখ্যাত ইয়াহুদী গোত্র বনু কুরাইজা সম্পর্কে খবর পাওয়া গেল, তারা মুসলিমদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে হানাদারদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তারা যেহেতু ছিল মুসলিমদের প্রতিবেশী, তাই তাদের দিক থেকে অনিষ্টের আশঙ্কা ছিল অনেক বেশি। তখন ছিল প্রচণ্ড শীত কাল। খাদ্য সামগ্রীরও ছিল অভাব। এতটা দীর্ঘ পরিখার খনন কার্যে দিন-রাত ব্যস্ত থাকার দরুণ রোজগারেরও কোন সুযোগ মেলেনি। ফলে খাদ্য সংকট তীব্রাকার ধারণ করল। এ অবস্থায় হানাদার বাহিনী পরিখার কিনারায় এসে শিবির ফেলল। অতঃপর উভয় পক্ষে তীর ও পাথর ছোড়াছুড়ি চলতে থাকল। লাগাতার প্রায় এক মাস এ অবস্থা চলল। রাত-দিন একটানা পাহারা দিতে দিতে মুজাহিদগণ ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। পরিশেষে এক সময় সুদীর্ঘ এ কঠিন পরীক্ষার অবসান হল আর তা এভাবে যে, আল্লাহ তাআলা হানাদারদের ছাউনির উপর দিয়ে এক হিমশীতল তীব্র ঝড়ো হাওয়া বইয়ে দিলেন। তাতে তাদের তাঁবু ছিড়ে গেল, হাড়ি-পাতিল সব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল, চুলা নিভে গেল এবং সওয়ারীর পশুগুলো ভয় পেয়ে চারদিকে ছোটাছুটি করতে লাগল। এভাবে তাদের গোটা শিবির জেরবার হয়ে গেল। অগত্যা তাদেরকে অবরোধ ত্যাগ করে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফিরে যেতে হল। আলোচ্য আয়াতে এই ঝড়ো হাওয়ার কথাই বলা হয়েছে। আয়াতে যে অদৃশ্য সেনাদলের কথা বলা হয়েছে, তা হল ফেরেশতার বাহিনী। তারাই বহুমুখী তৎপরতা দ্বারা শত্রুবাহিনীকে নাকাল করে ফেলেছিল। পরিশেষে তারা সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যমিমূঢ় হয়ে পড়ে এবং উপায়ান্তর না দেখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
১০

اِذۡ جَآءُوۡکُمۡ مِّنۡ فَوۡقِکُمۡ وَمِنۡ اَسۡفَلَ مِنۡکُمۡ وَاِذۡ زَاغَتِ الۡاَبۡصَارُ وَبَلَغَتِ الۡقُلُوۡبُ الۡحَنَاجِرَ وَتَظُنُّوۡنَ بِاللّٰہِ الظُّنُوۡنَا ١۰

ইযজাঊকুমমিনফাওকিকুম ওয়া মিন আছফালা মিনকুমওয়াইযঝা-গাতিল আবসা-রু ওয়া বালাগাতিল কুলূবুল হানা-জিরা ওয়া তাজুন্নূনা বিল্লা-হিজ জু নূনা।

স্মরণ কর যখন তারা তোমাদের উপর চড়াও হয়েছিল উপর দিক থেকেও এবং নিচের দিক থেকেও ১১ এবং যখন চোখ বিস্ফারিত হয়েছিল এবং প্রাণ মুখের কাছে এসে পড়েছিল আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা রকমের ভাবনা ভাবতে শুরু করেছিলে। ১২

তাফসীরঃ

১১. এ রকম কঠিন পরীক্ষার সময়ে অন্তরে নানা রকমের ওয়াসওয়াসা ও ভাবনা জেগে থাকে। এর দ্বারা এমন সব ভাবনার প্রতি ইশারা করা হয়েছে, যা দ্বারা ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
১১

ہُنَالِکَ ابۡتُلِیَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَزُلۡزِلُوۡا زِلۡزَالًا شَدِیۡدًا ١١

হুনা-লিকাব তুলিয়াল মু’মিনূনা ওয়া ঝুলঝিলূঝিলঝা-লান শাদীদা-।

তখন মুমিনগণ কঠিনভাবে পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তাদেরকে তীব্র প্রকম্পনে কাঁপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
১২

وَاِذۡ یَقُوۡلُ الۡمُنٰفِقُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللّٰہُ وَرَسُوۡلُہٗۤ اِلَّا غُرُوۡرًا ١٢

ওয়া ইযইয়াকূ লুলমুনা-ফিকূনা ওয়াল্লাযীনা ফী কুলূবিহিম মারাদুম মা-ওয়া‘আদানাল্লাহুয়া রাছূলুহূইল্লা-গুরূরা-।

এবং স্মরণ কর যখন মুনাফেকগণ এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা বলছিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। ১৩

তাফসীরঃ

১৩. বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় আছে, হযরত সালমান ফারসী (রাযি.) যে স্থানে পরিখা খনন করেছিলেন, সেখানে একটি কঠিন পাথরের চাঁই বের হয়ে এসেছিল। সেটি কোনক্রমেই ভাঙ্গা যাচ্ছিল না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিষয়টা অবগত করা হলে তিনি স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হন এবং হাতে কোদাল নেন। তিনি প্রথমে পাঠ করলেন, وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا “এবং তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্যিকারভাবে পূর্ণতা লাভ করল”। তারপর পাথরের উপর কোদাল মারলেন। তাতে পাথরটির এক-তৃতীয়াংশ ভেঙ্গে গেল। সেই সঙ্গে তা থেকে আগুনের এমন এক ফুলকি ছুটল, যার আলোয় তিনি ইয়ামান ও কিসরার অট্টালিকাসমূহ দেখতে পেলেন। তারপর তিনি আবার পাঠ করলেন, وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَّعَدْلًا “এবং তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্যিকার ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পূর্ণতা লাভ করল”। এই বলে তিনি দ্বিতীয় বার কোদাল মারলেন। তাতে পাথরটির দ্বিতীয় অংশ ভেঙ্গে গেল এবং সেই সঙ্গে আগুনের এমন এক ফুলকি ছুটল, যার আলোয় তিনি রোমের অট্টালিকাসমূহ দেখতে পেলেন। তারপর তৃতীয় আঘাত হানলেন এবং তাতে সম্পূর্ণ পাথরটি ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। অতঃপর তিনি বললেন, ইয়ামান, ইরান ও রোমের অট্টালিকাসমূহ দেখিয়ে আমাকে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, এসব দেশ আমার উম্মতের করতলগত হবে। মুনাফেকরা তো একথা শুনে হেসেই খুন। তারা ব্যঙ্গ করে বলল, যারা নিজেদের নগর রক্ষা করতেই হিমশিম খাচ্ছে, তারা কিনা রোম ও ইরান জয়ের স্বপ্ন দেখছে। মুফাসসিরগণ বলেন, এ আয়াতে মুনাফেকদের সেই সব মন্তব্যের প্রতিই ইশারা করা হয়েছে।
১৩

وَاِذۡ قَالَتۡ طَّآئِفَۃٌ مِّنۡہُمۡ یٰۤاَہۡلَ یَثۡرِبَ لَا مُقَامَ لَکُمۡ فَارۡجِعُوۡا ۚ وَیَسۡتَاۡذِنُ فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمُ النَّبِیَّ یَقُوۡلُوۡنَ اِنَّ بُیُوۡتَنَا عَوۡرَۃٌ ؕۛ وَمَا ہِیَ بِعَوۡرَۃٍ ۚۛ اِنۡ یُّرِیۡدُوۡنَ اِلَّا فِرَارًا ١٣

ওয়া ইযকা-লাততাইফাতুম মিনহুম ইয়াআহলা ইয়াছরিবা লা-মুকা-মা লাকুম ফারজি‘ঊ ওয়া ইয়াছতা’যিনুফারীকুম মিনহুমুন নাবিইইয়া ইয়াকূলূনা ইন্না বুইঊতানা‘আওরাতুওঁ ওয়ামা-হিয়া বি‘আওরাতিইঁ ইয়ঁইউদূ না ইল্লা-ফিরা-রা-।

এবং যখন তাদেরই মধ্যকার কতিপয় লোক বলছিল, হে ইয়াসরিববাসী! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই। সুতরাং ওয়াপস চলে যাও এবং তাদেরই মধ্যে কিছু লোক (বাড়ি যাওয়ার জন্য) এই বলে নবীর কাছে অনুমতি চাইল যে, আমাদের ঘর অরক্ষিত, ১৪ অথচ তা অরক্ষিত ছিল না; বরং তাদের অভিপ্রায় ছিল কেবল (কোনও উপায়ে) পালিয়ে যাওয়া।

তাফসীরঃ

১৪. এরা ছিল মুনাফেকদের একটি দল। তারা তাদের ঘর-বাড়ি অরক্ষিত থাকার বাহানা দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে চাচ্ছিল।
১৪

وَلَوۡ دُخِلَتۡ عَلَیۡہِمۡ مِّنۡ اَقۡطَارِہَا ثُمَّ سُئِلُوا الۡفِتۡنَۃَ لَاٰتَوۡہَا وَمَا تَلَبَّثُوۡا بِہَاۤ اِلَّا یَسِیۡرًا ١٤

ওয়া লাও দুখিলাত ‘আলাইহিম মিন আকতা-রিহা-ছু ম্মা ছুইলুল ফিতনাতা লাআ-তাওহাওয়ামা-তালাব্বাছূবিহাইল্লা ইয়াছীরা।

মদীনার চারদিক থেকে যদি তাদের কাছে শত্রুদের প্রবেশ ঘটত আর তাদেরকে বিদ্রোহে যোগ দিতে বলা হত, তবে তারা অবশ্যই তাতে যোগ দিত এবং তখন গৃহে অবস্থান করত অল্পই। ১৫

তাফসীরঃ

১৫. অর্থাৎ এখন তো মুনাফেকরা তাদের বাড়ির প্রাচীর নিচু হওয়ার ও তা অরক্ষিত থাকার বাহানা দেখাচ্ছে, কিন্তু শত্রু সৈন্য যদি চারদিক থেকে মদীনায় ঢুকে পড়ে এবং তাদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার প্ররোচনা দেয়, তবে শত্রুদের পাল্লা ভারি দেখে তারা অবশ্যই তাদের সঙ্গে মিলিত হবে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে। তখন আর তাদের ঘর-বাড়ি অরক্ষিত থাকার কথা খেয়াল থাকবে না।
১৫

وَلَقَدۡ کَانُوۡا عَاہَدُوا اللّٰہَ مِنۡ قَبۡلُ لَا یُوَلُّوۡنَ الۡاَدۡبَارَ ؕ وَکَانَ عَہۡدُ اللّٰہِ مَسۡـُٔوۡلًا ١٥

ওয়া লাকাদ কা-নূ‘আ-হাদুল্লা-হা মিন কাবলুলা-ইউওয়ালূলনাল আদবা -রা ওয়া কা-না ‘আহদুল্লা-হি মাছঊলা।

বস্তুত তারা পূর্বে আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। আর আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
১৬

قُلۡ لَّنۡ یَّنۡفَعَکُمُ الۡفِرَارُ اِنۡ فَرَرۡتُمۡ مِّنَ الۡمَوۡتِ اَوِ الۡقَتۡلِ وَاِذًا لَّا تُمَتَّعُوۡنَ اِلَّا قَلِیۡلًا ١٦

কুল্লাই ইয়ানফা‘আকুমুল ফিরা-রু ইন ফারারতুম মিনাল মাওতি আবিলকাতলি ওয়া ইযাল লা-তুমাত্তা‘ঊনা ইল্লা-কালীলা-।

(হে নবী! তাদেরকে) বলে দাও, তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে পলায়ন কর, তবে সে পলায়ন তোমাদের কোন কাজে আসবে না এবং সেক্ষেত্রে তোমাদেরকে (জীবনের) আনন্দ ভোগ করতে দেওয়া হবে অতি সামান্যই।
১৭

قُلۡ مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَعۡصِمُکُمۡ مِّنَ اللّٰہِ اِنۡ اَرَادَ بِکُمۡ سُوۡٓءًا اَوۡ اَرَادَ بِکُمۡ رَحۡمَۃً ؕ وَلَا یَجِدُوۡنَ لَہُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَلِیًّا وَّلَا نَصِیۡرًا ١٧

কুল মান যাল্লাযী ইয়া‘সিমুকুম মিনাল্লা-হি ইন আরা-দা বিকুম ছুূআন আও আরা-দা বিকুম রাহমাতাওঁ ওয়ালা-ইয়াজিদূ না লাহুম মিন দূ নিল্লা-হি ওয়ালিইয়াওঁ ওয়ালা-নাসীরা-।

বল, এমন কে আছে, যে তোমাদেরকে আল্লাহ হতে রক্ষা করতে পারে, যদি তিনি তোমাদের কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করেন অথবা (এমন কে আছে, যে তার রহমত ঠেকাতে পারে), যদি তিনি তোমাদের প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করেন? তারা আল্লাহ ছাড়া কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।
১৮

قَدۡ یَعۡلَمُ اللّٰہُ الۡمُعَوِّقِیۡنَ مِنۡکُمۡ وَالۡقَآئِلِیۡنَ لِاِخۡوَانِہِمۡ ہَلُمَّ اِلَیۡنَا ۚ  وَلَا یَاۡتُوۡنَ الۡبَاۡسَ اِلَّا قَلِیۡلًا ۙ ١٨

কাদ ইয়া‘লামুল্লা-হুল মু‘আওবিকীনা মিনকুম ওয়াল কাইলীনা লিইখওয়া নিহিম হালুম্মা ইলাইনা- ওয়ালা-ইয়া’তূনাল বা’ছা ইল্লা-কালীলা-।

আল্লাহ তাদেরকে ভালো করেই জানেন, তোমাদের মধ্যে যারা (জিহাদে) বাধা সৃষ্টি করে এবং নিজ ভাইদেরকে বলে, আমাদের কাছে চলে এসো ১৬ আর তারা নিজেরা তো যুদ্ধে আসে অতি সামান্যই।

তাফসীরঃ

১৬. এর দ্বারা বিশেষ এক মুনাফেকের প্রতি ইশারা করা হয়েছে। সে নিজ ঘরে পানাহারে মশগুল থাকত আর তার যে অকৃত্রিম মুসলিম ভাই যুদ্ধে যোগদানের জন্য প্রস্তুত হত তাকে তা থেকে ফেরানোর চেষ্টা করত। তাকে হতোদ্যম করার জন্য বলত, নিজেকে নিজে মুসিবতে ফেলতে যাচ্ছ কেন? তার চেয়ে আমার কাছে চলে এসো এবং আমার সাথে নিশ্চিন্তে পানাহারে শরীক হয়ে যাও। (ইবনে জারীর তাবারী)
১৯

اَشِحَّۃً عَلَیۡکُمۡ ۚۖ فَاِذَا جَآءَ الۡخَوۡفُ رَاَیۡتَہُمۡ یَنۡظُرُوۡنَ اِلَیۡکَ تَدُوۡرُ اَعۡیُنُہُمۡ کَالَّذِیۡ یُغۡشٰی عَلَیۡہِ مِنَ الۡمَوۡتِ ۚ فَاِذَا ذَہَبَ الۡخَوۡفُ سَلَقُوۡکُمۡ بِاَلۡسِنَۃٍ حِدَادٍ اَشِحَّۃً عَلَی الۡخَیۡرِ ؕ اُولٰٓئِکَ لَمۡ یُؤۡمِنُوۡا فَاَحۡبَطَ اللّٰہُ اَعۡمَالَہُمۡ ؕ وَکَانَ ذٰلِکَ عَلَی اللّٰہِ یَسِیۡرًا ١٩

আশিহহাতান ‘আলাইকুম, ফাইযা-জাআল খাওফুরাআইতাহুম ইয়ানজুরূনা ইলাইকা তাদূ রু আ‘ইউনুহুম কাল্লাযী ইউগশা-‘আলাইহি মিনাল মাওতি ফাইযা-যাহাবাল খাওফুছালাকূকুম বিআলছিনাতিন হিদা-দিন আশিহহাতান ‘আলাল খাইরি উলাইকা লাম ইউ’মিনূফাআহবাতাল্লা-হু আ‘মা-লাহুম ওয়া কা-না যা-লিকা ‘আলাল্লা-হি ইয়াছীরা-।

(এবং তাও) তোমাদের প্রতি লালায়িত হয়ে। ১৭ সুতরাং যখন বিপদ এসে পড়ে, তখন তুমি তাদেরকে দেখবে মৃত্যু ভয়ে মূর্ছিত ব্যক্তির মত তোমার দিকে ঘূর্ণিত চোখে তাকাচ্ছে। অতঃপর যখন বিপদ কেটে যায় তখন তারা অর্থের লোভে তীক্ষ্ণ ভাষায় তোমাদেরকে বিদ্ধ করে। ১৮ তারা আদৌ ঈমান আনেনি। ফলে আল্লাহ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিয়েছেন আর এটা তো আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ।

তাফসীরঃ

১৭. অর্থাৎ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও কঠোর ভাষায় মুসলিমদের কাছে গনীমতের অংশ দাবি করত।
২০

یَحۡسَبُوۡنَ الۡاَحۡزَابَ لَمۡ یَذۡہَبُوۡا ۚ  وَاِنۡ یَّاۡتِ الۡاَحۡزَابُ یَوَدُّوۡا لَوۡ اَنَّہُمۡ بَادُوۡنَ فِی الۡاَعۡرَابِ یَسۡاَلُوۡنَ عَنۡ اَنۡۢبَآئِکُمۡ ؕ  وَلَوۡ کَانُوۡا فِیۡکُمۡ مَّا قٰتَلُوۡۤا اِلَّا قَلِیۡلًا ٪ ٢۰

ইয়াহছাবূনাল আহঝা-বা লাম ইয়াযহাবূ ওয়া ইঁ ইয়া’তিল আহঝা-বুইয়াওয়াদ্দূলাও আন্নাহুম বা-দূ না ফিল আ‘রা-বি ইয়াছআলূনা ‘আন আমবাইকুম ওয়া লাও কা-নূ ফীকুম মা-কা-তালূইল্লা- কালীলা-।

তারা মনে করছে সম্মিলিত বাহিনী এখনও চলে যায়নি। তারা (পুনরায়) এসে পড়লে তারা কামনা করবে, যদি তারা দেহাতীদের মধ্যে গিয়ে বসবাস করত (এবং সেখানে থেকেই) তোমাদের খবরাখবর জেনে নিত! ১৯ আর তারা যদি তোমাদের মধ্যে থাকত, তবু যুদ্ধে অল্পই অংশগ্রহণ করত।

তাফসীরঃ

১৯. অর্থাৎ কাফের বাহিনী পরাস্ত হয়ে ফিরে যাওয়া সত্ত্বেও কাপুরুষ মুনাফেকরা তা বিশ্বাস করতে পারছিল না। তারা এমনই ভীরু যে, কাফেরদের বাহিনী পুনরায় ফিরে এসে হামলা করলে এদের কামনা হবে নগর ত্যাগ করে কোন দেশে চলে যাওয়া এবং যতদিন যুদ্ধ চলে সেখানেই বসবাস করতে থাকা আর যুদ্ধ পরিস্থিতি কী এবং মুসলিমদেরই বা অবস্থা কী সে সম্পর্কে খবর নিতে থাকা। (-অনুবাদক, তাফসীরে উসমানীর ভাবাবলম্বনে)
২১

لَقَدۡ کَانَ لَکُمۡ فِیۡ رَسُوۡلِ اللّٰہِ اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ لِّمَنۡ کَانَ یَرۡجُوا اللّٰہَ وَالۡیَوۡمَ الۡاٰخِرَ وَذَکَرَ اللّٰہَ کَثِیۡرًا ؕ ٢١

লাকাদ কা-না লাকুমফীরাছূলিল্লা-হি উছওয়াতুনহাছানাতুল লিমান কা-না ইয়ারজুল্লা-হা ওয়াল ইয়াওমাল আখিরা ওয়া যাকারাল্লা-হা কাছীরা-।

বস্তুত রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।
২২

وَلَمَّا رَاَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الۡاَحۡزَابَ ۙ  قَالُوۡا ہٰذَا مَا وَعَدَنَا اللّٰہُ وَرَسُوۡلُہٗ وَصَدَقَ اللّٰہُ وَرَسُوۡلُہٗ ۫  وَمَا زَادَہُمۡ اِلَّاۤ اِیۡمَانًا وَّتَسۡلِیۡمًا ؕ ٢٢

ওয়া লাম্মা-রাআল মু’মিনূনাল আহঝা-বা কা-লূহা-যা-মা-ওয়া‘আদানাল্লা-হু ওয়া রাছূলুহূওয়া সাদাকাল্লা-হু ওয়া রাছূলুহূ ওয়ামা-ঝা-দাহুম ইল্লাঈমা-নাওঁ ওয়া তাছলীমা-।

মুমিনগণ যখন (শত্রুদের) সম্মিলিত বাহিনীকে দেখেছিল, তখন তারা বলেছিল, এটাই সেই বিষয় যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে দিয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছিলেন। আর এ ঘটনা তাদের ঈমান ও আনুগত্যের চেতনাকে আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিল।
২৩

مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ رِجَالٌ صَدَقُوۡا مَا عَاہَدُوا اللّٰہَ عَلَیۡہِ ۚ  فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ قَضٰی نَحۡبَہٗ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ یَّنۡتَظِرُ ۫ۖ  وَمَا بَدَّلُوۡا تَبۡدِیۡلًا ۙ ٢٣

মিনাল মু’মিনীনা রিজা-লুন সাদাকূমা-‘আ-হাদুল্লা-হ ‘আলাইহি ফামিনহুম মান কাদানাহবাহূওয়া মিনহুম মাইঁ ইয়ানতাজিরু ওয়ামা-বাদ্দালূতাবদীলা-।

এই ঈমানদারদের মধ্যেই এমন লোকও আছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতিকে সত্যে পরিণত করেছে এবং তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা তাদের নজরানা আদায় করেছে এবং আছে এমন কিছু লোক, যারা এখনও প্রতীক্ষায় আছে ২০ আর তারা (তাদের ইচ্ছার ভেতর) কিছুমাত্র পরিবর্তন ঘটায়নি।

তাফসীরঃ

২০. নজরানা আদায়ের অর্থ যুদ্ধের ময়দানে শাহাদাত বরণ করা। প্রকৃত মুমিনগণ আল্লাহ তাআলার সঙ্গে ওয়াদা করেছিল, তারা তাঁর পথে প্রাণ উৎসর্গ করতে দেরি করবে না। তারপর তাদের মধ্যে কতিপয় তো প্রাণের নজরানা পেশ করে শাহাদতের পেয়ালা পান করে ফেলল এবং কতিপয় এমন যে, তারা জিহাদে তো অংশগ্রহণ করেছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত শাহাদত লাভের সুযোগ হয়নি। তারা প্রচণ্ড আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষায় আছে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদের সেই শুভক্ষণ কখন নসীব হবে, যখন তারা জান কুরবানী দিতে পারবে।
২৪

لِّیَجۡزِیَ اللّٰہُ الصّٰدِقِیۡنَ بِصِدۡقِہِمۡ وَیُعَذِّبَ الۡمُنٰفِقِیۡنَ اِنۡ شَآءَ اَوۡ یَتُوۡبَ عَلَیۡہِمۡ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ۚ ٢٤

লিয়াজঝিয়াল্লা-হুসসা-দিকীনা বিসিদকিহিম ওয়া ইউ‘আযযি বাল মুনা-ফিকীনা ইন শাআ আওঁইয়াতূবা ‘আলাইহিম ইন্নাল্লা-হা কা-না গাফূরার রাহীমা।

(এ ঘটনা ঘটানোর কারণ) আল্লাহ সত্যনিষ্ঠদেরকে তাদের সততার পুরস্কার দেবেন এবং মুনাফেকদেরকে ইচ্ছা করলে শাস্তি দেবেন অথবা তাদের তাওবা কবুল করবেন। ২১ নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

২১. অর্থাৎ যে সকল মুনাফেক তাদের মুনাফেকী হতে খাঁটি মনে তাওবা করবে, আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা কবুল করে নেবেন।
২৫

وَرَدَّ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِغَیۡظِہِمۡ لَمۡ یَنَالُوۡا خَیۡرًا ؕ  وَکَفَی اللّٰہُ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ الۡقِتَالَ ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ قَوِیًّا عَزِیۡزًا ۚ ٢٥

ওয়া রাদ্দাল্লা-হুল্লাযীনা কাফারূবিগাইজিহিম লাম ইয়ানা-লূখাইরাওঁ ওয়া কাফাল্লা-হুল মু’মিনীনাল কিতা-লা ওয়া কা-নাল্লা-হু কাবিইইয়ান ‘আঝীঝা-।

আর আল্লাহ কাফেরদেরকে তাদের ক্রোধ সহকারে এমনভাবে ফিরিয়ে দিলেন যে, তারা কোন সুফল অর্জন করতে পারল না। মুমিনদের পক্ষ হতে যুদ্ধের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী।
২৬

وَاَنۡزَلَ الَّذِیۡنَ ظَاہَرُوۡہُمۡ مِّنۡ اَہۡلِ الۡکِتٰبِ مِنۡ صَیَاصِیۡہِمۡ وَقَذَفَ فِیۡ قُلُوۡبِہِمُ الرُّعۡبَ فَرِیۡقًا تَقۡتُلُوۡنَ وَتَاۡسِرُوۡنَ فَرِیۡقًا ۚ ٢٦

ওয়া আনঝালাল্লাযীনা জা-হারূহুম মিন আহলিল কিতা-বি মিন সায়া-সীহিম ওয়া কাযাফা ফী কুলূবিহিমুর রু‘বা ফারীকান তাকতুলূনা ওয়া তা’ছিরূনা ফারীকা-।

কিতাবীদের মধ্যে যারা তাদেরকে (অর্থাৎ মুসলিমদের শত্রুদেরকে) সাহায্য করেছিল, আল্লাহ তাদেরকে তাদের দুর্গ থেকে অবতরণে বাধ্য করলেন ২২ এবং তাদের অন্তরে এমন ভীতি সঞ্চার করলেন যে, (হে মুসলিমগণ!) তাদের কতককে তো তোমরা হত্যা করছিলে আর কতককে করছিলে বন্দী।

তাফসীরঃ

২২. এর দ্বারা বনু কুরাইজার প্রতি ইশারা করা হয়েছে। এটা ছিল ইয়াহুদীদের একটি গোত্র। এ গোত্রটি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য চুক্তিবদ্ধ ছিল। কিন্তু আহযাবের যুদ্ধকালে তারা চুক্তি ভঙ্গ করে হানাদারদের সাথে চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল এবং তারা পিছন দিক থেকে মুসলিমদের উপর আঘাত হানার পরিকল্পনা করেছিল। সঙ্গত কারণেই আহযাবের যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্র মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার হুকুমে তাদের উপর আক্রমণ চালান। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা তাদের সুরক্ষিত দুর্গের ভেতর আশ্রয় নেয়। মুসলিমগণ দীর্ঘ এক মাস তাদেরকে অবরোধ করে রাখে। পরিশেষে তারা দুর্গ ত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং হযরত সাদ ইবনে মুআয (রাযি.) তাদের সম্পর্কে যে ফায়সালা দেবেন তা মেনে নেবে বলে সম্মতি জানায়। হযরত সাদ ইবনে মুআয (রাযি.) রায় দিলেন, তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধক্ষম পুরুষ তাদেরকে হত্যা করা হোক এবং নারী ও শিশুদেরকে কয়েদী বানিয়ে রাখা হোক। সুতরাং এরূপই করা হল।
২৭

وَاَوۡرَثَکُمۡ اَرۡضَہُمۡ وَدِیَارَہُمۡ وَاَمۡوَالَہُمۡ وَاَرۡضًا لَّمۡ تَطَـُٔوۡہَا ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرًا ٪ ٢٧

ওয়া আওরাছাকুম আরদাহুম ওয়া দিয়া-রাহুম ওয়া আমওলা-লাহুম ওয়া আরদাল লাম তাতাঊহা- ওয়া কা-নাল্লা-হু ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীরা-।

আল্লাহ তোমাদেরকে ওয়ারিশ বানিয়ে দিলেন তাদের ভূমি, ঘর-বাড়ি ও অর্থ-সম্পদের এবং এমন ভূমির, যা (এখনও পর্যন্ত) তোমরা পদানত করনি। ২৩ আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।

তাফসীরঃ

২৩. এর দ্বারা খায়বারের জমির দিকে ইশারা করা হয়েছে। খায়বারে বহু সংখ্যক ইয়াহুদী বাস করত এবং সেখান থেকে তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা রকম চক্রান্ত করত। এ আয়াত মুসলিমদেরকে সুসংবাদ শোনাচ্ছে যে, কিছু কালের মধ্যে খায়বারও তাদের অধিকারে চলে আসবে। সুতরাং এমনই হয়েছিল। হিজরী সপ্তম সনে সমগ্র খায়বার মুসলিমদের দখলে চলে আসে।
২৮

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ قُلۡ لِّاَزۡوَاجِکَ اِنۡ کُنۡـتُنَّ تُرِدۡنَ الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا وَزِیۡنَتَہَا فَتَعَالَیۡنَ اُمَتِّعۡکُنَّ وَاُسَرِّحۡکُنَّ سَرَاحًا جَمِیۡلًا ٢٨

ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুকুললিআঝওয়া-জিকা ইন কুনতুন্না তুরিদনাল হায়া-তাদ্দুনইয়া-ওয়া ঝীনাতাহা-ফাতা‘আ-লাইনা উমাতিত‘কুন্না ওয়া উছাররিহকুন্না ছারা-হান জামীলা-।

হে নবী! নিজ স্ত্রীদেরকে বল, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার শোভা চাও, তবে এসো আমি তোমাদেরকে কিছু উপহার সামগ্রী দিয়ে সৌজন্যের সাথে বিদায় দেই।
২৯

وَاِنۡ کُنۡـتُنَّ تُرِدۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ وَالدَّارَ الۡاٰخِرَۃَ فَاِنَّ اللّٰہَ اَعَدَّ لِلۡمُحۡسِنٰتِ مِنۡکُنَّ اَجۡرًا عَظِیۡمًا ٢٩

ওয়া ইন কনতুন্না তুরিদনাল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূওয়াদ্দা-রাল আ-খিরাতা ফাইন্নাল্লা-হা আ‘আদ্দা লিলমুহছিনা-তি মিনকুন্না আজরান ‘আজীমা-।

আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখেরাতের নিবাস কামনা কর, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীলা, তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন। ২৪

তাফসীরঃ

২৪. এ আয়াতসমূহের পটভূমি এই যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুণ্যবতী স্ত্রীগণ সম্পর্কে সকলেরই জানা তারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি পরম নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। কোন রকম কষ্টের অভিযোগ তাদের মুখে কখনও উচ্চারিত হয়নি। আহযাব ও বনু কুরাইজার যুদ্ধের পর কেবল এতটুকু ঘটেছিল যে, এসব যুদ্ধ জয়ের ফলে যখন মুসলিমদের কিছুটা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য লাভ হল, তখন উম্মত মাতাদের অন্তরে খেয়াল জাগল, এতদিন তারা যে দৈন্যদশার ভেতর দিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন, এখন তার ভেতর কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। সুতরাং একবার তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমীপে বিষয়টা উত্থাপনও করলেন। কথা প্রসঙ্গে তারা কায়সার ও কিসরার রাণীদের উদাহরণও টানলেন যে, তারা কতটা জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করে এবং তাদের প্রত্যেকের কত সেবক-সেবিকা রয়েছে। এখন যখন মুসলিমদের আর্থিক স্বচ্ছলতা এসে গেছে, তখন আমাদের খোরপোষও কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে। যদিও নবী-পত্নীদের অন্তরে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের এতটুকু চাহিদা জাগা কোন গুনাহের বিষয় ছিল না, কিন্তু শ্রেষ্ঠতম নবীর জীবনসঙ্গিনী হওয়ার সুবাদে তারা যে উচ্চতর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এরূপ চাহিদা পেশকে তাদের পক্ষে শোভন মনে করা হয়নি। সেই সঙ্গে রাজা-রাণীদের উদাহরণ টানায়ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে কষ্ট লেগে থাকবে যে, তারা নিজেদেরকে রাণীদের সঙ্গে তুলনা করার মত অমর্যাদাকর উক্তি কেন করলেন। এ প্রেক্ষাপটেই আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদের এ আয়াতসমূহ দ্বারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশনা দান করলেন যে, আপনি আপনার স্ত্রীগণকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন, তারা যদি নবীর সঙ্গে থাকতে চায়, তবে তাদের জীবনদৃষ্টির পরিবর্তন করতে হবে। অন্যান্য নারীদের মত দুনিয়ার ডাটফাট যেন তাদের লক্ষ্যবস্তু না হয়; বরং তাদের লক্ষ্যবস্তু থাকতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য এবং তার ফলশ্রুতিতে আখেরাতের সফলতা। সেই সঙ্গে তাদের সামনে এ বিষয়টাও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, তারা যদি দুনিয়ায় ভোগ-সামগ্রী কামনা করে তবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার তাদের রয়েছে। আর তারা তা চাইলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম যে তাদেরকে তিক্ততার সাথে বিদায় দেবেন তা নয়; বরং সুন্নত মোতাবেক উপঢৌকনাদি দিয়ে অত্যন্ত সৌজন্যের সাথেই তাদেরকে বিদায় দেবেন। সুতরাং এ আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ স্ত্রীগণের সামনে এ প্রস্তাবনা রাখলেন, কিন্তু তারাও তো ছিলেন নবী-পত্নী। নবীর নুরানী সান্নিধ্যে থেকে থেকে ইতোমধ্যেই তো পার্থিব মোহমুক্তি তাদের অর্জিত হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলার ও তাঁর নবীর মহব্বতে তাদের অন্তর ছিল প্লাবিত। কাজেই তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে থাকাকেই প্রাধান্য দিলেন আর সেজন্য যত দৈন্য ও দুঃখের সম্মুখীন হতে হোক না কেন তাকে তারা তুচ্ছ গণ্য করলেন।
৩০

یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ مَنۡ یَّاۡتِ مِنۡکُنَّ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ یُّضٰعَفۡ لَہَا الۡعَذَابُ ضِعۡفَیۡنِ ؕ وَکَانَ ذٰلِکَ عَلَی اللّٰہِ یَسِیۡرًا ٣۰

ইয়া-নিছাআন নাবিইয়ি মাই ইয়া’তি মিনকুন্না বিফা-হিশাতিম মুবাইয়িনাতিইঁ ইউদা‘আফ লাহাল ‘আযা-বুদি‘ফাইনি ওয়া কা-না যা-লিকা ‘আলাল্লা-হি ইয়াছীরা-।

ওহে নবী পত্নীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হলে তার শাস্তি দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে। আর আল্লাহর পক্ষে তা অতি সহজ।
৩১

وَمَنۡ یَّقۡنُتۡ مِنۡکُنَّ لِلّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ وَتَعۡمَلۡ صَالِحًا نُّؤۡتِہَاۤ اَجۡرَہَا مَرَّتَیۡنِ ۙ وَاَعۡتَدۡنَا لَہَا رِزۡقًا کَرِیۡمًا ٣١

ওয়া মাইঁ ইয়াকনুত মিনকুন্না লিল্লা-হি ওয়া রাছূলিহী ওয়া তা‘মাল সা-লিহান নু’তিহাআজরাহা-মাররাতাইনি ওয়া আ‘তাদনা-লাহা-রিঝকান কারীমা-।

আর তোমাদের মধ্যে যে-কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত হয়ে থাকবে ও সৎকর্ম করবে আমি তাকে পুরস্কারও দেব দ্বিগুণ এবং আমি তার জন্য সম্মানজনক জীবিকা প্রস্তুত করে রেখেছি।
৩২

یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۚ ٣٢

ইয়া-নিছাআন্নাবিইয়ি লাছতুন্না কাআহাদিম মিনান নিছাই ইনিত্তাকাইতুন্না ফালাতাখদা‘না বিলকাওলি ফাইয়াতমা‘আল্লাযীফীকালবিহী মারাদুওঁ ওয়া কুলনা কাওলাম মা‘রূফা-।

হে নবী পত্নীগণ! তোমরা সাধারণ নারীদের মত নও যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। ২৫ সুতরাং তোমরা কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, পাছে অন্তরে ব্যাধি আছে এমন ব্যক্তি লালায়িত হয়ে পড়ে। আর তোমরা বলো ন্যায়সঙ্গত কথা। ২৬

তাফসীরঃ

২৫. এ আয়াত নারীদেরকে গায়রে মাহরাম বা পর-পুরুষের সাথে কথা বলার নিয়ম শিক্ষা দিয়েছে। বলা হয়েছে যে, ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের সাথে মধুর ও আকর্ষণীয় ভাষায় কথা বলা উচিত নয়। তাই বলে তিক্ত ও রুক্ষ্ম ভাষা ব্যবহার করাও ঠিক নয়; বরং সাদামাটাভাবে প্রয়োজনীয় কথাটুকু বলে দেবে। এর দ্বারা অনুমান করা যায় যে, সাধারণ কথাবার্তায়ও যখন নারীদেরকে এরূপ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তখন পর-পুরুষের সামনে সুর দিয়ে কবিতা পড়া বা গান-বাদ্য করা কী পরিমাণ গর্হিত হবে!
৩৩

وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی وَاَقِمۡنَ الصَّلٰوۃَ وَاٰتِیۡنَ الزَّکٰوۃَ وَاَطِعۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ ؕ  اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیُذۡہِبَ عَنۡکُمُ الرِّجۡسَ اَہۡلَ الۡبَیۡتِ وَیُطَہِّرَکُمۡ تَطۡہِیۡرًا ۚ ٣٣

ওয়া কারনা ফী বুয়ূতিকুন্না ওয়ালা-তাবাররাজনা তাবাররুজাল জা-হিলিইয়াতিল ঊলা-ওয়া আকিমনাসসালা-তা ওয়া আতীনাঝঝাকা-তা ওয়া আতি‘নাল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূ ইন্নামাইউরীদুল্লা-হু লিইউযহিবা ‘আনকুমুর রিজছা আহলাল বাইতি ওয়া ইউতাহহিরাকুম তাতহীরা-।

নিজ গৃহে অবস্থান কর ২৭ (পর-পুরুষকে) সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না, যেমন প্রাচীন জাহেলী যুগে প্রদর্শন করা হত ২৮ এবং নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার (আহলে বাইত)! ২৯ আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে মলিনতা দূরে রাখতে এবং তোমাদেরকে সর্বতোপ্রকারে পবিত্রতা দান করতে।

তাফসীরঃ

২৭. এ আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, নারীর আসল জায়গা হল তার ঘর। এর অর্থ এমন নয় যে, ঘর থেকে বের হওয়া তার জন্য একদম জায়েয নয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস দ্বারা পরিষ্কারভাবেই জানা যায়, প্রয়োজনে তারা পর্দার সাথে বাইরে যেতে পারবে, কিন্তু এ আয়াত মূলনীতি বলে দিয়েছে যে, নারীর আসল কাজ তার গৃহে। পরিবার গঠনই তার মূল দায়িত্ব। যেসব তৎপরতা এ দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটায় তা নারী জীবনের মৌল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী এবং তা দ্বারা সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
৩৪

وَاذۡکُرۡنَ مَا یُتۡلٰی فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ مِنۡ اٰیٰتِ اللّٰہِ وَالۡحِکۡمَۃِ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ لَطِیۡفًا خَبِیۡرًا ٪ ٣٤

ওয়াযকুরনা মা-ইউতলা-ফী বুয়ূতিকুন্না মিন আ-য়া-তিল্লা-হি ওয়াল হিকমাতি ইন্নাল্লাহা কা-না লাতীফান খাবীরা-।

এবং তোমাদের গৃহে আল্লাহর যে আয়াতসমূহ ও হেকমতের কথা পাঠ করা হয়, তা স্মরণ রাখ। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী এবং সর্ববিষয়ে অবহিত।
৩৫

اِنَّ الۡمُسۡلِمِیۡنَ وَالۡمُسۡلِمٰتِ وَالۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ وَالۡقٰنِتِیۡنَ وَالۡقٰنِتٰتِ وَالصّٰدِقِیۡنَ وَالصّٰدِقٰتِ وَالصّٰبِرِیۡنَ وَالصّٰبِرٰتِ وَالۡخٰشِعِیۡنَ وَالۡخٰشِعٰتِ وَالۡمُتَصَدِّقِیۡنَ وَالۡمُتَصَدِّقٰتِ وَالصَّآئِمِیۡنَ وَالصّٰٓئِمٰتِ وَالۡحٰفِظِیۡنَ فُرُوۡجَہُمۡ وَالۡحٰفِظٰتِ وَالذّٰکِرِیۡنَ اللّٰہَ کَثِیۡرًا وَّالذّٰکِرٰتِ ۙ اَعَدَّ اللّٰہُ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃً وَّاَجۡرًا عَظِیۡمًا ٣٥

ইন্নাল মুছলিমীনা ওয়াল মুছলিমা-তি ওয়াল মু’মিনীনা ওয়াল মু’মিনা-তি ওয়াল কা-নিতীনা ওয়াল কা-নিতা-তি ওয়াসসা-দিকীনা ওয়াসসা-দিকা-তি ওয়াসসা-বিরীনা ওয়াসসা-বিরাতি ওয়াল খা-শি‘ঈনা ওয়াল খা-শি‘আ-তি ওয়াল মুতাসাদ্দিকীনা ওয়াল মুতাসাদ্দিকা-তি ওয়াসসাইমীনা ওয়াসসাইমা-তি ওয়াল হা-ফিজীনা ফুরূজাহুম ওয়াল হা-ফিজা-তি ওয়াযযা-কিরীনাল্লা-হা কাছীরাওঁ ওয়াযযা-কিরা-তি আ‘আদ্দাল্লা-হু লাহুম মাগফিরাতাওঁ ওয়া আজরান ‘আজীমা-।

নিশ্চয়ই আনুগত্য প্রকাশকারী পুরুষ ও আনুগত্য প্রকাশকারী নারী, ৩০ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, ইবাদতগোজার পুরুষ ও ইবাদতগোজার নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, আন্তরিকভাবে বিনীত পুরুষ ও আন্তরিকভাবে বিনীত নারী, ৩১ সদকাকারী পুরুষ ও সদকাকারী নারী, রোযাদার পুরুষ ও রোযাদার নারী, নিজ লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী পুরুষ ও হেফাজতকারী নারী এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও স্মরণকারী নারী আল্লাহ এদের সকলের জন্য মাগফেরাত ও মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন।

তাফসীরঃ

৩০. এটা اَلْخٰشِعِيْن (যা اَلْخُشُوْع হতে নির্গত)-এর তরজমা। এর অর্থ ‘ইবাদতকালে যাদের অন্তর বিনয়-বিগলিত হয়ে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে থাকে। সূরা ‘মুমিনুন’-এর দ্বিতীয় আয়াতে এর ব্যাখ্যা গত হয়েছে।
৩৬

وَمَا کَانَ لِمُؤۡمِنٍ وَّلَا مُؤۡمِنَۃٍ اِذَا قَضَی اللّٰہُ وَرَسُوۡلُہٗۤ اَمۡرًا اَنۡ یَّکُوۡنَ لَہُمُ الۡخِیَرَۃُ مِنۡ اَمۡرِہِمۡ ؕ  وَمَنۡ یَّعۡصِ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًا مُّبِیۡنًا ؕ ٣٦

ওয়া মা-কা-না লিমু’মিনিওঁ ওয়ালা-মু’মিনাতিন ইযা-কাদাল্লা-হু ওয়া রাছূলুহূআমরান আইঁ ইয়াকূনা লাহুমুল খিয়ারাতুমিন আমরিহিম ওয়া মাইঁ ইয়া‘সিল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূফাকাদ দাল্লা দালা-লাম মুবীনা-।

আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন বিষয়ে চূড়ান্ত ফায়সালা দান করেন, তখন কোন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর নিজেদের বিষয়ে কোন এখতিয়ার বাকি থাকে না। ৩২ কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করলে সে তো সুস্পষ্ট গোমরাহীতে পতিত হল।

তাফসীরঃ

৩২. এ আয়াত নাযিল হয়েছে এমন কয়েকটি ঘটনার পটভূমিতে, যাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকজন সাহাবীর সঙ্গে কয়েক নারীর বিবাহ সম্পন্ন করেছিলেন, কিন্তু সে বিবাহে সেই নারী বা তার অভিভাবকগণ প্রথম দিকে সম্মত থাকেনি। হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ.) সেসব ঘটনা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। সবগুলো ঘটনারই সাধারণ অবস্থা ছিল এই যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই-যেই সাহাবীর সঙ্গে বিবাহের পয়গাম দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে বিশেষ কোন দোষ ছিল না, কিন্তু সংশ্লিষ্ট নারী বা তার আত্মীয়গণ কেবল বংশীয় বা আর্থিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে প্রথম দিকে প্রস্তাব গ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছিল। অন্যদিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব সম্ভব বংশীয় ও বিত্তগত অহমিকা নির্মূল করতে চাচ্ছিলেন, যাতে মানুষ এ জাতীয় শ্রেষ্ঠত্বের কারণে বিবাহের ভালো-ভালো প্রস্তাব গ্রহণ থেকে পিছিয়ে না থাকে। শরীয়ত যদিও বর-কণের মধ্যকার সমতা ও কাফাআতের বিষয়টিকে মোটামুটিভাবে বিবেচনায় রেখেছে, কিন্তু আত্মীয়তা প্রতিষ্ঠার আরও বড় কোন আকর্ষণ যদি বর্তমান থাকে, তবে কেবল এই বিবেচনায় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা কিছুতেই সমীচীন নয় যে, খান্দানী শরাফাতের দিক থেকে বরপক্ষ কণে পক্ষের সমপাল্লার নয়। সুতরাং এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর সবগুলো ঘটনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রস্তাব গ্রহণ করে নেওয়া হয় এবং তাঁর ইচ্ছামতই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যায়। এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য হল হযরত যায়দ ইবনে হারিছা (রাযি.)-এর বিবাহের ঘটনা। পরবর্তী আয়াতসমূহ এরই সাথে সম্পৃক্ত। হযরত যায়দ (রাযি.) প্রথম দিকে হযরত খাদিজা (রাযি.)-এর গোলাম ছিলেন। তিনি তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দান করে দেন। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে গোলামীর জীবনে বহাল রাখেননি; বরং আযাদ করে তাকে নিজের পোষ্যপুত্র বানিয়ে নেন। পরবর্তী আয়াতের টীকায় এটা বিস্তারিত আসছে। আরও পরে যখন তার বিবাহের সময় আসল তখন তিনি নিজ ফুফাত বোন হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রাযি.)-এর সাথে তার বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। হযরত যয়নব (রাযি.) ছিলেন উঁচু খান্দানের মেয়ে। সেকালে কোন মুক্তিপ্রাপ্ত গোলামের সাথে এরূপ উঁচু ঘরের মেয়ের বিবাহকে ভালো চোখে দেখা হত না। স্বাভাবিকভাবেই হযরত যয়নব এ প্রস্তাবে সম্মত হতে পারেননি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়। আয়াত নাযিল হওয়ার পর তিনি পত্রপাঠ প্রস্তাবটি গ্রহণ করে নেন এবং হযরত যায়দ ইবনে হারেছা (রাযি.)-এর সঙ্গে তার বিবাহ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এ বিবাহের মোহরানা আদায় করেন। আয়াতটি যদিও এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে, কিন্তু এর শব্দাবলী সাধারণ। এটা শরীয়তের এই বুনিয়াদী মূলনীতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুমের পর কারও নিজের মতামত খাটানোর অধিকার থাকে না।
৩৭

وَاِذۡ تَقُوۡلُ لِلَّذِیۡۤ اَنۡعَمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِ وَاَنۡعَمۡتَ عَلَیۡہِ اَمۡسِکۡ عَلَیۡکَ زَوۡجَکَ وَاتَّقِ اللّٰہَ وَتُخۡفِیۡ فِیۡ نَفۡسِکَ مَا اللّٰہُ مُبۡدِیۡہِ وَتَخۡشَی النَّاسَ ۚ وَاللّٰہُ اَحَقُّ اَنۡ تَخۡشٰہُ ؕ فَلَمَّا قَضٰی زَیۡدٌ مِّنۡہَا وَطَرًا زَوَّجۡنٰکَہَا لِکَیۡ لَا یَکُوۡنَ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ حَرَجٌ فِیۡۤ اَزۡوَاجِ اَدۡعِیَآئِہِمۡ اِذَا قَضَوۡا مِنۡہُنَّ وَطَرًا ؕ وَکَانَ اَمۡرُ اللّٰہِ مَفۡعُوۡلًا ٣٧

ওয়া ইযতাকূলু লিল্লাযী আন‘আমাল্লা-হু আলাইহি ওয়াআন‘আমতা ‘আলাইহি আমছিক ‘আলাইকা ঝাওজাকা ওয়াত্তাকিল্লা-হা ওয়া তুখফী ফী নাফছিকা মাল্লা-হু মুবদীহি ওয়া তাখশান্না-ছা ওয়াল্লা-হু আহাক্কুআন তাখশা-হু ফালাম্মা-কাদা-ঝাইদুম মিন হাওয়াতারান ঝাওয়াজনা-কাহা-লিকাই লা-ইয়াকূনা ‘আলাল মু’মিনীনা হারাজুন ফীআঝওয়াজি আদ‘ইয়াইহিম ইযা-কাদাও মিনহুন্না ওয়াতারা- ওয়া কা-না আমরুল্লা-হি মাফ ‘ঊলা-।

এবং (হে রাসূল!) স্মরণ কর, যার প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন এবং তুমিও অনুগ্রহ করেছিলে, ৩৩ তাকে যখন তুমি বলছিলে, তুমি তোমার স্ত্রীকে নিজ বিবাহে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। ৩৪ তুমি নিজ অন্তরে এমন কথা গোপন করছিলে, আল্লাহ যা প্রকাশ করে দেওয়ার ছিলেন। ৩৫ তুমি মানুষকে ভয় করছিলে অথচ আল্লাহই এ বিষয়ের বেশি হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে। অতঃপর যায়দ যখন নিজ স্ত্রীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটাল তখন আমি তার সাথে তোমার বিবাহ সম্পন্ন করলাম, যাতে মুসলিমদের পক্ষে তাদের পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীগণকে বিবাহ করাতে কোন সমস্যা না থাকে, যখন তারা তাদের সাথে সম্পর্ক শেষ করে ফেলবে। আর আল্লাহর আদেশ তো কার্যকর হওয়ারই ছিল।

তাফসীরঃ

৩৩. এর দ্বারা হযরত যায়দ ইবনে হারেছা (রাযি.)কে বোঝানো হয়েছে। তার প্রতি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তো ছিল এই যে, তিনি তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে পৌঁছে দেন ও ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন। তিনি ছিলেন সেই চার সাহাবীর একজন, যারা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছিলেন, তার ব্যাখ্যা এই যে, তিনি আট বছর বয়সে নিজ মায়ের সাথে নানাবাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে কায়ন গোত্রের লোক হামলা চালিয়ে তাকে গোলাম বানিয়ে ফেলে এবং উকাজের মেলায় হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রাযি.)-এর কাছে বিক্রি করে ফেলে। তিনি তার এ শিশু গোলামটিকে নিজ ফুফু হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রাযি.)কে দিয়ে দেন। অতঃপর যখন হযরত খাদীজা (রাযি.)-এর সাথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবাহ হয়, তখন হযরত খাদীজা (রাযি.) তাকে তাঁর খেদমতে পেশ করেন। হযরত যায়দ (রাযি.)-এর বয়স তখন পনের বছর। এর কিছুকাল পর তার পিতা ও চাচা জানতে পারে যে, তাদের সন্তান মক্কা মুকাররমায় আছে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ছুটে আসল এবং আরজ করল আপনি যে কোনও বিনিময় চান আমরা দিতে রাজি আছি, তবু আমাদের সন্তানকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন। তিনি বললেন, আপনাদের ছেলে যদি আপনাদের সাথে যেতে চায়, তবে কোনরূপ বিনিময় ছাড়াই তাকে আপনাদের হাতে ছেড়ে দেব। কিন্তু সে যদি যেতে সম্মত না হয়, তবে আমি তাকে যেতে বাধ্য করতে পারব না। একথা শুনে তারা অত্যন্ত খুশী হল। তারপর হযরত যায়দ (রাযি.)কে ডাকা হল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এখতিয়ার দিলেন যে, তিনি চাইলে নিজ পিতা ও চাচার সঙ্গে যেতে পারেন এবং চাইলে থেকেও যেতে পারেন, কিন্তু হযরত যায়দ (রাযি.) এই বিস্ময়কর উত্তর দিলেন যে, আমি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারব না। একথা শুনে তার পিতা ও চাচা হতবিহ্বল হয়ে গেল। কী বলে তাদের ছেলে! স্বাধীনতার চেয়ে দাসত্বকেই সে বেশি পছন্দ করছে? নিজ পিতা ও চাচার উপর এক অনাত্মীয় ব্যক্তিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে? কিন্তু হযরত যায়দ (রাযি.) তার কথায় অনড়। তিনি বললেন, আমি আমার এ প্রভুর আচার-ব্যবহার দেখেছি। আমি তার যে ব্যবহার পেয়েছি তারপর দুনিয়ার কোনও ব্যক্তিকেই আমি তার উপর প্রাধান্য দিতে পারব না। প্রকাশ থাকে যে, এটা সেই সময়ের ঘটনা, যখনও পর্যন্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত লাভ করেননি। শেষ পর্যন্ত তার পিতা ও চাচা তাকে ছাড়াই ফিরে গেল, তবে আশ্বস্ত হয়ে গেল যে, তাদের ছেলে এখানে ভালো থাকবে। অনন্তর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আজাদ করে দিলেন এবং পবিত্র কাবার কাছে গিয়ে কুরাইশের লোকজনের সামনে ঘোষণা করে দিলেন ‘আজ থেকে সে আমার পুত্র! আমি তাকে দত্তক গ্রহণ করলাম। এরই ভিত্তিতে লোকে তাকে যায়দ ইবনে মুহাম্মাদ ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র’ বলে ডাকত।
৩৮

مَا کَانَ عَلَی النَّبِیِّ مِنۡ حَرَجٍ فِیۡمَا فَرَضَ اللّٰہُ لَہٗ ؕ  سُنَّۃَ اللّٰہِ فِی الَّذِیۡنَ خَلَوۡا مِنۡ قَبۡلُ ؕ  وَکَانَ اَمۡرُ اللّٰہِ قَدَرًا مَّقۡدُوۡرَۨا ۫ۙ ٣٨

মা-কা-না ‘আলান্নাবিইয়ি মিন হারাজিন ফীমা-ফারাদাল্লাহু লাহূ ছুন্নাতাল্লা-হি ফিল্লাযীনা খালাও মিন কাবলু ওয়া কা-না আমরুল্লা-হি কাদারাম মাকদূ রা-।

আল্লাহ নবীর জন্য যা বিধিসম্মত করেছেন, তা করাতে তার প্রতি আপত্তির কিছু নেই। পূর্বে যারা গত হয়েছে, তাদের (অর্থাৎ সেই নবীদের) ক্ষেত্রেও এটাই ছিল আল্লাহর নীতি। আল্লাহর ফায়সালা মাপাজোখা, সুনির্ধারিত হয়ে থাকে।
৩৯

الَّذِیۡنَ یُبَلِّغُوۡنَ رِسٰلٰتِ اللّٰہِ وَیَخۡشَوۡنَہٗ وَلَا یَخۡشَوۡنَ اَحَدًا اِلَّا اللّٰہَ ؕ وَکَفٰی بِاللّٰہِ حَسِیۡبًا ٣٩

আল্লাযীনা ইউবালিলাগূনা রিছা-লা-তিল্লা-হি ওয়া ইয়াখশাওনাহূওয়ালা-ইয়াখশাওনা আহাদান ইল্লাল্লা-হা ওয়া কাফা-বিল্লা-হি হাছীবা-।

(নবী তো তারা,) যারা আল্লাহর প্রেরিত বিধানাবলী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, তাঁকেই ভয় করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। হিসাব গ্রহণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।
৪০

مَا کَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنۡ رِّجَالِکُمۡ وَلٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰہِ وَخَاتَمَ النَّبِیّٖنَ ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا ٪ ٤۰

মা-কা-না মুহাম্মাদুন আবা আহাদিম মিররিজা-লিকুম ওয়ালা-কির রাছূলাল্লা-হি ওয়া খাতামান নাবিইয়ীনা ওয়াকা-নাল্লা-হু বিকুল্লি শাইয়িন ‘আলীমা-।

(হে মুমিনগণ!) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নন, কিন্তু সে আল্লাহর রাসূল এবং নবীদের মধ্যে সর্বশেষ। ৩৬ আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞাত।

তাফসীরঃ

৩৬. মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়দ ইবনে হারেছা (রাযি.)কে যেহেতু নিজের পুত্ররূপে ঘোষণা করেছিলেন, তাই লোকে তাকে যায়দ ইবনে মুহাম্মাদ (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র) বলে ডাকত। পূর্বে যেহেতু পোষ্যপুত্রকে নিজের আপন পুত্রের মত পরিচিত করতে নিষেধ করা হয়েছে, তাই হযরত যায়দকেও যায়দ ইবনে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতে নিষেধ করে দেওয়া হয়। এ আয়াতে বলা হয়েছে, তিনি কোন পুরুষের জন্মদাতা পিতা নন। (কেননা তাঁর জীবিত সন্তান ছিল কেবল কন্যাগণই। পুত্রগণ সকলে শৈশবেই ইন্তেকাল করেছিলেন)। কিন্তু আল্লাহর রাসূল হওয়ার সুবাদে তিনি সমগ্র উম্মতের রূহানী পিতা। আর তিনি যেহেতু সর্বশেষ রাসূল, কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী আসবে না তাই নিজ কর্ম দ্বারা জাহেলী যুগের সমস্ত রসম-রেওয়াজ নির্মূল করার দায়িত্ব তাঁরই উপর বর্তায়।
৪১

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اذۡکُرُوا اللّٰہَ ذِکۡرًا کَثِیۡرًا ۙ ٤١

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুযকুরুল্লা-হা যিকরান কাছীরা-।

হে মুমিনগণ! আল্লাহকে স্মরণ কর অধিক পরিমাণে।
৪২

وَّسَبِّحُوۡہُ بُکۡرَۃً وَّاَصِیۡلًا ٤٢

ওয়া ছাব্বিহূহু বুকরাতাওঁ ওয়া আসীলা-।

এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তার তাসবীহ পাঠ কর।
৪৩

ہُوَ الَّذِیۡ یُصَلِّیۡ عَلَیۡکُمۡ وَمَلٰٓئِکَتُہٗ لِیُخۡرِجَکُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ؕ وَکَانَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ رَحِیۡمًا ٤٣

হুওয়াল্লাযী ইউসাললী ‘আলাইকুম ওয়া মালাইকাতুহূলিইউখরিজাকুম মিনাজ্জুলুমা-তি ইলাননূরি ওয়া কা-না বিলমু’মিনীনা রাহীমা-।

তিনিই তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও, তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আলোতে নিয়ে আসার জন্য। তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।
৪৪

تَحِیَّتُہُمۡ یَوۡمَ یَلۡقَوۡنَہٗ سَلٰمٌ ۖۚ وَاَعَدَّ لَہُمۡ اَجۡرًا کَرِیۡمًا ٤٤

তাহিইয়াতুহুম ইয়াওমা ইয়ালকাওনাহূছালা-মুন ওয়া আ‘আদ্দা লাহুম আজরান কারীমা-।

মুমিনগণ যে দিন আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, সেদিন তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানো হবে সালাম দ্বারা। আল্লাহ তাদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।
৪৫

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ شَاہِدًا وَّمُبَشِّرًا وَّنَذِیۡرًا ۙ ٤٥

ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুইন্নাআরছালনা-কা শাহিদাওঁ ওয়া মুবাশশিরাওঁ ওয়া নাযীরা-।

হে নবী! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে
৪৬

وَّدَاعِیًا اِلَی اللّٰہِ بِاِذۡنِہٖ وَسِرَاجًا مُّنِیۡرًا ٤٦

ওয়া দা-‘ইয়ান ইলাল্লা-হি বিইযনিহী ওয়া ছিরা-জাম মুনীরা-।

এবং আল্লাহর নির্দেশে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও আলো বিস্তারকারী প্রদীপরূপে।
৪৭

وَبَشِّرِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ بِاَنَّ لَہُمۡ مِّنَ اللّٰہِ فَضۡلًا کَبِیۡرًا ٤٧

ওয়া বাশশিরিল মু’মিনীনা বিআন্না লাহুম মিনাল্লা-হি ফাদলান কাবীরা-।

মুমিনদেরকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও যে, তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে মহা অনুগ্রহ।
৪৮

وَلَا تُطِعِ الۡکٰفِرِیۡنَ وَالۡمُنٰفِقِیۡنَ وَدَعۡ اَذٰىہُمۡ وَتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ وَکَفٰی بِاللّٰہِ وَکِیۡلًا ٤٨

ওয়ালা-তুতি‘ইল কা-ফিরীনা ওয়াল মুনা-ফিকীনা ওয়াদা‘ আযা-হুম ওয়া তাওয়াক্কাল ‘আলাল্লা-হি ওয়া কাফা-বিল্লা-হি ওয়াকীলা-।

কাফের ও মুনাফেকদের আনুগত্য করো না এবং তাদের পক্ষ থেকে যে কষ্ট-ক্লেশ তোমাকে দেওয়া হয়, তা অগ্রাহ্য কর এবং আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখ। কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট।
৪৯

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا نَکَحۡتُمُ الۡمُؤۡمِنٰتِ ثُمَّ طَلَّقۡتُمُوۡہُنَّ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ تَمَسُّوۡہُنَّ فَمَا لَکُمۡ عَلَیۡہِنَّ مِنۡ عِدَّۃٍ تَعۡتَدُّوۡنَہَا ۚ فَمَتِّعُوۡہُنَّ وَسَرِّحُوۡہُنَّ سَرَاحًا جَمِیۡلًا ٤٩

ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ ইযা-নাকাহতুমুল মু’মিনা-তি ছুম্মা তাল্লাকতুমূহুন্না মিন কাবলি আন তামাছছূহুন্না ফামা-লাকুম ‘আলাইহিন্না মিন ‘ইদ্দাতিন তা‘তাদ্দূনাহা- ফামাত্তি‘ঊ হুন্না ওয়া ছাররিহূহুন্না ছারা-হান জামীলা-।

হে মুমিনগণ! তোমরা মুমিন নারীদেরকে বিবাহ করার পর তাদেরকে স্পর্শ করার আগেই তালাক দিলে তোমাদের জন্য তাদের উপর কোন ইদ্দত ওয়াজিব নয়, যা তোমাদেরকে গণনা করতে হবে। ৩৭ সুতরাং তাদেরকে কিছু উপহার সামগ্রী দিবে ৩৮ এবং সৌজন্যের সাথে তাদেরকে বিদায় করবে।

তাফসীরঃ

৩৭. ‘তাদেরকে কিছু উপহার সামগ্রী দেবে’, অর্থাৎ তালাকের মাধ্যমে বিদায় দানকালে এক জোড়া কাপড় দেবে। পরিভাষায় একে ‘মুতআ’ বলা হয়। মুতআ মোহরানার অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তার অতিরিক্ত। তালাক নিবিড় সাক্ষাতের আগে হোক বা পরে সর্বাবস্থায়ই স্ত্রীকে এটা দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। আয়াতে বোঝানো উদ্দেশ্য যে, কোন অবস্থাতেই যদি স্বামী-স্ত্রীতে বনিবনাও সম্ভব না হয় এবং তালাক দেওয়া অপরিহার্য হয়ে যায়, তবে তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের বিষয়টি শত্রুতামূলকভাবে ও কলহপূর্ণ পরিবেশে ঘটানো উচিত নয়; বরং শান্তিপূর্ণভাবে ও সৌজন্যের সাথেই সম্পন্ন করা চাই।
৫০

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِنَّاۤ اَحۡلَلۡنَا لَکَ اَزۡوَاجَکَ الّٰتِیۡۤ اٰتَیۡتَ اُجُوۡرَہُنَّ وَمَا مَلَکَتۡ یَمِیۡنُکَ مِمَّاۤ اَفَآءَ اللّٰہُ عَلَیۡکَ وَبَنٰتِ عَمِّکَ وَبَنٰتِ عَمّٰتِکَ وَبَنٰتِ خَالِکَ وَبَنٰتِ خٰلٰتِکَ الّٰتِیۡ ہَاجَرۡنَ مَعَکَ ۫ وَامۡرَاَۃً مُّؤۡمِنَۃً اِنۡ وَّہَبَتۡ نَفۡسَہَا لِلنَّبِیِّ اِنۡ اَرَادَ النَّبِیُّ اَنۡ یَّسۡتَنۡکِحَہَا ٭ خَالِصَۃً لَّکَ مِنۡ دُوۡنِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ؕ قَدۡ عَلِمۡنَا مَا فَرَضۡنَا عَلَیۡہِمۡ فِیۡۤ اَزۡوَاجِہِمۡ وَمَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُہُمۡ لِکَیۡلَا یَکُوۡنَ عَلَیۡکَ حَرَجٌ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ٥۰

ইয়াআইয়ূহান্নাবিইয়ুইন্না আহলালনা-লাকা আঝওয়া-জাকাল্লা-তীআ-তাইতা উজূরাহুন্না ওয়ামা-মালাকাত ইয়ামীনুকা মিম্মাআফা-আল্লা-হু ‘আলাইকা ওয়া বানা-তি ‘আম্মিকা ওয়া বানা-তি ‘আম্মা-তিকা ওয়া বানা-তি খা-লিকা ওয়া বানা-তি খা-লা-তিকাল্লা-তী হা-জার না মা‘আকা ওয়ামরাআতাম মু’মিনাতান ইওঁ ওয়াহাবাত নাফছাহা-লিন্নাবিইয়ি ইন আরা-দান নাবিইয়ুআইঁ ইয়াছতানকিহাহা- খালিসাতাল্লাকা মিন দূ নিল মু’মিনীনা কাদ ‘আলিমনা-মা-ফারাদনা-‘আলাইহিম ফীআঝওয়া-জিহিম ওয়ামা-মালাকাত আইমা-নুহুম লিকাইলা-ইয়াকূনা ‘আলাইকা হারাজুওঁ ওয়া কা-নাল্লা-হু গাফূরার রাহীমা-।

হে নবী! আমি তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার সেই স্ত্রীগণকে, যাদেরকে তুমি তাদের মোহরানা আদায় করে দিয়েছ। ৩৯ তাছাড়া আল্লাহ গনীমতের যে সম্পদ তোমাকে দান করেছেন তার মধ্যে যে দাসীগণ তোমার মালিকানায় এসেছে তাদেরকেও (তোমার জন্য হালাল করেছি) এবং তোমার চাচার কন্যাগণ, ফুফুর কন্যাগণ, মামার কন্যাগণ ও খালার কন্যাগণকেও, যারা তোমার সাথে হিজরত করেছে। ৪০ তাছাড়া কোন মুমিন নারী বিনা মোহরানায় নিজেকে নবীর নিকট (বিবাহের জন্য) পেশ করলে, নবী যদি তাকে বিবাহ করতে চায়, তাকেও (হালাল করেছি)। ৪১ বিশেষভাবে তোমারই জন্য, অন্য মুমিনদের জন্য নয়। মুমিনদের স্ত্রীগণ ও তাদের দাসীদের সম্পর্কে তাদের প্রতি যে বিধান আমি আরোপ করেছি, তা আমার ভালোভাবেই জানা আছে। ৪২ (আমি তা থেকে তোমাকে ব্যতিক্রম রেখেছি এজন্য), যাতে তোমার কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

৩৯. ৫০ ও ৫১ নং আয়াতে বিশেষভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত বিধানাবলী বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে প্রথম বিধান হল স্ত্রীর সংখ্যা সম্পর্কে। সাধারণ মুসলিমদের জন্য একত্রে চারের অধিক বিবাহ জায়েয নয়। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য চারের অধিক বিবাহের অনুমতি রয়েছে। এ অনুমতির অনেক তাৎপর্য আছে। বিস্তারিত জানতে ‘মাআরিফুল কুরআনে’ দেখা যেতে পারে।
৫১

تُرۡجِیۡ مَنۡ تَشَآءُ مِنۡہُنَّ وَتُــٔۡوِیۡۤ اِلَیۡکَ مَنۡ تَشَآءُ ؕ وَمَنِ ابۡتَغَیۡتَ مِمَّنۡ عَزَلۡتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکَ ؕ ذٰلِکَ اَدۡنٰۤی اَنۡ تَقَرَّ اَعۡیُنُہُنَّ وَلَا یَحۡزَنَّ وَیَرۡضَیۡنَ بِمَاۤ اٰتَیۡتَہُنَّ کُلُّہُنَّ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ مَا فِیۡ قُلُوۡبِکُمۡ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ عَلِیۡمًا حَلِیۡمًا ٥١

তুরজী মান তাশাউ মিনহুন্না ওয়া তু’বী ইলাইকা মান তাশাউ ওয়া মানিবতাগাইতা মিম্মান ‘আঝালতা ফালা-জুনা-হা ‘আলাইকা যা-লিকা আদনা আন তাকাররা আ‘ইউনুহুন্না ওয়ালা-ইয়াহঝান্না ওয়া ইয়ারদাইনা বিমাআ-তাইতাহুন্না কুল্লুহুন্না ওয়াল্লাহু ইয়া‘লামুমা-ফী কূলূবিকুম ওয়া কা-নাল্লা-হু ‘আলীমান হালীমা-।

তুমি স্ত্রীদের মধ্যে যার পালা ইচ্ছা কর মুলতবি করতে পার এবং যাকে চাও নিজের কাছে রাখতে পার। তুমি যাদেরকে পৃথক করে দিয়েছ, তাদের মধ্যে কাউকে ওয়াপস গ্রহণ করতে চাইলে তাতে তোমার কোন গুনাহ নেই, ৪৩ এ নিয়মে বেশি আশা করা যায়, তাদের চোখ জুড়াবে, তারা বেদনাহত হবে না এবং তুমি তাদেরকে যা-কিছু দেবে তাতে তারা সকলে সন্তুষ্ট থাকবে। ৪৪ তোমাদের অন্তরে যা-কিছু আছে আল্লাহ সে সম্বন্ধে অবহিত এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।

তাফসীরঃ

৪৩. এটা চতুর্থ বিধান যা বিশেষভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রযোজ্য ছিল। সাধারণভাবে মুসলিমদের জন্য বিধান হল, কারও একাধিক স্ত্রী থাকলে প্রতিটি বিষয়ে তাদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য। কাজেই এক স্ত্রীর সঙ্গে সে যত রাত যাপন করবে, সমপরিমাণ রাত অন্য স্ত্রীর সঙ্গে যাপন করতে হবে। এটা ফরয। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে এরূপ পালা নির্ধারণের আবশ্যকতা স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল। তাকে অনুমতি দেওয়া হয় যে, তিনি চাইলে কোন স্ত্রীর পালা মুলতবি করতে পারেন। প্রকাশ থাকে যে, এটাও এমন এক অনুমতি, যা দ্বারা সমগ্র জীবনে একবারও তিনি কোন সুবিধা ভোগ করেননি। তিনি সর্বদা স্ত্রীদের মধ্যে সব ব্যাপারেই সমতা রক্ষা করে চলেছেন।
৫২

لَا یَحِلُّ لَکَ النِّسَآءُ مِنۡۢ بَعۡدُ وَلَاۤ اَنۡ تَبَدَّلَ بِہِنَّ مِنۡ اَزۡوَاجٍ وَّلَوۡ اَعۡجَبَکَ حُسۡنُہُنَّ اِلَّا مَا مَلَکَتۡ یَمِیۡنُکَ ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ رَّقِیۡبًا ٪ ٥٢

লা-ইয়াহিল্লুলাকান্নিছাউ মিম বা‘দুওয়ালা আন তাবাদ্দালা বিহিন্না মিন আঝওয়া-জিওঁ ওয়ালাও আ‘জাবাকা হুছনুহুন্না ইল্লা-মা-মালাকাত ইয়ামীনুকা ওয়াকা-নাল্লা-হু ‘আলাকুল্লি শাইয়ির রাকীবা-।

এরপর অন্য নারী তোমার পক্ষে হালাল নয় এবং এটাও জায়েয নয় যে, তুমি এদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করবে, যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে। ৪৫ অবশ্য তোমার মালিকানায় যে দাসীগণ আছে (তারা তোমার জন্য হালাল)। আল্লাহ সবকিছুর উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।

তাফসীরঃ

৪৫. এ আয়াত পূর্বের দুই আয়াতের কিছুকাল পরে নাযিল হয়েছে। পূর্বে ২৮ ও ২৯ নং আয়াতে উম্মুল মুমিনীনগণকে যে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল, তার উত্তরে তো তারা সকলেই দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতার উপর আখেরাতের জীবন ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তার পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে তাঁর নবীর প্রতি এমন দুটি নির্দেশ জারি করেন, যা পুরোপুরিই তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ আনুকুল্যের পরিচায়ক। (ক) প্রথম নির্দেশ এই যে, বর্তমান স্ত্রীদের অতিরিক্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর কাউকে বিবাহ করতে পারবেন না। (খ) আর দ্বিতীয় নির্দেশ হল, বর্তমান স্ত্রীগণের মধ্যে কাউকে তালাক দিয়ে তার স্থলে অন্য কাউকে বিবাহ করতে পারবেন না। কোন কোন মুফাসসির অন্য রকম তাফসীরও করেছেন, কিন্তু উপরে যে তাফসীর করা হল তা হযরত আনাস (রাযি.) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) সহ আরও অনেকের থেকে বর্ণিত আছে (রূহুল মাআনী, বায়হাকী ও অন্যান্য গ্রন্থের বরাতে)। তাছাড়া আয়াতের শব্দাবলীর প্রতি লক্ষ্য করলে অন্যান্য তাফসীর অপেক্ষা এ তাফসীরই বেশি পরিষ্কার মনে হয়।
৫৩

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَدۡخُلُوۡا بُیُوۡتَ النَّبِیِّ اِلَّاۤ اَنۡ یُّؤۡذَنَ لَکُمۡ اِلٰی طَعَامٍ غَیۡرَ نٰظِرِیۡنَ اِنٰىہُ ۙ وَلٰکِنۡ اِذَا دُعِیۡتُمۡ فَادۡخُلُوۡا فَاِذَا طَعِمۡتُمۡ فَانۡتَشِرُوۡا وَلَا مُسۡتَاۡنِسِیۡنَ لِحَدِیۡثٍ ؕ اِنَّ ذٰلِکُمۡ کَانَ یُؤۡذِی النَّبِیَّ فَیَسۡتَحۡیٖ مِنۡکُمۡ ۫ وَاللّٰہُ لَا یَسۡتَحۡیٖ مِنَ الۡحَقِّ ؕ وَاِذَا سَاَلۡتُمُوۡہُنَّ مَتَاعًا فَسۡـَٔلُوۡہُنَّ مِنۡ وَّرَآءِ حِجَابٍ ؕ ذٰلِکُمۡ اَطۡہَرُ لِقُلُوۡبِکُمۡ وَقُلُوۡبِہِنَّ ؕ وَمَا کَانَ لَکُمۡ اَنۡ تُؤۡذُوۡا رَسُوۡلَ اللّٰہِ وَلَاۤ اَنۡ تَنۡکِحُوۡۤا اَزۡوَاجَہٗ مِنۡۢ بَعۡدِہٖۤ اَبَدًا ؕ اِنَّ ذٰلِکُمۡ کَانَ عِنۡدَ اللّٰہِ عَظِیۡمًا ٥٣

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূলা-তাদখুলূবুয়ূতান নাবিইয়ি ইল্লাআইঁ ইউ’যানা লাকুম ইলাতা‘আ-মিন গাইরা না-জিরীনা ইনা-হু ওয়ালা-কিন ইযা-দু‘ঈতুম ফাদখুলূফাইযাতা‘ইমতুম ফানতাশিরূ ওয়ালা-মুছতা’নিছীনা লিহাদীছিন ইন্না যা-লিকুম কা-না ইউ’যিন্নাবিইয়া ফাইয়াছতাহয়ী মিনকুম ওয়াল্লা-হু লা-ইয়াছতাহয়ী মিনাল হাক্কি ওয়া ইযা-ছাআলতুমূহুন্না মাতা-‘আন ফাছআলূহুন্না মিওঁ ওয়ারাই হিজা-বিন যালিকুম আতহারু লিকুলূবিকুম ওয়া কুলূবিহিন্না; ওয়ামা-কা-না লাকুম আন তু’যূরাছূলাল্লা-হি ওয়ালাআন তানকিহূআঝওয়াজাহু মিম বা‘দিহীআবাদান ইন্না যালিকুম কানা ‘ইনদালিল হি ‘আজীমা-।

হে মুমিনগণ! নবীর ঘরে (অনুমতি ছাড়া) প্রবেশ করো না। অবশ্য তোমাদেরকে আহার্যের জন্য আসার অনুমতি দেওয়া হলে ভিন্ন কথা। তখন এভাবে আসবে যে, তোমরা তা প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকবে না। কিন্তু যখন তোমাদেরকে দাওয়াত করা হয় তখন যাবে। তারপর যখন তোমাদের খাওয়া হয়ে যাবে তখন আপন-আপন পথ ধরবে; কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়বে না। ৪৬ বস্তুত তোমাদের এ আচরণ নবীকে কষ্ট দেয়, কিন্তু সে তোমাদেরকে (তা বলতে) সঙ্কোচবোধ করে। আল্লাহ সত্য বলতে সঙ্কোচবোধ করেন না। নবীর স্ত্রীগণের কাছে তোমরা কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাবে। ৪৭ এ পন্থা তোমাদের অন্তর ও তাদের অন্তর অধিকতর পবিত্র রাখার পক্ষে সহায়ক হবে। নবীকে কষ্ট দেওয়া তোমাদের জন্য জায়েয নয় এবং এটাও জায়েয নয় যে, তার (মৃত্যুর) পর তোমরা তার স্ত্রীদেরকে কখনও বিবাহ করবে। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা গুরুতর ব্যাপার।

তাফসীরঃ

৪৬. এ আয়াতে সামাজিক কিছু আদব-কেতা বর্ণিত হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হযরত যয়নব (রাযি.)কে বিবাহ করার পর ওলিমার অনুষ্ঠান করেন, সেই সময়ে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। তখন ঘটেছিল এই যে, কিছু লোক খাদ্য প্রস্তুত হওয়ার অনেক আগেই এসে বসে থাকল। আবার কিছু লোক খাওয়া-দাওয়ার পরও অনেকক্ষণ পর্যন্ত নবীগৃহে বসে গল্পে লিপ্ত থাকল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একেকটি মুহূর্ত ছিল মহা মূল্যবান। অতিথিদের দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে তাঁকেও তাদের সঙ্গে বসে থাকতে হল, যাতে তাঁর অনেক কষ্ট হল। ঘটনাটি যেহেতু ঘটেছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তাই আয়াতে বিশেষভাবে তাঁর ঘরের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এর বিধানাবলী সাধারণভাবে সকলের জন্যই প্রযোজ্য। এতে আদব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, (ক) কারও ঘরে তার অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না। (খ) কেউ খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করলে অতিথির এমন কোন পন্থা অবলম্বন করা উচিত নয়, যা মেজবানের পক্ষে পীড়াদায়ক। সুতরাং খাওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে গিয়ে বসে থাকবে না। আবার খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘক্ষণ বসে আলাপ-সালাপে মেতে থাকবে না। এতে নিমন্ত্রণকারীর কাজকর্ম বিঘ্নিত হয় ও সে কষ্ট পায়। এসব ইসলামী তাহযীব ও আদব-কায়দার পরিপন্থী।
৫৪

اِنۡ تُبۡدُوۡا شَیۡئًا اَوۡ تُخۡفُوۡہُ فَاِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا ٥٤

ইন তুবদূশাইআন আও তুখফূহু ফাইন্নাল্লা-হা কা-না বিকুল্লি শাইয়িন ‘আলীমা-।

তোমরা কোন বিষয় প্রকাশ কর বা তা গোপন রাখ, আল্লাহ তো প্রতিটি বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন।
৫৫

لَا جُنَاحَ عَلَیۡہِنَّ فِیۡۤ اٰبَآئِہِنَّ وَلَاۤ اَبۡنَآئِہِنَّ وَلَاۤ اِخۡوَانِہِنَّ وَلَاۤ اَبۡنَآءِ اِخۡوَانِہِنَّ وَلَاۤ اَبۡنَآءِ اَخَوٰتِہِنَّ وَلَا نِسَآئِہِنَّ وَلَا مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُہُنَّ ۚ وَاتَّقِیۡنَ اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ شَہِیۡدًا ٥٥

লা-জুনা-হা‘আলাইহিন্না ফীআ-বাইহিন্না ওয়ালাআবনাইহিন্না ওয়ালা ইখওয়ানিহিন্না ওয়ালাআবনাই ইখওয়া-নিহিন্না ওয়ালাআবনাই আখাওয়া-তিহিন্না ওয়ালানিছাইহিন্না ওয়ালা-মা-মালাকাত আইমা-নুহুন্না, ওয়াত্তাকীনাল্লা-হা ইন্নাল্লা-হা কা-না ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন শাহীদা-।

নবীর স্ত্রীগণের জন্য তাদের পিতাগণ, তাদের পুত্রগণ, তাদের ভাইগণ, তাদের ভাতিজাগণ, তাদের ভাগিনাগণ, তাদের আপন নারীগণ ৪৮ ও তাদের দাসীগণের ক্ষেত্রে (অর্থাৎ তাদের সামনে পর্দাহীনভাবে আসাতে) কোন গুনাহ নেই এবং (হে নারীগণ!) তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিটি বস্তুর প্রত্যক্ষকারী।

তাফসীরঃ

৪৮. ‘তাদের আপন নারীগণ’ সূরা নূরেও (২৪ : ৩১) এরূপ গত হয়েছে। কোন কোন মুফাসসিরের মতে এর দ্বারা মুসলিম নারীগণকে বোঝানো হয়েছে। সুতরাং অমুসলিম নারীদের থেকেও পর্দা করা জরুরী। কিন্তু যেহেতু বিভিন্ন হাদীস দ্বারা জানা যায়, অমুসলিম নারীগণ উম্মুল মুমিনীনদের কাছে যাতায়াত করত, তাই ইমাম রাযী (রহ.) ও আল্লামা আলুসী (রহ.) বলেন, ‘আপন নারী’ হল সেই সকল নারী, যাদের সাথে মেলামেশা করা হয়, তারা মুসলিম হোক বা অমুসলিম। এরূপ নারীদের সাথে নারীদের পর্দা করা ওয়াজিব নয়। এছাড়া আরও যাদের সঙ্গে পর্দা ওয়াজিব নয়, তার বিস্তারিত বিবরণ সূরা নুরের ২৪ : ৩১ নং আয়াতের টীকায় গত হয়েছে।
৫৬

اِنَّ اللّٰہَ وَمَلٰٓئِکَتَہٗ یُصَلُّوۡنَ عَلَی النَّبِیِّ ؕ یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا صَلُّوۡا عَلَیۡہِ وَسَلِّمُوۡا تَسۡلِیۡمًا ٥٦

ইন্নাল্লা-হা ওয়া-মালাইকাতাহূইউসাললূনা ‘আলান নাবিইয়ি ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আমানূসাললূ‘আলাইহি ওয়া ছালিলমূতাছলীমা-।

নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ পাঠান। ৪৯ হে মুমিনগণ! তোমরাও তার প্রতি দরূদ পাঠাও এবং অধিক পরিমাণে সালাম পাঠাও।

তাফসীরঃ

৪৯. ‘দরূদ পাঠান’ কুরআন মাজীদে ব্যবহৃত শব্দ হল সালাত। ‘নবীর প্রতি সালাত’ এর অর্থ হল নবীর প্রতি দয়া ও মমতা দেখানো, তাঁর প্রশংসা করা ও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন। এই সালাত পাঠানো তথা নবীর প্রতি দয়া ও মমতা দেখানো এবং প্রশংসা করা ও সম্মান প্রদর্শনকে বুঝতে হবে এর কর্তার শান মোতাবেক। এ আয়াতে বলা হয়েছে সালাত পাঠানোর কাজটি আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণ করেন, তারপর মুমিনদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তোমরাও নবীর প্রতি সালাত পাঠাও। তাহলে সালাত পাঠানোর এক কর্তা তো আল্লাহ তাআলা, দ্বিতীয় কর্তা ফেরেশতাগণ এবং তৃতীয় কর্তা মুমিনগণ। এ তিনের প্রত্যেকের শান মোতাবেকই সালাতের মর্ম নির্ধারিত হবে। উলামায়ে কেরাম বলেন, আল্লাহর সালাত হল রহমত বর্ষণ, ফেরেশতাদের সালাত হল ইসতিগফার আর মুমিনদের সালাত হল রহমত বর্ষণের দুআ (-অনুবাদক তাফসীরে উসমানী থেকে সংক্ষেপিত)।
৫৭

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ لَعَنَہُمُ اللّٰہُ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ وَاَعَدَّ لَہُمۡ عَذَابًا مُّہِیۡنًا ٥٧

ইন্নাল্লাযীনা ইউ’যূ নাল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূলা‘আনাহুমল্লা-হুফিদ্দুনইয়া-ওয়াল আ-খিরাতি ওয়া আ‘আদ্দা লাহুম ‘আযা-বাম মুহীনা-।

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের উপর লানত করেছেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন লাঞ্ছনাকর শাস্তি।
৫৮

وَالَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ بِغَیۡرِ مَا اکۡتَسَبُوۡا فَقَدِ احۡتَمَلُوۡا بُہۡتَانًا وَّاِثۡمًا مُّبِیۡنًا ٪ ٥٨

ওয়াল্লাযীনা ইউ’যূ নাল মু’মিনীনা ওয়াল মু’মিনা-তি বিগাইরি মাকতাছাবূফাকাদিহতামালূ বুহতানাওঁ ওয়া ইছমাম মুবীনা-।

যারা মুমিন নর ও মুমিন নারীদেরকে বিনা অপরাধে কষ্ট দান করে, তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।
৫৯

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ قُلۡ لِّاَزۡوَاجِکَ وَبَنٰتِکَ وَنِسَآءِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ یُدۡنِیۡنَ عَلَیۡہِنَّ مِنۡ جَلَابِیۡبِہِنَّ ؕ ذٰلِکَ اَدۡنٰۤی اَنۡ یُّعۡرَفۡنَ فَلَا یُؤۡذَیۡنَ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ٥٩

ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুকুল লিআঝওয়া-জিকা ওয়া বানা-তিকা ওয়ানিছাইল মু’মিনীনা ইউদনীনা ‘আলাইহিন্না মিন জালাবীবিহিন্না যা-লিকা আদনাআইঁ ইউ‘রাফনা ফালাইউ’যাইনা ওয়া কা-নাল্লা-হু গাফূরার রাহীমা-।

হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের ও মুমিন নারীদেরকে বলে দাও, তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের (মুখের) উপর নামিয়ে দেয়। ৫০ এ পন্থায় তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। ৫১ আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

৫০. এ আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পর্দার হুকুম কেবল নবী-পত্নীদের জন্য বিশেষ নয়; বরং সমস্ত মুসলিম নারীদের জন্য ব্যাপক। তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যখন কোন প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যায়, তখন যেন তাদের চাদর মুখের উপর টেনে দেয় এবং এভাবে তাদের চেহারা ঢেকে রাখে। বোঝা যাচ্ছে, পথ-ঘাট দেখার জন্য কেবল চোখ খোলা থাকবে এবং তা বাদে চেহারার অবশিষ্টাংশ ঢেকে রাখবে। এর এক পদ্ধতি তো এই হতে পারে যে, যে কাপড় দ্বারা সমগ্র শরীর ঢাকা যায়, তার একাংশ চেহারায় এমনভাবে পেচিয়ে দেওয়া হবে, যাতে চোখ ছাড়া আর কিছু খোলা না থাকে। আবার এমনও হতে পারে যে, এজন্য আলাদা নেকাব ব্যবহার করা হবে।
৬০

لَئِنۡ لَّمۡ یَنۡتَہِ الۡمُنٰفِقُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ مَّرَضٌ وَّالۡمُرۡجِفُوۡنَ فِی الۡمَدِیۡنَۃِ لَنُغۡرِیَنَّکَ بِہِمۡ ثُمَّ لَا یُجَاوِرُوۡنَکَ فِیۡہَاۤ اِلَّا قَلِیۡلًا ۖۛۚ ٦۰

লাইল্লাম ইয়ানতাহিল মুনা-ফিকূনা ওয়াল্লাযীনা ফী কুলূবিহমি মারাদুওঁ ওয়াল মুরজিফূনা ফিল মাদীনাতি লানুগরিয়ান্নাকা বিহিম ছুম্মা লা-ইউজা-বিরূনাকা ফীহাইল্লা-কালীলা-।

মুনাফেকগণ, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে এবং যারা নগরে গুজব রটিয়ে বেড়ায় তারা যদি বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করাব, ফলে তারা এ নগরে তোমার সাথে অল্প কিছুদিনই অবস্থান করতে পারবে
৬১

مَّلۡعُوۡنِیۡنَ ۚۛ اَیۡنَمَا ثُقِفُوۡۤا اُخِذُوۡا وَقُتِّلُوۡا تَقۡتِیۡلًا ٦١

মাল‘ঊনীনা আইনামা-ছূকিফূ উখিযূওয়াকুত্তিলূতাকতীলা-।

অভিশপ্তরূপে। অতঃপর তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে পাকড়াও করা হবে এবং তাদেরকে এক-এক করে হত্যা করা হবে। ৫২

তাফসীরঃ

৫২. এ আয়াতে মুনাফেকদেরকে সাবধান করা হয়েছে যে, এখন তো তাদের মুনাফেকী গোপন আছে, কিন্তু তারা যদি নারীদেরকে উত্যক্ত করা ও ভিত্তিহীন গুজব রটনা করে বেড়ানো ইত্যাদি অশোভন কার্যকলাপ থেকে বিরত না হয়, তবে তাদের মুখোশ খুলে দেওয়া হবে এবং তখন তাদের সাথেও কাফের শত্রুদের মত আচরণ করা হবে।
৬২

سُنَّۃَ اللّٰہِ فِی الَّذِیۡنَ خَلَوۡا مِنۡ قَبۡلُ ۚ وَلَنۡ تَجِدَ لِسُنَّۃِ اللّٰہِ تَبۡدِیۡلًا ٦٢

ছুন্নাতাল্লা-হি ফিল্লাযীনা খালাও মিন কাবলু ওয়ালান তাজিদা লিছুন্নাতিল্লা-হি তাবদীলা-।

এটা আল্লাহর রীতি, যা পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও কার্যকর ছিল। তুমি কখনই আল্লাহর রীতিতে কোনরূপ পরিবর্তন পাবে না। ৫৩

তাফসীরঃ

৫৩. আল্লাহ তাআলার রীতি দ্বারা এস্থলে বোঝানো উদ্দেশ্য যে, যারা পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে বেড়ায়, তাদেরকে প্রথমে সাবধান করা হয়, তারপরও তারা বিরত না হলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।
৬৩

یَسۡـَٔلُکَ النَّاسُ عَنِ السَّاعَۃِ ؕ قُلۡ اِنَّمَا عِلۡمُہَا عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ وَمَا یُدۡرِیۡکَ لَعَلَّ السَّاعَۃَ تَکُوۡنُ قَرِیۡبًا ٦٣

ইয়াছআলুকান্না-ছু‘আনিছছা-‘আতি কুল ইন্নামা- ‘ইলমুহা-‘ইনদাল্লা-হি ওয়ামাইউদরীকা লা‘আল্লাছছা-‘আতা তাকূনুকারীবা-।

লোকে তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এর জ্ঞান কেবল আল্লাহরই কাছে আছে। তোমার কী করে জানা থাকবে? হয়ত কিয়ামত নিকটেই এসে পড়েছে।
৬৪

اِنَّ اللّٰہَ لَعَنَ الۡکٰفِرِیۡنَ وَاَعَدَّ لَہُمۡ سَعِیۡرًا ۙ ٦٤

ইন্নাল্লা-হা লা‘আনাল কা-ফিরীনা ওয়া আ‘আদ্দা লাহুম ছা‘ঈরা-।

নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদেরকে তাঁর রহমত থেকে বিতাড়িত করেছেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত আগুন।
৬৫

خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ۚ  لَا یَجِدُوۡنَ وَلِیًّا وَّلَا نَصِیۡرًا ۚ ٦٥

খা-লিদীনা ফীহাআবাদাল লা-ইয়াজিদূ না ওয়ালিইয়াওঁ ওয়া নাসীরা-।

তাতে তারা সর্বদা এভাবে থাকবে যে, তারা কোন অভিভাবক পাবে না এবং সাহায্যকারীও না।
৬৬

یَوۡمَ تُقَلَّبُ وُجُوۡہُہُمۡ فِی النَّارِ یَقُوۡلُوۡنَ یٰلَیۡتَنَاۤ اَطَعۡنَا اللّٰہَ وَاَطَعۡنَا الرَّسُوۡلَا ٦٦

ইয়াওমা তুকাল্লাবু উজূহুহুম ফিন্না-রি ইয়াকূ লূনা ইয়া-লাইতানা-আতা‘নাল্লাহা ওয়াআতা‘নাররাছূলা-।

যে দিন আগুনে তাদের চেহারা ওলট-পালট করে ফেলা হবে, তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রাসূলের কথা মানতাম!
৬৭

وَقَالُوۡا رَبَّنَاۤ اِنَّاۤ اَطَعۡنَا سَادَتَنَا وَکُبَرَآءَنَا فَاَضَلُّوۡنَا السَّبِیۡلَا ٦٧

ওয়া কা-লূ রাব্বানা ইন্না আতা‘না-ছা-দাতানা- ওয়াকুবারাআনা-ফাআদাললূনাছ ছাবীলা-।

এবং বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের নেতৃবর্গ ও আমাদের গুরুজনদের আনুগত্য করেছিলাম, তারাই আমাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছে।
৬৮

رَبَّنَاۤ اٰتِہِمۡ ضِعۡفَیۡنِ مِنَ الۡعَذَابِ وَالۡعَنۡہُمۡ لَعۡنًا کَبِیۡرًا ٪ ٦٨

রাব্বানাআ-তিহিম দি‘ফাইনি মিনাল ‘আযা-বি ওয়াল ‘আনহুম লা‘নান কাবীরা-।

হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদের প্রতি লানত করুন, মহা লানত।
৬৯

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ اٰذَوۡا مُوۡسٰی فَبَرَّاَہُ اللّٰہُ مِمَّا قَالُوۡا ؕ  وَکَانَ عِنۡدَ اللّٰہِ وَجِیۡہًا ؕ ٦٩

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূলা-তাকূনূকাল্লাযীনা আ-যাও মূছা-ফাবাররাআহুল্লা-হু মিম্মা-কা-লূ ওয়া কা-না ‘ইনদাল্লা-হি ওয়াজীহা-।

হে মুমিনগণ! তাদের মত হয়ো না, যারা মূসাকে কষ্ট দিয়েছিল, অতঃপর আল্লাহ তারা যা রটনা করেছিল, তা হতে তাকে নির্দোষ প্রমাণ করেন। ৫৪ সে ছিল আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাবান।

তাফসীরঃ

৫৪. বনী ইসরাঈল হযরত মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে নানা রকমের কথা প্রচার করত ও ভিত্তিহীন সব অভিযোগ তার সম্পর্কে উত্থাপন করত। এভাবে তারা তাকে কষ্ট দিয়ে বেড়াত। এই উম্মতকে বলা হচ্ছে, তাদের মত আচরণ যেন তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে না করে।
৭০

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا سَدِیۡدًا ۙ ٧۰

ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুত্তাকুল্লা-হা ওয়াকূলূকাওলান ছাদীদা-।

হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্য-সঠিক কথা বল।
৭১

یُّصۡلِحۡ لَکُمۡ اَعۡمَالَکُمۡ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَمَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ فَقَدۡ فَازَ فَوۡزًا عَظِیۡمًا ٧١

ইউসলিহলাকুম আ‘মা-লাকুম ওয়া ইয়াগফিরলাকুম যুনূবাকুম ওয়া মাইঁ ইউতি‘ইল্লা-হা ওয়া রাছুলাহূফাকাদ ফা-ঝা ফাওঝান ‘আজীমা-।

তাহলে আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী শুধরে দেবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে সে মহা সাফল্য অর্জন করল।
৭২

اِنَّا عَرَضۡنَا الۡاَمَانَۃَ عَلَی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَالۡجِبَالِ فَاَبَیۡنَ اَنۡ یَّحۡمِلۡنَہَا وَاَشۡفَقۡنَ مِنۡہَا وَحَمَلَہَا الۡاِنۡسَانُ ؕ  اِنَّہٗ کَانَ ظَلُوۡمًا جَہُوۡلًا ۙ ٧٢

ইন্না-‘আরাদনাল আমা-নাতা ‘আলাছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিওয়াল জিবা-লি ফাআবাইনা আইঁ ইয়াহমিলনাহা-ওয়া আশফাকনা মিনহা-ওয়া হামালাহাল ইনছা-নু ইন্নাহূকা-না জালূমান জাহূলা-।

আমি আমানত পেশ করেছিলাম আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পাহাড়-পর্বতের সামনে। তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল ও তাতে শঙ্কিত হল আর তা বহন করে নিল মানুষ। ৫৫ বস্তুত সে ঘোর জালেম, ঘোর অজ্ঞ। ৫৬

তাফসীরঃ

৫৫. এস্থলে আমানত অর্থ ‘নিজের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ মেনে চলার যিম্মাদারী গ্রহণ’। বিশ্বজগতে আল্লাহ তাআলার কিছু বিধান তো সৃষ্টিগত বা প্রাকৃতিক (তাকবীনী), যা মেনে চলতে সমস্ত সৃষ্টি বাধ্য; কারও পক্ষে তা অমান্য করা সম্ভবই নয়। যেমন জীবন ও মৃত্যু সংক্রান্ত ফায়সালা। কিন্তু আল্লাহ তাআলা চাইলেন এমন কিছু বিধান দিতে যা সৃষ্টি তার স্বাধীন ইচ্ছা বলে মান্য করবে। এজন্য তিনি তার কোন-কোন সৃষ্টির সামনে এই প্রস্তাবনা রাখলেন যে, কিছু বিধানের ব্যাপারে তাদেরকে এখতিয়ার দেওয়া হবে। চাইলে তারা নিজ ইচ্ছায় সেসব বিধান মেনে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করবে কিংবা চাইলে তা অমান্য করবে। মান্য করলে তারা জান্নাতের স্থায়ী নি‘আমত লাভ করবে আর যদি অমান্য করে তবে তাদেরকে জাহান্নামে শাস্তি দেওয়া হবে। যখন এ প্রস্তাব আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে রাখা হল, তারা এ যিম্মাদারী গ্রহণ করতে ভয় পেয়ে গেল ফলে তারা এটা গ্রহণ করল না। ভয় পেল এ কারণে যে, এর পরিণতিতে জাহান্নামে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু যখন মানুষকে এ প্রস্তাব দেওয়া হল, তারা এটা গ্রহণ করে নিল। আসমান, যমীন ও পাহাড় আপাতদৃষ্টিতে যদিও এমন বস্তু, যাদের কোন বোধশক্তি নেই, কিন্তু কুরআন মাজীদের কয়েকটি আয়াত দ্বারা জানা যায়, তাদের মধ্যে এক পর্যায়ের বোধশক্তি আছে, যেমন সূরা বনী ইসরাঈলে (১৭ : ৪৪) গত হয়েছে। সুতরাং এসব সৃষ্টিকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল সেটা যদি প্রতীকী অর্থে না হয়ে বাস্তব অর্থে হয় এবং তাদের অস্বীকৃতিও হয় একই অর্থে, তাতে আপত্তির কোন অবকাশ নেই। অবশ্য এটাও সম্ভব যে, আমানত গ্রহণের প্রস্তাব দান ও তাদের প্রত্যাখ্যান প্রতীকী অর্থে হয়েছিল। অর্থাৎ আমানত বহনের যোগ্যতা না থাকাকে প্রত্যাখ্যান শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সূরা আরাফের ১৭২ নং আয়াত (৭ : ১৭২) ও তার টীকা দেখে নেওয়া যেতে পারে।
৭৩

لِّیُعَذِّبَ اللّٰہُ الۡمُنٰفِقِیۡنَ وَالۡمُنٰفِقٰتِ وَالۡمُشۡرِکِیۡنَ وَالۡمُشۡرِکٰتِ وَیَتُوۡبَ اللّٰہُ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ٪ ٧٣

লিইউ‘আযযি বাল্লা-হুল মুনা-ফিকীনা ওয়াল মুনাফিকা-তি ওয়াল মুশরিকীনা ওয়াল মুশরিকা-তি ওয়া ইয়াতূবাল্লা-হু ‘আলাল মু’মিনীনা ওয়াল মু’মিনা-তি ওয়াকা-নাল্লা-হু গাফূরার রাহীমা-।

পরিণামে আল্লাহ মুনাফেক পুরুষ ও মুনাফেক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদেরকে শাস্তিদান করবেন আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।