সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা আল ওয়াক্বিয়াহ্‌ (الواقيـة) | নিশ্চিত ঘটনা

মাদানী

মোট আয়াতঃ ৯৬

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

اِذَا وَقَعَتِ الۡوَاقِعَۃُ ۙ ١

ইযা-ওয়াকা‘আতিল ওয়া-কি‘আহ।

যখন অবশ্যম্ভাবী ঘটনা ঘটবে,

তাফসীরঃ

১. এ আয়াতে কিয়ামতকে ‘ওয়াকিআ’ বা ঘটনা শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ আজ তো কাফেরগণ কিয়ামতকে অবিশ্বাস করছে। কিন্তু যে দিন সে ঘটনা ঘটবে, সে দিন কেউ তা অস্বীকার করতে পারবে না।

لَیۡسَ لِوَقۡعَتِہَا کَاذِبَۃٌ ۘ ٢

লাইছা লিওয়াক‘আতিহা-কা-যিবাহ।

তখন এর সংঘটনকে অস্বীকার করার কেউ থাকবে না।

خَافِضَۃٌ رَّافِعَۃٌ ۙ ٣

খা-ফিদাতুর রাফি‘আহ।

তা নিচু ও উঁচুকারক জিনিস।

তাফসীরঃ

২. অর্থাৎ একদলকে নিচে নামাবে এক দলকে উঁচুতে নেবে। দুনিয়ায় যারা অহংকার করত, যাদেরকে বড় উঁচু তবকার লোক মনে করা হত, তাদেরকে ধ্বংসের তলদেশে জাহান্নামের গর্তে নিয়ে যাবে আর যারা বিনয় অবলম্বন করত, যাদেরকে নিচ তলার মানুষ মনে করে ছোট চোখে দেখা হত, ঈমান ও সৎকর্মের বদৌলতে তারা জান্নাতের উচ্চ স্তরে পৌঁছে যাবে। -অনুবাদক

اِذَا رُجَّتِ الۡاَرۡضُ رَجًّا ۙ ٤

ইযা-রুজ্জাতিল আরদুরাজ্জা-।

যখন পৃথিবীকে প্রবল কম্পনে কাঁপিয়ে দেওয়া হবে।

وَّبُسَّتِ الۡجِبَالُ بَسًّا ۙ ٥

ওয়া বুছছাতিল জিবা-লুবাছছা-।

এবং পর্বতসমূহকে পিষে চূর্ণ করা হবে।

فَکَانَتۡ ہَبَآءً مُّنۡۢبَثًّا ۙ ٦

ফাকা-নাত হাবাআম মুমবাছছা-।

ফলে তা বিক্ষিপ্ত ধুলোকণায় পরিণত হবে।

وَّکُنۡتُمۡ اَزۡوَاجًا ثَلٰثَۃً ؕ ٧

ওয়া কুনতুম আঝওয়া-জান ছালা-ছাহ।

এবং (হে মানুষ!) তোমরা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হবে।

فَاَصۡحٰبُ الۡمَیۡمَنَۃِ ۬ۙ  مَاۤ اَصۡحٰبُ الۡمَیۡمَنَۃِ ؕ ٨

ফাআসহা-বুল মাইমানাতি মাআসহা-বুল মাইমানাহ।

সুতরাং যারা ডান হাত বিশিষ্ট, আহা, কেমন যে সে ডান হাত বিশিষ্টগণ!

তাফসীরঃ

৩. ‘ডান হাত বিশিষ্টগণ’ হল সেই ভাগ্যবান মুমিনগণ, যারা তাদের ডান হাতে আমলনামা লাভ করবে। সেটা প্রমাণ করবে যে, তারা ঈমানদার এবং তারা জান্নাতে যাবে। [এর এক তরজমা হতে পারে “ডান দিকের দল”। অর্থাৎ যারা আরশের ডান দিকে থাকবে এবং প্রতিশ্রুতি গ্রহণকালে যাদেরকে হযরত আদম আলাইহিস সালামের ডান পাঁজর থেকে বের করা হয়েছিল। এদের সম্পর্কে মিরাজের হাদীসে আছে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম তাঁর ডান দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন -অনুবাদক, তাফসীরে উছমানী থেকে সংক্ষেপিত।]

وَاَصۡحٰبُ الۡمَشۡـَٔمَۃِ ۬ۙ  مَاۤ اَصۡحٰبُ الۡمَشۡـَٔمَۃِ ؕ ٩

ওয়া আসহা-বুল মাশআমাতি মাআসহা-বুল মাশআমাহ ।

আর যারা বাম হাত বিশিষ্ট, কী (হতভাগ্য) সে বাম হাত বিশিষ্টগণ!

তাফসীরঃ

৪. ‘বাম হাতবিশিষ্ট’ তারা, যাদের আমলনামা দেওয়া হবে বাম হাতে। এটা হবে তাদের কুফরের আলামত। [এর অন্য তরজমা হতে পারে ‘বাম দিকের দল’, অর্থাৎ যারা আরশের বাম দিকে থাকবে। প্রতিশ্রুতি গ্রহণকালে তাদেরকে হযরত আদম আলাইহিস সালামের বাম পাঁজর থেকে বের করা হয়েছিল। এদেরই সম্পর্কে মিরাজের হাদীসে আছে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম যখন তাঁর বাম দিকে তাকাচ্ছিলেন, তখন কাঁদছিলেন -অনুবাদক, তাফসীরে উছমানী থেকে গৃহীত]।
১০

وَالسّٰبِقُوۡنَ السّٰبِقُوۡنَ ۚۙ ١۰

ওয়াছছা-বিকূনাছছা-বিকূন।

আর যারা অগ্রগামী, তারা তো অগ্রগামীই!

তাফসীরঃ

৫. অগ্রগামীদের দ্বারা নবী-রাসূলগণ ও এমন সব মুত্তাকীকে বোঝানো হয়েছে, যারা তাকওয়া-পরহেজগারীর সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত।
১১

اُولٰٓئِکَ الۡمُقَرَّبُوۡنَ ۚ ١١

উলাইকাল মুকাররাবূন।

তারাই আল্লাহর বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা।
১২

فِیۡ جَنّٰتِ النَّعِیۡمِ ١٢

ফী জান্না-তিন না‘ঈম।

তারা থাকবে নি‘আমতপূর্ণ উদ্যানে।
১৩

ثُلَّۃٌ مِّنَ الۡاَوَّلِیۡنَ ۙ ١٣

ছু ল্লাতুম মিনাল আওওয়ালীন।

বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে
১৪

وَقَلِیۡلٌ مِّنَ الۡاٰخِرِیۡنَ ؕ ١٤

ওয়া কালীলুম মিনাল আ-খিরীন।

এবং অল্প সংখ্যক পরবর্তীদের মধ্য হতে।

তাফসীরঃ

৬. অর্থাৎ সর্বোচ্চ স্তরের লোকদের অধিকাংশই হবে প্রাচীন কালের নবী-রাসূল ও মুত্তাকীগণ। পরবর্তীকালের লোকদের মধ্যেও সেই স্তরের লোক থাকবে বটে, কিন্তু তাদের সংখ্যা হবে কম। [পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বলে ঠিক কাদের বোঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে দু’টি মত আছে। (ক) পূর্ববর্তী হল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বের উম্মতগণ আর পরবর্তী হচ্ছে তাঁর উম্মত। এ হিসেবে অর্থ দাঁড়ায়, পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরের মুত্তাকীর সংখ্যা বেশি ছিল। তাদের সংখ্যা এই উম্মতের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম। (খ) পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উভয়ই এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এই উম্মতের প্রথম দিকের লোকদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরের মুত্তাকীর সংখ্যা পরবর্তীকালের লোকদের চেয়ে বেশি। ইবনে কাছীর (রহ.) এই সম্ভাবনাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। রূহুল মাআনীতে তাবারানীর বরাতে হযরত আবু বাকরা (রাযি.) বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, তারা উভয়ই এ উম্মতের অন্তর্ভুক্ত’। তাছাড়া এক প্রসিদ্ধ হাদীসে আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগ এবং তারপর তাদের পরবর্তী যুগ। ইতিহাসও প্রমাণ করে, সাহাবায়ে কেরাম তো সকলেই এবং তাদের পরে তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনের যুগে এত বেশি সংখ্যক মানুষ তাকওয়া-পরহেজগারীর সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন, যেমনটা তাদের পরে দেখা যায়নি এবং সে সংখ্যা ক্রমশ কমেই আসছে। সুতরাং এটাই বেশি সঠিক মনে হয় যে, আয়াতে এ উম্মতেরই প্রথম দিকের ও শেষের দিকের মানুষকে বোঝানো হয়েছে (-অনুবাদক, তাফসীরে রূহুল মাআনী ও তাফসীরে উছমানী অবলম্বনে)।
১৫

عَلٰی سُرُرٍ مَّوۡضُوۡنَۃٍ ۙ ١٥

‘আলা-ছুরুরিমমাওদূ নাহ।

সোনার তারে বোনা উঁচু আসনে
১৬

مُّتَّکِـِٕیۡنَ عَلَیۡہَا مُتَقٰبِلِیۡنَ ١٦

মুত্তাকিঈনা ‘আলাইহা-মুতাকা-বিলীন।

তারা পরস্পর সামনাসামনি হেলান দিয়ে থাকবে।
১৭

یَطُوۡفُ عَلَیۡہِمۡ وِلۡدَانٌ مُّخَلَّدُوۡنَ ۙ ١٧

ইয়াতূ ফূ‘আলাইহিম বিলদা-নুমমুখাল্লাদূন।

তাদের সামনে (সেবার জন্য) ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরেরা,
১৮

بِاَکۡوَابٍ وَّاَبَارِیۡقَ ۬ۙ  وَکَاۡسٍ مِّنۡ مَّعِیۡنٍ ۙ ١٨

বিআকওয়া-বিওঁ ওয়া আবা-রীকা ওয়াকা’ছিম মিম্মা‘ঈন।

এমন পান-পাত্র, জগ ও প্রস্রবণ-নিসৃত স্বচ্ছ সূরা পাত্র নিয়ে,
১৯

لَّا یُصَدَّعُوۡنَ عَنۡہَا وَلَا یُنۡزِفُوۡنَ ۙ ١٩

লা-ইউসাদ্দা‘ঊনা ‘আনহা-ওয়ালা ইউনঝিফূন।

যা পানে তাদের মাথা ব্যথা হবে না এবং তারা চেতনা হারাবে না
২০

وَفَاکِہَۃٍ مِّمَّا یَتَخَیَّرُوۡنَ ۙ ٢۰

ওয়া ফা-কিহাতিম মিম্মা-ইয়াতাখাইয়ারূন।

এবং তাদের পছন্দমত ফল নিয়ে,
২১

وَلَحۡمِ طَیۡرٍ مِّمَّا یَشۡتَہُوۡنَ ؕ ٢١

ওয়া লাহমি তাইরিম মিম্মা-ইয়াশতাহূন।

এবং তাদের চাহিদা মত পাখির গোশত নিয়ে
২২

وَحُوۡرٌ عِیۡنٌ ۙ ٢٢

ওয়া হূরুন ‘ঈন।

এবং তাদের জন্য থাকবে আয়তলোচনা হুর
২৩

کَاَمۡثَالِ اللُّؤۡلُوَٴ الۡمَکۡنُوۡنِ ۚ ٢٣

কাআমছা-লিল লু’লুয়িল মাকনূন।

যেন তারা লুকিয়ে রাখা মুক্তা।
২৪

جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ٢٤

জাঝাআম বিমা-কা-নূইয়া‘মালূন।

তাদের কৃতকর্মের প্রতিদানস্বরূপ।
২৫

لَا یَسۡمَعُوۡنَ فِیۡہَا لَغۡوًا وَّلَا تَاۡثِیۡمًا ۙ ٢٥

লা-ইয়াছমা‘ঊনা ফীহা-লাগওয়াওঁ ওয়ালা-তা’ছীমা-।

তারা সে জান্নাতে শুনবে না কোন অহেতুক কথা এবং না কোন পাপের কথা।
২৬

اِلَّا قِیۡلًا سَلٰمًا سَلٰمًا ٢٦

ইল্লা-কীলান ছালা-মান ছালা-মা-।

তবে সেখানে হবে কেবল শান্তিপূর্ণ কথা, কেবলই শান্তিপূর্ণ কথা।
২৭

وَاَصۡحٰبُ الۡیَمِیۡنِ ۬ۙ  مَاۤ اَصۡحٰبُ الۡیَمِیۡنِ ؕ ٢٧

ওয়া আসহা-বুল ইয়ামীনি মাআসহা-বুল ইয়ামীন।

আর যারা ডান হাত বিশিষ্ট, আহা, কেমন যে সে ডান-হাত বিশিষ্টগণ!
২৮

فِیۡ سِدۡرٍ مَّخۡضُوۡدٍ ۙ ٢٨

ফী ছিদরিম মাখদূদ।

(তারা আয়েশে থাকবে) কাঁটাবিহীন কুল গাছের মাঝে

তাফসীরঃ

৭. পূর্বে বলা হয়েছে, আমাদেরকে বোঝানোর জন্য জান্নাতের ফলসমূহের নাম রাখা হয়েছে এই দুনিয়ায় ফল-ফলাদির নামেই। কিন্তু সে ফলের আকার-আকৃতি ও স্বাদ-সুবাস দুনিয়ার ফল অপেক্ষা অচিন্তনীয়রূপে উৎকৃষ্ট হবে। এক হাদীসে আছে, এক দেহাতী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিল, কুল গাছ তো সাধারণত কষ্টদায়ক হয়ে থাকে। কুরআন মাজীদে এ গাছের কথা আসল কেন? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা কি বলেননি, সে গাছে কাঁটা থাকবে না? আল্লাহ তাআলা প্রতিটি কাঁটার স্থানে একটি ফল সৃষ্টি করবেন। প্রতিটি ফলে থাকবে বাহাত্তর রকম স্বাদ। এক স্বাদ অন্য স্বাদের সাথে মিলবে না (রূহুল মাআনী, হাকিম ও বায়হাকীর বরাতে। হাকিম (রহ.) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)।
২৯

وَّطَلۡحٍ مَّنۡضُوۡدٍ ۙ ٢٩

ওয়া তালহিমমানদূ দ।

এবং কাঁদি ভরা কলা গাছ,
৩০

وَّظِلٍّ مَّمۡدُوۡدٍ ۙ ٣۰

ওয়া জিলিলমমামদুদ।

সুদূর বিস্তৃত ছায়া,
৩১

وَّمَآءٍ مَّسۡکُوۡبٍ ۙ ٣١

ওয়া মাইমমাছকূব।

প্রবহমান পানি
৩২

وَّفَاکِہَۃٍ کَثِیۡرَۃٍ ۙ ٣٢

ওয়া ফা-কিহাতিন কাছীরাহ।

এবং প্রচুর ফলমূলের ভেতর।
৩৩

لَّا مَقۡطُوۡعَۃٍ وَّلَا مَمۡنُوۡعَۃٍ ۙ ٣٣

লা-মাকতূ‘আতিওঁ ওয়ালা-মামনূ‘আহ।

যা কখনও শেষ হবে না এবং যাতে কোন বাধাও দেওয়া হবে না।
৩৪

وَّفُرُشٍ مَّرۡفُوۡعَۃٍ ؕ ٣٤

ওয়া ফুরুশিমমারফূ‘আহ।

আর তারা থাকবে উঁচুতে রাখা ফরাশে।

তাফসীরঃ

৮. কুরআন মাজীদের একাধিক জায়গায় বলা হয়েছে, জান্নাতীদের আসন হবে উঁচুতে। সেই আসনে থাকবে ফরাশ বিছানো। তাই বলা হয়েছে, তারা থাকবে উঁচুতে রাখা ফরাশে।
৩৫

اِنَّاۤ اَنۡشَاۡنٰہُنَّ اِنۡشَآءً ۙ ٣٥

ইন্নাআনশা’না-হুন্না ইনশাআ।

নিশ্চয়ই আমি সে নারীদেরকে দিয়েছি নব উত্থান।

তাফসীরঃ

৯. কুরআন মাজীদ জান্নাতের নারীদেরকে বোঝানোর জন্য চমৎকার পন্থা অবলম্বন করেছে। সরাসরি তাদের নাম না নিয়ে কেবল সর্বনামের মাধ্যমে তাদের প্রতি ইশারা করে দিয়েছে। এর ভেতর যেমন সাহিত্যালংকারের স্বাদ রয়েছে, তেমনি নারীদের পর্দাশীলতার মর্যাদাও অক্ষুণ্ণ আছে। কোন কোন মুফাসসিরের মতে, জান্নাতবাসীদের জন্য যাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে বা সৃষ্টি করা হবে, এখানে সেই হুরদের কথাই বোঝানো হয়েছে। আবার কেউ বলেন, এরা হলেন নেককার লোকদের সেই জীবন সঙ্গিনীগণ, যারা নিজেরাও পুণ্যবতী। আখেরাতে তাদেরকে যে ‘নব উত্থান’ দেওয়া হবে, তার মানে দুনিয়ায় তাদের রূপ-লাবণ্য যেমনই থাকুক না কেন, আখেরাতে তাদেরকে তাদের স্বামীদের জন্য অপরূপ সুন্দরী বানিয়ে দেওয়া হবে, যেমন এক হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এরূপ বর্ণিত আছে। এমনিভাবে দুনিয়ায় যেসব নারীর বিবাহ হয়নি, তাদেরকেও নতুন জীবন দিয়ে কোন না কোন জান্নাতবাসীর সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হবে। হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনার দিকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, উভয় শ্রেণীর নারীই এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ হুরগণও এবং দুনিয়ার পুণ্যবতী নারীগণও (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য রূহুল মাআনী)।
৩৬

فَجَعَلۡنٰہُنَّ اَبۡکَارًا ۙ ٣٦

ফাজা‘আলনা-হুন্না আবকা-রা।

সুতরাং তাদেরকে বানিয়েছি কুমারী। ১০

তাফসীরঃ

১০. কোন কোন হাদীস দ্বারা বোঝা যায়, তাদের কুমারীত্ব কখনও ক্ষুণ্ণ হবে না।
৩৭

عُرُبًا اَتۡرَابًا ۙ ٣٧

‘উরুবান আতরা-বা-।

(স্বামীদের পক্ষে) প্রেমময়ী ও সমবয়স্কা। ১১

তাফসীরঃ

১১. এর এক অর্থ হতে পারে এই যে, তারা তাদের স্বামীদের সমবয়স্কা হবে। কেননা সম বয়সীর সাথেই প্রণয়-প্রীতি জমে ভালো, সখ্য বেশি সুখকর হয়। দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে, তারা সকলে পরস্পরে সমবয়স্কা হবে। কোন কোন হাদীসে আছে, জান্নাতবাসীদেরকে তেত্রিশ বছর বয়সী করে দেওয়া হবে। এটাই পূর্ণ যৌবনের বয়স (তিরমিযী, হযরত মুআয [রাযি.] থেকে)।
৩৮

لِّاَصۡحٰبِ الۡیَمِیۡنِ ؕ٪ ٣٨

লিআসহা-বিল ইয়ামীন।

সবই ডান হাত বিশিষ্টদের জন্য।
৩৯

ثُلَّۃٌ مِّنَ الۡاَوَّلِیۡنَ ۙ ٣٩

ছু ল্লাতুম মিনাল আওওয়ালীন।

(যাদের মধ্যে) অনেকে হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে
৪০

وَثُلَّۃٌ مِّنَ الۡاٰخِرِیۡنَ ؕ ٤۰

ওয়া ছুল্লাতুম মিনাল আ-খিরীন।

এবং অনেকে হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। ১২

তাফসীরঃ

১২. অর্থাৎ এই স্তরের মুমিন আগের যামানার লোকদের মধ্যেও অনেক হবে এবং পরের যামানার লোকদের মধ্যেও অনেক।
৪১

وَاَصۡحٰبُ الشِّمَالِ ۬ۙ  مَاۤ اَصۡحٰبُ الشِّمَالِ ؕ ٤١

ওয়া আসহা-বুশশিমা-লি মাআসহা-বুশ শিমা-ল।

আর যারা বাম হাতবিশিষ্ট, কী হতভাগ্য সে বাম-হাত বিশিষ্টগণ!
৪২

فِیۡ سَمُوۡمٍ وَّحَمِیۡمٍ ۙ ٤٢

ফী ছামূমিওঁ ওয়া হামীম।

তারা থাকবে উত্তপ্ত বায়ু ও ফুটন্ত পানিতে।
৪৩

وَّظِلٍّ مِّنۡ یَّحۡمُوۡمٍ ۙ ٤٣

ওয়া জিলিলম মিইঁ ইয়াহমূম।

কালো ধুয়ার ছায়ায়
৪৪

لَّا بَارِدٍ وَّلَا کَرِیۡمٍ ٤٤

লা-বা-রিদিওঁ ওয়ালা-কারীম।

যা হবে না শীতল, না উপকারী।
৪৫

اِنَّہُمۡ کَانُوۡا قَبۡلَ ذٰلِکَ مُتۡرَفِیۡنَ ۚۖ ٤٥

ইন্নাহুম কা-নূকাবলা যা-লিকা মুতরাফীন।

ইতঃপূর্বে তারা ছিল আরাম-আয়েশের ভেতর।
৪৬

وَکَانُوۡا یُصِرُّوۡنَ عَلَی الۡحِنۡثِ الۡعَظِیۡمِ ۚ ٤٦

ওয়াকা-নূইউসিররূনা ‘আলাল হিনছিল ‘আজীম।

অতি বড় পাপের উপর অনড় থাকত। ১৩

তাফসীরঃ

১৩. অতি বড় পাপ হল কুফর ও শিরক।
৪৭

وَکَانُوۡا یَقُوۡلُوۡنَ ۬ۙ  اَئِذَا مِتۡنَا وَکُنَّا تُرَابًا وَّعِظَامًا ءَاِنَّا لَمَبۡعُوۡثُوۡنَ ۙ ٤٧

ওয়া কা-নূইয়াকূলূনা আইযা-মিতনা-ওয়া কুন্না-তুরা-বাওঁ ওয়া ‘ইজা-মান আইন্নালামাব‘ঊছূন।

এবং বলত, আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও অস্থিতে পরিণত হব, তখনও কি আমাদেরকে পুনরায় জীবিত করা হবে?
৪৮

اَوَاٰبَآؤُنَا الۡاَوَّلُوۡنَ ٤٨

আওয়া আ-বাউনাল আওওয়ালূন।

এবং আমাদের বাপ-দাদাদেরকেও, যারা পূর্বে গত হয়ে গেছে?
৪৯

قُلۡ اِنَّ الۡاَوَّلِیۡنَ وَالۡاٰخِرِیۡنَ ۙ ٤٩

কুল ইন্নাল আওওয়ালীনা ওয়াল আ-খিরীন।

বলে দাও, নিশ্চয়ই আগের ও পরের সমস্ত মানুষকে
৫০

لَمَجۡمُوۡعُوۡنَ ۬ۙ اِلٰی مِیۡقَاتِ یَوۡمٍ مَّعۡلُوۡمٍ ٥۰

লামাজমূ‘ঊনা ইলা-মীকা-তি ইয়াওমিম মা‘লূম।

নির্দিষ্ট এক দিনের স্থিরীকৃত সময়ে একত্র করা হবে।
৫১

ثُمَّ اِنَّکُمۡ اَیُّہَا الضَّآلُّوۡنَ الۡمُکَذِّبُوۡنَ ۙ ٥١

ছু ম্মা ইন্নাকুম আইইয়ুহাদ্দাললূনাল মুকাযযি বূন।

অতঃপর হে অবিশ্বাসী পথভ্রষ্টগণ! অবশ্যই তোমরা
৫২

لَاٰکِلُوۡنَ مِنۡ شَجَرٍ مِّنۡ زَقُّوۡمٍ ۙ ٥٢

লাআ-কিলূনা মিন শাজারিম মিন ঝাক্কূম।

এমন এক গাছ থেকে খাবে, যার নাম যাক্কুম। ১৪

তাফসীরঃ

১৪. জাহান্নামে এ গাছের বিবরণ পূর্বে সুরা সাফফাত (৩৭ : ৬২) ও সূরা দুখানে (৪৪ : ৪৩) গত হয়েছে।
৫৩

فَمَالِـُٔوۡنَ مِنۡہَا الۡبُطُوۡنَ ۚ ٥٣

ফামা-লিঊনা মিনহাল বুতূন।

অতঃপর তা দ্বারা উদর পূর্ণ করবে।
৫৪

فَشٰرِبُوۡنَ عَلَیۡہِ مِنَ الۡحَمِیۡمِ ۚ ٥٤

ফাশা-রিবূনা ‘আলাইহি মিনাল হামীম।

তদুপরি পান করবে ফুটন্ত পানি।
৫৫

فَشٰرِبُوۡنَ شُرۡبَ الۡہِیۡمِ ؕ ٥٥

ফাশা-রিবূনা শুরবাল হীম।

পানও করবে সেইভাবে, যেভাবে পান করে তৃষ্ণার রোগে আক্রান্ত উট। ১৫

তাফসীরঃ

১৫. এর দ্বারা শোথ রোগে আক্রান্ত উটকে বোঝানো হয়েছে। এমন উট বারবার পানি পান করে, কিন্তু কিছুতেই পিপাসা মেটে না।
৫৬

ہٰذَا نُزُلُہُمۡ یَوۡمَ الدِّیۡنِ ؕ ٥٦

হা-যা-নুঝুলুহুম ইয়াওমাদ্দীন।

এটাই বিচার দিবসে তাদের আপ্যায়ন।
৫৭

نَحۡنُ خَلَقۡنٰکُمۡ فَلَوۡلَا تُصَدِّقُوۡنَ ٥٧

নাহনুখালাকনা-কুম ফালাওলা-তুসাদ্দিকূন।

আমিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তোমরা কেন বিশ্বাস করছ না?
৫৮

اَفَرَءَیۡتُمۡ مَّا تُمۡنُوۡنَ ؕ ٥٨

আফারাআইতুমমা-তুমনূন।

আচ্ছা বল তো, তোমরা যে বীর্য স্খলন কর
৫৯

ءَاَنۡتُمۡ تَخۡلُقُوۡنَہٗۤ اَمۡ نَحۡنُ الۡخٰلِقُوۡنَ ٥٩

আ আনতুম তাখলুকূনাহূআম নাহনুল খা-লিকূন।

তা কি তোমরা সৃষ্টি কর না আমিই তার স্রষ্টা? ১৬

তাফসীরঃ

১৬. এর দ্বারা খোদ বীর্য সৃষ্টিও বোঝানো হতে পারে, যাতে মানুষের কোন হাত নেই অথবা বীর্য দ্বারা যে মানব শিশুর জন্ম হয়, তার সৃষ্টিও বোঝানো যেতে পারে। কেননা বীর্যের একটা বিন্দুকে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করিয়ে মানুষের রূপ দান করা, তাতে প্রাণ সঞ্চার করা এবং তাকে দেখা, শোনা ও বোঝার শক্তি দান করা আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কার পক্ষে সম্ভব?
৬০

نَحۡنُ قَدَّرۡنَا بَیۡنَکُمُ الۡمَوۡتَ وَمَا نَحۡنُ بِمَسۡبُوۡقِیۡنَ ۙ ٦۰

নাহনুকাদ্দারনা-বাইনাকুমুল মাওতা ওয়ামা-নাহনুবিমাছবূকীন।

আমি তোমাদের মধ্যে মৃত্যুর ফায়সালা করে রেখেছি এবং এমন কেউ নেই, যে আমাকে ব্যর্থ করে দিতে পারে
৬১

عَلٰۤی اَنۡ نُّبَدِّلَ اَمۡثَالَکُمۡ وَنُنۡشِئَکُمۡ فِیۡ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٦١

‘আলাআননুবাদ্দিলা আমছা-লাকুম ওয়া নুনশিআকুম ফী মা-লা-তা‘লামূন।

এ ব্যাপারে যে, আমি তোমাদের স্থলে তোমাদের মত অন্য লোক আনয়ন করব এবং তোমাদেরকে এমন কোন রূপ দান করব, যা তোমরা জান না। ১৭

তাফসীরঃ

১৭. বলা হচ্ছে যে, মানুষের সৃজন যেমন আল্লাহ তাআলারই কাজ, তেমনি তার মৃত্যু দানও তিনিই করে থাকেন। তারপর তাকে পুনরায় যে-কোনও আকৃতিতে জীবিত করে তোলার ক্ষমতাও তাঁর আছে। এ কাজে তাঁকে ব্যর্থ করে দেওয়ার শক্তি কারও নেই।
৬২

وَلَقَدۡ عَلِمۡتُمُ النَّشۡاَۃَ الۡاُوۡلٰی فَلَوۡلَا تَذَکَّرُوۡنَ ٦٢

ওয়া লাকাদ ‘আলিমতুমুন্নাশআতাল ঊলা-ফালাওলা-তাযাক্কারূন।

তোমরা তো তোমাদের প্রথম সৃজন সম্পর্কে অবগত আছ। তা সত্ত্বেও তোমরা কেন উপদেশ গ্রহণ কর না? ১৮

তাফসীরঃ

১৮. অর্থাৎ অন্ততপক্ষে এতটুকু কথা তো তোমরাও জান যে, তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি কেবল আল্লাহ তাআলাই করেছেন। অন্য কারও তাতে কোনও অংশীদারিত্ব নেই। যখন এটা তোমরা জান, তখন কেবল তাকে মাবুদ বলে স্বীকার করাতে তোমাদের বাধা কীসের এবং তিনি যে তোমাদের মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন এটা বিশ্বাস করতে কেন তোমাদের এত কুণ্ঠা?
৬৩

اَفَرَءَیۡتُمۡ مَّا تَحۡرُثُوۡنَ ؕ ٦٣

আফারাআইতুম মা-তাহরুছূন।

তোমরা কি ভেবে দেখেছ, তোমরা জমিতে যা-কিছু বোন,
৬৪

ءَاَنۡتُمۡ تَزۡرَعُوۡنَہٗۤ اَمۡ نَحۡنُ الزّٰرِعُوۡنَ ٦٤

আআনতুম তাঝরা‘ঊনাহূআম নাহনুঝঝা-রি‘ঊন।

তা কি তোমরা উদগত কর, না আমিই ১৯ তার উদগতকারী?

তাফসীরঃ

১৯. অর্থাৎ তোমরা তো জমিতে কেবল বীজ ফেল। অতঃপর সেই বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম ঘটিয়ে তাকে চারা বানানো তারপর সেই চারাকে গাছ বানিয়ে তা থেকে তোমাদের উপকারী ফল বা ফসল জন্মানোর মত ক্ষমতা কি তোমাদের ছিল? আল্লাহ তাআলা ছাড়া এমন কে আছে, যে তোমাদের বোনা বীজকে এই পরিণতিতে পৌঁছাতে পারেন?
৬৫

لَوۡ نَشَآءُ لَجَعَلۡنٰہُ حُطَامًا فَظَلۡتُمۡ تَفَکَّہُوۡنَ ٦٥

লাও নাশা-উ লাজা‘আলনা-হু হুতা-মান ফাজালতুম তাফাক্কাহূন।

আমি ইচ্ছা করলে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে পারি, ফলে তোমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে
৬৬

اِنَّا لَمُغۡرَمُوۡنَ ۙ ٦٦

ইন্না-লামুগরামূন।

যে, আমরা তো দায়গ্রস্ত হয়ে পড়লাম,
৬৭

بَلۡ نَحۡنُ مَحۡرُوۡمُوۡنَ ٦٧

বাল নাহনুমাহরূমূন।

বরং আমরা সম্পূর্ণ বঞ্চিত হলাম ২০!

তাফসীরঃ

২০. অর্থাৎ এর বীজ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় যে খরচ হয়েছে, একে তার দেনা মাথায় চাপল, তার ফসল না পাওয়ায় জীবিকা থেকেও বঞ্চিত হলাম! এখন তো না খেয়ে কাটাতে হবে। -অনুবাদক
৬৮

اَفَرَءَیۡتُمُ الۡمَآءَ الَّذِیۡ تَشۡرَبُوۡنَ ؕ ٦٨

আফারাআইতুমুল মাআল্লাযী তাশরাবূন।

আচ্ছা বল তো, এই যে পানি তোমরা পান কর
৬৯

ءَاَنۡتُمۡ اَنۡزَلۡتُمُوۡہُ مِنَ الۡمُزۡنِ اَمۡ نَحۡنُ الۡمُنۡزِلُوۡنَ ٦٩

আ আনতুম আনঝালতুমূহু মিনাল মুঝনি আম নাহনুল মুনঝিলূন।

মেঘ থেকে তা কি তোমরা বর্ষণ করাও, না আমিই তার বর্ষণকারী?
৭০

لَوۡ نَشَآءُ جَعَلۡنٰہُ اُجَاجًا فَلَوۡلَا تَشۡکُرُوۡنَ ٧۰

লাও নাশাউ জা‘আলনা-হু উজা-জান ফালাওলা-তাশকুরূন।

আমি ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও কি তোমরা শোকর আদায় কর না?
৭১

اَفَرَءَیۡتُمُ النَّارَ الَّتِیۡ تُوۡرُوۡنَ ؕ ٧١

আফারাআইতুমুন্না-রাল্লাতী তূরূন।

আচ্ছা বল তো, এই যে আগুন তোমরা জ্বালাও,
৭২

ءَاَنۡتُمۡ اَنۡشَاۡتُمۡ شَجَرَتَہَاۤ اَمۡ نَحۡنُ الۡمُنۡشِـُٔوۡنَ ٧٢

আ আনতুম আনশা’তুম শাজারাতাহাআম নাহনুল মুনশিঊন।

তার বৃক্ষ কি তোমরা সৃষ্টি ২১ কর, না আমিই তার স্রষ্টা?

তাফসীরঃ

২১. এর দ্বারা ইশারা ‘মারখ’ ও ‘আফার’ গাছের দিকে। এসব গাছ আরব দেশসমূহে জন্মায়। এর ডালা ঘষলে আগুন জ্বলে ওঠে। আরববাসী এর দ্বারা চকমকি পাথর বা দিয়াশলাইয়ের কাজ নিত। সূরা ইয়াসীনেও (৩৬ : ৮০) এর উল্লেখ রয়েছে।
৭৩

نَحۡنُ جَعَلۡنٰہَا تَذۡکِرَۃً وَّمَتَاعًا لِّلۡمُقۡوِیۡنَ ۚ ٧٣

নাহনুজা‘আলনা-হা-তাযকিরাতাওঁওয়া মাতা-‘আল লিলমুকবিন।

আমিই তাকে বানিয়েছি উপদেশের উপকরণ এবং মরুচারীদের জন্য উপকারী বস্তু। ২২

তাফসীরঃ

২২. উপদেশের উপকরণ বলা হয়েছে এ কারণে যে, এর ভেতর চিন্তা করলে আল্লাহ তাআলার কুদরত উপলব্ধি করা যায়। কিভাবে তিনি তাজা গাছ থেকে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন! দ্বিতীয়ত এর দ্বারা জাহান্নামের আগুনের কথাও স্মরণ হয়, ফলে তা থেকে বাঁচার চিন্তা জাগ্রত হয়। এ গাছ যদিও সকলের জন্যই আগুন জ্বালানোর কাজে আসে, কিন্তু এক সময় মরুভূমিতে যারা সফর করত, তাদের জন্য এটা অতি বড় নি‘আমত ছিল। ভ্রমণকালে যখন আগুন জ্বালানোর প্রয়োজন হত, তখন তারা এর দ্বারা সে প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলত। এ কারণেই বিশেষভাবে মরুচারীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৭৪

فَسَبِّحۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الۡعَظِیۡمِ ٪ؓ ٧٤

ফাছাববিহবিছমি রাব্বিকাল ‘আজীম।

সুতরাং (হে রাসূল!) তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নাম নিয়ে তার তাসবীহ পাঠ কর।
৭৫

فَلَاۤ اُقۡسِمُ بِمَوٰقِعِ النُّجُوۡمِ ۙ ٧٥

ফালাউকছিমুবিমাওয়া-কি‘ইননুজূম।

যে সকল স্থানে নক্ষত্র পতিত হয় ২৩ আমি তার শপথ করে বলছি,

তাফসীরঃ

২৩. এখান থেকে কুরআন মাজীদের সত্যতা এবং এটা যে আল্লাহ তাআলার কালাম, তা প্রমাণ করা উদ্দেশ্য। মক্কা মুকাররমার কাফেরগণ অনেক সময় বলত, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একজন অতীন্দ্রিয়বাদী এবং এ কুরআন মূলত অতীন্দ্রিয়বাদীদের কথা (নাউযুবিল্লাহ)। অতীন্দ্রিয়বাদীরা যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করত, তাতে তারা জিন ও শয়তানদের সাহায্য নিত। কুরআন মাজীদ বিভিন্ন স্থানে জানিয়ে দিয়েছে যে, শয়তানদেরকে আকাশের কাছে গিয়ে সেখানকার কথাবার্তা শোনার আর সুযোগ দেওয়া হয় না। কোন শয়তান সে চেষ্টা করলে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড (شهاب ثاقب) ছুঁড়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয় (দেখুন সূরা হিজর ১৫ : ১৮; সূরা সাফফাত ৩৭ : ১০)। সাধারণ কথাবার্তায় شهاب ثاقب-কে ‘নক্ষত্রের পতন’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়, তাই কুরআন মাজীদ নক্ষত্রের উল্লেখ করত একথাও জানিয়ে দিয়েছে যে, তাকে শয়তানদের থেকে হেফাজতের জন্যও ব্যবহার করা হয় (সূরা সাফফাত ৩৭ : ৭; সূরা মুলক ৬৭ : ৫)। সুতরাং জিন ও শয়তান যখন আকাশ পর্যন্ত পৌঁছতেই পারে না, তখন তাদের পক্ষে কুরআনের মত পরিপক্ব ও সত্য বাণী পেশ করাই সম্ভব নয়। সেই প্রসঙ্গেই এখানে নক্ষত্রের পতন স্থলসমূহের শপথ করে ইশারা করা হয়েছে যে, তোমরা যদি গভীরভাবে চিন্তা কর, তবে পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবে, কুরআন মাজীদ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বাণী। কোন অতীন্দ্রিয়বাদী এরূপ বাণী কখনও তৈরি করতে পারবে না। কেননা অতীন্দ্রিয়বাদী যা বলে তা শয়তানদের সাহায্য নিয়ে বলে। আর এসব নক্ষত্র শয়তানদেরকে ঊর্ধ্ব জগতে পৌঁছা হতে নিবৃত্ত রাখে।
৭৬

وَاِنَّہٗ لَقَسَمٌ لَّوۡ تَعۡلَمُوۡنَ عَظِیۡمٌ ۙ ٧٦

ওয়া ইন্নাহূলাকাছামুল লাও তা‘লামূনা ‘আজীম।

আর তোমরা যদি বোঝ, তো এটা এক মহা শপথ, ২৪

তাফসীরঃ

২৪. এটি একটি অন্তর্বর্তী বাক্য। এতে নক্ষত্র পতনের শপথ যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ সে দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কেননা এ শপথের মাধ্যমে জানান দেওয়া হচ্ছে যে, নক্ষত্র পতনের স্থানসমূহ সাক্ষ্য দেয় কোন অতীন্দ্রিয়বাদীর পক্ষে এরূপ বাণী তৈরি করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত নক্ষত্ররাজির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ম-শৃঙ্খলা অত্যন্ত পরিপক্ব ও সুসংহত। এর ভেতর কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে না। কুরআন মাজীদও তার মত এক পরিপক্ব ও সুবিন্যস্ত বাণী, যা এক সুচারু ব্যবস্থাপনার অধীনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নাযিল করা হয়েছে।
৭৭

اِنَّہٗ لَقُرۡاٰنٌ کَرِیۡمٌ ۙ ٧٧

ইন্নাহূলাকুরআ-নুন কারীম।

নিশ্চয়ই এটা অতি সম্মানিত কুরআন,
৭৮

فِیۡ کِتٰبٍ مَّکۡنُوۡنٍ ۙ ٧٨

ফী কিতা-বিম মাকনূন।

যা এক সুরক্ষিত কিতাবে (পূর্ব থেকেই) লিপিবদ্ধ আছে।
৭৯

لَّا یَمَسُّہٗۤ اِلَّا الۡمُطَہَّرُوۡنَ ؕ ٧٩

লা-ইয়ামাছছুহূইল্লাল মুতাহহারূন।

একে স্পর্শ করে কেবল তারাই, যারা অত্যন্ত পবিত্র, ২৫

তাফসীরঃ

২৫. শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর দ্বারা ফেরেশতাদেরকে বোঝানো হয়েছে। কাফেরগণ প্রশ্ন করত, আমরা কিভাবে বিশ্বাস করব, এ কুরআন কোনরূপ রদ বদল ছাড়া তার প্রকৃত রূপেই আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, মাঝখানে শয়তান বা অন্য কেউ এতে কোনও রকম হস্তক্ষেপ করেনি? এ আয়াতসমূহ দ্বারা তার উত্তর দেওয়া হয়েছে যে, কুরআন মাজীদ লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ আছে এবং তা পবিত্র ফেরেশতাগণ ছাড়া অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারে না। এখানে ‘অত্যন্ত পবিত্র’ দ্বারা যদিও ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে ইঙ্গিত নিহিত রয়েছে যে, ঊর্ধ্বজগতে যেমন পবিত্র ফেরেশতাগণই একে স্পর্শ করে, তেমনি দুনিয়ায়ও একে কেবল তাদেরই স্পর্শ করা উচিত, যারা পাক-পবিত্র। বিভিন্ন সহীহ হাদীসে একে বিনা অযুতে স্পর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
৮০

تَنۡزِیۡلٌ مِّنۡ رَّبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ٨۰

তানঝীলুম মির রাব্বিল ‘আ-লামীন।

এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ হতে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ।
৮১

اَفَبِہٰذَا الۡحَدِیۡثِ اَنۡتُمۡ مُّدۡہِنُوۡنَ ۙ ٨١

আফা বিহা-যাল হাদীছিআনতুম মুদহিনূন।

তবুও কি তোমরা এ বাণীকে অবহেলা কর?
৮২

وَتَجۡعَلُوۡنَ رِزۡقَکُمۡ اَنَّکُمۡ تُکَذِّبُوۡنَ ٨٢

ওয়া তাজ‘আলূনা রিঝকাকুম আন্নাকুম তুকাযযি বূন।

এবং তোমরা (এর প্রতি) অবিশ্বাসকেই তোমাদের উপজীব্য বানিয়ে নিয়েছ?
৮৩

فَلَوۡلَاۤ اِذَا بَلَغَتِ الۡحُلۡقُوۡمَ ۙ ٨٣

ফালাও লাইযা-বালাগাতিল হুলকূম।

অতঃপর এমন কেন হয় না যে, যখন (কারও) প্রাণ কণ্ঠাগত হয়,
৮৪

وَاَنۡتُمۡ حِیۡنَئِذٍ تَنۡظُرُوۡنَ ۙ ٨٤

ওয়া আনতুম হীনাইযিন তানজু রূন।

এবং তোমরা (বিমর্ষ মনে তার দিকে) তাকিয়ে থাক,
৮৫

وَنَحۡنُ اَقۡرَبُ اِلَیۡہِ مِنۡکُمۡ وَلٰکِنۡ لَّا تُبۡصِرُوۡنَ ٨٥

ওয়া নাহনুআকরাবুইলাইহি মিনকুম ওয়ালা-কিল্লা-তুবসিরূন।

এবং তোমাদের চেয়ে আমিই তার বেশি কাছে থাকি, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।
৮৬

فَلَوۡلَاۤ اِنۡ کُنۡتُمۡ غَیۡرَ مَدِیۡنِیۡنَ ۙ ٨٦

ফালাওলাইন কুনতুম গাইরা মাদীনিন।

যদি তোমাদের হিসাব-নিকাশ হওয়ার না-ই থাকে,
৮৭

تَرۡجِعُوۡنَہَاۤ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ٨٧

তার জি‘ঊনাহাইন কুনতুম সা-দিকীন।

তবে তোমরা সেই প্রাণকে ফিরিয়ে আনছ না কেন যদি তোমরা সত্যবাদী হও? ২৬

তাফসীরঃ

২৬. কাফেরগণ যে কুরআন মাজীদের উপর ঈমান আনতে অস্বীকার করত, তার একটা বড় কারণ ছিল ‘আমরা মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত হব না’ তাদের এই দাবি। এ সূরারই ৪৫ নং আয়াতে এটা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এস্থলে সে বিষয়েই আলোকপাত করছেন। বলা হচ্ছে, এ দুনিয়ায় যে-ই আসে, একদিন না একদিন তার মৃত্যু ঘটে। এটা বাস্তব সত্য, যা তোমরাও স্বীকার কর। তো যখন কারও মৃত্যু আসে, তখন তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও তার চিকিৎসক সর্ব প্রযত্নে যে-কোনও উপায়ে তাকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে, কিন্তু মৃত্যু এসেই যায় এবং সকলে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত হওয়ার ও হিসাব-নিকাশ হওয়ার ব্যাপার না-ই থাকে, তবে প্রতিটি মানুষকে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ কেন করতে হয়? এবং তোমরা তাকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে কেন এত অপারগ? দুনিয়ায় জীবন ও মৃত্যুর এই যে অমোঘ বিধান কার্যকর রয়েছে, এটাই প্রমাণ করে, জীবন ও মৃত্যুর মালিক বিশ্বজগতকে অহেতুক সৃষ্টি করেননি। তিনি সৃষ্টি করেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, মানুষকে জীবন ভরের জন্য অবকাশ দিয়ে পরিশেষে হিসাব নেওয়া হবে সে সেই অবকাশকে কী কাজে লাগিয়েছে।
৮৮

فَاَمَّاۤ اِنۡ کَانَ مِنَ الۡمُقَرَّبِیۡنَ ۙ ٨٨

ফাআম্মাইন কা-না মিনাল মুকাররাবীন।

অতপর সে (মৃত ব্যক্তি) যদি আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের একজন হয়,
৮৯

فَرَوۡحٌ وَّرَیۡحَانٌ ۬ۙ وَّجَنَّتُ نَعِیۡمٍ ٨٩

ফারাওহুওঁ ওয়া রাই হা-নুওঁ ওয়া জান্নাতুনা‘ঈম।

তবে (তার জন্য) শুধু আরাম, সুরভি ও নি‘আমতপূর্ণ জান্নাত।
৯০

وَاَمَّاۤ اِنۡ کَانَ مِنۡ اَصۡحٰبِ الۡیَمِیۡنِ ۙ ٩۰

ওয়া আম্মাইন কা-না মিন আসহা-বিল ইয়ামীন।

আর যদি হয় ডান হাত বিশিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত,
৯১

فَسَلٰمٌ لَّکَ مِنۡ اَصۡحٰبِ الۡیَمِیۡنِ ؕ ٩١

ফাছালা-মুল্লাকা মিন আসহা-বিল ইয়ামীন।

তবে (তাকে বলা হবে যে,) তোমার জন্য রয়েছে শান্তি, যেহেতু তুমি ডান হাত বিশিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত।
৯২

وَاَمَّاۤ اِنۡ کَانَ مِنَ الۡمُکَذِّبِیۡنَ الضَّآلِّیۡنَ ۙ ٩٢

ওয়া আম্মাইন কা-না মিনাল মুকাযযি বীনাদ্দাল্লীন।

আর যদি হয় সেই পথভ্রষ্টদেরঅন্তর্ভুক্ত, যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করত,
৯৩

فَنُزُلٌ مِّنۡ حَمِیۡمٍ ۙ ٩٣

ফানুঝুলুম মিন হামীম।

তবে (তার জন্য আছে) ফুটন্ত পানির আপ্যায়ন,
৯৪

وَّتَصۡلِیَۃُ جَحِیۡمٍ ٩٤

ওয়া তাসলিয়াতুজাহীম।

আর জাহান্নামে প্রবেশ।
৯৫

اِنَّ ہٰذَا لَہُوَ حَقُّ الۡیَقِیۡنِ ۚ ٩٥

ইন্না হা-যা-লাহুওয়া হাক্কুল ইয়াকীন।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটাই যথার্থ সুনিশ্চিত বিষয়। ২৭

তাফসীরঃ

২৭. অর্থাৎ হে নবী! পুণ্যবান ও পাপিষ্ঠদের এই যে পরিণাম আপনাকে জানালাম, আখিরাতে নেককারদের যে পুরস্কার ও বদকারদের যে শাস্তি সম্পর্কে অবহিত করলাম, এটা সন্দেহাতীত সত্য, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। -অনুবাদক
৯৬

فَسَبِّحۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الۡعَظِیۡمِ ٪ ٩٦

ফাছাব্বিহবিছমি রাব্বিকাল ‘আজীম।

সুতরাং (হে রাসূল!) তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নাম নিয়ে তার তাসবীহ পাঠ কর।