সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা আত তাক্‌ভীর (التكوير) | অন্ধকারাচ্ছন্ন

মাক্কী

মোট আয়াতঃ ২৯

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

اِذَا الشَّمۡسُ کُوِّرَتۡ ۪ۙ ١

ইযাশশামছুকুওবিরাত।

যখন সূর্যকে ভাঁজ করা হবে

তাফসীরঃ

১. এখান থেকে ১৪ নং পর্যন্ত আয়াতসমূহে কিয়ামত ও আখেরাতের বিভিন্ন অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। সূর্যকে ভাঁজ করার ধরনটা কি রকমের হবে তা আল্লাহ তাআলাই জানেন, তবে এতটুকু বিষয় তো পরিষ্কার যে, তার ফলে সূর্যের আলো শেষ হয়ে যাবে। তাই কেউ কেউ আয়াতের অর্থ করেছেন, ‘যখন সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে’। ভাঁজ করাকে আরবীতে ‘তাকবীর’ (تكوير) বলে। তাই এ সূরার নাম সূরা তাকবীর। প্রথম আয়াতে ব্যবহৃত كورت শব্দটি এর থেকেই উৎপন্ন।

وَاِذَا النُّجُوۡمُ انۡکَدَرَتۡ ۪ۙ ٢

ওয়া ইযাননুজূমুন কাদারাত।

এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে-খসে পড়বে

وَاِذَا الۡجِبَالُ سُیِّرَتۡ ۪ۙ ٣

ওয়া ইযাল জিবা-লুছুইয়িরাত।

এবং যখন পর্বতসমূহকে সঞ্চালিত করা হবে

وَاِذَا الۡعِشَارُ عُطِّلَتۡ ۪ۙ ٤

ওয়া ইযাল ‘ইশা-রু ‘উত্তিলাত।

এবং যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনীকেও পরিত্যক্ত রূপে ছেড়ে দেওয়া হবে

তাফসীরঃ

২. সে কালে আরববাসীর কাছে উটনীকে সর্বাপেক্ষা মূল্যবান সম্পদ মনে করা হত। উটনী গর্ভবতী হলে তো তার দাম আরও বেড়ে যেত। গর্ভকাল দশ মাস পূর্ণ হয়ে গেলে সে উটনী হত সর্বাপেক্ষা দামী। এ আয়াতে বলা হয়েছে, কিয়ামত যখন সংঘটিত হবে, তখন প্রত্যেকে এমন দিশাহারা হয়ে পড়বে যে, কারও অর্থ-সম্পদ সামলানোর মত ফুরসত থাকবে না। তাই এমন মূল্যবান উটনীও উপেক্ষিত হবে।

وَاِذَا الۡوُحُوۡشُ حُشِرَتۡ ۪ۙ ٥

ওয়া ইযাল উহূশু হুশিরাত।

এবং যখন বন্য পশুসমূহ একত্র করা হবে

তাফসীরঃ

৩. কিয়ামতের বিভীষিকাময় অবস্থা দেখে বন্য পশুরাও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে, তাই তারা সব জড়ো হয়ে যাবে, যেমন ঘোর দুর্যোগের সময় একাকী থাকার চেয়ে অন্যের সাথে একত্রে থাকলে কিছুটা স্বস্তি বোধ হয়।

وَاِذَا الۡبِحَارُ سُجِّرَتۡ ۪ۙ ٦

ওয়া ইযাল বিহা-রু ছুজ্জিরাত।

এবং যখন সাগরগুলিকে উত্তাল করে তোলা হবে,

তাফসীরঃ

৪. এর মানে সাগরের পানি এমন ফুঁসে উঠবে যে, সবগুলো সাগর একাকার হয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে। এর আরেক অর্থ হতে পারে, সাগরসমূহের পানি শুকিয়ে যাবে এবং তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।

وَاِذَا النُّفُوۡسُ زُوِّجَتۡ ۪ۙ ٧

ওয়া ইযাননুফূছুঝুওবিজাত।

এবং যখন মানুষকে জোড়া-জোড়া বানিয়ে দেওয়া হবে।

তাফসীরঃ

৫. অর্থাৎ একেক ধরনের লোককে একেক জায়গায় জড়ো করা হবে। সমস্ত কাফেরকে এক স্থানে, সমস্ত মুমিনকে এক স্থানে, নেককারদেরকে এক স্থানে ও বদকারদেরকে এক স্থানে। মোটকথা কর্ম অনুযায়ী সমস্ত মানুষ আলাদা-আলাদা ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে।

وَاِذَا الۡمَوۡءٗدَۃُ سُئِلَتۡ ۪ۙ ٨

ওয়া ইযাল মাওঊদাতুছুইলাত।

এবং যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে, জিজ্ঞেস করা হবে

بِاَیِّ ذَنۡۢبٍ قُتِلَتۡ ۚ ٩

বিআইয়ি যামবিন কুতিলাত।

তাকে কী অপরাধে হত্যা করা হয়েছিল?

তাফসীরঃ

৬. প্রাক-ইসলামী যুগের একটি বর্বরতা ছিল এ রকম যে, মানুষ নারী জাতিকে অত্যন্ত অশুভ মনে করত। কোন কোন গোত্রে এই নিষ্ঠুর প্রথাও চালু ছিল যে, তাদের কারও ঘরে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাকে চরম লজ্জাজনক মনে করত আর সে লজ্জা ঢাকার জন্য তারা সন্তানটিকে জ্যান্ত কবর দিত। কিয়ামতে সেই সন্তানকে হাজির করে জিজ্ঞেস করা হবে, তাকে কি অপরাধে হত্যা করা হয়েছিল? এর দ্বারা উদ্দেশ্য হবে সেই জালেমদেরকে শাস্তি দেওয়া যারা তার প্রতি এরূপ পাশবিক আচরণ করেছিল।
১০

وَاِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتۡ ۪ۙ ١۰

ওয়া ইযাসসুহুফুনুশিরাত।

এবং যখন আমলনামা খুলে দেওয়া হবে
১১

وَاِذَا السَّمَآءُ کُشِطَتۡ ۪ۙ ١١

ওয়া ইয়াছ ছামাউ কুশিতাত।

এবং যখন আকাশের ছাল খসানো হবে

তাফসীরঃ

৭. অর্থাৎ পশুর চামড়া ছাড়ানো হলে, যেমন তার অস্থি-মাংস সব প্রকাশ হয়ে পড়ে, তেমনি আকাশকেও সম্পূর্ণরূপে উম্মুক্ত করে দেওয়া হবে, ফলে তাতে যা-কিছু আছে সব প্রকাশ হয়ে পড়বে -অনুবাদক, তাফসীরে উছমানী অবলম্বনে।
১২

وَاِذَا الۡجَحِیۡمُ سُعِّرَتۡ ۪ۙ ١٢

ওয়া ইযাল জাহীমুছু‘‘য়িরাত।

এবং যখন জাহান্নামকে প্রজ্বলিত করা হবে
১৩

وَاِذَا الۡجَنَّۃُ اُزۡلِفَتۡ ۪ۙ ١٣

ওয়া ইযাল জান্নাতুউঝলিফাত।

এবং যখন জান্নাতকে নিকটবর্তী করা হবে,
১৪

عَلِمَتۡ نَفۡسٌ مَّاۤ اَحۡضَرَتۡ ؕ ١٤

‘আলিমাত নাফছুম মাআহদারাত।

তখন প্রত্যেক ব্যক্তি জানতে পারবে সে (ভালো-মন্দ) যা কিছু হাজির করেছে।
১৫

فَلَاۤ اُقۡسِمُ بِالۡخُنَّسِ ۙ ١٥

ফালা উকছিমুবিলখুন্নাছ।

আমি শপথ করছি সেই সব নক্ষত্রের, যা পিছন দিকে চলে
১৬

الۡجَوَارِ الۡکُنَّسِ ۙ ١٦

আল জাওয়া-রিল কুন্নাছ।

যা চলতে চলতে অদৃশ্য হয়ে যায়।

তাফসীরঃ

৮. কোন কোন নক্ষত্র এমনও আছে, যাদেরকে কখনও পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যেতে দেখা যায় এবং কখনও পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে। যেন তারা এক দিকে চলতে চলতে এক পর্যায়ে উল্টো দিকে ঘুরে যায়। ফের চলতে চলতে এক সময় দৃষ্টির আড়াল হয়ে যায়। নক্ষত্রদের এ রকম পরিক্রমণ আল্লাহ তাআলার অপার শক্তির এক বিস্ময়কর নিদর্শন। তাই কুরআন মাজীদে তাদের শপথ করা হয়েছে।
১৭

وَالَّیۡلِ اِذَا عَسۡعَسَ ۙ ١٧

ওয়াল্লাইলি ইযা-‘আছ‘আছ।

এবং শপথ করছি রাতের, যখন তার অবসান হয়
১৮

وَالصُّبۡحِ اِذَا تَنَفَّسَ ۙ ١٨

ওয়াসসুবহিইযা-তানাফফাছ।

এবং ভোরের, যখন তা শ্বাস গ্রহণ করে।

তাফসীরঃ

৯. ভোরবেলা সাধারণত মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হয়। সেই বাতাসের বয়ে চলাকে অলংকারপূর্ণ ভাষায় ‘ভোরের শ্বাস গ্রহণ’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। (এর আরেক অর্থ যখন ভোর উদ্ভাসিত হয়, তার আলো ছড়িয়ে পড়ে। -অনুবাদক)
১৯

اِنَّہٗ لَقَوۡلُ رَسُوۡلٍ کَرِیۡمٍ ۙ ١٩

ইন্নাহূলাকাওলুরাছূলিন কারীম।

নিশ্চয়ই এটা (অর্থাৎ কুরআন) এক সম্মানিত ফেরেশতার আনীত বাণী ১০

তাফসীরঃ

১০. এর দ্বারা হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে বোঝানো হয়েছে, যিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ওহী নিয়ে আসতেন।
২০

ذِیۡ قُوَّۃٍ عِنۡدَ ذِی الۡعَرۡشِ مَکِیۡنٍ ۙ ٢۰

যী কুওওয়াতিন ‘ইনদা যিল ‘আরশি মাকীন।

যে শক্তিশালী, আরশের অধিপতির কাছে মর্যাদাসম্পন্ন।
২১

مُّطَاعٍ ثَمَّ اَمِیۡنٍ ؕ ٢١

মুতা-‘ইন ছাম্মা আমীন।

যাকে সেখানে মান্য করা হয় ১১ এবং যে আমানতদার।

তাফসীরঃ

১১. অর্থাৎ ঊর্ধ্ব জগতে অন্যান্য ফেরেশতা তাকে মান্য করে চলে।
২২

وَمَا صَاحِبُکُمۡ بِمَجۡنُوۡنٍ ۚ ٢٢

ওয়া মা-সা-হিবুকুম বিমাজনূন।

(হে মক্কাবাসীগণ!) তোমাদের সঙ্গী (অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উন্মাদ নয়।
২৩

وَلَقَدۡ رَاٰہُ بِالۡاُفُقِ الۡمُبِیۡنِ ۚ ٢٣

ওয়া লাকাদ রাআ-হু বিলউফুকিল মুবীন।

নিশ্চয়ই সে তাকে (অর্থাৎ জিবরাঈলকে) স্পষ্ট দিগন্তে দেখতে পেয়েছে। ১২

তাফসীরঃ

১২. হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সাধারণত কোন মানুষের আকৃতিতে আসতেন। কিন্তু একবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তাঁর আসল আকৃতিতে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি আকাশের এক প্রান্তে নিজের আসল আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সেভাবে দেখতে পান। আয়াতের ইশারা সেই ঘটনার দিকেই। বিষয়টা কিছুটা বিস্তারিত সূরা নাজমেও গত হয়েছে। সেখানে ২, ৩ ও ৪ নং টীকা দ্রষ্টব্য।
২৪

وَمَا ہُوَ عَلَی الۡغَیۡبِ بِضَنِیۡنٍ ۚ ٢٤

ওয়ামা-হুওয়া ‘আলাল গাইবি বিদানীন।

এবং সে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নয়। ১৩

তাফসীরঃ

১৩. অর্থাৎ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে অদৃশ্য বিষয়ক যা-কিছু জানতেন তা মানুষের কাছে গোপন করতেন না; বরং সকলের কাছেই তা প্রকাশ করে দিতেন। জাহেলী যুগে যারা কাহিন বা অতীন্দ্রিয়বাদী নামে পরিচিত ছিল, তারাও মানুষকে অদৃশ্য বিষয়ে জানানোর দাবি করত। তারা এটা করত দুষ্ট জিনদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে। জিনরা তাদেরকে নানা রকমের মিথ্যা কথা শুনিয়ে দিত আর তাই তারা মানুষের কাছে প্রকাশ করত। তাও আবার টাকার বিনিময়ে। ফি ছাড়া তারা কাউকে কিছু বলতে চাইত না। আল্লাহ তাআলা কাফেরদেরকে বলছেন, তোমরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ‘কাহিন’ বলছ, অথচ কাহিনরা তো তোমাদের কাছে মিথ্যা বলার ক্ষেত্রেও এমন কার্পণ্য করে যে দক্ষিণা ছাড়া কিছু বলতে চায় না। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অদৃশ্য বিষয়ে যেসব সত্য জানতে পারেন, তা তোমাদের কাছে প্রকাশ করতে কোন কার্পণ্য করেন না এবং সেজন্য তিনি কোন বিনিময়ও গ্রহণ করেন না।
২৫

وَمَا ہُوَ بِقَوۡلِ شَیۡطٰنٍ رَّجِیۡمٍ ۙ ٢٥

ওয়ামা-হুওয়া বিকাওলি শাইতা-নির রাজীম।

এবং এটা (অর্থাৎ কুরআন) কোন বিতাড়িত শয়তানের (রচিত) বাণীও নয়।
২৬

فَاَیۡنَ تَذۡہَبُوۡنَ ؕ ٢٦

ফাআইনা তাযহাবূন।

তা সত্ত্বেও তোমরা কোন দিকে যাচ্ছ?
২৭

اِنۡ ہُوَ اِلَّا ذِکۡرٌ لِّلۡعٰلَمِیۡنَ ۙ ٢٧

ইন হুওয়া ইল্লা-যিকরুল লিল‘আ-লামীন।

এটা তো জগদ্বাসীদের জন্য উপদেশ,
২৮

لِمَنۡ شَآءَ مِنۡکُمۡ اَنۡ یَّسۡتَقِیۡمَ ؕ ٢٨

লিমান শাআ মিনকুম আইঁ ইয়াছতাকীম।

তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে থাকতে চায় তার জন্য।
২৯

وَمَا تَشَآءُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ اللّٰہُ رَبُّ الۡعٰلَمِیۡنَ ٪ ٢٩

ওয়ামা-তাশাঊনা ইল্লাআইঁ ইয়াশাআল্লা-হু রাব্বুল ‘আ-লামীন।

তোমরা ইচ্ছা করবে না, যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক। ১৪

তাফসীরঃ

১৪. সুতরাং তোমাদের উচিত তাঁর অভিমুখী হওয়া ও তাঁর কাছে দুআ করা যাতে তিনি তোমাদের অন্তরে সদিচ্ছা জাগ্রত করেন, সরল পথে চলার আগ্রহ দান করেন এবং তাতে প্রতিষ্ঠিত থাকতে সাহায্য করেন। -অনুবাদক
সূরা আত তাক্‌ভীর | মুসলিম বাংলা