সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা আল বালাদ (الـبلد) | নগর

মাক্কী

মোট আয়াতঃ ২০

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

لَاۤ اُقۡسِمُ بِہٰذَا الۡبَلَدِ ۙ ١

লাউকছিমুবিহা-যাল বালাদ।

আমি শপথ করছি এই নগরের

وَاَنۡتَ حِلٌّۢ بِہٰذَا الۡبَلَدِ ۙ ٢

ওয়া আনতা হিল্লুম বিহা-যাল বালাদ।

যখন (হে নবী!) তুমি এই নগরের বাসিন্দা।

তাফসীরঃ

১. ‘এই নগর’ দ্বারা মক্কা মুকাররমাকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এ নগরকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থানের কারণে এর মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর আবির্ভাবের জন্য এ নগরকে বাছাই করে আল্লাহ তাআলা একে মহিমান্বিত করেছেন। এ আয়াতের আরও দু’টি ব্যাখ্যা আছে। বিস্তারিত জানার জন্য ‘মাআরিফুল কুরআন’ দেখা যেতে পারে।

وَوَالِدٍ وَّمَا وَلَدَ ۙ ٣

ওয়া ওয়া-লিদিওঁ ওয়ামা-ওয়ালাদ।

এবং আমি শপথ করছি পিতার ও তার সন্তানের

তাফসীরঃ

২. ‘পিতা’ হচ্ছেন হযরত আদম আলাইহিস সালাম, যেহেতু সমস্ত মানুষ তারই সন্তান। এভাবে এ আয়াতে সমগ্র মানব জাতির শপথ করা হয়েছে।

لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡ کَبَدٍ ؕ ٤

লাকাদ খালাকনাল ইনছা-না ফী কাবাদ।

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি পরিশ্রমের ভেতর

তাফসীরঃ

৩. চতুর্থ আয়াতের এ কথাটি বলার জন্য আগের শপথগুলো করা হয়েছে। বোঝানো হচ্ছে যে, দুনিয়ায় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে শ্রমনির্ভর করে। তাকে কোনও না কোনও পরিশ্রম করতেই হয়। যত বড় রাজা-বাদশাহ হোক বা হোক অজস্র সম্পদের মালিক, জীবন রক্ষার জন্য তাকে অবশ্যই এক রকমের না এক রকমের পরিশ্রম স্বীকার করতেই হবে। কেউ যদি দুনিয়ায় সম্পূর্ণ বিনা মেহনতে বেঁচে থাকতে চায়, তবে সেটা তার অসার কল্পনা। এটা কখনও সম্ভব নয়। হাঁ পরিপূর্ণ আরামের জীবন হল জান্নাতের জীবন, যা দুনিয়ায় কৃত শ্রম-সাধনার বদৌলতে লাভ হবে। আয়াতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, দুনিয়ায় কাউকে যখন কোন কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হতে হয়, তখন সে যেন এই চরম সত্য চিন্তা করে। বিশেষত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামকে মক্কা মুকাররমায় যে দুঃখ-কষ্ট পোহাতে হচ্ছিল, তজ্জন্য এ আয়াতে তাদেরকে সান্তনাও দান করা হয়েছে। এ কথাটি বলার জন্য প্রথমে মক্কা মুকাররমার শপথ করা হয়েছে সম্ভবত এ কারণে যে, এ নগরকে আল্লাহ তাআলা যদিও দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা বেশি সম্মানিত স্থান বানিয়েছেন, কিন্তু তার এ সম্মান ও মর্যাদা আপনা-আপনিই সৃষ্টি হয়ে যায়নি। এর জন্যও এখানে প্রচুর শ্রম ব্যয় করতে হয়েছে। তার এ মর্যাদা দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্য আজও মানুষকে মেহনত করতে হয়। তারপর বিশেষভাবে এ নগরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের কথা উল্লেখ করে সম্ভবত ইশারা করা হয়েছে যে, তিনি শ্রেষ্ঠতম নবী ও শ্রেষ্ঠতম নগরের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও যখন কষ্ট-ক্লেশ তাকেও স্বীকার করতে হয়েছে, তখন ষোল আনা আরামের জীবন কে আশা করতে পারে? অতঃপর হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও তার সন্তানদের শপথ করার মধ্যে এই ইঙ্গিত রয়েছে যে, তোমরা গোটা মানবেতিহাসের প্রতি লক্ষ্য করে দেখ, সর্বত্র এই একই চিত্র দেখতে পাবে। বুঝতে পারবে, মানুষের জীবনটাই শ্রম-নির্ভর ও ক্লেশপূর্ণ।

اَیَحۡسَبُ اَنۡ لَّنۡ یَّقۡدِرَ عَلَیۡہِ اَحَدٌ ۘ ٥

ওয়া ইয়াহছাবুআল্লাইঁ ইয়াকদিরা ‘আলাইহি আহাদ।

সে কি মনে করে তার উপর কারও ক্ষমতা চলবে না?

یَقُوۡلُ اَہۡلَکۡتُ مَالًا لُّبَدًا ؕ ٦

ইয়াকূ লুআহলাকতুমা-লাল লুবাদা-।

সে বলে, আমি অঢেল অর্থ-সম্পদ উড়িয়েছি।

তাফসীরঃ

৪. মক্কা মুকাররমায় কয়েকজন কাফের খুব বেশি পেশী শক্তির অধিকারী ছিল। তাদেরকে যখন আল্লাহ তাআলার শাস্তির ভয় দেখানো হত, বলত, আমাদেরকে কেউ কাবু করতে পারবে না। যেসব কাফের বিত্তবান ছিল তারা একে অন্যকে বলত, দেখ আমি প্রচুর অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে ফেলেছি। ব্যয় করাকে ‘উড়ানো’ শব্দে ব্যক্ত করে বোঝাতো যে, এই ব্যয়ে আমি কোন কিছু গ্রাহ্য করি না। তারা বিশেষভাবে গর্ব করত সেই ব্যয় নিয়ে, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতা ও শত্রুতার পেছনে করত।

اَیَحۡسَبُ اَنۡ لَّمۡ یَرَہٗۤ اَحَدٌ ؕ ٧

আইয়াহছাবুআল্লাম ইয়ারাহূআহাদ।

সে কি মনে করে তাকে কেউ দেখছে না?

তাফসীরঃ

৫. অর্থাৎ যা-কিছু ব্যয় করেছে, তা তো দেখানোর জন্য করেছে। এর উপর গর্ব কিসের? আল্লাহ তাআলা কি দেখছেন না সে কী কাজে ও কী উদ্দেশ্যে ব্যয় করছে?

اَلَمۡ نَجۡعَلۡ لَّہٗ عَیۡنَیۡنِ ۙ ٨

আলাম নাজ‘আল্লাহূ‘আইনাইন।

আমি কি তাকে দেইনি দু’টি চোখ?

وَلِسَانًا وَّشَفَتَیۡنِ ۙ ٩

ওয়া লিছা-নাওঁ ওয়া শাফাতাইন।

এবং একটি জিহ্বা ও দু’টি ঠোঁট?
১০

وَہَدَیۡنٰہُ النَّجۡدَیۡنِ ۚ ١۰

ওয়া হাদাইনা-হুন্নাজদাঈন।

আমি তাকে দু’টো পথই দেখিয়েছি।

তাফসীরঃ

৬. আল্লাহ তাআলা মানুষকে ভালো ও মন্দ দুই পথই দেখিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে এখতিয়ার দিয়েছেন, নিজ ইচ্ছায় চাইলে ভালো পথ অবলম্বন করতে পারে এবং চাইলে মন্দ পথেও যেতে পারে। তবে ভালো পথে চললে পুরস্কার পাবে আর মন্দ পথে চললে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।
১১

فَلَا اقۡتَحَمَ الۡعَقَبَۃَ ۫ۖ ١١

ফালাকতাহামাল ‘আকাবাহ।

তবুও সে প্রবেশ করতে পারেনি ঘাঁটিতে।

তাফসীরঃ

৭. العقبة অর্থ ঘাঁটি, দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথ। সাধারণত যুদ্ধকালে শত্রু থেকে আত্মরক্ষার জন্য এরূপ পথ বেছে নেওয়া হয়। এস্থলে ঘাঁটিতে প্রবেশ করার অর্থ সওয়াবের কাজ করা, যেমন পরের আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা নিজেই ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। এসব কাজকে ‘ঘাঁটিতে প্রবেশ’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে এ কারণে যে, এগুলো মানুষকে আল্লাহ তাআলার আযাব থেকে রক্ষার জন্য সহায়ক হয়।
১২

وَمَاۤ اَدۡرٰىکَ مَا الۡعَقَبَۃُ ؕ ١٢

ওয়ামাআদরা-কা মাল ‘আকাবাহ।

তুমি কি জান সে ঘাঁটি কী?
১৩

فَکُّ رَقَبَۃٍ ۙ ١٣

ফাক্কুরাকাবাহ ।

(তা হচ্ছে কারও) গর্দানকে (দাসত্ব থেকে) মুক্ত করা
১৪

اَوۡ اِطۡعٰمٌ فِیۡ یَوۡمٍ ذِیۡ مَسۡغَبَۃٍ ۙ ١٤

আও ইত‘আ-মুন ফী ইয়াওমিন যী মাছগাবাহ ।

অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্য দান করা
১৫

یَّتِیۡمًا ذَا مَقۡرَبَۃٍ ۙ ١٥

ইয়াতীমান যা-মাকরাবাহ।

কোন ইয়াতীম আত্মীয়কে
১৬

اَوۡ مِسۡکِیۡنًا ذَا مَتۡرَبَۃٍ ؕ ١٦

আও মিছকীনান যা-মাতরাবাহ।

অথবা এমন কোন মিসকীনকে যে ধুলো মাটিতে গড়াগড়ি খায়।
১৭

ثُمَّ کَانَ مِنَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَوَاصَوۡا بِالصَّبۡرِ وَتَوَاصَوۡا بِالۡمَرۡحَمَۃِ ؕ ١٧

ছু ম্মা কা-না মিনাল্লাযীনা আ-মানূওয়াতাওয়া-সাও বিসসাবরি ওয়াতাওয়া-সাও বিল মারহামাহ।

আর অন্তর্ভুক্ত হওয়া সেই সব লোকের, যারা ঈমান এনেছে, একে অন্যকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়েছে এবং একে অন্যকে দয়ার উপদেশ দিয়েছে।
১৮

اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡمَیۡمَنَۃِ ؕ ١٨

উলাইকা আসহা-বুল মাইমানাহ।

তারাই সৌভাগ্যবান লোক।

তাফসীরঃ

৮. ‘তারাই সৌভাগ্যবান’ এটা اَصْحٰبُ الْمَيْمَنَةِ -এর তরজমা। এর আরেক তরজমা হতে পারে, ‘তারাই ডান হাত বিশিষ্ট’। তখন এর দ্বারা সেই সব লোককে বোঝানো হবে, যাদেরকে তাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে।
১৯

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِنَا ہُمۡ اَصۡحٰبُ الۡمَشۡـَٔمَۃِ ؕ ١٩

ওয়াল্লাযীনা কাফারূবিআ-য়া-তিনা-হুম আসহা-বুল মাশআমাহ।

অপর দিকে যারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করেছে, তারাই হতভাগ্য।

তাফসীরঃ

৯. اَصْحٰبُ الْمَشْئَمَةِ -এর তরজমা। এর আরেক তরজমা হতে পারে ‘তারাই বাম হাত বিশিষ্ট’, অর্থাৎ যাদেরকে তাদের বাম হাতে আমলনামা দেওয়া হবে।
২০

عَلَیۡہِمۡ نَارٌ مُّؤۡصَدَۃٌ ٪ ٢۰

‘আলাইহিম না-রুম মু’সাদাহ।

তাদের উপর চাপানো থাকবে আবদ্ধকৃত আগুন। ১০

তাফসীরঃ

১০. অর্থাৎ তার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে, যাতে জাহান্নামীরা বাইরে বের হতে না পারে। বদ্ধস্থানে থাকার কারণে আগুনের তীব্রতাও অনেক বেশি হবে।
সূরা আল বালাদ | মুসলিম বাংলা