প্রবন্ধ
‘আত্মানং বিদ্ধি’ আকিদা পোষণ! বাউল মতবাদ! পর্ব—৩
৭ জানুয়ারী, ২০২৬
১১৮৯
০
হিন্দু ধর্মে একটি সাধনার কথা বলা হয়েছে— ‘আত্মানং বিদ্ধি’, অর্থাৎ নিজেকে চেনো। এই আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানকেই মানবজীবনের মূল সাধনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাউল ধর্মে কী বলে?
বাউলদের ধর্মেও অন্যতম সাধনা হলো, হিন্দুদের ‘আত্মানং বিদ্ধি’। দেখুন, তারা লিখেছে—
খোদ বান্দার দেহে খোদা সে রয় লুকায়ে,
আলিফে মিম বসায়ে আহমদ নাম হলো সে না।
ইরফানী কোরান খুঁজে দেখতে পাবে তনের মাঝে,
ছয় লতিফায় কী রূপ সাজে জিকির উঠছে সদাই। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৬৪)
তারা এর ব্যাখ্যায় লিখেছে—
‘আত্মানং বিদ্ধি’ অর্থাৎ, নিজেকে চেনো বলে হিন্দুশাস্ত্রে একটি কথার প্রচলন রয়েছে। অপরদিকে হাদিসেও বলা হয়েছে—মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাও। অর্থাৎ, যে নিজেকে চিনেছে, সে আল্লাহকে চিনেছে। তার মানে আত্মানুসন্ধানই আসল কথা। সেটিই মনেপ্রানে ধারণ করেছেন বাংলার বাউলেরা। —(বাউলসাধনা, পৃ. ৩২)
অর্থাৎ তারা বুঝাতে চায়—যে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে সক্ষম হয়, সে উপলব্ধি করতে পারে যে, তার ভেতরেই আল্লাহ বিরাজমান। অর্থাৎ সে নিজেই আল্লাহর রূপ।
ইসলাম কী বলে?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি। এটি হাদিসের নামে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা হয়েছে। ইমাম সুয়ূতী রহি. বলেছেন—
إن هذا الحديث ليس بصحيح ، وقد سئل عنه النووي في فتاويه فقال : إنه ليس بثابت ، وقال ابن تيمية : موضوع ، وقال الزركشي في الأحاديث المشتهرة : ذكر ابن السمعاني : إنه من كلام يحيى بن معاذ الرازي
“এই হাদিসটি সহীহ নয়। ইমাম নববী রহি.-কে তার ফতোয়ায় এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন—এটা (হাদিস হিসাবে) প্রমাণিত নয়। ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন, ‘এটি জাল।’ ইমাম যারকাশি তাঁর ‘আল-আহাদিসুল মুশতাহারাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন—ইমাম ইবনে সামআনী উল্লেখ্য করেছেন যে, এটি ইয়াহিয়া ইবনে মুয়ায আর-রাযীর বাণী থেকে এসেছে।” —(আল-হাবী লিস সুয়ূতী, পৃ. ২৮৭)
ইয়াহহিয়া ইবনে মুয়ায রাযী (রহ.)-এর বাণীর ব্যাখ্যা : এই বাণীটি যদিও হাদিস নয়, কিন্তু তাসাউফের লাইনে এ বাণীটা অত্যান্ত গুরুত্ববহ। কিন্তু এই বাণীটার যে মর্মার্থ বাউলরা করেছেন, সেটা বিকৃত ব্যাখ্যা। এর প্রকৃত ব্যাখ্যার ব্যাপারে ইমাম সুয়ূতী (রহ.) এই বলেন—
أي من عرف نفسه بذلها وعجزها وفقرها عرف الله بعزه وقدرته وغناه ، فتكون معرفة النفس أولا ثم معرفة الله من بعد
“যে কেউ নিজের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব এবং দারিদ্র্যকে চিনতে পারে, সে ঈশ্বরের শক্তি, এবং ঐশ্বর্যকে চিনতে পারে। সুতরাং, আত্ম-জ্ঞান প্রথমে আসে, তারপরে ঈশ্বরের জ্ঞান।” —(আল-হাবী লিস সুয়ূতী, পৃ. ২২৭)
সুতরাং তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির পরিমণ্ডলে ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মুʿআয রাযী (রহ.)-এর বক্তব্য ও বাউলদের দাবির মধ্যে কোনও সামঞ্জস্য নেই। বরং ইয়াহইয়া ইবনে মুʿআয (রহ.)-এর কথায় মানুষের আত্মা পরিশুদ্ধ হয়, আর বাউলদের বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে শিরকের ধারণা প্রতিফলিত হয়।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
নাস্তিকতা প্রসঙ্গে কিছু সিগনিফিকেন্ট পয়েন্ট
নাস্তিকরা—অর্থাৎ যারা সৃষ্টিকর্তাকে মানে না—যখন আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তারা বিজ্ঞানক...
মূর্তি ও ভাস্কর্যপ্রীতি : ইসলাম কী বলে?
ইসলামের যে বিষয়গুলোর নিষিদ্ধতা অকাট্য ও মুতাওয়াতিরভাবে প্রমাণিত তার মধ্যে প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ ...
নাজাতের জন্য শিরকমুক্ত ঈমান ও বিদ'আতমুক্ত আমল জরুরী
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] الحمد لله وكفى وسلام على عباده الذين اصطفى، أما بعد فأعوذ بالله من الشي...
কালিমার মর্মবাণী
কালিমায়ে তাওহীদ لا إله إلا الله محمد رسول الله প্রথম অংশ-তাওহীদে ইলাহী لا إله إلا الله (লা-ইলাহা ইল...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন