মানুষের ভালোবাসা বিশেষ, যার বিকল্প নেই
মানুষের ভালোবাসা বিশেষ, যার বিকল্প নেই
[আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিশেষ মর্যাদায় সৃষ্টি করেছেন, যার কোনো বিকল্প নেই। মানুষের আসল পরিচয় হলো—সে ভালোবাসতে পারে এবং ভালোবাসার কদর করতে জানে। অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে মানুষের বিকল্প আছে, কিন্তু মহব্বতের ক্ষেত্রে মানুষ অনন্য। আল্লাহ নবিগণকে পাঠিয়েছেন মানুষকে এই শিক্ষা দিতে যে, তারা যেন আল্লাহর সাথে মহব্বতের সম্পর্ক স্থাপন করে এবং আল্লাহর মহব্বতের কৃতজ্ঞতা আদায় করে। এই কৃতজ্ঞতা আদায় হয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পূর্ণ জীবনাদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে—শুধু নামাজ-রোজা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় সুন্নাত পালনের মাধ্যমে। যখন মানুষ এই পথে চলে, তখন তার অন্তরে এমন স্বাদ আসে যে দুনিয়ার সকল ভোগ-বিলাস তুচ্ছ হয়ে যায়।]
তারিখ ও স্থান:
১৫ই নভেম্বর ২০০৭, বৃহস্পতিবার, মাগরিব নামাজ বাদ, আলাইপুর মারকাজ মসজিদ, নাটোর।
أعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ، آمِنُوْا كَمَا آمَن النَّاسُ
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ ، أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلاَةُ وَالسَّلَامُ.
আল্লাহ তাআলা এই জগতে মানুষকে এক বিশেষ স্থান ও বিশেষ মর্যাদা দিয়ে পাঠিয়েছেন। আর বিশেষ মানে হলো এই যে, যেটা বিশেষ নয় তার বিকল্প আছে। আর বিশেষ যে, তার কোনো বিকল্প নেই। আর মানুষ এমন ধরনের জীব যে, এর বদল কিছু পাওয়া যায় না। তো মানুষকে মানুষ হিসাবে যখন পাবে, তখনই তার আসল পরিচয় পাবে। বদল হিসাবে কী আর বিশেষ কী, কথা একটু পরিষ্কার হওয়া দরকার।
মা-বাবার ছেলে, অসুস্থ ছেলে, তার চিকিৎসা ইত্যাদি করতে হচ্ছে, কেউ প্রস্তাব দিলো যে এই ছেলে ভালো হবে কি হবে না আর তার চিকিৎসায় বহু ব্যয় হবে, আর হাসপাতালে গেলে অনেকে আছে তার ছেলেকে দিয়ে দেবে, তো অন্য কোনো ছেলে নিয়ে নেন তাকে পালবেন, আর এই ছেলে, ব্যয়বহুল চিকিৎসা, ভালো হবে কি হবে না, একে বাদ দিয়ে দেন, উত্তম ভালো বিকল্প পাওয়া যাবে।
তো এই ধরনের প্রস্তাব কেউ দেবেই না, কোনো সুস্থ মানুষ দেবে না। আর যদি কোনো পাগল বা কোনো বোকা দেয়ও, এটা কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব নয়। কেন? ছেলে এই ধরনের যে, তার কোনো বিকল্প হতে পারে না? এটা কোনো প্রয়োজনের জিনিস নয়, ভালোবাসার ব্যাপার। যত প্রয়োজনের জিনিস আছে জরুরিয়াতের সাথে সম্পর্কিত যেগুলো, এগুলোর সব বিকল্প আছে। আর যেগুলো ভালোবাসার সাথে সম্পর্কিত, এগুলোর কোনো বিকল্প নেই। কোনো কিছু দিয়ে তার বদল হবে না।
হজে যাবে তো এর জন্য এক জামানায় মানুষ জাহাজে যেত। এখন এয়ারোপ্লেনে যায়, জাহাজের চেয়ে সময় অনেক কম লাগে, আরামে যাওয়া যায়। তো ভালো বিকল্প পাওয়া গেছে, এখন আর জাহাজে যেতে রাজি নয়। তো এই ব্যাপারে বিকল্প সম্ভব। যদি কেউ দেশের মধ্যেই বা অন্য কোনো দেশে আরও সুন্দর করে একটা কাবার মতো জিনিস বানায়, এখানে যাওয়া সহজ আর থাকা খাওয়ার ভালো বন্দোবস্ত আছে, তো মক্কাশরীফ গিয়ে হজ না করে এখানে যে কাবার মতো জিনিস হয়েছে, ওটার হজই করো। বলে যে, না, এটা সম্ভব না।
তো বলল যে, আগে তোমরা জাহাজে যেতে এখন প্লেনে যাও, ওটার তো বিকল্প আছে, এটারও বিকল্প করতে অসুবিধা কী? ওটার বিকল্প হতে পারে, কারণ প্লেনে চড়া কোনো লক্ষ্য বা কোনো মাকসাদ নয়। একটা মাকসাদ হাসিল করার জন্য এটা উপলক্ষ্য। উপলক্ষ্য পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করা এটা কোনো কিছুর উপলক্ষ্য নয়; এটা আল্লাহরই সাথে মহব্বতের প্রকাশ, এখানে কোনো বিকল্প হতে পারে না।
মা অসুস্থ, তার জন্য নার্স রাখা হয়েছে। নার্সের অনেক বেতন, আর মেজাজও বেশি ভালো নয়। রাগটাগও বেশি করে কিন্তু যেহেতু মায়ের সেবাযত্নের প্রয়োজন, আর সব ধরনের যত্ন এ ছেলেমেয়েদের দ্বারা হয় না, কিছু কিছু যত্ন এমন ধরনের আছে, যেগুলোর কিছু জ্ঞান দরকার। যেমন ইনজেকশন দেওয়া ইত্যাদি। তো ছেলে বলল যে আমিও ইনজেকশন দিতে পারি না, মেয়েও পারে না, কেউ পারে না। এটার জন্য দক্ষ লোকের প্রয়োজন। তো যে এই ব্যাপারে দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, প্রেশার দেখা-টেখা ইত্যাদি অনেকগুলো জিনিস আছে, যার ফলে মায়ের যত্নের জন্য বেতন দিয়ে নার্স রাখা হয়েছে। কিন্তু এই নার্সের বেতনও অনেক দিতে হয় আর মেজাজও অনেক খড়া। তখন আরেক জন নার্স পাওয়া গেল। সেও দক্ষ, বরং দক্ষতার দিকে আরও বেশি, মেজাজ ভালো, তো যদি পায় ওরকম তাহলে বদলে নেবে। আরও ভালো নার্স পাওয়া গেছে, বেতনও কম মেজাজও ভালো, তো একেই রাখি, একে বাদ দিয়ে দিই। কিন্তু এটা হবে না যে এই মা তো বিছানায় পড়ে আছে, বিছানায় পেশাব-পায়খানা করে, একে রেখে তো বেশি সুবিধা হচ্ছে না, এই মাকে বাদ দিই আর আরেক মা জোগাড় করি। ওটা হবে না, কারণ ওটা মহব্বতের আর মহব্বতের ব্যাপারে কোনো বিকল্প হয় না। আর ওই মহব্বতের মাকসাদ পূরা করার জন্য, তার যত্ন করার জন্য, এটা হচ্ছে একটা জরুরিয়াত, নার্স রাখা; এখানে বিকল্প হতে পারে।
মানুষের প্রধান পরিচয় হলো যে, সে মহব্বত করে, আর মহব্বতের কদর করতে জানে। এই ব্যাপারে দুনিয়াতে মানুষের কোনো বিকল্প নেই; যদিও অনেকে বিকল্প খুঁজে, কুকুর পালে, বিড়াল পালে, কিন্তু এটা কোনো জ্ঞানের কথা নয়। কুকুর যদিও কিছু মহব্বত বোঝে, গরুও বোঝে, কিন্তু মানুষের বদল হতে পারে না, মানুষের মাত্রার নয়। আর যে কুকুরকে বড়ই ভক্ত মনে হয় আর অন্য কেউ তাকে একটু ভালো বিস্কুট-টিস্কুট দেয় তো ওদিকে চলে যাবে। নাও যদি যায়, সে তার মনিবের কদর করে ঠিকই, কিন্তু মানুষের বদল হতে পারে না। এর মোকাবিলায় জরুরিয়াত, পাহারার জন্য রাখা হয়েছে প্রহরী, আর কুকুরও রাখা হয়েছে। তো পাহারা দেওয়ার কাজ যেটা তা মানুষের চেয়ে হয়তো কুকুর ভালো করবে। মানুষ অনেক সময় ঘুমিয়ে যায়, ক্লান্ত হয়ে যায়, ভয় পেয়ে যায়। কুকুর ভয়ও পাবে না, যদি কেউ আসে তবে ঘেউ ঘেউ করবে। মানুষ অত জোরে চিৎকারও করতে পারে না যে, ডাকাডাকি করে গোটা বাড়ির মানুষকে জাগিয়ে দেবে। তো সে চেষ্টা করলেও পারে না, মানুষের গলায় অত জোর নেই। কুকুরের গলায় আছে। যখন ঘেউ ঘেউ আরম্ভ করে, গোটা বাড়ির মানুষ জেগে যাবে। আর চোর-ডাকাতকে তাড়ানোর ব্যাপারেও কুকুর বেশি পারে। মানুষকে দেখে চোর অত ভয় পাবে না। কুকুর আক্রমণ করলে যত ভয় পাবে। বিভিন্ন ব্যাপারে।
তো মানুষের আসল যে জায়গায় তার কদর, যেখানে তার বিকল্প নেই, সেটা হলো একমাত্র জায়গা, যেখানে তার সম্পর্ক ভালোবাসার সাথে। ভালোবাসার সাথে মানে নিজে ভালোবাসতে পারে, আর অন্য কেউ ভালোবাসলে তার কদর করতে পারে। এটাই মানুষের প্রধান পরিচয়। এ ছাড়া মানুষের যত উপকারিতা আছে, যত মূল্য আছে, সবগুলোর বিকল্প আছে, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিকল্পগুলো মানুষের চেয়ে আরও বেশি ভালো।
আমাদের দেশে ওই সুপারি ইত্যাদি চাষ করে, মালয়েশিয়া ইত্যাদিতে চাষ করে, আমি দেখিনি শুনেছি যে, ওই সুপারি কাটার জন্য, উঁচু গাছ তো, মানুষের উপরে উঠে কাটা সময়সাপেক্ষ, পরিশ্রম লাগে। আমাদের দেশে এটার প্রচলন নেই, কিন্তু ওই মালয়েশিয়া ওদিকে নাকি ওটার জন্য বানর পালে। একটা-দুইটা বানর, বানরের জন্য খরচও অত বেশি নয়। আর গাছে ওঠা বানরের জন্য বড়ই সহজ কাজ। সুপারি পাকল, লাফ দিয়ে গাছে উঠল, ওই সুপারিগুলো সে হাতের মধ্যে ছুরি নিয়ে উঠে কেটে নিচে ফেলে দেয়, লাফ দিয়ে পাশের গাছে চলে যায়, কেটে ফেলে দেয়। একটা বানর এই ব্যাপারে অনেক মানুষের কাজ করতে পারে, আর একটা বানরের বেতন মানুষের চেয়ে অনেক কম। শুধু খাবার দিলেই হয়ে যাবে। এ ছাড়া মাসিক বেতনও দিতে হয় না, বোনাসও দিতে হয় না, ঈদ বোনাসও লাগে না, কোনো কিছুই লাগে না। আর যদি এই কাজটার জন্য মানুষ রাখত, তো ব্যয়বহুলও বেশি, কাজ করে অনেক কম। তারপর যন্ত্রপাতি। একজন মানুষ কোদাল দিয়ে যত কাজ করতে পারে, গরু লাঙল দিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি করতে পারে, ট্র্যাক্টর আরও বেশি করতে পারে। তো অন্যান্য ময়দানে তো মানুষের এত বেশি কদর নেই, মানুষের আসল কদরের জায়গা হলো ভালোবাসা। ভালোবাসার সম্পর্ক। সে নিজেই কাউকে ভালোবাসতে পারে, অন্য কেউ তাকে ভালোবাসলে সেটার কদর করতে পারে।
একটা ঘটনা অথবা গল্প, সম্ভবত একটা বাস্তব ঘটনাই হতে পারে। আল্লাহ তাআলা অস্বাভাবিক ধরনের ঘটনা অনেক সময় মানুষকে দেখান। যেহেতু এটা স্বাভাবিকভাবে হওয়ার কথা নয়, মানুষের শিক্ষার জন্য হয়ে থাকে। সম্ভবত মাওলানা ইউসুফ রহ. কোনো এক বয়ানের মধ্যে এই কথা বলেছিলেন। আমি নিজে তো শুনিনি, অন্যভাবে কথা এসে পৌঁছেছে।
কোনো এক রাজবাড়িতে রাজকুমারী ছিল, আর রাজকুমারীর সব কাপড়চোপড় যেগুলো ছিল, ওগুলো ধোপাকে দেওয়া হতো ধোয়ার জন্য। রাজকুমারীর কাপড় ধোপা এবং ধোপার বাড়িতে ধোপার ছেলেও ছিল, তারা ধুতো। এই কাপড়ের মাধ্যমে ধোপার ছেলে সেই রাজকুমারীর প্রেমে পড়ল। রাজকুমারী তার নাগালে কোথায়, বহুত দূরে। কিন্তু ওর ময়লা কাপড় ওর কাছে যায়, আর এইগুলো সে ধোয়, আর এর বাড়িতে সেই ধোপা বা ধোপার পরিবারের যারা ছিল তারা এটা লক্ষ করল এবং জানতে পারল আর তার পরের কথা, কেমন করে সেটা রাজা পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
রাজার কানে যখন কথা পড়ল, তো রাজা খুব রাগ করল আর রাজার রাগ করার কথাই যে ধোপার ছেলের আস্পর্ধা কত, কিছু না করুক, এই কথা চিন্তা করাই তো তার আদবের খেলাফ। রাজা খুব রাগ করল আর নিষেধ করে দিলো যে, ওকে যেন কাপড় ধুতে না দেওয়া হয়। তো নিষিদ্ধ হয়ে গেল। ওই কাপড় স্পর্শ করতে পারে না রাজার আদেশে। আর যখন সে এই আদেশ পেল, এই দুঃখে যে রাজকুমারীর কাপড়ই ধুতে পারবে না, আমার জীবনের কী অর্থ, মরে গেলো। এর পরে যখন কাপড় ধোয়া হয়, কাপড় যখন ফেরত নিয়ে আসা হয়, রাজকুমারীর আগের মতো কাপড় আর পছন্দ হয় না ধোয়া। একসময় সে রাগ করে ধোপাকে বলল, আগে তো কত ভালো করে ধোয়া হতো আর এখন ভালো ধোয়া হয় না কেন? তো ধোপা বেচারা বড় মনের দুঃখে বলল, যে ওরই তো ছেলে মারা গেছে, সে তো বাপ, তার মনে তো ব্যথা আছে, তো সে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, যে ধুতো তার মতো কে আর ধোবে? অর্থাৎ ওই গোপন কথা প্রকাশ হলো আর রাজকুমারীও জানতে পারল। রাজকুমারী যখন এটা জানল তো ওর দিলে এটার আছর পড়ল। যে দূর থেকে আমাকে দেখেইনি কোনো দিন, নাম শোনেইনি কোনো দিন, আর ভালোবাসায় সে জীবনই দিয়ে দিলো। তো আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন যে, সে নিজেই ভালোবাসতে পারে আর ভালোবাসার কদরও করতে পারে। এটা মানুষেরই বৈশিষ্ট্য। অন্য কেউ জ্ঞ বাঘ, ভল্লুক, হাস, মোরগ, বিড়াল, কুকুর, না ভালোবাসতে পারে, না তার কদর করতে পারে। আর হয়তো বা জিন্নাত হতে পারে। কারণ জানি না, জিন্নাতের জন্যও শরিয়ত আছে, আর শরিয়ত থাকা মানেই হলো তারও দিল আছে। আর এটা দিলেরই ব্যাপার, কলবের ব্যাপার। আল্লাহ তাআলা কলব এটা মানুষকেই দিয়েছেন।
তো রাজকুমারীর দিলে বড় আছর পড়ল। আর সে চাইল তাকে কোথায় দাফন করেছে আমি তার কবরে যাব। আরেক মুসিবত, ধোপা বেচারা এখন রাজকুমারীকে নিয়ে কী করে। তো যাই হোক বড় ভয়, আর শেষপর্যন্ত গোপনে একটা বন্দোবস্ত করল তার ছেলের কবরে রাজকুমারীকে নিয়ে যাওয়ার। তো অন্ধকারে ওখানে গেল, গিয়ে কবরের পাশে দাঁড়ালো। আর তার চারপাশে ঘুরিল, বলা যাক তাওয়াফ করল বা কিছু একটা করল। আর কী জানি করল, কবর খুলে গেল, আর সে ওখানে ঢুকে গেল, আর আবার কবর বন্ধ হয়ে গেল। বেচারা ধোপার জন্য আর এক নতুন মুসিবত। তো কিছু বলেইনি কিন্তু ধীরে ধীরে কথা প্রকাশ হয়েই গেল। কথা তো গোপন থাকে না, বের হয়েই যায়। কথা প্রকাশ পেল। আর তারপর কবরের কাছে গিয়ে কবর খোলা হলো। দেখা যাক কথা সত্য, না খামোখা মিথ্যা কথা বলেছে। তো খুলে দেখল, হ্যাঁ, ঠিকই। দুজনেই ওখানে আছে, এক দেহ হয়ে গেছে। তো সম্ভবত এটা বাস্তব ঘটনাই, কোথাকার জানি না। হিন্দুস্তানের কোথাকার বা কোনো এক দেশের হতে পারে। আর ওই যে বললাম, আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে অস্বাভাবিক ঘটনা অনেক সময় ঘটান, নানান ধরনের জিনিস হয়ে থাকে। শুধু যে আল্লাহওয়ালাদের জীবনেই অস্বাভাবিক ঘটনা হয়ে থাকে তাও নয়। যারা আল্লাহকে চেনেও না, তাদের জীবনেও অস্বাভাবিক ঘটনা কিছু ঘটতে পারে।
মানুষের এই বৈশিষ্ট্য যে সে ভালোবাসতে পারে, আর ভালোবাসার কদর করতে পারে, ওই জায়গায়ই মানুষের মানুষ হিসাবে পরিচয়। আর বাকি যত জায়গা আছে, সব জায়গায় মানুষের পরিচয় অন্যদের সাথে মেলে। সেজন্য সাহসী ব্যক্তি, বাহাদুর ব্যক্তি, কখনো বলে যে সিংহের মতো, সিংহের মতো মেলে। কিন্তু কোনো মানুষকে কারও মতো বলে না যে, অমুকের মতো প্রেমিক। বিড়ালের মতো, কোকিলের মতো, কোকিলকণ্ঠী হতে পারে, বাঘের সাহস হতে পারে, উটের মতো পরিশ্রমী হতে পারে। কিন্তু দিল এমন জিনিস এর দৃষ্টান্ত এমন কেউ নেই, ওর উপমা ও নিজেই। সে কুকুরের ভালোবাসা জানে, এ কথা অর্থহীন। তো আল্লাহ তাআলা মানুষকে পাঠিয়েছেন আর মানুষের প্রধান পরিচয় হচ্ছে যে, সে যেন তার নিজ পরিচয় দুনিয়াতেই দিয়ে যায়, এটাকেই পূর্ণতায় পৌঁছায়।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন পূরা দুনিয়ার মানুষকে ভালোবাসা শেখানোর জন্য; অন্য কিছুই নয়। নবিরা এসে মানুষকে এমন কোনো শিক্ষা দেননি, যার দ্বারা কোনো বাজারে, যে বাজারের বিকল্প আছে, সেই বাজারে তার মূল্য বাড়বে। এমন কাজ করতে পারে যে খুব তার দাম হবে, নানান ধরনের উপকারিতা। আম্বিয়া আ. এই মানুষকে কোনো জ্ঞান দেওয়ার জন্য আসেননি। এমন বাজারে যে বাজারে মানুষের বিকল্প আছে ওই জায়গায় মানুষের দাম বাড়ানোর জন্য চেষ্টা ছিল না। নবীর দাম বাড়ানোর একমাত্র ময়দান সেখানে, মানুষ হিসাবেই যেখানে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, কোনো বিকল্প নেই।
রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করে মদিনায় এলেন, মদিনার মানুষ তারা কৃষিকাজ করতেন, আর কৃষিকাজ মক্কার লোক তারা জানতেন না। আর মদিনায় কৃষিকাজ মানে ধানের চাষ নয়, ওখানে খেজুরের চাষ। খেজুরের চাষের মধ্যে একটা জিনিস করতে হয়, যেগুলোর সাথে আমরা পরিচিত না। গাছের মধ্যে নর-মাদি আছে, ধানটান সবকিছুর মধ্যেই আছে; কিন্তু ওগুলো লক্ষ করা হয় না। যারা এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ, যারা জানে-টানে, তারা জানে, 'কিন্তু' আছে সবগুলোর মধ্যেই। এমনি আমরা দেখি যে মশা, কোনোটা পুরুষ মশা, কোনোটা মহিলা মশা। যারা এই ব্যাপারে জানে তারা খুব চেনে। রোগটোগের ব্যাপারে সবগুলো সমান নয়। ম্যালেরিয়া যে বহন করে, ও বিশেষ জাতের মহিলা মশা শুধু বহন করে।
খেজুরের যে গাছ আছে, ওখানে নর গাছ আলাদা থাকে, যেগুলোতে খেজুর হয় না, ফুল হয় ঠিকই; কিন্তু ফুল অন্য ধরনের, সাদা পাউডারের মতো। আর মাদি গাছে ফুল হয়। ভালো ফসলের জন্য নর গাছের ফুলের ডাল এনে মাদি গাছের ফুলের ডালে বেঁধে দিতে হয়, যাতে ওই পরাগায়ন বলে ওটা যেন বেশি হয়, আরবিতে এটাকে লিকাহ বলে।
রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা করতে দেখলেন, আর জিজ্ঞাসা করলেন যে এটা কেন করল, তো তারা বুঝালেন, কিন্তু ধারণা হলো যে এটা বোধ হয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পছন্দ করেননি। এই জন্য পরের বছর আর করলেন না, আর না করাতে ফসল কমে গেল। যখন রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানলেন তখন তাদের বললেন যে, এইসব ব্যাপারে তোমরা যেভাবে জানো সেভাবেই করবে।
রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৃষিকাজের ব্যাপারে আদেশ দিতেও আসেননি, নিষেধ করতেও আসেননি, শেখাতে আসেননি। রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো দুনিয়াতে এসেছেন গোটা মানবজাতির কাছে মুআল্লিম হয়ে, শিক্ষা দেওয়ার জন্য। بُعِثْتُ مُعَلِّمًا - মুআল্লিম হিসাবে, শিক্ষক হিসাবে আমি প্রেরিত হয়েছি। অথচ পরিষ্কার বলে দিলেন যে, এটা তোমরা যেভাবে জানো সেভাবেই করবে, এটা শিক্ষকের কাজ হলো না। তো রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষক হিসাবে ঠিকই এসেছেন, কিন্তু শিক্ষক হিসাবে মানে এটা নয় যে সব ব্যাপারেই।
নিজস্ব ব্যাপার আছে, উস্তাদ রাখা হলো, হুজুরকে রাখা হলো বাচ্চাকে কুরআন শরিফ পড়ানোর জন্য, বা নিজেই কুরআন শরিফ পড়ার জন্য উস্তাদ রেখেছেন। গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে বা গাড়ি চালানো জানে না, তো হুজুরকে বলল যে, হুজুর আমাকে গাড়ি চালানো শেখান। তো হুজুর বলল যে, এগুলো আমি জানি না। কে শেখাবে? ড্রাইভারের কাছে যান। ওটা ওর ব্যাপার, আমি এসেছি কিরাতের জন্য।
রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও মুআল্লিম হিসাবে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু কী ব্যাপারে মুআল্লিম? তো কৃষিকাজের ব্যাপারে তো বলেই দিলেন যে আমি এটার জন্য না; এটা তো যারা জানে তারা তাদের মতোই করবে।
রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন দুনিয়ার মানুষকে ওই একটা জিনিসই শেখানোর জন্য: **ভালোবাসা**। নিজে ভালোবাসো, অন্যের ভালোবাসার কদর করো। আর এই দুটো আসলে একই জিনিস, এপিঠ-ওপিঠ। ঈমানও তাই, আমলও তাই, আখলাকও তাই। ঈমানও ভালোবাসারই নাম।
الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَشَدّ حُبًّا للهِ - যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহকে বেশি ভালোবাসে।
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنفُسِهِمْ - মুমিনদের কাছে নবি তাদের নিজেদের চেয়ে বেশি মহব্বতের, বেশি প্রিয়।
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন।
এই কথা বলেননি যে আমার অনুসরণ করো, বেশি ফসল পাবে। দুনিয়ার বহুত কিছু হতে পারে যে আমার অনুসরণ করলে এটা হবে এটা হবে এটা হবে। রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা একটা কথা দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, আমার অনুসরণ করো, ভালোবাসা শিখবে। দুটোই, إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ - যদি তুমি আল্লাহকে ভালোবাসো, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো।
'যদি'র মধ্যে কিছু সন্দেহ আছে। ওই যদি দূর হবে, যত বেশি রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইত্তেবা করবে, আল্লাহর প্রতি তোমার ভালোবাসা সন্দেহমুক্ত হবে, আর অপরদিকে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন।
তো রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইত্তেবার মধ্যে আল্লাহ তাআলা এই দুই জিনিস রেখেছেন যে, আল্লাহর প্রতি তোমার ভালোবাসা পরিপূর্ণ হবে, আর তুমি আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র হবে। তুমিও আল্লাহকে ভালোবাসবে, আল্লাহও তোমাকে ভালোবাসবেন।
সম্পূর্ণ দীনই এই কথার মধ্যে জ্ঞ কী করলে আমি আল্লাহকে ভালোবাসব, আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন। আর ওটারই আরেকটা অংশ মাখলুককে ভালোবাসা। এই দুই জিনিস যদি হয়ে যায়, তো সম্পূর্ণ দীন হয়ে গেছে। দীনের এই দুই ভালোবাসার বাইরে দীনের কিছুই নেই।
বাকি যতগুলো হুকুম আছে, বলা হয় যে পাঁচটা শাখা আছে: আকায়িদ, ইবাদত, মুয়ামালাত, আখলাকিয়াত, মুয়াশারাত। মনের আকিদা কী, তার ইবাদত কী ধরনের, তার লেনদেন কী ধরনের হবে, তার সামাজিক আচরণ কী ধরনের হবে, অন্যের সাথে তার সম্পর্ক কী রকমের হবে জ্ঞ এই সবগুলো ঘুরেফিরে দুই ভালোবাসার শাখা।
সরাসরি আল্লাহর মহব্বত, ঈমান বলে, ওটার প্রকাশ করাকে ইবাদত বলে। মানুষের মহব্বত, ওটাকে আখলাক বলে, ওটার প্রকাশ ওটাকেও আখলাক বলে, হুকুক ইত্যাদি বলে। সব ধরনের, মানুষের সাথে যত ব্যাপারে, যত আহকাম আছে, সব আহকামের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সাথে মহব্বতের সম্পর্ক কায়েম করা। আর আল্লাহর সরাসরি যত হুকুম আছে, সবগুলোর লক্ষ্য আল্লাহর সাথে মহব্বতের সম্পর্ক কায়েম করা।
আল্লাহ তাআলা রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়েছেন এই মহব্বতের সম্পর্ক কায়েম করার জন্য। এটার এত গুরুত্ব ছিল যে, এটার মোকাবিলায় সব জিনিস তুচ্ছ।
মদিনাওয়ালাদের যখন রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তারা ধারণা করলেন যে রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বোধ হয় এই ব্যাপারে পছন্দ করেননি। পরের বছর এই ভেবে পরাগায়ন ছেড়ে দিলেন, ফসল কমে গেল। দুনিয়াতে তো আমরা এভাবে দেখতে পাই যে, জীবিকা মানুষের এত গুরুত্বপূর্ণ যে, এর জন্য বাকি সব ছেড়ে দেয়। ভাইকে, চাচাকে, সবাইকে খুব ভালোবাসে, সারাজীবন ভালোবাসার সম্পর্ক; কিন্তু যখন জমি নিয়ে টানাটানি পড়ে, তখন আর ভাইও থাকে না, বাপও থাকে না, কেউই থাকে না। যে ভাইকে কোলে নিয়েছে, গোসল করিয়েছে, মুখে লোকমা তুলে দিয়েছে, বুকের উপর ঘুম পাড়িয়েছে, ওই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মোকাদ্দমা করে আর আগে যায় তো আরও বেশি যায়। আজ সেই ভাই যার বিরুদ্ধে মোকাদ্দমা করছে, এমনকি আল্লাহ তাআলা মাফ করুক, চূড়ান্ত ক্ষেত্রে হয়তো মার্ডার-টার্ডার ইত্যাদি হয়ে যায়। আবার ছেলেবেলার কথা যখন মনে পড়ে যায়, তো চোখের পানিও ফেলে। মহব্বত যে নেই তা নয়, এখনো আছে কিন্তু জমির মহব্বত এটার উপর গালিব হয়ে গেছে। জমি মানে কী? তার জীবিকা। তো ওটা মানুষের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ, এত গুরুত্বপূর্ণ যে, এর মোকাবিলায় অন্য কিছুই টেকে না।
এখানে সাহাবিদের ব্যাপারে দেখা যায় যে, মাত্র একটা কথা, যে কথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসলে বলেনওনি। তারা ধারণা করেছেন, আর সেই একটা দুর্বল ধারণার উপর তাদের ফসলই নষ্ট করে দিলেন। কোনো ব্যবসায়ী বাকি যা-কিছু হোক, তার ব্যবসা নষ্ট করতে রাজি হবে না। কোনো কৃষক তার ফসল নষ্ট করতে রাজি হবে না, বাকি সব জায়গায় মানবে। বাপ বাবার জায়গায় বাপ, বাপ ঠিকই আছে; কিন্তু বাবা, ফসল ফসল, এখানে বাপগিরিও চলবে না, ভাইও চলবে না, কিছুই না।
আর সাহাবিরা এই কথার উপর তাদের ফসল নষ্ট করে দিলেন। একেবারে নষ্ট না হলেও অনেক কমে গেল। কমপক্ষে এইটুকু তো করতে পারতেন যে, পরবর্তী বছরে এই লিকাহ না করার ব্যাপারে যে চিন্তা করলেন, দ্বিমত হতে পারত যে, ঠিক আছে, রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গিয়ে কথাটা ভালো করে জিজ্ঞেস করি, একটু পরিষ্কার হয়ে যাই, এটাই তাঁর উদ্দেশ্য কি না; নিষেধ তো করেননি, শুধু জিজ্ঞেস করেছেন এটা কেন করো?
'এটা কেন করো' জ্ঞ এতে নিষেধও প্রমাণিত হয় না। আমাদের ধারণা, বোধ হয় পছন্দ করেননি, তো ধারণা বোধ হয় পছন্দ করেননি এরকম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারি কমপক্ষে কথাটা পরিষ্কার করা হোক, তাও করেননি।
কারণ মহব্বতের মোকাবিলায় এটার কোনো স্থানই নেই। জিজ্ঞাসারও দরকার নেই। আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল যা চান, যেটা ভালোবাসেন, ওটার মোকাবিলায় জিজ্ঞেস করার কোনো প্রয়োজন নেই। মহব্বত এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।
রাসুল করিম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এটাই শিখেছেন যে, আল্লাহ যেটাকে ভালোবাসেন, আল্লাহ রাসুল যেটাকে ভালোবাসেন, ওটা করব। তাতে ফসল যায় যাক, জিজ্ঞেস করারও দরকার নেই। এখানে 'বোধ হয় ওটা ভালোবাসেন' এটা যথেষ্ট। কারণ একটা মেহনত করে এই মহব্বত শিখেছেন আর এটারই গুরুত্ব ছিল।
একজন সাহাবি রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কী করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন আর মানুষও আমাকে ভালোবাসবে?
এটাও জিজ্ঞাসা করতে পারতেন যে, কী করলে আমরা আরও ভালো ফসল পাব, কী করলে ব্যবসায় বেশি লাভ হবে। বেশুমার প্রশ্ন মানুষের মনে জাগে, আর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর সে খুঁজে। কীভাবে চিকিৎসা করা হলে রোগী বেশি ভালো হবে, কীভাবে পড়াশোনা করলে পরীক্ষায় নম্বর বেশি পাওয়া যাবে। মানুষের মনই হলো যেন হাজারও প্রশ্ন আর চাহিদার সমষ্টি। এর মোকাবিলায় সাহাবিদের প্রশ্ন একটাই যে, **কী করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন, আল্লাহর রাসুল আমাকে ভালোবাসবেন, মানুষ আমাকে ভালোবাসবে**। বাকি সব কথা দিল থেকে বের হয়ে গেছে, ওই একটাই।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আ.-কে ওই একটা কথা দিয়ে পাঠিয়েছেন, পূরা দুনিয়ার মানুষকে ভালোবাসা শেখাও। আর এটার উপর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ারও ওয়াদা করেছেন, আখিরাতেরও ওয়াদা করেছেন। বাকি সব তোমার প্রয়োজন যেগুলো ভাবছ, ওগুলো কোনোটার চিন্তা করার মোটেই দরকার নেই; এমনি হয়ে যাবে। এমনি কীভাবে হয়ে যাবে, এমনি এই রকমভাবে হয়ে যাবে, যেরকমভাবে মেহমানরা খায়।
মেহমান তো ওই যে এখানে এসেছে, খাওয়ার জন্য আসেনি, ও এসেছে মহব্বতে, এবং শুধু মহব্বতে**। আর যত, তার এই মহব্বতের মধ্যে শুধু কথাটা যত বেশি পরিষ্কার হবে যে আর কিছুই চাই না, তার মেহমানদারি তত বেশি উন্নতমানের হবে। এর মোকাবিলা হতে পারে, এত সব নেক আমল করল, কিন্তু কোনো একটা কারণে আল্লাহ তাআলা নারাজ হয়ে গেছেন, আর তার জন্য জাহান্নামের ফয়সালা। তো ওই যে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া আর নারাজ হয়ে যাওয়া মানে কী, আল্লাহ তাআলা তাকে কোনো কারণে ভালোবেসেছেন। সে আমল যে ক্রয় করছে না, আমলই যদি মাপা হয় তো কোথায় একটা কুকুরের যত্ন করা, কোথায় হাজারও মানুষের উপর জুলুম করা। মানুষের উপর জুলুম করার ওজন একটা কুকুরের উপর মেহেরবানি করার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু কোনো কারণে আল্লাহ তাআলার মহব্বত তার উপর পড়ে গেছে। আর ধ্বংসও ওই একই কারণে, কোনো কারণে আল্লাহ তাআলা নারাজ হয়ে গেছেন তার উপরে।
এর মোকাবিলায় যে এই আশা করে এসেছে যে, যাই, হয়তো কিছু খাবারটাবার পাওয়া যাবে, তো তাদেরকে মেহমান বলা হয় না। যদিও আল্লাহওয়ালারা, আখলাকওয়ালারা তাদেরকেও মেহমান বলতেন, কিতাবের মধ্যে তাদেরকেও মেহমান বলা হয়। কিন্তু আমাদের সমাজের পরিভাষায় তাদেরকে ফকির বলা হয়, সায়েল বলা হয়; মেহমান বলা হয় না। তাকে, ওরকম বড় বাড়িতে যদি যায়, আখলাকওয়ালা বাড়ি, দানশীল বাড়ি, তো ফিরতেও দেবে না, খেতে দেবে, কিন্তু মেহমানকে যেভাবে দেয় সেভাবে না। বিভিন্নভাবে, অনেক নিম্নমানের, জিনিস নিম্নমানের হবে, বাসনপত্র নিম্নমানের হবে, পরিবেশন নিম্নমানের হবে, সবই নিম্নমানের।
আর মেহমানের মধ্যে আর সায়েলের মধ্যে পার্থক্য এটা যে, সায়েল ওই খাবারের জন্য এসেছে আর মেহমান মহব্বতে এসেছে। তো যদি মহব্বতের সম্পর্ক হয়ে যায়, তাহলে সে মানুষের হাতে যেটুকু আছে ওইটুকু সে সবচেয়ে উত্তম পাবে। বিনা চিন্তায় বিনা পরিশ্রমে এবং সবচেয়ে ভালো। কারণ সম্পর্কের দাবি যেটা মূলত মহব্বতেরই দাবি, সম্পর্কের দাবি যেকোনো যোগ্যতার চেয়ে অনেক বেশি।
একজন ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি বা কেউ একজন তার ম্যানেজার আছেন, খুব যোগ্যতাসম্পন্ন বিভিন্ন দিক থেকে, বুদ্ধিশুদ্ধি যেমন, তেমনই সৎ, নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত, দক্ষ; অনেক গুণের অধিকারী। তো স্বাভাবিকভাবে এরকম গুণী ম্যানেজারকে কে না কদর করে। উনি খুব কদর করেন, সম্মান করেন, খাতির করেন, বেতন যা ওইটা তো দেনই; বরং বিভিন্ন সময় হাদিয়া-টাদিয়া আর বোনাস ইত্যাদি তো দিতেই থাকেন।
কিন্তু তার সম্পূর্ণ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বানালেন এই ছেলেকে, ম্যানেজারকে নয়। টাকাপয়সা যেগুলো দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু এটা নয় যে এখানেও সম্পত্তির কিছু মালিকানা দিই। তাও না, একেবারে ষোলো আনাই ছেলেকে; যে ছেলে ওই ম্যানেজারের একেবারে বিপরীত, বোকা, অসৎ, গাঁজাখোর আরও যা কিছু বলার বলা যেতে পারে। এরপরেও ওই সম্পর্কের দাবিতে সবকিছুর উত্তরাধিকারী হলো, আর এমন এই উত্তরাধিকারী হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও না সমাজের, না দেশের, না আল্লাহর নজরে এই ব্যক্তি দোষী হলো।
আল্লাহও বলেন না, তুমি অন্যায় করেছ; দেশের আইনও বলে না, তুমি অন্যায় করেছ। সবাই বলেন যে, ঠিকই আছে। কী কারণে ঠিক আছে, ছেলে অযোগ্য তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু এগুলো সম্পর্কের দাবি, বড় শক্তিশালী দাবি । বান্দা যে আল্লাহর কাছ থেকে পাবে, ওই সম্পর্কের কারণে পাবে; কোনো যোগ্যতা দিয়ে সে পাবে না।
একবার রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কেউ তার আমল দিয়ে জান্নাতে যেতে পারবে না । ম্যানেজার যেরকম তার যোগ্যতা দিয়ে কাজ করে, আল্লাহর কাছে যোগ্যতা মানে কী, কে কত ভালো আমল করতে পারে। বেশি আমল করল ভালো আমল করল, তো রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, কেউ যোগ্যতা দিয়ে জান্নাত পাবে না। মানে তার কাজ দিয়ে, তার দক্ষতা দিয়ে, ভালো কাজ করে পাবে না। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি?
রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমিও না। إلَّا أَنْ يَّتَغَمَّدَهُ اللهُ بِرَحْمَتِهِ - বরং আল্লাহ তাআলা নিজ রহমত দিয়ে যদি মেহেরবানি করে আমাকে ঢেকে নেন তাহলে ভিন্ন কথা।
তো আল্লাহর রহমত কী জিনিস? আল্লাহ তাআলা যাকে নিজের করেন, কী কারণে ওটার কোনো কিছু বোঝা যাবে না। দুনিয়াতে যেরকম ভালোবাসা এমন ধরনের জিনিস, যদি কেউ বুঝতে চায়, তো প্রচলিত কোনো নিয়মের ছকের মধ্যে বড় অংশ পড়ে না। এমন বুদ্ধিমান ছেলে এরকম পাগলি মেয়েকে কেন ভালোবাসে, সুন্দরীও নয়, শিক্ষাও নেই, তো লিস্ট করলে তো তার দোষ অনেকগুলো পাওয়া যাবে, গুণ কিছুই পাওয়া যাবে না, কিন্তু তবুও।
তো সে যখন তাকে পছন্দ করল, পরিবারের লোক যখন তাকে বোঝাতে চায় যে, এর মধ্যে এই এই দোষ আছে, সব বলল; ছেলে শুনে বলে, তোমরা তো দূর থেকে দেখছ, আমি তো কাছে থেকে দেখেছি। ওর চোখ যে ট্যারা তা তো তোমরা দেখোনি, আমি তো এটাও জানি, তাহলে শেষ পর্যন্ত ফয়সালা কী? ফয়সালা ওকেই বিয়ে করব। তো কোনো ছকের মধ্যে পড়ে না। বিলকুল এই কথা, যদিও মানুষের জন্য দুর্বোধ্য, এরকম নয় যে কোনো কারণ নেই, খোঁজ করলে এর পেছনেও কোনো গভীর কারণ পাওয়া যাবে। সবাই আবিষ্কার করতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা কখনো কখনো কারণ যদিও বলেন, এমন তুচ্ছ কারণ যেটা মনে হয়, তুচ্ছ তো নয় আসলে, কিন্তু এমন সূক্ষ্ম কারণ যে বড় বড় গুনাহ তার জন্য মাফ করে দিলেন, জান্নাত দিয়ে দিলেন। কত মানুষের উপর জুলুম করেছে আর এক কুকুরের গায়ে তেল মালিশ করেছে, এতজন মানুষের উপর জুলুম করল এক কুকুরের গায়ে তেল দেওয়ার কারণে সব মাফ করে দিলেন। এটা কোনো ধরনের কোনো বুদ্ধির বিচারের আওতার মধ্যে আনা মুশকিল।
আর তার মোকাবিলা হতে পারে, এত সব নেক আমল করল, কিন্তু কোনো একটা কারণে আল্লাহ তাআলা নারাজ হয়ে গেছেন, আর তার জন্য জাহান্নামের ফয়সালা। তো ওই যে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া আর নারাজ হয়ে যাওয়া মানে কী, আল্লাহ তাআলা তাকে কোনো কারণে ভালোবেসেছেন। সে আমল যে ক্রয় করছে না, আমলই যদি মাপা হয় তো কোথায় একটা কুকুরের যত্ন করা, কোথায় হাজারও মানুষের উপর জুলুম করা। মানুষের উপর জুলুম করার ওজন একটা কুকুরের উপর মেহেরবানি করার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু কোনো কারণে আল্লাহ তাআলার মহব্বত তার উপর পড়ে গেছে। আর ধ্বংসও ওই একই কারণে, কোনো কারণে আল্লাহ তাআলা নারাজ হয়ে গেছেন তার উপরে।
মানুষের সম্পর্কও ওরকম জ্ঞ বোকা, কানা, ট্যারা পছন্দ করল কোনো কারণে, তো তাকে বিয়ে করে ফেলল। তিনি গুণী, অতি ভালো, বুদ্ধিমতী, কিন্তু ও ফয়সালা করে ফেলেছে একে তালাকই দেবে। দোষটা কী, সালিসিরা বসে বোঝানোর চেষ্টা করে, সব বোঝে, এমন বেশি কী দোষ বলতেও পারে না; কিন্তু তার মন আর বদলে না, এর সাথে না। কারণ যে নেই তা নয়, গভীর কোনো কারণ আছে, যে কারণ মূলত তার ভালোবাসা ও সম্পর্কের সাথে সম্পৃক্ত।
বাড়িতে আগুন লেগে গেছে, ওর ভুলের কারণে গাফলতির কারণে গোটা বাড়িতে আগুন লাগল, সম্পত্তি তো গেলই, ছেলেরাও পুড়ে মরল, এটাও মাফ করে দেবে; কিন্তু মন উঠে গেছে, এটা আর রাখতে চাইবে না। কারণ মানুষের আসল কদর হলো ওই ভালোবাসার মধ্যে।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন যে, দুনিয়ার মানুষকে ডাকো আমার ভালোবাসার দিকে। সে যেন আমাকে ভালোবাসে, আমি যেন তাকে ভালোবাসি। বান্দা যদি আল্লাহকে ভালোবাসে, তো আল্লাহ তাআলা এই ভালোবাসার বড় বেশি কদর করেনওয়ালা।
ওই যে রাজকুমারী আর ধোপার ছেলের কথা বললাম, রাজকুমারী ওই ধোপার ছেলের ভালোবাসার কদর করল। নিজে তো ওকে দেখেওনি, কিছুই না, কিন্তু যখন জানল যে আমাকে ওই মাত্রায় সে ভালোবেসেছে যে তার জীবন দিয়ে দিয়েছে, তো মানুষ হিসেবে এটা তার, নিজেকে সে বাধ্য করল যে এটার আমাকে কদর করতে হবে। একজন মানুষ যদি ভালোবাসার এত কদর করতে পারে তো আল্লাহ তাআলা কত কদর করতে পারেন। একটা ধোপার ছেলে রাজকুমারীকে ভালোবেসেছে, রাজকুমারী ওইটার কদর করল। তো কোথায় মানুষ আর কোথায় আল্লাহ।
রাজা যদি ওই কথার উপর রেগে যায় যে ধোপার ছেলের এত আস্পর্ধা যে আমার মেয়েকে ভালোবাসে। তো এই ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার বহুত বেশি হক ছিল এই কথা বলা যে, বান্দার কত বেশি আস্পর্ধা যে আমাকে ভালোবাসতে চায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ভালোবাসার বহুতই কদর করেনওয়ালা।
কোনো এক জায়গায় থানভি রহ. বলেছেন যে, আল্লাহ তাআলার কত মেহেরবানি যে, আল্লাহ আমাদেরকে সরাসরি তার নাম ধরে ডাকার জন্য অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন। সামান্য একজন মানুষ ওর নাম ধরে ডাকলে ও নারাজ হয়ে যায়, কেমন বেয়াদব। তো আল্লাহর এই গৌরব অনেক বেশি ছিল, সরাসরি আল্লাহর সম্বন্ধে তো সে নাম ডাকতে পারতই না, আকারে ইঙ্গিতে যদি ইঙ্গিত দিত তাও আদবের খেলাফ হতো। তো নাম উচ্চারণ করতে পারে না, আকারে ইঙ্গিতে বলা আদবের খেলাফ হয়, ও বেচারা করবে কী?
তো আল্লাহ তাআলার কত মেহেরবানি যে, কোনো কিছুর দরকার নেই। সামান্য একজন মানুষ যে পরিমাণ আদব দাবি করে, আল্লাহ তাআলা তাও দাবি করেন না, আল্লাহ তাআলা খোশ হন। **সরাসরি আমাকে ডাকো, সোজা আমার নাম ধরে ডাকো**। سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى - আল্লাহর নাম ধরে ডাকো। আল্লাহ তাআলা ভালোবাসাকে বড় বেশি কদর করেন। আর ভালোবাসা যদি প্রবল হয়, তো সব আদব-টাদব মাফ হয়ে যায়।
বাচ্চারা সাধারণত 'আপনি' বলে না, কোনো বাচ্চাকে আপনি বলতে শুনিনি। যত মুরব্বীই হোক আর যত শেখই হোক, তুমি বলে। কিন্তু যদি ওর মধ্যে একটু ভালোবাসা থাকে, অল্পটুকুই, তো ওটা বড় ভালো লাগে। ওই শেখও কদর করেন, মুরব্বীরাও কদর করেন, সবাই কদর করেন। সে সরাসরি মজলিসের মধ্যে বলে, এটা করে দাও। তো মজলিসের মধ্যে দশজন বসে আছে, ওর কাছে গিয়ে, মনে করা যাক একটা কলা নিয়ে বলল যে আমাকে খাইয়ে দাও, ও নিজে খেতে পারে না, ও খুশি হবে। তার নিজের গর্বের অনেক কিছু আছে, যে আমার এত মুরিদ আছে, এত এই, এত আছে। কিন্তু ছোট্ট একটা বাচ্চা যে বাকি সবাইকে বাদ দিয়ে আমার কাছে এসে বলল যে আমাকে খাইয়ে দাও, সেটার জন্য সে খুব গর্বিত।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে ভালোবাসার কদর করার যোগ্যতা দিয়েছেন, এটা মানুষই পারে। এইজন্য মানুষের পরিচয়, অন্যকিছু নয়। এই সাহাবিদেরকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন যে এরাই ছিলেন মানুষ, যারা নিজেরা ভালোবাসতে পারতেন আর যারা ভালোবাসার কদর করা জানতেন। এদের মতো ঈমান আনো। আর কিছু না, না জামাকাপড়, না শহর, না লেখাপড়া, না ব্যবসাবাণিজ্য, না কৃষি, না কিছু না; এক জিনিস, আমাদের কাছে একটাই আছে শুধু, যে নিজেই ভালোবাসেন আর ভালোবাসার কদর করেন।
এটা সাহাবিদের সবচেয়ে বড় গুণ, বলা যেতে পারে একমাত্র গুণ আর ওইটাই, ওই জায়গায়ই মানুষের পরিচয়। খুব হালচাষ করতে পারে, একজন মানুষের খুব গুণাগুণ গাওয়া হলো যে খুব হালচাষ করতে পারে, এর মোকাবিলায় কেউ বলতে পারে যে গরু তার চেয়ে বেশি পারে। খুব ভালো প্রহরী, সারারাত পাহারা দেয়, তো আরেকজন বলতে পারে যে আমার কুকুর এর চেয়ে বেশি পারে।
কিন্তু ভালোবাসা একটা জিনিস, যেখানে মানুষের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। মানুষই, আল্লাহ তাআলার একমাত্র সৃষ্টি দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, যে ভালোবাসতে পারে, ভালোবাসার কদর করতে পারে। এর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। না গরু পারবে, না ছাগল পারবে, না হাঁস পারবে, না মুরগি পারবে, না কেউ পারবে। কেউ ভালোবাসা জানে না, শুধু মানুষ জানে, আর এটাই মানুষের পরিচিতি।
তো আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানি করে আমাদের দীন দিয়েছেন, আল্লাহর পথে বের হয়ে আমরা ভালোবাসা শিখি। আর এই দুই ভালোবাসার নামই দীন। ঈমান মানে আল্লাহকে ভালোবাসা, আখলাক মানে মাখলুককে ভালোবাসা। আল্লাহর ভালোবাসার হক ইবাদত, মাখলুককে ভালোবাসার হক আখলাক। আল্লাহর পথে বের হয়ে শিখতে হবে, আর সবকিছু এর জন্য তুচ্ছ করে দেওয়া। জানমাল সবকিছু খরচ করে এই ভালোবাসা শেখা। আর ভালোবাসার প্রমাণ কিছুর বিনিময়েই দিতে হয়। সবসময় এটা যে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
আমার ছেলেকে খুব আদর করল, তো এই কথা ছেলের বাপ কদর করবে, ঠিক আছে, আমার ছেলেকে আদর করল, পরমুহূর্তে ভুলেও যাবে, এমন কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু ছেলে নদীতে পড়ে গিয়েছিল, স্রোতের মধ্যে, আর ও লাফ দিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করতে গেল, যেখানে নিজের মরে যাওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা ছিল, ওই কথা যখন জানবে, তো তখন ওটা শুধু আমার ছেলেকে ভালোবাসার লাইসেন্স দিয়েছে, ওই কথার মতো একটা দুর্বল কথা নয় এটা। নিজের জীবন বিপন্ন করে তার ভালোবাসার প্রমাণ করেছে যে, তার নিজের জীবনও এর মোকাবিলায় তুচ্ছ।
এই সবকিছুর মোকাবিলায় ভালোবাসাকে উপরে তুলে দেখানো, সব জায়গায় আল্লাহ তাআলা এটাই দেখিয়েছেন যে, তুমিও ওইরকম আল্লাহকে ভালোবাসা শেখো, ওইরকম মাখলুককে ভালোবাসা শেখো, যেন তোমার বাকি সবকিছু এর মোকাবিলায় তুমি তুচ্ছ করতে পারো। নবিদের জীবন, সাহাবিদের জীবন, অলি-আল্লাহদের জীবন এটারই বিভিন্ন রূপের ঘটনা যে, কেমন করে নিজের জীবন তুচ্ছ করে নিজের ভালোবাসার প্রমাণ করা হয়। এটাই শুধু ইবরাহিম আ.-এর ছেলেকে জবাই করা নয়, সব আল্লাহওয়ালার এটাই তাদের জীবনের প্রমাণ। আমরাও আল্লাহর পথে বের হয়ে বাকি সবকিছুকে তুচ্ছ করে আল্লাহকে ভালোবাসা শিখি এবং আল্লাহর ভালোবাসার কদর করা আমরা শিখি, আর মাখলুককে ভালোবাসি, কদর করি। এর জন্য ভাই আল্লাহর পথে বের হতে হবে। বের হয়ে, দুইটাই একসাথে, বাকি সবকিছুকে তুচ্ছ করা, আর ভালোবাসাকে তার নিজ মর্যাদায় পৌঁছানো।
ঠিক আছে না ইনশাআল্লাহ, হিম্মত করে বলি ইনশাআল্লাহ, চিল্লার জন্য বলি, ৩ চিল্লার জন্য বলি। আগে যারা ৩ চিল্লা দিয়েছি, প্রতেক বছর ৩ চিল্লার নিয়ত করি ইনশাআল্লাহ।
(মজমার ভেতর থেকে আলমাস ভাই আওয়াজ দিলেন, এখনও আযানের পৌনে এক ঘণ্টা বাকি আছে, আরও কিছু কথা হলে ভালো হয়) আগে তো তাশকিল হোক এখন, বলি ভাই। ... যারা আগে ৩ চিল্লা দিয়েছি তারাও প্রতেক বছর ৩ চিল্লার নিয়ত করি, আর যাদের আগে হয়নি তারাও প্রথম বারের জন্য বলি। ... আল্লাহ কবুল করুক। ... আরও বলি ভাই। ... ভাই, আমাদের হাতে এখনও যেহেতু সময় আছে এটাও একটু কাজে লাগাই ইনশাআল্লাহ। আর আমার উপর আদেশ হয়ে গেছে যে, কোনোভাবে লাগাতে হবেই।
আল্লাহর মেহেরবানি যে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দীনের মেহনত দিয়েছেন আর দীনের মেহনতের লক্ষ্য এটাই যে আমাদের মধ্যে দীন আসা। দীন আসা মানে হচ্ছে যে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক শুদ্ধ হওয়া, মাখলুকের সাথে সম্পর্ক শুদ্ধ হওয়া। এর জন্য মেহনতের প্রধানত দুটো শাখা জ্ঞ একটা বাইরে গিয়ে সময় লাগানো, আর একটা নিজের জায়গায়, যেটাকে মোকামি কাজ বলে। মেহনত করে ধাপে ধাপে ওইগুলোকে বাড়ানো।
মোকামি কাজের মধ্যে, যারা কিছু পুরোনো, একেবারে নতুনদের এইগুলো চোখে নেই, কিন্তু যারা কিছু পুরোনো, যে খুব বেশি পুরোনো তা নয়, যারা কয়েক বছর আগে থেকে একটু জানি, এক সময় ৩ দিনের জামাত গুলো মারকাজ থেকে বের হতো। যেমন মহল্লা থেকে জামাতগুলো এখন যায়, মসজিদ থেকে, কয়েক বছর আগে এটা ছিল না। বরং বৃহস্পতিবার সবাই এখানে চলে আসত, সকালবেলা এখান থেকে জামাত যেত। তাই না? জামাতে যাওয়া ওইটাও মসজিদে ছিল না, মসজিদে কোনো পরামর্শের আমল ছিল না।
সপ্তাহে দুটো গাশত ছিল, মোকামি গাশত, বেরুনি গাশত, তালিম ছিল, কিন্তু মসজিদের পরামর্শ এই জিনিসটা ছিল না। পরামর্শ মারকাজে হতো, জামাত বের হওয়া মারকাজে, যেই জামাত বের হচ্ছে তার হেদায়েত মারকাজে। ফেরত যাওয়ার জন্য ওয়াপসি কথা যেগুলো বলা হয় ওগুলো মারকাজে।
এইসব জিনিস এখন মসজিদ পর্যায়ে চলে গেছে। এখন মসজিদ থেকেই জামাতও তৈরি হওয়া, মসজিদ থেকেই বের হওয়া, মসজিদে পরামর্শ হওয়া; শুধু একটা জিনিস এটা মাঝামাঝি পর্যায়ে এখানে আছে যে, রোখ, কোথায় জামাত যাবে। তো এটা, এখনও মারকাজ থেকে জামাতের রোখ দেওয়া হয়, কিন্তু এটা যেভাবে বলা হয় আমরা ঠিক সেভাবে করি না। যেভাবে, নিজামুদ্দিন থেকে যেভাবে বলেন, মসজিদে তারা পরামর্শ করে রোখের জন্য **تجاويز** বলে অর্থাৎ নিজে প্রস্তাব ঠিক করবে। মারকাজে সেই প্রস্তাব পেশ করবে, মারকাজওয়ালা ওইটাকেই অনুমোদন করে দেবেন। এটা মূলত একটা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন, নিজে থেকে রায়-টায় বদলাবে-টদলাবে এমন কিছু নয়।
বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে বদলাবে, কখনো বিশেষ কোনো অসুবিধা থাকে যে, যে মসজিদে প্রস্তাব করেছে ওইটা হয়তো তাদের খেয়াল ছিল না, ইতিমধ্যে একটা জামাত ওখানে চলে গেছে। বা হয়তো হতে পারে যেহেতু অন্য মহল্লার মসজিদ, তারা বলল যে এখানে তো এ সপ্তাহে আসা যাবে না ইত্যাদি। এ ছাড়া এরকম ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া যেভাবে বলবে সেভাবেই দিয়ে দেবে অর্থাৎ ওইটাও ঘুরে-ফিরে গিয়ে বলা যেতে পারে যে, নিজের মসজিদেই চলে গেল, কোথায় জামাত যাবে। এটা শুধু যোগাযোগ ঠিকমতো রাখার জন্য, যাতে একটা কাজ বিচ্ছিন্ন না হয় যে সম্পর্কই না থাকে। এমন অবস্থা না হয় তার জন্য মারকাজে এসে কিছু রোখের ব্যাপারে আলোচনা করে নেওয়া।
অগ্রসর হওয়ার দিকে আল্লাহর মেহেরবানি, এখন পরবর্তী ধাপের দিকে যাওয়া হচ্ছে। যেটা এই গত ৫ দিনের জোরের মধ্যে আলোচনা করেছিলেন, সবাই ভালো করে খেয়াল করে শুনেছি কি না জানি না, যে, **প্রতেক ব্যক্তি তার জামাত বের করবে**। জোরের মধ্যে এই কথা কয়েকবার এসেছে। সাথিদের খেয়াল আছে না কি? ... আর যে কথা একটু চালাতে হয় তো বারবার করে বলতে হয়, আদলবদল করে বলতে হয়। কারগুজারি-টারগুজারি একটু সাথে দিয়েও বলতে হয় যাতে কথা পরিষ্কার হয়। যে কারগুজারি শুনালেন ওইটা একটু আবার শোনাই। উদ্দেশ্য এটা, এটার উপর আমরা আমল আরম্ভ করি।
প্যারিসের একটা শহরতলি, মাসি ওটার নাম। যখন এই কথা বলা হলো যে, সাথিরা নিজ জিম্মাদারিতে জামাত বের করবে। মাসিওয়ালাদের কী কথা বলা হয়েছিল হুবহু, ওটা জানি না। কিন্তু ওরা যেটা করল, সেটা হলো যে, মাসির সাথিরা ওই যে প্যারিসের শহরতলির কথা যে বললাম, নিজ মসজিদে তারা একত্রিত হলেন আর পরামর্শ করলেন যে, এখন আমরা ওই মসজিদওয়ার একটা জামাত যায় ওটা নয়, বরং আমরা নিজ দায়িত্বে আলাদা আলাদা জামাত বের করব।
সাথিরা ছিলেন ২১ জন, ওই পরামর্শের মধ্যে, মহল্লার সাথি। তারা ঠিক করলেন যে, তাহলে ঠিক আছে, আমরা আমাদের জামাত আলাদা আলাদা। আমার জামাত আলাদা, তোমার জামাত আলাদা, মানে এটা হলো যে, এই ২১ জনের ২১টা জামাত। আর এই ২১ জনের ২১টা জামাতের মধ্যে আমার জামাতে বাকি ২০ জনের কেউ থাকবে না বা ওদের কোনো জামাতে আমিও যাব না। আমার জামাতে কারা থাকবে? এখানে যারা নেই ওই ধরনের লোক, অর্থাৎ নতুন।
যত পুরোনো আছে সে তার নিজস্ব জামাত তৈরি করবে, নতুনদেরকে সাথে নেবে। এই ব্যাপারে পরস্পরকে সাহায্য করব। বাকি ২২টা জামাত ২২ জনকে আমিও সাহায্য করব তার সাথি জোগাড় করতে, আমাকেও বাকি ২২ জন সাহায্য করবে; কিন্তু নিজে আসবে না, তো এটা তারা নিয়ত করল। পরের মাসে সেই হিসাবে ২১টা জামাত বের হওয়ার কথা, ২১ জন নিয়ত করেছে।
কিন্তু এটা কার্যকরী হতে একটু সময় লেগে যায়, পরের মাসে ২১টা হলো না ৩টা হলো। এরপরের মাসে হলো ৫টা, তার পরের মাসে হলো ৮টা। মানে বেশ কয়েকবার আমি কথা শুনেছি, তাও এগুলো সংখ্যা-টংখ্যা মনে রাখতে আমার ভুল হয়, যেমন টেলিফোন নম্বর আমি মনে রাখতে পারিই না। আদলবদল হয়ে যেতে পারে, মোটামুটি এই ধরনের।
আমি ওখানে ছিলাম, এই জুন মাসের শেষের দিকে, গত এই জুন মাসের শেষে জুন-জুলাইয়ের প্রথম দিকে ওখানে ছিলাম। আর ছিলাম হিসেবে এটা আল্লাহর ফজলে বহুত চর্চাও হয়েছে। অন্য মহল্লাদেরও এই কথার কারগুজারি শুনিয়ে তাদের ওঠাবার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেজন্য অনেকবার এই কারগুজারি শুনেছি। ওদের মহল্লায় গিয়েওছি কয়েকবার। ফসাল ওখানকার সবচেয়ে ফিকিরবান সাথিদের একজন, ওর বাসায় গিয়েছি, ওখানে খাওয়া-দাওয়াও করেছি।
তো জুলাই মাসে, ওইটা তখন ৬/৭ মাস থেকে এই তারতিব আরম্ভ হয়েছে, জুলাই মাসে যখন ছিলাম তখন ৬ মাস বা ৭ মাস পরে এখন ওখানে **২২টা জামাত, সবাই বের করছে**। তো আমরাও নিয়ত করতে পারি। আমরা এখানে ভাবি যে পুরোনো সাথি হওয়া চাই, ওই যে ২১ জন আছে ওই ২১ জনের মধ্যে পুরোনো-টুরোনো কিছুই নয়। আর ওদের ওখানে পুরোনো-টুরোনো মানে হলো, একবার-দুবার যে ৩দিন দিয়েছে সেই পুরোনো। আমাদের মতো নয় যে ৩ চিল্লা দেওয়া হতে হবে, বিদেশ সফর করতে হবে, তারপর এই হতে হবে, তারপর হবে পুরোনো। মরার পরে হয় কি না সন্দেহ। ওখানে ৩ দিন যে একবার-দুবার দিয়েছে সেই পুরোনো। তো ৬ মাসে ২২টা জামাত হয়ে যায়।
ফিরে এসে রাজশাহীতে, ইউনিভার্সিটিতে এই কারগুজারি পেশ করে আর ইউনিভার্সিটির সামনে এই তাকাজা রাখলাম যে তাহলে আমরাও ওরকম করি। **নিজস্ব জামাত, আমার জামাত**। ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন হলে যে মসজিদ আছে, মসজিদ ঠিক বলা যায় না, হলের ভেতরে যে রুম আছে, ওইটাকে প্রেয়ার রুমও বলে, মসজিদও বলে। জামাতগুলো যায়, ৯টা হলের ৯টা জামাত, তো সবসময় মাঝে মাঝে কোনো হলের দুর্বলতা থাকে, একটা-দুইটা হলের জামাত যায় না, বাকি ৭/৮টা জামাত যায়।
তো তাদের সামনে কথা রাখা হলো। বেশ কয়েকজন নিয়ত করল যে, আগামী মাস থেকে আমি আমার জামাত বের করব, আমি আর হলের জামাতে যাব না, আমার জামাত আলাদা, নতুন অন্যদের যাকে পারি তাকে নিয়ে। জুলাই মাসে এটা হলো, আগস্ট মাসে অর্থাৎ ১ মাস পরে আমাদের জামাত বের হলো ২৪টা। যেখানে আগের মাসে ছিল সম্ভবত ৭টা, তো সেই হিসেবে মোটামুটি সাড়ে তিন গুণ বেশি হলো।
কোনো কোনো হলের ওই আরিফ ওরা যে হলে আছে, ওখানে সাথি কম, আর তার মধ্যে একজন-দুজন সাথি আছে যে একটু কাজের মধ্যে জাহিরিভাবে দুর্বলও মনে হয়; কিন্তু নিজস্ব জামাত নিয়ে বের হওয়ার নিয়ত করল, এবং যে নিজে দুর্বল ছিল, অন্যান্য মাসে যার কাছেই বারবার করে গাশত করতে হতো, যাতে যায়, তো কয়েকবার গাশত করার পরে সে যেত, এই মাসে যখন নিজেই জামাত করবে তো ওর কাছে কে আর গাশত করবে, কেউ গাশত করেনি; কিন্তু ও নিজে গাশত করে ১৪ জনের জামাত নিয়ে গেছে।
তো যেখানে আগের মাসে ওকে নেওয়ার জন্য ১৪ বার গাশত করতে হয়েছে আর পরের মাসে যেহেতু নিয়ত করে ফেলেছে নিজস্ব জামাত বের করবে, তো ওর কাছে কেউ গাশত করেনি আর ও নিজে গাশত করে আরও ১৪ জনকে নিয়ে গেছে, নতুন। আর মেহনত করলে তো তৈরি হয়, এই যাদেরকে নিয়ে গেল তাদের বেশিরভাগই আগে কখনো যায়নি। আগে কোনো জানাই ছিল না এরা কী, বিভিন্ন জায়গা থেকে তাশকিল করেছে।
তো আমরা যদি নিয়ত করে ফেলি ইনশাআল্লাহ সহজ হবে, আল্লাহর রহমতে নিয়ত করলে মানুষের মধ্যে ফিকির পয়দা হয়, দোয়াও করে, চেষ্টাও করে। আর তখন সে চলতে-ফিরতে-উঠতে-বসতে কাজ করে।
তো ফ্রান্সে এই কারগুজারি শোনানোর তাশকিলের মধ্যে এই কথাও তারা বলে থাকে, তো ভাই এটা যে জামাত তাশকিল হবে এটা ওই সাড়ে ২১ ঘণ্টার মেহনতে। সাড়ে ২১ ঘণ্টা কী হিসাবে? তো ওরা হিসাব করে যে আনুষ্ঠানিকভাবে উসুলি যে আড়াই ঘণ্টা আছে, ওই আড়াই ঘণ্টায় কাজ তো কিছুই হয় না, তো কাজ তো করতে হবে বাকি সাড়ে ২১ ঘণ্টায়।
তো এই হিসাবে বলে যে, আড়াই ঘণ্টা তো তোমার তাবলিগে নষ্ট হয়ে গেল, ওইটাতে তো কিছু হবে না, হবে তো বাকি সাড়ে ২১ ঘণ্টায়। তো সেজন্য এই যে মাসিক জামাতগুলো তৈরি করবে, ওই সাড়ে ২১ ঘণ্টার মেহনতে এটা হবে। ওই সাড়ে ২১ ঘণ্টার মেহনত কখন? উঠতে-বসতে, খাওয়াদাওয়া করতে, চলতে-ফিরতে, মেহনত করলে তো ওরকমই হবে, যদি কেউ ফিকির করে তো চলতে-ফিরতে হয়ে যায়।
কয়েক বছর আগে টাঙ্গাইর ইজতিমার সময় জেদ্দার একজন লোক, ওর সাথে পরিচয় হলো মাঠে, নতুন। তো জেদ্দার, পরিচয় হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, জেদ্দার কিছু সাথি যাদের নামটাম জানি, অমুককে চেনো না কি, অমুককে চেনো তাহলে?
"আমি কাউকে চিনি না।"
"তো কেমন করে এলে?"
"গোসল করতে গিয়েছিলাম, তো অনেকে নিজে, কখনো কখনো বাইরে পাবলিক গোসলের বন্দোবস্ত আছে, গোসল করতে গিয়েছিলাম, গোসল করতে যখন গিয়েছি, তো তখন ওখানে আরেকজন গোসল করতে গিয়েছিল। সে বলল, 'বাংলাদেশে বিরাট ইজতিমা চলছে, তুমি যাবে না কি?'
'হ্যাঁ যাব।'
'চলো জলদি।'"
তো জলদি করে গোসল করে চলে এসেছে। সময় বেশি ছিল না তখন টিকেটও পেয়ে গেলাম। তো তখনই, টাঙ্গাই যখন দেখেছি তখন ওর চুল ভিজা নয়, এতক্ষণে চুল শুকিয়ে গেছে, যখন প্লেনে উঠেছিল তখন বোধ হয় চুল ভেজাও ছিল। তো ওই চলতে-ফিরতে গাশত হয়, তাশকিলও হয়।
তো আমরা যদি নিয়ত করে নিই যে আমার জামাত বের করব, তো ইনশাআল্লাহ বহুত জামাত বের হবে।
তো আমরা রাজশাহীতে ওই কী জানি কোন মুফতিরা এসব ফতোয়া আবিষ্কার করেছে যে, আমার মহল্লার বাকি যে সাথিদের সাথে আমরা যাই, যারা পুরোনো, পরিচিত, এরা হচ্ছে আমার সব গায়রে মাহরাম, গায়রে মাহরামদের সাথে একসাথে সফর শরআন জায়েজ নয়; সফর তাদের সাথে জায়েজ যারা মাহরাম। বাকি অন্যান্য যত লোক আছে দুনিয়ার, এরা মাহরাম, কিন্তু আমার মহল্লার সাথিরা যারা, যাদের সাথে প্রতেক মাসে যাওয়া হয়, এরা গায়রে মাহরাম, এদের সাথে না।
তো এই একটা নিয়ম করে ফেললে যে আমি মহল্লার অন্যান্য পুরোনো সাথির সাথে যাব না, আর ওদেরকে আমি নেব না।
ফ্রান্সে ওইটা একটু ভিন্ন জগৎ, তারা অন্যান্য শব্দ ব্যবহার করে, ওদের কাছে খুব পরিচিত এই তাশকিলের ব্যাপারে একটা কথা। ওরা বলে যে এখন থেকে আর **ক্লাব সিস্টেম না**, ওই যে একটা ক্লাব, তাবলিগের ক্লাব আছে মহল্লার মসজিদে। ওই ক্লাবের লোক আমরা প্রতেক মাসে একবার ৩ দিনে পিকনিকে যাই। ক্লাবের সদস্যরা, তো ওই সিলসিলা এখন আর নয় যে, সব পুরোনো ক্লাবের সদস্য একসাথে মিলে চলে গেল। নতুন সবাই নিষিদ্ধ, সব পুরোনো সাথি আর পুরোনো মেম্বারই যেন থাকে।
তো যদিও উসুলান নিষিদ্ধ করে না, কিন্তু হাবভাব মোটামুটি এরকমই যে, আমাদের ক্লাবে যেন নতুন কেউ না আসে, শুধু পুরোনোরাই থাকবে; আমরা একসাথে বসব, আমরাই একসাথে পিকনিক করব। তো ওরকম নয়, এখন প্রতেকেই নতুনদেরকে নিয়ে যাবে।
আর এতে ওরা বলছে যে, নতুনদেরকে নিয়ে যাবে, আর পুরোনোদের জিম্মায় থাকবে তাদের নতুনদের তরবিয়ত। এই তরবিয়ত করতে গিয়ে নিজেরও ভালো তরবিয়ত হবে।
মাসিক যে মাশওয়ারা প্যারিসে হয়, ওই মহল্লার সাথি কারগুজারি শুনাচ্ছিল আর তার মধ্যে এই প্রসঙ্গ এলো যে তরবিয়তের ব্যাপার, তো পুরোনো একজন বলল যে, তরবিয়তের ব্যাপার তো এটাই বলা হয়েছে যে পুরোনোরা নতুনদের তরবিয়ত করবে, কিন্তু বাস্তবে হয় উল্টো। নতুনও পুরোনোদের তরবিয়ত করে, কীভাবে? যে তাহাজ্জুদের ফজায়েল বয়ান করা হয়েছে রাতে, বা তালিমের মধ্যে।
রাত ওখানে একেবারে ছোট, মাগরিবের নামাজ সাড়ে ৯টার দিকে পড়ে, কখনো আরেকটু পরেও, সাড়ে ৯টা-১০টায় প্রায় মাগরিবের নামাজ। তো মাগরিবের নামাজই সাড়ে ৯টা বা ১০টায় পড়ে, ফজরের নামাজ ওই তিনটার দিকে বড়জোর, বা তার আগেই পড়তে হয়, তো রাতে ঘুমাবে কখন। সময় একেবারে কম থাকে, তারপর আবার তাহাজ্জুদ পড়বে কখন।
তো যদিও তাহাজ্জুদের বয়ান তো করা হয়, কিন্তু তাহাজ্জুদে কারও ওঠা খুবই মুশকিল ব্যাপার। নতুন কথা শুনেছে, সে উঠে গেছে বা সম্ভবত আসলে ঘুমায়নি, ওই ওরা সব নতুন নতুন ছিল, তো ওরা নিজেরা বসে গল্পগুজব করেছে আর তার মধ্যে রাত হয়ে গেছে, তো তাহাজ্জুদের সময় যখন হয়ে গেছে, তো পুরোনোদের কাছে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে সব তুলে দিয়েছে জ্ঞ এই ওঠো ওঠো ওঠো, তাহাজ্জুদ পড়বে। আমির-জিম্মাদার যে ছিলেন তাকেও তুলে দিয়েছে, ও বেচারা বলতেও পারে না যে আমার তো তাহাজ্জুদের নিয়তই নেই। নতুন লোক এসে ধাক্কা দিয়ে সব তুলে দিয়েছে যে, তাহাজ্জুদ পড়তে হবে, তো ওরাই করাচ্ছে।
ওই সময় এশার নামাজ পড়ে সবাই উঠতে পারে না ফজরের জন্য, তো ওরা ওদের একটা নিজস্ব তারতিব বের করেছে যে, রাতে শোয়ার দরকার নেই, এশার নামাজ পড়ে কিছু গল্পগুজব করে আর তারপর তাহাজ্জুদ পড়ে ফজরের নামাজ পড়ে তারপর শোব। সময় একেবারে কম, তো ওরা ওদের নিজের তারতিব, আর এই নতুন যারা বের হয়েছে ওরা তাদের মতো অন্যান্য নতুন যারা আছে, অন্যদের তাশকিলও খুব সহজে করতে পারে।
কারণ হুজুরদের দেখলে অন্য ছেলেরা তো প্রথমেই ভয় পেয়ে যায়, আর দেখেই অন্যদিকে চলে যায়, কথাই বলতে পারে না। ওই নতুন যারা গিয়েছে, ও তো এখনো হুজুর হয়নি, তার পোশাক-আশাক হাবভাব কোনোটাতেই ও যে তাশকিল করবে, এটা বন্ধুরা আন্দাজ করতে পারে না। যার ফলে ও বলে চল, তো চলে আসে। তো প্রথম ও নতুন থাকা অবস্থায় ওই তাশকিল বেশি হয়, এটা হামেশাই।
আবু বকর সিদ্দিক রা. যেদিন নিজে ইসলাম কবুল করলেন, ওই একদিন-দুদিনের মধ্যে ৫ জন বা ৮ জন সাহাবিকে আনলেন; উসমান রা., আবদুর রহমান বিন আউফ রা.-সহ আরও কয়েকজন বড় বড় সাহাবি। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক রা. পরবর্তীকালে অত বেশি আর পারেননি, তখন উনি চিহ্নিত হয়ে গেছেন, কিন্তু প্রথম দিন সহজ ছিল।
এই নতুনরা তো খুব নতুনদের তাশকিল করতে পারে, কিছুদিনের মধ্যে ২২টা জামাত বানিয়ে ফেলেছে। তো আল্লাহর ফজলে এখন সহজ, রাজশাহীতে ওই যে বললাম যে, আগের মাসে ৭টা জামাত, পরের মাসে ২৪টা জামাত।
আমরা যদি নিয়ত করে ফেলি ইনশাআল্লাহ যে আমি আমার, আমার জামাত বের করব। মহল্লায় গিয়ে কাজ করার সময় যে জায়গায় আমরা একটু ভুল করি তা হচ্ছে যে, মহল্লায় পরামর্শ করলাম, আর পরামর্শের তখন একটু ধরন, সুর বদলে যায় যে, ভাই এখন থেকে আমাদের জামাত বেশি করার দরকার, গত মাসে একটা জামাত বের হয়েছে, এই মাসে কয়টা জামাত বের করব? কেউ বলে যে ২টা জামাত, কেউ বলে ৩টা জামাত, তো ২ জামাতের ৩ জামাতের ফয়সালা হলো কিন্তু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নেওয়ার কোনো ফয়সালা হলো না।
তেমন কেউ দায়িত্ব নিল না, তো এটাতে হয় না। ২ জামাত বা ৫ জামাত, তিন জামাত কোনো ফয়সালাই নয়, বরং আমি আমার জামাত আলাদা, এই ফয়সালা। তো যখন ব্যক্তি তার নিজের উপর দায়িত্ব নেয় তখন ওর দ্বারা কাজ হয়। আর যদি ইজতিমায়ীর উপর ছেড়ে দেয় তো কাজ হয় না, বা ভালো হয় না।
আমরা নিয়ত করি ইনশাআল্লাহ যে, মহল্লায় গিয়ে আমি হয়তো জামাত তৈরি করব, কিন্তু এই জাতীয় পরামর্শ নয় যে আমাদের মহল্লার জামাতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এটা নয়, বরং মজলিসের মধ্যে বসে তাশকিল করি এবং তাশকিলের মধ্যে এই কথার তাশকিল হয় যে, আগামী মাসে নিজস্ব আলাদা জামাত কে বের করবে?
ওই মহল্লার যে মসজিদের জামাত আছে, ওই জামাতে আমরা যাব না, বরং আমি আমার জামাত বের করব। এটাতে কে কে তৈরি? এটাতে যারা তৈরি হয়, বাকি যারা তৈরি হতে পারেনি, তারা সাহায্য করবে। আর একমাস-দুমাস পরে যারা এই মাসে তৈরি হতে পারেনি, তার পরের মাসে হয়তো তারাও তৈরি হবে। কিন্তু এই মাসে যারা তৈরি হয়েছে তারা আলাদা জামাত বের করবে, ঠিক আছে না ভাই ইনশাআল্লাহ।
এখন আমরা নিজের মসজিদে গিয়ে এই কথাটা আরেকটু রাখি, আর এই মসজিদের সাথিদেরকে সামনে রেখে তারপর এই ইনফিরাদি জামাতের তাশকিল করি যে, প্রতেক ব্যক্তির জামাত। আগে, ওই আবার বলি, আগে যেরকম হতো মারকাজের জামাত, তারপর হলো না আলাইপুরের জামাত, বোবানীগঞ্জের জামাত, সেন্ট্রাল মসজিদের জামাত, মসজিদওয়ার জামাতগুলো চিহ্নিত হলো। ঠিক ওরকমই এখন থেকে এটা হবে যে আবদুর রহমানের জামাত, আবদুল হকের জামাত, আবদুল মজিদের জামাত, একেকটা ব্যক্তির একেকটা জামাত। আল্লাহ তাওফিক নসিব করুক।
-
দোয়া:
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ نَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، نَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوبُ إِلَيْكَ.
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১১ নভেম্বর, ২০২৪
১২১৩২
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১১ নভেম্বর, ২০২৪
১১১৯২
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস. সময়: মাগরিবের পর :১০/০৬/২০০৬ তারিখ أعُوْذ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
২১২৪
প্রত্যাশা-হিসাব ও তাওয়াক্কুল-বরকত
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও ক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৭১১
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন