প্রবন্ধ
আমি ও আমার
২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
৪৪২২
০
জীবনে দুটি শব্দ পাশাপাশি আসতে পারে
১. আমি, ২. আমার।
'আমি' সুন্দর, 'আমার' সুন্দর;
'আমি' শক্তিশালী, 'আমার' শক্তিশালী।
'আমি শক্তিশালী' তো বোধগম্য কথা আর 'আমার শক্তিশালী' অর্থাৎ আমার অস্ত্র শক্তিশালী, যদিও আমি নিজে দুর্বল। আমি সুন্দর অথবা আমার সুন্দর তথা আমার বাড়ি সুন্দর, আমার জামা-কাপড় সুন্দর, আমার বাড়িঘর সুন্দর; যদিও আমি সুন্দর নই। তো এক হলো 'আমি' আর আরেকটি হলো 'আমার'।
এক রমণী নতুন সংসার আরম্ভ করেছে। গরিব ঘর আর সে অতি সুন্দরী। অল্প বয়স, সুন্দর স্বাস্থ্য, অতি সুন্দরী। ঝুপড়ির কুঁড়েঘরে থাকে, জামা-কাপড় অতি নিম্নমানের। ধীরে ধীরে আল্লাহ তাআলা তার অবস্থা পরিবর্তন করলেন। যে এক সময় কুঁড়েঘরে থাকত, সে এক পর্যায়ে এসে রাজমহলের মতো প্রাসাদে থাকতে লাগল। জামা-কাপড় যা এক সময় নিম্নমানের ছিল, এখন সেখানে ধন-দৌলত-স্বচ্ছলতা এসেছে। এখন সে রাজ পোশাক পরিধান করছে। ইতিমধ্যে অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। যেরকমভাবে তার বাহ্যিক অবস্থার বিরাট পরিবর্তন হয়েছে, কুঁড়েঘর থেকে রাজমহলে চলে গিয়েছে, ধীরে ধীরে তার ধন-দৌলত-স্বচ্ছলতাও বেড়েছে, সেরকমভাবে এই সময়ের প্রবাহের সাথে সাথে নিজের মধ্যেও পরিবর্তন হয়েছে। এক সময় সে যুবতী ছিল, এখন সে বৃদ্ধ মহিলা। এক সময় তার বড় রূপ ছিল, ক্রমেই বয়সের ভারে সে রূপ হারিয়ে গিয়েছে। এখন তাকে দেখে বোঝা মুশকিল যে, এক সময় সে খুব রূপবতী ছিল।
এখন এই বার্ধক্যে এসে আয়নাতে নিজেকে দেখছে। সাথে সাথে ঘরের দামি আসবাবপত্রগুলো দেখছে, আবার জামা-কাপড়ও দেখছে... এই অবস্থায় নিজের প্রথম জীবনের স্মৃতিচারণ করে স্বগোক্তি করে উঠল, 'আমি সুন্দর ছিলাম, আমার কিছুই সুন্দর ছিল না। এখন আমার সবকিছু সুন্দর হয়েছে কিন্তু আমি আর সুন্দর নেই।' তো এক হলো আমি, আর অপরটি হলো আমার। দুনিয়াতে এই দুই জিনিসেরই মেহনত চলছে।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন এই 'আমি'র প্রতি। প্রতিটি ব্যক্তিকে এমন মেহনতে মশগুল করা যে, যেন ক্রমেই তার সেই আমি সুন্দর হতে পারে। আর পুরো দুনিয়াতে এর মোকাবেলায় অন্যান্য মেহনতও সমান্তরালে চলছে। এই মেহনতগুলো যে খারাপ—এমনটি নয়, ভালো মেহনতও রয়েছে; কিন্তু সেই মেহনতগুলোর লক্ষ্য আমি নয়, লক্ষ্য হচ্ছে আমার।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষকে এই দাওয়াত দেওয়ার জন্য যে, মেহনত করে তুমি নিজে সুন্দর হয়ে যাও। আর সমগ্র বিশ্ব সভ্যতার নামে বিভিন্ন ধরনের মেহনত প্রচলিত রয়েছে। বর্তমান সভ্যতাকে বলা হয় আধুনিক সভ্যতা। প্রাচীন আমলে, বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন জাতিতে বিভিন্ন সভ্যতা প্রচলিত ছিল। এই সব সভ্যতাগুলো মেহনত করেছে 'আমার'কে সুন্দর বানানোর জন্যই। সব সভ্যতার মধ্যে সেসব সভ্যতাই উল্লেখযোগ্য যারা সফলকাম হয়েছে, সার্থক হয়েছে। অর্থাৎ, তারা ঠিকই সুন্দর বানাতে পেরেছিল। পার্থক্য এতটুকুই যে, কোনো সভ্যতাই ওই ব্যক্তিত্বকে সভ্য বানানোর প্রতি অগ্রসর হয়নি। আর এটি তাদের লক্ষ্যও ছিল না; বরং তারা তার চারপাশে 'আমার সৌন্দর্য'কে নির্মাণে ব্যস্ত ছিল। তো এক-একটি সভ্যতা মানুষের ঘরবাড়ি, জামা-কাপড় তথা মানুষের আনুষাঙ্গিক যা কিছু রয়েছে, এই বিভিন্ন ধরনের জিনিসকে সুন্দর বানিয়েছে, ভালো বানিয়েছে, শক্তিশালী বানিয়েছে।
আধুনিক যামানায় বিভিন্ন গবেষণা ও মেহনত করে অতিশক্তিশালী অস্ত্র আবিষ্কার করা হয়েছে; কিন্তু মানুষকে শক্তিশালী বানানোর চেষ্টা করা হয়নি, আর মানুষও শক্তিশালী হয়নি এবং এমন কোনো লক্ষ্যও তাদের ছিল না। সভ্যতাগুলোর লক্ষ্য ছিল, শক্তিশালী অস্ত্র তৈরি করা। আর এতে মানুষ সফলকাম হয়েছে। মানুষকে শক্তিশালী বানাতে চায়নি, এবং এটি তাদের লক্ষ্যও ছিল না। ফলাফল মানুষ শক্তিশালী হয়নি। সুতরাং মানুষ ক্রমেই দুর্বল হয়ে গিয়েছে। দুনিয়াতে কোনো মেহনতই একেবারে এমনি এমনি হয়ে যায় না; বরং কিছু না কিছুর বিনিময়ে হয়ে থাকে। সুতরাং যে 'আমি'কে সুন্দর বানায়, সে 'আমার' বিনিময়ে 'আমি'কে সুন্দর বানায়। আমিকে সুন্দর বানাতে তার 'আমার সৌন্দর্য'কে হারাতে হয়েছে। আর যে আমাকে সুন্দর বানিয়েছে, তাকে আমির সৌন্দর্যকে হারাতে হয়েছে।
এক ব্যক্তি, সে নেক স্বভাবের ভালো মানুষ; কিন্তু তার ঘরবাড়ি ইত্যাদি সুন্দর নয়। সে মনস্থ করল যে, এরকম চলবে না; আমার বাড়িও সুন্দর হওয়া চাই। আমার বাড়ি সুন্দর হওয়া প্রয়োজন। সহজ পথে এতদিন পর্যন্ত আমি চলেছি, আমি সম্পদ অর্জন করতে পারিনি। এতদিন আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক রেখেছি, মেহমানদারি করেছি, দান-খয়রাত করেছি, এতে আমার কাছে সম্পদ জমেনি আর আমার বাড়িও সুন্দর হয়নি। এখন আমি ঠিক করেছি, আমার বাড়ি সুন্দর বানাব। তো আমার বাড়ি সুন্দর বানাতে গেলে আমার জমির প্রয়োজন, সম্পদের প্রয়োজন। অতএব এখন থেকে আর দান-খয়রাত করব না; আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্কও রাখব না। আমার কাছে যদি কেউ আসে, তো তার মেহমানদারিও করব না; সততাও রক্ষা করা হবে না। কারণ, সৎ পথে বেশি উপার্জন করা যায় না। মিথ্যা বলতে হবে, জুলুম করতে হবে, অন্যায় করতে হবে। সুতরাং যেহেতু সে বাড়ি সুন্দর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুতরাং সে দান-খয়রাত ছাড়ল; দানশীলতা ছেড়ে সে কৃপণ হলো। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্কও ছেদন করল। সবার কাছে সে প্রিয় ছিল, এখন সবার কাছে সে অপ্রিয় হলো। সৎ ছিল, এখন অসৎ পথে উপার্জন আরম্ভ করে অসৎ হয়ে গেল। আর ধীরে ধীরে কয়েক বছর পরে সে ঠিকই বিরাট সম্পদের অধিকারী হয়ে গেল। বিরাট মহল বানিয়ে ফেলল। তার পছন্দনীয় আলিশান মহলে সে এখন বসবাস করে। এখন তার 'আমার বাড়ি' যেভাবে সে চেয়েছিল, বড় সুন্দর হয়েছে; কিন্তু তার সেই 'আমার বাড়ি'টা বানাতে গিয়ে তার 'আমি'টা একেবারে কুৎসিত হয়ে গিয়েছে। এক সময় সে দানশীল ছিল, এখন সে কৃপণ হয়েছে। এক সময় সে সৎ ছিল, এখন সে অসৎ হয়ে গিয়েছে। এক সময় সে মেহেরবান ছিল, এখন সে জালিম হয়েছে। অর্থাৎ, 'আমি'র বিনিময়ে 'আমার' বাড়িটা সুন্দর করেছে।
অপরদিকে অন্য এক ব্যক্তি, তার নিকট সুন্দর একটি বাড়ি ছিল, সম্পদ ছিল, জমি-জমা ছিল, আরও অনেককিছুই ছিল; কিন্তু সে দানশীল ছিল না, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিল না, প্রতিবেশীদের প্রতি সে দৃষ্টি দিত না, তার উপার্জনের মধ্যেও সে ততবেশি পরহেজগার-তাকওয়াবান ছিল না; কিন্তু সে একটা পর্যায়ে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিল যে, এভাবে চলবে না। আমি আল্লাহর সামনে এমনভাবে হাজির হতে চাই, আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে দেখে সন্তুষ্ট হন। আল্লাহর নজরে আমি যেন সুন্দর হই। সুতরাং মেহনত যখন আরম্ভ করল যে, আমি সুন্দর হব, আল্লাহ যেন আমাকে পছন্দ করেন। তো এখন সে তার অসৎ উপার্জন ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সততার ভেতর সীমিত করল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তার উপার্জন অনেক কমে গেল। কারণ, অসৎ উপার্জন তো এখন আর নেই। অন্যের যে সমস্ত হক, যা সে জুলুম করে নিয়েছিল, সেগুলো সে খোঁজ করে করে তার পাওনাদারকে ফেরত দিয়ে দিল। যার কাছে মাফ চাওয়ার ছিল, মাফ চাইল, পাওনাগুলো আদায় করল। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে দেখল তার ভাতিজা, ভাগনে বড় অভাবের মধ্যে আছে, সুতরাং পাওনাগুলো আদায় করার পরে যেটুকু তার কাছে রয়ে গিয়েছিল, সেই জমি থেকে তাদেরকেও কিছু দান করল। প্রতিবেশীদের মধ্যে লক্ষ্য করল, অনেক অভাবী আছে। সুতরাং সে নিজে যা খায়, প্রতিবেশীদেরকেও সেগুলো খাওয়ায়। দেখা গেল, তার 'আমার' বলতে আর কিছুই নেই। এক সময় যার বড় বাড়ি ছিল, এখন সে ছোট ঝুপড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। দামি দামি জামা-কাপড় পরত, এখন সে একেবারে সস্তা আর সাদাসিধে জীবন অতিবাহিত করছে। তো তার 'আমার' বলতে যা ছিল, সব হারিয়ে ফেলেছে; কিন্তু তার 'আমি'টা হয়ে গিয়েছে বড় সুন্দর। এখন আর কেউ তার বাড়ির দিকে তাকিয়ে বলে না যে, তার বাড়িটি বড় সুন্দর। অথচ এক সময় তার বড় সুন্দর বাড়ি ছিল। পথিক তার বাড়ির দিকে তাকিয়ে বলত, মাশাআল্লাহ, এ বাড়িটি তো অনেক সুন্দর। কিন্তু এখন তার বাড়ি আর সুন্দর না; কিন্তু গোটা অঞ্চলের লোকেরা তাকেই বেশি ভালোবাসে যে, এই ব্যক্তিটি বড় সুন্দর। আগে ছিল তার বাড়ি সুন্দর, এখন তার বাড়ি আর সুন্দর নয় বরং সে নিজে সুন্দর।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষকে এই বিষয়ে আহ্বান করতে যাতে এক-একজন ব্যক্তি সুন্দর হয়। আর আল্লাহর নজরে যে সুন্দর হবে, মানুষের নজরেও সে সুন্দর হবে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে দাওয়াতও দিয়েছেন ওই ব্যক্তিদের দিকে। ইরশাদ করেন,
آمِنُوْا كَمَا آمَنَ النَّاسُ .
'দুনিয়ার মানুষরা ঈমান আনো যেরকম মানুষরা ঈমান এনেছে।'
উলামায়ে কেরাম বলেন, এখানে মানুষ বলতে সাহাবায়ে কেরাম উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা বলতে পারতেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদের মতো ঈমান আনো; কিন্তু তা না বলে বলেছেন, মানুষের মতো ঈমান আনো। সম্ভবত এ কারণে যে, মানুষই যদি দেখতে চাও, তবে মানুষের মতো মানুষ হলেন তারা। আমরা যেরকম বলি, 'মানুষের মতো মানুষ।' সুতরাং বলা হচ্ছে, মানুষই যদি দেখতে চাও, তবে মানুষের মতো মানুষ হলেন তাঁরা (সাহাবারা)। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বাকিরা কি মানুষ না? উত্তর হলো, হ্যাঁ, তারা মানুষ তবে মানুষের মতো মানুষ না। প্রশ্ন উঠতে পারে, বাকিরা যদি মানুষের মতো মানুষ না হয়, তবে তারা কিসের মতো? উত্তর হলো, অন্যকিছুর মতো। যদি তাকে প্রশ্ন করা হয়, বাকিরা কিসের মতো? উত্তরে বলবে, তারা মানুষের মতো নয়। কিসের মতো? সেটি আপনি বুঝেন নি। যে যেভাবে বুঝে যে, শেয়ালের মতো, নাকি কুকুরের মতো, নাকি বানরের মতো। এটি আমি বলতে চাই না, আপনি বুঝেন নি।
আল্লাহ তাআলা গোটা দুনিয়ার মানুষ সম্পর্কে কিছু বলেননি যে, তারা কার মতো; কিন্তু সাহাবাদের সম্বন্ধে বলেছেন, এরা হচ্ছে মানুষ। অন্যান্যরা কি? এটি আল্লাহ তাআলা বলেননি। এটি আমাদের বুঝে নিতে হবে। তবে কখনো বলেছেন,
أُولٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
'যারা ঈমান আনেনি, ঈমান থেকে দূরে, তারা চতুষ্পদের মতো; বরং এরচেয়ে বেশি পথহারা।'
আল্লাহ তাআলা অন্য স্থানে ইরশাদ করেন,
وَمَنْ كَانَ فِي هٰذِهِ أَعْمٰى فَهُوَ فِي الْآخِرَةِ أَعْمٰى وَأَضَلُّ سَبِيلًا .
'এখানে যারা অন্ধ, তারা আখেরাতেও অন্ধ হবে এবং আরও পথহারা হবে।'
তো কেউ অন্ধ, কেউ চতুষ্পদের মতো, কেউ জানোয়ারের মতো... তাহলে মানুষকে? মানুষ হলেন সাহাবায়ে কেরাম। সুতরাং ঈমান যদি আনো তবে মানুষের মতো ঈমান আনো। তাঁরাই ছিলেন মানুষ। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের মাধ্যমে সারা দুনিয়ার মানুষকে ডেকেছেন যে, তাদের মতো ঈমান আনো।
বিভিন্ন সভ্যতা, তারা তাদের নিজ নিজ সভ্যতা নিয়ে গর্ব করে। তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমাদের গৌরব কিসে? কী দিয়ে? দুনিয়ার সব সভ্যতাই বলবে না যে, আমাদের গৌরব হচ্ছে অমুক ব্যক্তি বা অমুক ব্যক্তিবর্গ; বরং তারা বলবে, আমাদের গৌরব হচ্ছে অমুক নির্মাণকীর্তি। কখনো বলবে বিজ্ঞান, কখনো বলবে নির্মাণকীর্তি। কখনো বলবে প্রযুক্তি। কখনো বলবে শহর নির্মাণ। এরকম বিভিন্ন ধরনের সম্পদ, যেগুলো সম্পর্কে আমরা কিছুক্ষণ পূর্বে আলোচনা করছিলাম যে, এগুলো হচ্ছে 'আমার'। এক-এক জাতি তার এক-এক আমার নিয়ে গৌরব করে। আমার শহর, আমার বাড়ি, আমার পথঘাট, আমার নির্মাণকাজ, আমার অট্টালিকা, আমার শিল্প, আমার দর্শন, আমার বিজ্ঞান। আর আল্লাহ তাআলা গর্ব করেন কোনো 'আমার'কে নিয়ে নয়; বরং সাহাবাদেরকে নিয়ে যে, ঈমান আনো এদের মতো। কোনো সম্পদের মতো নয়, বরং এদের মতো। এদের মতো হও। আল্লাহ তাআলা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়েছেন কোনো পোশাক বা কোনো আবরণ দিয়ে নয়; বরং রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়েছেন একটি ব্যক্তি হিসেবে আর বলেছেন, তাঁর মতো হও। রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব মানুষদের জন্য দৃষ্টান্ত, অনুকরণীয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
لَقَدْ كَانَ فِي رَسُولِكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ.
'রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।'
উত্তম আদর্শ বলতে কী বোঝায়? তাঁর বাড়ির মতো বাড়ি বানাবে? তাঁর বাড়ি তো অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ছিল না। তাঁর জামার মতো জামা বানাবে? তাও না। তাহলে আমরা যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করি। তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করা, তাঁর জামার মতো জামা পরা—এটি হলো তাঁর সুন্নাত হিসেবে একটু চলা, তাঁর নকল করা; কিন্তু এটি মূল লক্ষ্য নয়। সেই যামানাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই রকম জামা-কাপড় পরতেন, তখন আরবের প্রচলন হিসেবে কাফেররাও সেরকমই জামা-কাপড়ই পরত। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেরকম ঝুপড়ি ঘরে ছিলেন, সে রকম ঝুপড়িতে তখনকার মানুষরাও ছিল, বর্তমানে অনেক মানুষও থাকে। হুবহু সেরকম না হলেও সেই নিম্নমানের ঝুপড়ি। মৌসুম ভিন্ন, আবহাওয়া ভিন্ন—তারপরও সেই ভিন্নতাকে যদি একটু নজরআন্দাজ করা হয় তাহলে আমাদের দেশে, ঢাকা শহরে যে সব বাড়ি ঘর আছে কমলাপুর রেলস্টেশনের আশেপাশে, ঢাকায় রাস্তার পাশে ফুটপাতে যেসব পলিথিন দিয়ে বানানো ঘরবাড়ি আছে। এগুলোকে আদৌ বাড়ি বলা যায় কি না। বাড়ি বলা যথার্থ হবে কি না। কারণ, শুধু বাস পুতে আর পলিথিন দিয়ে উপরের ছাদ মতো লাগিয়েছে। এখন এগুলোকে আদৌ বাড়ি বলা যায় কি না। তারপরও ধরে নিলাম যে, এটি বাড়ি। তো আবহাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এটিই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়ির মতো বা সাহাবাদের বাড়ির মতো। তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিসের নিদর্শন হিসেবে এসেছেন? তিনি যেরকম তুমিও সেরকম একজন ব্যক্তি হও। সাহাবায়ে কেরামও তেমনই হয়েছেন। আর এই সাহাবাগণ পরবর্তীদের জন্য তেমনই দৃষ্টান্ত ছিলেন, অনুকরণীয় ছিলেন।
সম্ভবত দামেস্কে... একজন মুসলমানকে এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করল, ইসলাম কী? কিছুদূরে আবু দারদা রা. —যাঁকে উমর রা. দামেস্কে পাঠিয়েছিলেন মুসলমানদের তালিম-তরবিয়তের জন্য— হেঁটে যাচ্ছিলেন। তার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, 'তাঁকে দেখ। তিনিই হলেন ইসলাম।'
এরকম নয় যে, তাঁর বাড়ি ইসলামের মতো, তাঁর জামা-কাপড় ইসলামের মতো, তাঁর বই ইসলামের মতো, তাঁর কথা ইসলামের মতো; বরং তিনিই ইসলাম। যে রকম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই ইসলাম, তাঁর কিছু নয়। আমি এ কথাটি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, এই মতাদর্শের বিপরীতে দুনিয়াতে যত মেহনত আছে, সবগুলো হচ্ছে 'আমি' নয়, বরং 'আমার' মেহনত। আমার সম্পদ, আমার জ্ঞান, আমার বিজ্ঞান, আমার সমাজ, আমার... আমার... ইত্যাদি নানান ধরনের আমার আর আমার। আমার মধ্যে আর আমির মধ্যে যদি কেউ পার্থক্য নির্ণয় করতে চায় তবে পার্থক্য হলো যে, আমার হলো ওই জিনিস, যা কেউ ছিনতাই করতে চাইলে ছিনতাই করতে পারে। যেটা হাতছাড়া হয়ে অন্যের হাতে চলে যেতে পারে। যেটি বেদখল হয়ে যেতে পারে। পক্ষান্তরে 'আমি' যা, এটি কখনো কোনো ডাকাত নিতে পারবে না। কোনো ছিনতাইকারি ছিনতাই করতে পারবে না। কখনো বেদখল হতে পারবে না। আর আল্লাহ তাআলা এমন কোনো জিনিসের প্রতি মানুষকে উৎসাহী করেননি, যা ছিনতাই হতে পারে; বরং এমন জিনিস দিয়েছেন, যেটি কখনো ছিনতাই হবে না। আমি আমার বাড়ির যতই নিরাপত্তা ব্যবস্থা করি না কেন, সেটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে যে, যে প্রহরীদেরকে আমি নিয়োজিত করেছি, আক্রমণকারী এরচেয়েও শক্তিশালী হলে আমার প্রহরীদেরকে মেরে বাড়ি দখল করে নিবে আর আমাকে তাড়িয়ে দিবে। আমার গলার হার, আমার উন্নতমানের জামা-কাপড়—সব চুরি-ডাকাতি হতে পারে। কিন্তু আমির সৌন্দর্য, আমার সৌন্দর্য কোন ডাকাত নিবে? কেউ নিতে পারবে না। এর জন্য কোনো পাহারার প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ তাআলা আল্লাহওয়ালাদের যে সম্পদ দিয়েছেন, সে সম্পদ রক্ষায় কখনো কোনো প্রহরির প্রয়োজন হয়নি। কারণ, এটি ওহি, এটি কখনো ছিনতাইকারিদের হাতে পড়বে না। যদি ছিনতাই হয়ে যায়, তবে বিষয়টি ভালো করে যাচাই করতে হবে। সম্ভবত ইমাম রাজি অথবা এমন কোনো বড় আলেম সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, তিনি সফরে ছিলেন। কাফেলা ডাকাতদের কবলে পড়ল। এক যামানায় ডাকাতদের বড় উপদ্রব ছিল। বিশেষ করে মরুভূমির মতো নির্জন যায়গাতে যদি ডাকাত ইত্যাদি আক্রমণ করে তবে কে ওখানে রক্ষা করতে আসবে। আর ডাকাতের হাতে পড়লে হত্যা হওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। কেউ বাঁচানোর জন্য যাওয়ার মতো ছিল না। অতঃপর ওই ডাকাতরা তাকে বন্দি করল, পরবর্তীতে তাকে মুক্তিপণ দিতে বলল। তো সেসময় যারা কাছে ছিল, ঘনিষ্ঠজন ছিল, তারা সবাই তাঁকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনল। আর তিনি যখন তাদের প্রশ্ন করলেন, কীভাবে ডাকাতদের হাতে পড়লে? তারা বলল, আপনি তো ইলম-সহ সব হারিয়ে ফেলেছিলেন। তখন তিনি নিজেকে খুব তিরস্কার করলেন। নিজেকে অনেক ছোট করে দিলেন। দীর্ঘদিন ধরে ইলম হাসিল করেছিলেন আর ইলমের উদ্দেশ্য হলো বিপদ থেকে মুক্তি। ইলম হাসিলের পর যদি বিপদমুক্ত না হই, তাহলে সেই ইলমের ফায়দা কী? অতঃপর তিনি আরও ইলম অর্জনে লেগে গেলেন। পরবর্তীতে সেই একই পথে এক ব্যক্তি ওই যাত্রাপথে তাঁকে চিনলেন। বললেন, এই তো সেই আলেম। তো তাঁর ছিল তাকওয়া, তাঁর ছিল ইলম, আরও কত-কী ছিল, সব এক পর্যায়ে তাকে পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং ওটা ছিনতাই হয়ে গেছে। আর যা ছিনতাই হয়ে গেছে, তা ভালো করে যাচাই করে নেওয়া দরকার। মনে হয় এটা শয়তানের ছলনা ছাড়া অন্য কিছু নয়। প্রকৃত ইলম ছিনতাই হয় না।
কারণ, ইলম হলো ওটা, ইলম হচ্ছে সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুমগণ। সাহাবায়ে কেরামকে কোনো ডাকাতরা ছিনতাই করতে পারেনি, ধরতে পারেনি বা বন্দি করতে পারেনি। বন্দি করার প্রশ্নই ওঠে না। তাঁদের শত্রুরা তাদের ধরতে পারেনি, ডাকাতরাও পারেনি, আর কেউই পারেনি। শত্রুরা তাঁদের সম্পদ ছিনতাই করতে পারে; তাঁদের ইলম ছিনতাই করতে পারে না। সাহাবায়ে কেরাম যতকিছু হারিয়েছেন, সেগুলো হারিয়েছেন আল্লাহর পথে নিজেরা দান করেছেন বলেই। এজন্য যা হারিয়েছেন, তা নিজেরাই হারিয়েছেন; কেউ তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়নি। সব সম্পদ নিজেরাই দান করে দিয়েছেন। কারণ এটিই হলো ওই ইলমের দাবি। এই যে 'আমি', 'আমি' যে ইলম তা ছিনতাই হয় না।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষের মেহনত করার জন্য যাতে মানুষ সুন্দর হয়, শক্তিশালী হয়। এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম দুশমনদের থেকে ভয় পেতেন না। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধে এত কম সাহাবা নিয়ে গিয়েছিলেন যে, লড়াই করার মতো তখন যথেষ্ট ছিল না; কিন্তু ভয় পাননি। আর তাঁদের শত্রু অনেক শক্তিশালী ছিল, তাও ভয় পাননি। বদরের সেই অবস্থা থেকে পরবর্তীতে হুনাইনের যুদ্ধে তাদের অবস্থা এত উন্নত হয়ে গিয়েছিল যে, বারো হাজারের মতো লোক ছিল। অতএব, সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের এই সংখ্যাবলের দিকে তাকিয়ে অভিমান প্রকাশ করে ফেললেন। আল্লাহ তাআলা তাতে নারাজ হলেন। অতঃপর তাদেরকে এক পর্যায়ে এনে বুঝালেন যে, তোমাদের এই বারো হাজার সংখ্যাবল কোনো কাজে আসবে না। এটা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। এখানে যে উপকৃত হতে পারত, সে হলো ঈমান। বারো হাজার নয়। বদরের যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম খুব কম ছিলেন, কিন্তু বিজয় লাভ করেছিলেন। হুনাইনে সংখ্যা অনেক বেশি ছিল, কিন্তু প্রথমদিকে পরাজিত হয়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বুঝালেন, বারো হাজার সংখ্যা কোনো কাজে আসেনি, এখন যেটা উপকারে এসেছে, তা হলো ঈমান। অর্থাৎ, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা বারো হাজারের দিকে তাকিয়ে ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল। আর যখন শুধু আল্লাহর দিকে তাকাল, তখন আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করলেন।
সুতরাং, আমাদের দৃষ্টিকে আল্লাহ তাআলা পরিবর্তন করে দিতে চান। আমাদের চোখের পর্দাকে সরিয়ে দিতে চান। আমাদের চোখের সামনে যেসব জাহেরি জিনিস রয়েছে— অর্থাৎ আসবাব—এই আসবাবকে চূড়ান্ত মনে করা থেকে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মুক্ত করতে চান। আল্লাহ তাআলা চান, আমরা যেন আসবাবের দাসত্ব থেকে মুক্ত হই, আসবাবের উপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত হই এবং আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হই।
এজন্যই আল্লাহর পথে বের হয়ে নিজেকে আসবাবমুক্ত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা যেন মেহেরবানি করে আমার এই ত্যাগকে কবুল করেন আর আমার মনকে এই সম্পদের মোহ থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَكَ اللّٰهُمَّ نَشْهَدُ اَنْ لَّا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ نَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوْبُ إِلَيْكَ.
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ওয়ায-মাহফিল আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম-নীতি
ওয়ায মাহফিলের উদ্দেশ্য দৈনন্দিন জীবনে মহান আল্লাহ পাকের বিধি-বিধান সঠিকভাবে পালন করার জন্য প্রয়োজনী...
কিছু অমূল্য নসিহত
...
এক আমেরিকান নওমুসলিম নারীর ঈমানদীপ্ত কাহিনী
...
ঈমানের মেহনত : পরিচয় ও পদ্ধতি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর.. মুহতারাম হাযেরীন! আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের জন্য চারট...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন