প্রবন্ধ
মাশওয়ারা: গুরুত্ব, বৈশিষ্ট্য ও নিয়ম
২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
০
০
(প্রদত্ত বয়ান হতে সংগৃহীত)
وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
"যারা রবের ডাকে সাড়া দিল, নামাজ কায়েম করল, মাশওয়ারার মাধ্যমে কাজ সমাধা করল এবং আল্লাহ তা'আলা যা দিয়েছেন তা থেকে দান করল।"
[সূরা আশ-শূরা: আয়াত ৩৮]
আল্লাহ তা'আলা মাশওয়ারাকে নামাজ এবং যাকাতের মাঝখানে বলেছেন আর ঈমানের সাথে জড়িত করেছেন। মাশওয়ারা ঐসব আমলের মধ্যে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর ডাকে যে সাড়া দিল তা প্রমাণিত হয়। এর দ্বারা আমলের গুরুত্ব বোঝা যায়। এটা কত পূর্ণ জিনিস যে আল্লাহ তা'আলা ঈমানের সাথে জড়িত করেছেন। যদিও এই কথা বলা হয়নি যে, মাশওয়ারা করে না সে মুমিন নয়, কিন্তু ঈমানের সাথে জড়িত করার মাধ্যমে ঐ ধরনের একটা আভাস আছে। যে ঈমান আনল, সে নামাজ পড়ল। অনেক ফকিহের মত যে নামাজ পড়ল না, সে ঈমান আনেনি। তো মাশওয়ারাও ঐ সব আমলের মধ্যে যেহেতু নামাজ আর যাকাতের মাঝখানে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর যখন অনেকেই যাকাত দিতে অস্বীকার করল, আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে চাইলেন। কেউ কেউ আপত্তি করলেন যে, ইসলাম তো তারা অস্বীকার করেনি। নামাজ তো পড়ছে। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তার উত্তরে বললেন যে, "আল্লাহ তা'আলা নামাজ ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করেননি।" তো নামাজ না পড়লে যেমন তার উপর কিতালের হুকুম হয়, ঐ দলিল থেকেই আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যাকাত অস্বীকারকারীদের কিতালের হুকুম দিয়েছেন। কারণ যাকাত এবং নামাজকে একসাথে রাখা হয়েছে। আর এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মাশওয়ারাকে এই দুটার মাঝখানে রেখেছেন। এর ভিতরেও এক ধরনের একটা ইঙ্গিত আছে যে, যাকাত, নামাজ যে রকম আমল, মাশওয়ারাও ঐ রকম আমল। কয়েকটা কথা যখন একসাথে বলা হয় যেমন, কেউ এই কথা বলবে না জামা-গেঞ্জি-টুপি, বরং বলবে জামা-কাপড়-টুপি। আর নামাজ ও যাকাত দুটাই ইবাদত। এই দুটার মাঝখানে মাশওয়ারাকে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাশওয়ারাকে জাহেরি ভাবে, ইবাদতের মেজাজের মধ্যে অনেকেই দেখে না। কারণ মাশওয়ারা এমন একটা আমল যে, যারা আবিদ নয়, যাদের ইবাদতভিত্তিক জীবন নয়, তারাও বিভিন্ন কারণে মাশওয়ারা করে। নামাজ পড়ে না কিন্তু মাশওয়ারা করছে, মুসলমান নয় কিন্তু মাশওয়ারা করছে। মাশওয়ারা নাম না করলেও আলোচনা আছে, বিবেচনা আছে, চিন্তা-ফিকির আছে। তো সেই হিসেবে যেহেতু দুনিয়াদাররা করে, তাই ইবাদতের মধ্যে অনেক সময় গণনা করা হয় না। অথচ আল্লাহ তা'আলা দীনের যত আহকাম দিয়েছেন সবগুলো ইবাদতের মেজাজ নিয়ে করা। ইবাদতের মেজাজ নিয়ে করা ও এমনি থেকে একটা কাজের মেজাজ নিয়ে করার মধ্যে পার্থক্য হলো যে দুনিয়াবি একটা কাজ যখন কেউ করে, তখন ঐ কাজ থেকে একটা যৌক্তিক পরিণতি আশা করে। আর ইবাদতের মেজাজ হলো কাজ থেকে যেমন সরাসরি ফায়দা আশা করা হয়, ঐরকম আশা করা না। বরং ইবাদতকে আল্লাহর কাছে কবুল করাতে চাওয়া করে, আর আল্লাহ যদি এই ইবাদত বা আমলের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান তাহলে আল্লাহ দিবেন।
ব্যাপারটা উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করি। ধরা যাক, কেউ রেস্তোরাঁ করে আর ভালো রান্না করবার চেষ্টা করে। ভালো রান্না করে মানুষকে খাওয়ায়। রেস্তোরাঁও যে ভালো রান্না করে মানুষকে খাওয়ায়, ঐটা বিক্রি করে সরাসরি ঐখান থেকেই লাভ আশা করে। অপর একজন, সেও ভালো রান্না করবার চেষ্টা করছে আর তার কোনো মেহমানকে খাওয়াচ্ছে। সেও ফায়দা হাসিল করে। কিন্তু ঐ রান্নার বিনিময়ে টাকার ফায়দা নয়। এটার মাধ্যমে তার মেহমানের সন্তুষ্টি অর্জন করার চেষ্টা করে। সে যদি সন্তুষ্ট হয় তাহলে কি হল— সেটা বিভিন্ন সংঘ বা বড় একটা অংশ অন্যসব থেকে হতে পারে। কেউ জিজ্ঞাসা করল, "তুমি মেহমানকে এত যত্ন করে খাওয়াচ্ছ, তো কি চাও?" সে বলল "আমি উনার সন্তুষ্টি চাই, উনাকে খুশি করতে চাই।" জিজ্ঞাসা করল, "উনি খুশি হলে তোমার কি লাভ?" অনেকের কাছেই এই একবারই অবাক মনে হবে। তো সে হলো কি লাভ—এটা কোন হলো? সে হলো আবার লাভ কি হবে, আমি শুধু সন্তুষ্ট করতে চাই। আমার ছেলে, আমার বাবা, আমার স্বামী, আমার স্ত্রী, আমার ভাই, আমার বোন আমার সাথে একটা সম্পর্ক আছে তাই তাদের সন্তুষ্টি চাই। আমার বাবাকে আমি খাওয়ালাম, আমার বাবা যদি সন্তুষ্ট হয়, তাহলে ঐটাই আমাকে ভালো লাগবে। আমার ছেলে ছুটিতে এসেছে, ওকে আমি খাওয়ালাম। ছেলে যদি মজা করে খায় তাহলে ঐটাই আমার কাছে ভালো লাগবে। এই কথাও সত্য যে, যাকে সন্তুষ্ট করা হয় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে তার কাছ থেকে ফায়দা আসে। কিন্তু সে সরাসরি ফায়দার জন্য করছে না। ঐটা অন্য ভাবে আসে। ইবাদতের মেজাজও ঐরকমই যে আল্লাহ তা'আলা দিবেন। কিভাবে দিবেন, ঐটার কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই।
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا ۖ لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُكَ ۗ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَىٰ
"আপনি আপনার পরিবারের লোকদেরকে নামাজের আদেশ দিন এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিজিক চাই না। আমিই আপনাকে রিজিক দেই এবং আল্লাহ ভীতির পরিণাম ভালো।" [সূরা ত্বহা: ১৩২]
ওলামারা বলেন যে, এই আয়াতের মধ্যে নামাজের উপর রিজিকের ওয়াদা আছে। তো নামাজ তো এমন ধরনের জিনিস নয় যে, বিক্রি করে টাকা পাওয়া যায়। আর নামাজ পড়লে যে রিজিক আসবে—কোনো ধরনের কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক দেখা যায় না। যদি বলা হতো যে, বীজ বপন করো—রিজিক আসবে, তো এই কথা বোঝা যায় যেহেতু বীজ বপনের সাথে রিজিকের একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু নামাজের সাথে রিজিকের কি সম্পর্ক? কোনো সম্পর্কই তো দেখা যায় না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা দিবেন। হাকিকত হচ্ছে, ঐ নামাজ থেকে আসবে না, নামাজকে আল্লাহ যদি কবুল করেন তবে আল্লাহ দিবেন। যেরকম: গাছ থেকে তো সরাসরি ফলই আসে, জাহেরি ভাবে তাই দেখা যায়। ওখানে যে আল্লাহ দেন তো এই কথা দেখা যায় না। একজন কাফেরও সেজন্য গাছ লাগায়। এই আম কোথায় পেয়েছো? "গাছে পেয়েছি।" ঈমানদাররাও সবসময় এই কথা বলে না যে, আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন। বরং বলে এই গাছের ফল। কিন্তু নামাজ তো ওটা দেখা যায় না। এমন না যে, নামাজ পড়লাম আর ওখান থেকে ফল-টল এলো। আসল ইবাদতের মেজাজ হচ্ছে, আল্লাহ যদি কবুল করেন তাহলে দিবেন।
তো মাশওয়ারাও ঐরকম একটা আমল যে, আল্লাহ যদি কবুল করেন তাহলে আল্লাহ তা'আলা ঐখান থেকে ফায়দা দিবেন। আর যদি কবুল না হয় তাহলে কোনো ফায়দা আসবে না। গাছ লাগালাম, তো জাহেরি ভাবে আল্লাহর কাছে কবুল হোক আর নাহোক, বড় হলে তো ফল ধরবেই। আর কবুলিয়াতের চিন্তা করে না। তায় আল্লাহর উপর বিশ্বাস করে না সেও গাছ লাগায়, আর সেও ফল পায়। কিন্তু নামাজের ব্যাপারে এই চিন্তা করে না। যেই নামাজ পড়ছে সে কোনো না কোনো ভাবে কবুলিয়াতের চিন্তা তার মধ্যে আছে। নইলে সে পড়তই না। আর সেজন্য একবার মাত্র দীনদার লোক নয়, একজন মদখোর, কিন্তু যদি এক-আধবার নামাজ পড়েও, তো অজু করে নিয়ত করেই নামাজ পড়ে। এজন্য যে, সেও একথা জানে যে পড়ছি যখন তো কবুল হওয়ার জন্যই পড়ি। বিনা অজুতে যদি পড়ি, বিনা নিয়তে যদি পড়ি তো কবুলিয়াত হবে না। পড়লাম, তো কবুল করার জন্যই পড়লাম। কিন্তু এই কথা সে গাছ লাগানোর ব্যাপারে, বীজ বপন করার ব্যাপারে চিন্তা করবে না। গাছ লাগাও, গাছ লাগালে ফল পাবে। তাই ইবাদতের মেজাজ হলো ঐরকম।
কথা হলো মাশওয়ারা সেই। মাশওয়ারাকেও ইবাদতের মেজাজে করা যেন আল্লাহ যদি কবুল করেন, তবে এখান থেকে ফায়দা দিবেন।
ইবাদতের আলামত। আল্লাহ তা'আলা দুই ইবাদতের মাঝখানে, নামাজ ও যাকাত ইবাদতের বড় স্তম্ভ, তো দুই স্তম্ভের মাঝখানে মাশওয়ারাকে উল্লেখ করেছেন। এখানে একটা ইঙ্গিত যে, এটাকে ইবাদতের মেজাজে করা। যদিও দুনিয়াদাররা, বেঈমানেরা, বেদীনেরা মাশওয়ারা করছে। ডাকাতও ডাকাতি করার আগে মাশওয়ারা করে, চোররা চুরি করতে যাওয়ার আগে মাশওয়ারা করে কোন বাড়িতে যাবে, কোন পথে চুরি করবে। কিন্তু এই মাশওয়ারায় সে করছে, এই কথা সে কখনো চিন্তা করে না, তাতে সে মুসলমান হোক, হিন্দু হোক আর ডাকাত হোক যে, আল্লাহ তা'আলা আমার মাশওয়ারাকে কবুল করবেন কিনা। মাশওয়ারা করছে, কিন্তু কবুলিয়াতের চিন্তা ছিল না। কিন্তু ঈমানদার যখন মাশওয়ারা করবে তখন তার মধ্যে এই চিন্তা জরুরি থাকা চাই যে, এই মাশওয়ারা আল্লাহর কাছে মকবুল হবে কিনা। আর এটা মকবুল বানাবার চেষ্টা করা, চিন্তা-ফিকির করা। এইভাবে মাশওয়ারা করা যেন আল্লাহ তা'আলা এটা কবুল করেন। আল্লাহ যদি কবুল করেন তো আল্লাহ তা'আলা এখান থেকেই ফায়দা দিবেন। আর আল্লাহ যখন কোনো ফায়দা বের করেন, তখন তার কখন বা কি ফায়দা আসবে মানুষ তা চিন্তাও করতে পারে না। কেউ একটা কথা বলল আর তার কি ফায়দা হতে পারে, কি লোকসান হতে পারে মানুষ চিন্তা করে না। একটা কথা বলল আর চিন্তাও করেনি অথচ এই কথাটায় বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। আবার আরেকটা কথা বলেছে আর চিন্তাও করেনি অথচ বিরাট ফায়দা হয়ে গেছে।
১৪০০ বছর পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বলেছেন। এখন যেসব ফায়দা বের হচ্ছে সেসব কথা থেকে, তার বেশিরভাগ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জানা ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা ফায়দা বের করেছেন। এছাড়াও আরো দীনদার লোকেরা, আল্লাহওয়ালারা, ওলামারা দীনের বিভিন্ন মেহনত করে গেছেন। তারা মেহনত করেছেন একটা জিনিসকে সামনে রেখে আর আল্লাহ তা'আলা এর চেয়ে অনেক বেশি ফায়দা দান করেছেন।
আল্লাহর রাসূল এক সফরে ছিলেন। সফরেই একটা ঘোড়া কিনলেন। ঘোড়া মালিকের কাছে হস্তান্তর রয়েছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম টাকাও দিলেন না। কিন্তু ক্রয়-বিক্রয়ের কথায় হয়ে গেছে। এটা আমি কিনলাম, এটা আমি বিক্রি করলাম, কিন্তু হস্তান্তর হয়নি। সফর চলছে। কিছুদূর যাওয়ার পর আরেক লোক এসে ঐ ঘোড়ার দামাদামি করতে লাগল আর সে ভালো দাম দিলো। ঘোড়ার বিক্রেতা যে, তার নিয়ত বদলে গেল। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, "আপনি কি কিনবেন নাকি বিক্রি করে দিবো?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি তো কিনে নিয়েছি।" উনি বললেন, "না, কিনেননি।" তো যখন মতানৈক্য হয়ে গেল, সাক্ষী পাবেন কোথায়? তখন খুজায়মা (রা.) একজন সাহাবি, উনি সাক্ষ্য দিলেন। উনি সাক্ষ্য দিলেন যে, "আমি সাক্ষী যে আপনি ঘোড়া কিনেছেন।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কথার উপর ফয়সালা করে দিলেন যে, "তুমি সাক্ষী।" কিন্তু দুই সাক্ষী লাগবে, এক সাক্ষী পাওয়া গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাও ফয়সালা করে দিলেন যে "খুজায়মার সাক্ষ্য দুই সাক্ষীর সমান।" সংঘাত আপাতত ঘোড়ার শেষ হয়ে গেল, আর ঘোড়ার ব্যাপারেই ছিল।
রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর জমানায় কুরআন শরিফের সংকলন হলো আর নিয়ম বানানো হয়েছে যে, যার কাছে যে আয়াত লেখা আছে সে ওটা নিয়ে আসবে, আর তো আয়াতের সমর্থনে দুই সাক্ষী লাগবে। খুজায়মা (রা.) যখন আয়াত নিয়ে এলেন, দ্বিতীয় সাক্ষী নাই। সূরা তওবার শেষের আয়াত।
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
فَإِن تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ۖ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
অনেক ফজিলতের আয়াত। বড় বড় ফজিলতের ওয়াদা আছে এই আয়াত পড়ার উপর। তখন খুজায়মা (রা.) ঐ আয়াতের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিলেন। যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) ফয়সালা করলেন যে, "খুজায়মা (রা.) এর সাক্ষ্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তার সাক্ষ্য দুই সাক্ষীর সমান।" সেই কথার উপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তো কোথায় ঘোড়ার ক্রয়-বিক্রয় আর কোথায় কুরআন শরিফের সংকলন! ওখানে এসে কথার ফায়দা পাওয়া যাচ্ছে। তো আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো একটা কথা থেকে ফায়দা পৌঁছাতে চান, কোথায় ফায়দা পৌঁছাবেন আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন। ঐটা তখন হবে যখন আল্লাহ তা'আলা কবুল করবেন। কবুল যদি করেন না, তো অনেক দূরে দূরে ফায়দা পৌঁছাবেন যা একজন মানুষ ধারণাও করতে পারে না।
হিন্দুস্তান-পাকিস্তান যখন ভাগ হয়ে গেল, হিন্দুস্তান থেকে মুসলমানরা পাকিস্তানের দিকে যান। এদিকে হয়তো কিছু আসাম এলাকার দিক থেকে কিছু পাকিস্তানে এসেছে, কিন্তু বাকি বেশিরভাগ দিল্লি ঐসব অঞ্চল থেকে ব্যাপকভাবে পাকিস্তানে এসেছে। আর বিরাট দাঙ্গা হয়েছে। নিজামুদ্দিনে হযরত মাওলানা ইউসুফ রহ. ছিলেন, মাওলানা জাকারিয়া (রহ.) ছিলেন, আর প্রতিদিনই বিশ-ত্রিশটা টিকিট কেউ নিয়ে আসত। এসে ইউসুফ (রহ.) এর কাছে পরিবারসহ পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য বলতেন। হযরত ইউসুফ (রহ.) এর একই উত্তর ছিল, "ভাইজান যে ফয়সালা করেন" অর্থাৎ মাওলানা জাকারিয়া সাহেব (রহ.)। আর অবস্থা খুবই খারাপ, ভবিষ্যৎ আঁচ করাও মুশকিল। সব মুসলমান যদি চলে যায় তো হিন্দুস্তান মুসলমান শূন্য হলে এই মুল্লুকে দীনের কাজের কি হবে? তো মানুষজন টিকিট নিয়ে আসতেন। মাওলানা ইউসুফ (রহ.) জাকারিয়া (রহ.) এর দিকে ইঙ্গিত করে বলতেন যে, "উনি যা ফয়সালা করেন।" আর উনাকে যখন জিজ্ঞাসা করতেন উনি চুপ থাকতেন বা বলতেন, "আমি একাই ফয়সালা করতে পারবো না।"
তো একটা কথা ঝুলেই আছে, আর কোনো ফয়সালা হলো না। কিছুদিন পর সুযোগ হলো যাওয়ার, তো সাহারানপুরে গেলেন। সাহারানপুরে একটা সুযোগ হলো, সাহারানপুরে মাওলানা মাদানি (রহ.) এলেন আর রায়পুরি (রহ.) এলেন। তিনজন মাশওয়ারায় বসলেন একটা কামরার ভিতরে। লম্বা মাশওয়ারা হলো। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত, জোহরের নামাজ পড়ে আবার। মাদানি (রহ.) এর ভাই মাহমুদ মাদানি (রহ.), উনি মদিনায় ছিলেন, তৎকালীন সরকারের উপদেষ্টা কমিটিতে ছিলেন। উনি বারবার করে বলছেন যে "আপনার (ইউসুফ (রহ.), জাকারিয়া (রহ.) জন্য আমি শোল টিকিট পাঠাই, পরিবারসহ মদিনায় চলে আসুন।" তো এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কি আছে! পরিবারসহ নিরাপদে থাকবেন মদিনায়। তো এই ব্যাপারটো সামনে আছে। ফয়সালাটো মাদানি (রহ.) এর ছিল। আর এরপর উনি ফয়সালা করলেন হিন্দুস্তানে থাকার।
তো এই মাত্র তিনজন মাশওয়ারা করলেন আর এই কথাকে আল্লাহ তা'আলা হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে দিলেন। খুব তো এই কথা ছড়াল আর অনেক মানুষ যারা যাওয়ার ফয়সালা করেছিল, তারা ফয়সালা পরিবর্তন করলেন। তো তারা বাড়িতে ফিরে এলো। ইনারা ফয়সালা করেছেন তঁাদের নিজেদের ব্যাপারে, তাদেরকে কেউ দায়িত্ব দেয়নি যে অন্যেরা যাবে কি যাবে না, তার ফয়সালা করতে। তো নিজের ব্যাপারে ফয়সালা করেছেন। কিন্তু এই ফয়সালা এত পূর্ণ যে, তখন তো বোঝাই গেল, আর পরে এখন বোঝা যাচ্ছে। কত বড় পূর্ণ! যদি খোদা নাখাস্তা হিন্দুস্তানে না থাকার ফয়সালা করতেন, সব হিন্দুস্তানের লোকের জন্য পাকিস্তান আর ইস্ট পাকিস্তানে জায়গাও হতো না, মেতেও পারতেন না। আর হিন্দুস্তানের কি অবস্থা হতো পরবর্তীতে তা কল্পনাও করা মুশকিল। কিন্তু মাত্র তিনজন লোক তঁাদের নিজেদের ব্যাপারে ফয়সালা করলেন যে ফয়সালায় আল্লাহ তা'আলা এত বড় বরকত দিলেন, মুসলমানদের উপর কত বড় ক্ষতি থেকে বাঁচালেন! কত হাজার ও লাখো মুসলমান উপকৃত করলেন হিন্দুস্তানে থাকার ফয়সালা করে। থাকল আর এখন দীনের মেহনত চলছে। মাশওয়ারা যদি মকবুল হয়ে যায় আল্লাহ তা'আলা অনেক ফায়দা দিবেন, কিন্তু শর্ত হলো সেটাকে মকবুল বানাতে হবে। একজন বান্দার জন্য নামাজ, মাশওয়ারা, যাকাত এই সবকিছু ভালোভাবে কবুল করাতে হলে তার নিজের ইসলাহের প্রয়োজন। নামাজের মধ্যে যেরকম নামাজ পড়তে দাঁড়িয়েছি, এদিক ওদিক ধ্যান চলে গেল, মাশওয়ারার মধ্যেও মাশওয়ারা করতে বসেছি কিন্তু মন নানান ধরনের টানাটানি চলে আসল। ধরা যাক, একটা সংঘ এলো। এটার রায় দিলে কার কি সুবিধা হবে, কার কি অসুবিধা হবে, আমার কি সুবিধা, ওর কি সুবিধা, ওকে আমি পছন্দ করি না, সে আমাকে পছন্দ করে না, আমি এই দলের দিকে যাবো নাকি ঐ দলের দিকে যাবো। তো এই সব কথাগুলো কি চলে আসবে, মানুষ তো! পছন্দ-অপছন্দ, তার নিজের স্বার্থ, জামাতের স্বার্থ, পরের স্বার্থ, এই স্বার্থ ঐ স্বার্থ কত ধরনের জিনিস আছে। উচিত ছিল এই সব স্বার্থকে বাঁচিয়ে মাশওয়ারাকে পরিষ্কার রাখা।
তো মাত্র দুই রাকাত নামাজ সম্পূর্ণ করতে শেষ করতে পারি না, মন এদিক ওদিক চলে যায়! অথচ কেউ নামাজ পড়ার সময় অন্য চিন্তা করার জন্য নামাজ পড়ে নি। নামাজ পড়ছে আর নামাজ পড়ার জন্যই নিয়ত করেছে। কখন তার চিন্তা অন্য দিকে চলে গেল সে নিজেই জানে না। তো দুই রাকাত নামাজের ভিতরে যদি আমি আমার নিজেকে সামলিয়ে না রাখতে পারি, তো মাশওয়ারার ভিতরে কেমন করে সামলাবো?
তো নামাজকে পরিষ্কার করতে যেরকম তার সম্পূর্ণ চিন্তা-ফিকির আল্লাহকে সামনে রেখে পড়তে হবে, মাশওয়ারাও তাই। আর এজন্য সম্পূর্ণ মেহনতের প্রয়োজন।
নামাজের মধ্যে যেরকম মন যায়, তো যার নফস যেদিকে আছে ঐদিকেই যায়। নামাজ এখানে পড়ছে আর বাইরে কোথাও গান-বাজনা হচ্ছে, শব্দ আসছে। তো ঐ গানের রসিক সে যদি হয়, মন অলরেডি ঐদিকে চলে যাবে। আর যদি সে এটার সাথে বেশি সংশ্লিষ্ট হয়, তো দূরে কোথাও অল্প শোনা যাচ্ছে, শব্দ শোনাও যাচ্ছে না, কিছু মাঝে মাঝে শুনতে না পেয়েও শুনবে। সে বাকি শব্দগুলো শুনতে না পেলেও নিজে থেকেই কল্পনা করবে আর মনে মনে গান গাইবে। এদিকে নামাজও চলবে। আবার আরেকজন গান শুনতেই পায় না। তাকে জিজ্ঞাসা করলে যে "নামাজের মধ্যে বাজনা বাজছিল", সে বলবে "কোথায় কি!" তার গানের দিকে খেয়ালই নেই। সেও যে বড় অলি-আল্লাহ তাও নয়। কিন্তু ওর খেয়াল নামাজের দিকে নেই, ওর খেয়াল অন্যদিকে। তার খেয়াল হলো, 'সারের দাম কমলো না বাড়লো'।
তো নফসের একেকজনের একেক দিকে টান আছে। মাশওয়ারার মধ্যেও এ টানগুলো খুব কাজ করবে। কে কোন রায় দিচ্ছে, কোন রায় হলে আমার সুবিধা, কোন রায় হলে আমার অসুবিধা, কোন ফয়সালা কি হওয়া চাই! তো সে সচেতনভাবে, অবচেতনভাবে নিজের রায়কে ঐদিকে ঘুরাতে চাইবে। এজন্য মাশওয়ারাকে পরিষ্কার রাখা, ভালোভাবে রায় দিতে পারা এটা তার নফসের ইসলাহের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। নামাজ পরিষ্কার রাখা যেমন তার নফস পরিষ্কার রাখার সাথে জড়িত, মাশওয়ারাও তেমন। আল্লাহ তা'আলা আমাদের তৌফিক নসিব করুন। এইজন্য সম্পূর্ণ দীনকে ভালোভাবে উঠানো। আর বিশেষ করে নামাজের ভিতরে পরিষ্কার করা। মাশওয়ারার ভিতরে কোনো দলাদলির দিকে না যাওয়া, এইটা একটা বড় পূর্ণ মাসআলা। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রথম মাশওয়ারাতে এটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। ইসলামের প্রথম মাশওয়ারা ছিল বদরের কয়েদিদের নিয়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের ব্যাপারে রায় জিজ্ঞাসা করলেন যে কয়েদিদের কি করা হবে। রায় জিজ্ঞাসা করায় ছিলো এক ভূমিকা ছিল "গতকাল তোমাদের ভাই, আজ তোমাদের হাতে বন্দি", অর্থাৎ কুরাইশরা। তারা সবাই আত্মীয়। গতকাল তোমাদের ভাই, আজ তোমাদের হাতে বন্দি, কি করবো? আবু বকর সিদ্দিক (রা.) রায় দিলেন যে, মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হোক। ওমর (রা.) রায় দিলেন "প্রত্যেককে তার নিকট আত্মীয়ের হাতে সোপর্দ করা হবে আর সে তাকে কতল করবে।" আরো অনেকে রায় দিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) রায় দিলেন, "জঙ্গলের ভিতরে ঢুকিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হোক।" ওরকম বিভিন্ন ধরনের রায় ছিল। রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ একই ভূমিকাসহ আবার জিজ্ঞাসা করলেন, "গতকাল তোমাদের ভাই, আজ তোমাদের হাতে বন্দি, কি করা উচিত।" আবু বকর সিদ্দিক (রা.) আবার ঐ একই রায় দিলেন যে, মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। উমর (রা.) একই রায় দিলেন যে, প্রত্যেককে তার নিজের আত্মীয়ের হাতে সোপর্দ করা হোক আর সে তাকে কতল করবে।
আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যেভাবে রায় দিয়েছিলেন সেভাবে ফয়সালা হলো। উমর (রা.) কোনো বোকা মানুষ না। কোনো ধরনের কথার সাথে কি কি জড়িত তিনি জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ভূমিকার মধ্যে একটা নির্দেশনা আছে। 'গতকাল তোমাদের ভাই' বলার মাধ্যমে নরম হওয়া, গত দিনের ভাইয়ের কথা মনে করিয়ে দিলেন। উমর (রা.)-ও ঐভাবে রায় দিলেন।
আমরা জানি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্তুষ্টি আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম। আর সাহাবারা বিভিন্ন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছেন। সাহাবি আবু মুসা আশআরি (রা.) ঘরে কুরআন পড়ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আর উনার কুরআন শরিফ পড়া শুনলেন। সুন্দর পড়ছিলেন আর আল্লাহর রাসূল বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই শুনছিলেন। উনি ঘরে যখন এলেন, তখন বললেন, "তুমি কুরআন শরিফ পড়ছিলে আর আমি শুনছিলাম, খুব সুন্দর লাগছিল।" আবু মুসা আশআরি (রা.) বললেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, যদি জানতাম আপনি শুনছেন, তাহলে আমি আরো সাজিয়ে পড়তাম।" হলো: ইখলাস থাকলো কই? 'আমি আরও ভালো করে পড়তাম'—এই কথার দ্বারা ইখলাস থাকলো কোথায়?
ইখলাস আছে দুই কারণে। একটা হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তুষ্টি, ঐটা ঈমানের সাথে জড়িত। ঐটা অন্য মানুষের সন্তুষ্টির মতো নয়। আরেকটা হলো, অন্য মানুষকেও যদি সন্তুষ্ট করা হয় আল্লাহর ওয়াস্তে, তাহলে সেটাও সওয়াব আছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্তুষ্টি আল্লাহর ওয়াস্তেই করা হয়। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্তুষ্টিতে ইখলাস নষ্ট হয়নি। কিন্তু বদরের বন্দিদের ব্যাপারে উমর (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাশওয়ারাতে কেন সন্তুষ্ট করতে চাইলেন না? এই জায়গায় মাশওয়ারা ঐ ময়দান নয়।
অন্যান্য ব্যাপারে শরিয়তের হুকুম হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পছন্দ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মতো করে করা। এমনকি চিন্তা, ভিতরের চিন্তাও যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মতো হয়। কিন্তু মাশওয়ারাতে নিজের মতো করে করা। আমি যেটাকে পরিষ্কার মনে করছি ঐটাকেই পেশ করতে হবে। এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেটাকে পছন্দ করছেন, ঐটাকে না। ঐটা মাশওয়ারায় না। এমন না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বললেন, আমিও তাই বলি। বরং মাশওয়ারা হলো নিজের মত, নিজের চিন্তাকে পেশ করা।
মাশওয়ারাতে যখন কেউ অন্যের মতো রায় দেয় বা অন্যের কোনো সন্তুষ্টি চায়, ঐটাই মাশওয়ারাকে নষ্ট করে। দীনি মাশওয়ারা আর দলীয় মাশওয়ারা, পার্টির মৌলিক পার্থক্য এটাই। দীনি মাশওয়ারাতে প্রত্যেকে তার নিজের রায় দিবে এবং নিজে যেটাকে পরিষ্কার মনে করবে। আর দলীয় মাশওয়ারা হচ্ছে, তার দলের সাথে সুর মিলানো। আর দলের মধ্যেও দলের যে প্রধান, তার সাথে সুর মিলানো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে বেশি প্রধান আর কে হতে পারে! তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রথম মাশওয়ারাতেই এই কথাকে সাফ করে দিলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রায় বা মতের সাথে না মিলানো। কোনো মাশওয়ারাতে কেউ অন্য একজনের সাথে, বিশেষ করে যার গুরুত্ব আছে, যার কোনো প্রাধান্য আছে এর সাথে যদি তার সুর মিলালো, ঐখানেই সে খেয়ানত করলো। সে মাশওয়ারার সওয়াব তো পাবেই না, বরং আমানতের খাইয়ান হিসেবে পরিগণিত হবে। আর ঐ জায়গায় তখন দলীয় বিবেচনা ঢুকবে। তখন ঐটা দীন আর থাকবে না, ঐটা দলবাজি হয়ে যাবে। বড় পূর্ণ পার্থক্য!
অন্যের সাথে মিলানো যায় খাতির করার জন্য। খাতির করার ব্যাপার—এটা দীনের মধ্যে আছে, কারো সঙ্গে খাতির করা। মাশওয়ারা ঐ ময়দান নয় যেখানে কোনো বড় কারো খাতির করতে হবে। অবশ্য মাশওয়ারাতেও খাতির করা যায় অন্যভাবে। ধরা যাক, একজন দুর্বল, নতুন এসেছে, রায় দিতে সাহস পায় না। তাকে আপন করে নেওয়া, জুড়ে নেওয়া। সে একটা রায় দিলো, যে রায় হাসাহাসি হতে পারে। তো তার মন ভেঙে যাবে, লজ্জা পেয়ে যাবে, তখন তাকে সাহস দেওয়ার জন্য "ভাই, উনি খুব সুন্দর কথা বলেছেন।" আর তার সাথে মিলিয়ে নিজেও তার কথা সমর্থন করলো, ফয়সালাও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু, এটা মৌলিক বিষয় হবে না।
ইজতিমার মধ্যে পূর্ণ সব আলোচনা হলো। নতুন একজন এসে বললো, "একটু তরমুজ খাওয়ালে ভালো হয়।" এমন সময় কথাগুলো বললো যে, ঐসময় পূর্ণ মাশওয়ারা হচ্ছিল। একবার বেচারা লজ্জিত। কিছু কিছু লোক তার দিকে তাকালো। আর সেও বুঝতে পারলো "আমি খুব বড় বোকামি কাজ করেছি।" খুব লজ্জা পেল। সেই সময় কয়েকজন মুরুব্বি বললেন যে, "হ্যাঁ হ্যাঁ, কথাটো ঠিক। অনেক লোকজন এসেছে আর আরো আসবে। খাতির টাতির না করলে তো হয় না!" তো একজন লোক বেচারা যেন লজ্জা না পেয়ে যায়, তাকে সামলাবার জন্য একটু সময় খরচও হলো, তরমুজ খাওয়ার ফয়সালাও করে দিলেন। কিন্তু মৌলিক কোনো বিষয় নয়। আর এটা নতুন লোকের জন্য। পুরনোদের ব্যাপারে এরকম না। জ্যেষ্ঠ কারো সাথে রায় মিলানো, এটা খেয়ানত। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সহিহভাবে মাশওয়ারা করার তৌফিক নসিব করুন। আর এজন্য নিজের দীলকে পাক করা, নিজের জজবাকে পাক করা। কারো সন্তুষ্টি, মাশওয়ারাকে উপলক্ষ না বানানো যে আমি একটা রায় দিয়ে উনার কাছে মান্য হয়ে যাই। বড় গলদ জিনিস হবে যে, মাশওয়ারাকে উপলক্ষ করে আমি অন্যের মান্য হওয়ার চেষ্টা করছি। বড় খেয়ানত হবে। আল্লাহ আমাদের আমানতদারীর সাথে আমল করা তৌফিক নসিব করুন।
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ওয়ায-মাহফিল আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম-নীতি
ওয়ায মাহফিলের উদ্দেশ্য দৈনন্দিন জীবনে মহান আল্লাহ পাকের বিধি-বিধান সঠিকভাবে পালন করার জন্য প্রয়োজনী...
হাদীসের আলোকে মসজিদে ঘুমানোর শরয়ী বিধান
...
কাদিয়ানী থেকে মুসলমানঃ ফিরে আসার গল্প - ০১
...
‘এ দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীনের তলব পয়দা করা’
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন