প্রবন্ধ
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উত্তম চরিত্র ও আখলাক
৪ আগস্ট, ২০২৬
১৬৩
০
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী, সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল এবং সর্বাধিক আল্লাহভীরু।
হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, "নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬২০৩
উম্মুল মুমিনীন সফিয়্যা বিনতে হুয়াই (রাযি.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, "আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়ে উত্তম চরিত্রের কাউকে দেখিনি।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৩৩৭
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীর চরিত্রের প্রশংসা ও বর্ণনা দিয়ে বলেন: ( وَإِنّكَ لَعَلَىَ خُلُقٍ عَظِيمٍ ) "এবং নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।" — সূরা আল-কলম, আয়াত নং: ৪
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.)-কে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন: ( كان خلقه القرآن) "তাঁর চরিত্র ছিল আল-কুরআন।" — সনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৩৫০৪
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.)-এর এই মহান উক্তি আমাদের দিকনির্দেশনা দেয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্র ছিল কুরআন অনুসরণের নাম—কুরআনের আদেশ ও নিষেধের ওপর দৃঢ় থাকা, কুরআনে বর্ণিত প্রশংসিত গুণাবলী অর্জন করা এবং যেসব চরিত্রকে কুরআন নিন্দা করেছে তা থেকে দূরে থাকা।
ইবনে কাছীর (রহ.) তাঁর তাফসীরে বলেছেন: "এর অর্থ হলো, কুরআনের আদেশ-নিষেধ পালন করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্বভাব ও চরিত্রে পরিণত হয়েছিল... কুরআন যা নির্দেশ দিত তিনি তা করতেন, আর যা থেকে নিষেধ করত তা বর্জন করতেন। এটি ছিল সেই মহান চরিত্র, যার ওপর আল্লাহ তাঁকে সৃষ্টি করেছেন—যেমন লজ্জা, উদারতা, বীরত্ব, ক্ষমা, সহনশীলতা এবং সকল সুন্দর গুণ।"
আতা (রহ.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাযি.)-কে বললাম, 'তাওরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যে গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, তা আমাকে জানান।' তিনি বললেন: "হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! কুরআনে যেভাবে তাঁর صفة (গুণ) এসেছে, তাওরাতেও ঠিক সেভাবেই এসেছে—'হে নবী! আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী এবং নিরক্ষরদের রক্ষক হিসেবে। আপনি আমার বান্দা ও রাসূল, আমি আপনার নাম রেখেছি 'মুতাওয়াক্কিল' (আল্লাহর ওপর ভরসাকারী)।
তিনি কর্কশভাষী নন, কঠোরচিত্ত নন, হাটে-বাজারে চিৎকারকারী নন এবং মন্দের জবাব মন্দ দিয়ে দেন না; বরং তিনি ক্ষমা ও মার্জনা করেন। আর আল্লাহ তাঁকে ততক্ষণ পর্যন্ত তুলে নেবেন না, যতক্ষণ না তাঁর মাধ্যমে বক্র জাতিকে সোজা করেন—অর্থাৎ তারা বলবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই), আর এর মাধ্যমে তিনি অন্ধ চোখ, বধির কান এবং আবৃত হৃদয় উন্মুক্ত করবেন।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২১২৫
'হুসনুল খুলুক' বা সুন্দর চরিত্র বলতে কী বোঝায়?
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ( البر حسن الخلق ..) "সৎকর্মই হলো সুন্দর চরিত্র" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫৫৩
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) 'ইমাম নববির চল্লিশ হাদিস' নামক কিতাব-এর ২৭ নম্বর হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
"উত্তম চরিত্র অর্থ হলো আল্লাহর সাথে উত্তম আচরণ এবং আল্লাহর বান্দাদের সাথে উত্তম আচরণ। আল্লাহর সাথে উত্তম আচরণ হলো: তাঁর শরীয়তের বিধানগুলোকে সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের সাথে গ্রহণ করা, অন্তরে কোনো সংকীর্ণতা বা বিরক্তি না রাখা। আল্লাহ যখন সালাত, যাকাত, সিয়াম ইত্যাদির নির্দেশ দেন, তখন প্রফুল্ল চিত্তে তা পালন করা। আর মানুষের সাথে উত্তম আচরণ হলো: কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা, অন্যের দেওয়া কষ্টে ধৈর্য ধরা, হাসিমুখ রাখা ইত্যাদি।"
এত উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছে নিজের চরিত্র আরও সুন্দর করার জন্য দু‘আ করতেন এবং খারাপ চরিত্র থেকে আশ্রয় চাইতেন।
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন: "হে আল্লাহ! আপনি যেমন আমার বাহ্যিক সুরত সুন্দর করেছেন, তেমনি আমার চরিত্রকেও সুন্দর করে দিন।" — মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ৯
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বলে দু‘আ করতেন: "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কোন্দল, নেফাকী (কপটতা) এবং কদর্য চরিত্র থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ১৫৪৬
পরিবার-পরিজনের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উত্তম চরিত্র
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবারের জন্য, নিজের উম্মতের জন্য ছিলেন সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি। মিষ্টি কথা, স্ত্রীদের সম্মান ও মর্যাদার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখায় তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়ে সবচেয়ে উত্তম।" — সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৮৯৫
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিবারের সাথে কৌতুক করতেন, স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন এবং আদরের নাম ধরে ডাকতেন। যেমন আয়েশা (রাযি.)-কে ভালোবেসে (يا عائش ) 'ইয়া আইশ' বা (يا حميراء - লালচে ফর্সা) 'ইয়া হুমায়রা' বলে ডাকতেন। সম্মান জানিয়ে তাঁর বাবার নাম যুক্ত করে (يا ابنة الصديق - হে সিদ্দীকের কন্যা) 'ইয়া ইবনাতাস সিদ্দীক' বলেও ডাকতেন।
তিনি আনসারদের মেয়েদেরকে আয়েশা (রাযি.)-এর কাছে পাঠাতেন, যেন তারা তাঁর সাথে খেলাধুলা করতে পারে। আয়েশা (রাযি.) শরিয়তবিরোধী নয় এমন কোনো কিছু পছন্দ করলে তিনি তা মেনে নিতেন। আয়েশা (রাযি.) কোনো পাত্র থেকে পানি পান করলে তিনি সেই পাত্রটি হাতে নিতেন এবং আয়েশা (রাযি.) যেখানে মুখ রেখে পান করেছিলেন, ঠিক সেই স্থানে নিজের মুখ রেখে পান করতেন। আয়েশা (রাযি.) হাড়যুক্ত মাংসের টুকরো চিবিয়ে খেলে, তিনি সেটি তাঁর হাত থেকে নিয়ে আয়েশা (রাযি.) যেখানে মুখ দিয়ে কেটেছিলেন, ঠিক সেই স্থানে মুখ রেখে খেতেন। তিনি আয়েশা (রাযি.)-এর কোলে হেলান দিতেন এবং তাঁর কোলে মাথা রেখে কুরআন তিলাওয়াত করতেন—এমনকি কখনো কখনো আয়েশা (রাযি.) ঋতুমতী অবস্থায় থাকলেও। আয়েশা (রাযি.) ঋতুমতী থাকা অবস্থায় তিনি তাঁকে নিম্নাঙ্গে ভালো করে কাপড় জড়িয়ে নিতে বলতেন, তারপর তাঁর সান্নিধ্য লাভ করতেন। রোজা রাখা অবস্থাতেও তিনি তাঁকে চুম্বন করতেন। পরিবার-পরিজনের প্রতি তাঁর কোমলতা ও উত্তম চরিত্রের অন্যতম একটি দিক ছিল যে, তিনি আয়েশা (রাযি.)-কে খেলাধুলা করার সুযোগ দিতেন।
আসওয়াদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আয়েশা (রাযি.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে কী করতেন? তিনি বললেন: "তিনি পরিবারের গৃহস্থালী কাজে ব্যস্ত থাকতেন, আর যখন সালাতের সময় হতো, তখন অজু করে সালাতের জন্য বের হয়ে যেতেন।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৭৬
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.) বলেন, "তিনি নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, জুতো মেরামত করতেন এবং সাধারণ পুরুষরা ঘরে যেসব কাজ করে তিনি তা-ই করতেন।" — মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৩৮০০
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "সর্বাধিক সওয়াবের কাজ হলো নিজের পরিবারের পেছনে অর্থ ব্যয় করা।"
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমি এক সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে বের হয়েছিলাম। তখন আমি অল্প বয়স্কা মেয়ে ছিলাম; আমার শরীরে তেমন মাংস লাগেনি এবং আমি মোটা বা ভারীও হইনি। তিনি (নবীজী) লোকজনকে বললেন: 'তোমরা এগিয়ে যাও।' ফলে তারা এগিয়ে গেল। এরপর তিনি আমাকে বললেন: 'এসো, আমি ও তুমি দৌড় প্রতিযোগিতা করি।' (প্রতিযোগিতা হলে) আমি তাঁর চেয়ে এগিয়ে গেলাম এবং জিতে গেলাম। তিনি এ বিষয়ে চুপ থাকলেন। পরবর্তীতে আমি যখন মোটা হয়ে গেলাম এবং আমার শরীরে মাংস লাগল, তখন অন্য এক সফরে আবারও তাঁর সাথে বের হলাম। এবারও তিনি লোকজনকে বললেন: 'তোমরা এগিয়ে যাও।' তারা এগিয়ে গেল। তারপর তিনি আমাকে বললেন: 'এসো, আমি ও তুমি দৌড় প্রতিযোগিতা করি।' এবার তিনি আমার চেয়ে এগিয়ে গেলেন এবং জিতে গেলেন। তখন তিনি হাসতে হাসতে বললেন: 'এই জয় সেই জয়ের বদলে (বরাবর হয়ে গেল)!
— মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৫১১৯
উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যা (রাযি.) যখন উটে উঠতেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাঁটুকে সিঁড়ি বানিয়ে দিতেন যাতে সাফিয়্যা (রাযি.) পা রেখে উটে উঠতে পারেন। — সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৪২১১
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর প্রথম স্ত্রী খাদীজা (রাযি.)-র প্রতি প্রগাঢ় সম্মান ও গভীর ভালোবাসার অন্যতম প্রমাণ হলো—তিনি ছাগল জবেহ করতেন এবং তা (কেটে টুকরো করে) খাদীজা (রাযি.)-র বান্ধবী ও সহচরীদের কাছে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন; আর তা ছিল খাদীজা (রাযি.)-র ওফাতের পর। এমনকি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.) স্বীকার করেছেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই স্নেহপূর্ণ আচরণ আচরণের কারণে তিনি গাইরত বোধ করতেন।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬০০৪
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ন্যায়বিচার
আল্লাহর শরীয়ত বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ—তা নিজের আপনজনদের ওপর হলেও।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও।" — সূরা আন-নিসা, আয়াত নং: ১৩৫
"নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের মাঝে ন্যায়বিচার ও সমতা বজায় রাখতেন এবং তাঁদের কারও কারও মাঝে ঈর্ষাবোধ দেখা দিলে তা ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে সহ্য করতেন; যেমন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.) বেশ ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন।
হযরত উম্মে সালমা (রাযি.) থেকে বর্ণিত—তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের জন্য একটি পাত্রে করে কিছু খাবার পাঠালেন। এমন সময় আয়েশা (রাযি.) একটি ভারি পাথর হাতে নিয়ে এলেন এবং তা দিয়ে পাত্রটি ভেঙে দু'টুকরো করে ফেললেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভেঙে যাওয়া পাত্রের টুকরো দুটিকে একত্র করলেন এবং সাহাবীদের বললেন: (‘তোমরা খাও, তোমাদের মা ঈর্ষান্বিত হয়েছেন’—কথাটি তিনি দু'বার বললেন।) অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা (রাযি.)-এর ভালো পাত্রটি নিয়ে উম্মে সালমা (রা.)-এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন এবং উম্মে সালমা (রাযি.)-এর ভাঙা পাত্রটি আয়েশা (রাযি.)-কে রেখে দিলেন।" — সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং: ৩৯৫৬
মাখজুমী গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরি করলে যখন সুপারিশ করা হয়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট ঘোষণা দেন: "সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাতও কেটে দিতাম।"
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা বলার ধরণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কথা বলতেন, তখন অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলতেন; কোনো গণনাকারী গণনা করতে চাইলে তা গুনে রাখতে পারত। তাঁর কথা এত দ্রুত হতো না যে তা মনে রাখা যাবে না, আবার একেবারে থেমে থেমেও হতো না যে শ্রোতা তা বুঝতে পারবে না। বরং এ ক্ষেত্রে তাঁর নীতি ও পদ্ধতি ছিল সর্বাপেক্ষা নিখুঁত। যেমনটি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.) বর্ণনা করে বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের মতো এভাবে অনবরত দ্রুত কথা বলতেন না; বরং তিনি এমন স্পষ্ট ও পৃথক পৃথক বাক্যে কথা বলতেন যে, তাঁর পাশে উপবিষ্ট ব্যক্তি তা অনায়াসে মুখস্থ/সংরক্ষণ করে নিতে পারত। — সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৬৩৯
আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অহেতুক বা অনর্থক বিষয়ে কথা বলতেন না এবং কেবল সেই বিষয়েই কথা বলতেন যেটিতে তিনি আল্লাহর সওয়াবের আশা করতেন। আর তিনি কোনো কিছু অপছন্দ করলে তাঁর চেহারা মোবারক দেখেই তা চেনা যেত।"
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের সাথে আচরণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নাতনীকে (মেয়ে জয়নবের কন্যা উমামা) কোলে নিয়ে নামাযের ইমামতি করতেন; যখন দাঁড়াতেন তখন তাকে কোলে তুলে নিতেন, আর যখন সেজদায় যেতেন তখন তাকে নিচে নামিয়ে রাখতেন। আর একবার যখন তিনি মানুষকে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর নাতী হাসান ও হুসাইন (তাঁর মেয়ে ফাতিমার দুই পুত্র) হেলেদুলে হেঁটে হেঁটে আসছিল এবং হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বর থেকে নিচে নেমে এলেন এবং তাদের দু'জনকে কোলে তুলে নিয়ে এসে তাঁর সামনে বসালেন। তারপর বললেন: ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন: (আর জেনে রেখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি হলো পরীক্ষা স্বরূপ, আর নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে রয়েছে মহা পুরস্কার) - সূরা আল-আনফাল, আয়াত নং: ২৮। আমি এই দুটি ছোট শিশুকে হেঁটে আসতে ও হোঁচট খেতে দেখে নিজেকে সামলাতে পারলাম না, অবশেষে আমার খুতবা থামিয়ে তাদের দু'জনকে কোলে তুলে নিলাম।’
ছোটদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চরিত্র ছিল এমন যে, তিনি যখন শিশুদের পাশ দিয়ে যেতেন, ছোট হওয়া সত্ত্বেও তাদের সালাম দিতেন। তিনি সালাত আদায় করার সময় নিজের মেয়েকে সামনে কোলে তুলে রাখতেন, অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে জয়নবের কন্যা (নাতনী উমামা)-কে নামাযরত অবস্থায় সামনে তুলে রাখতেন। আর তিনি খুতবা ছেড়ে নিচে নেমে আসতেন হাসান ও হুসাইনকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য এবং তাদের নিজের সামনে এনে বসাতেন। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৭৭৪
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আচরণ সেবকদের সাথে
মহান বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে সাথে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নম্র ও দয়ালু। তিনি অশ্লীলভাষী ছিলেন না, গালিগালাজকারী বা অশোভন আচরণকারীও ছিলেন না, বাজারে উচ্চশব্দে চিৎকারকারী বা হট্টগোলকারীও ছিলেন না; আর তিনি মন্দের জবাবে মন্দ দিয়ে প্রতিদান দিতেন না, বরং ক্ষমা করতেন ও মার্জনা করতেন।
হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমি টানা ১০ বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে কখনো 'উফ' (বিরক্তি সূচক কোনো শব্দ) পর্যন্ত বলেননি। আর আমি যা করেছি সে সম্পর্কে কখনো বলেননি: 'তুমি এটা কেন করলে?' অথবা (যা করি নাই সে সম্পর্কে বলেননি): 'তুমি কেন এটা করলে না? —সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬০৩৮
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নিজ হাতে তাঁর কোনো সেবক বা কোনো নারীকে প্রহার করেননি, একমাত্র আল্লাহর পথে জিহাদ করা ছাড়া।"
অন্য বর্ণনায় এসেছে: "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে কখনো কোনো কিছুকে প্রহার করেননি—না কোনো নারীকে, না কোনো সেবককে; একমাত্র আল্লাহর পথে জিহাদ করা ছাড়া।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৩২৮
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যখন কোনো দু’টি কাজের মধ্যে ইখতিয়ার দেয়া হত, তখন তিনি দুটির মধ্যে অপেক্ষাকৃত সহজটি গ্রহণ করতেন যদি তা গুনাহের কাজ না হতো। আর যদি তা গুনাহের কাজ হতো, তা হলে তিনি তা থেকে সবার চাইতে দূরে সরে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন বিষয়ে নিজের ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ নিতেন না। অবশ্য কেউ আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে, তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার প্রতিশোধ নিতেন।" সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬১২৬
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দয়া ও রহমত
আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।" সূরা আল-আনবিয়া, আয়াত নং: ১০৭
আর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হলো: "আপনি মুশরিকদের বিরুদ্ধে লানত করুন", তখনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: "আমাকে লানতকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি, বরং আমাকে রহমত হিসেবে পাঠানো হয়েছে।"সহীহ মুসলিম, হাদীসনং: ২৫৯৯
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "হে আল্লাহ! আমি তো কেবলই একজন মানুষ। সুতরাং আমি যদি কোনো মুসলমানকে গালি দিয়ে থাকি বা তার ওপর লানত করে থাকি, তবে আপনি সেটাকে তার জন্য পবিত্রতা এবং প্রতিদানের কারণ বানিয়ে দিন।"
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোয়াগুলোর মধ্যে এটিও ছিল: "হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি আমার উম্মতের যেকোনো দায়িত্বভার গ্রহণ করল, অতঃপর সে তাদের ওপর কঠোরতা করল, তবে আপনিও তার ওপর কঠোরতা করুন; আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কোনো দায়িত্বভার গ্রহণ করল, অতঃপর সে তাদের সাথে কোমল আচরণ করল, তবে আপনিও তার সাথে কোমল আচরণ করুন।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৮২৮
আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করুন আল্লাহ তাওয়াক্কুল কারীদের ভালবাসেন।" সূরা আল-ইমরান, আয়াত নং: ১৫৯
এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দয়ার ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন: "রহমশীলদের প্রতি রহমানও রহম করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি রহম করবে তাহলে আকাশবাসী তোমাদের উপর রহম করবেন। রেহেম হল রহমান শব্দ থেকে উদগত। যে ব্যক্তি রেহেমের বন্ধন মিলাবে আল্লাহ তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন আর যে ব্যক্তি রেহেমের বন্ধন ছিন্ন করবে আল্লাহও তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন।" সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ১৯২৪
এবং জান্নাতীদের সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়ে বলেছেন: "জান্নাতী হবেন তিন ধরনের লোক—(এক প্রকার মানুষ) তারা, যারা রাষ্ট্রীয় কর্ণধার, ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী এবং নেক কাজের তাওফীক লাভে ধন্য লোক। (দ্বিতীয়) তারা ঐ সমস্ত মানুষ, যারা দয়ালু এবং আত্মীয়-স্বজন ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি কোমলচিত্ত। (তৃতীয়) ঐ সমস্ত মানুষ, যারা পুত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী, যাচঞাকারী নয় এবং সন্তানাদি সম্পন্ন লোক।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৮৬৫
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ক্ষমা ও সহনশীলতা
হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একদিন তিনি আমাকে একটি প্রয়োজনে পাঠালেন। আমি (কৌতুকবশত বা শিশুসুলভ ছলে) বললাম: 'আল্লাহর কসম, আমি যাব না।' অথচ আমার মনে ইচ্ছা ছিল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে যে কাজের আদেশ করেছেন আমি তা করতে অবশ্যই যাব। এরপর আমি বের হলাম এবং বাজারে খেলাধুলা রত কিছু বালকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেছন থেকে আমার ঘাড়ে ধরে ফেললেন। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তিনি হাসছেন। অতঃপর তিনি বললেন: 'হে আনাস! আমি তোমাকে যেখানে যেতে বলেছিলাম, তুমি কি সেখানে গিয়েছ?' আমি বললাম: 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এখনই যাচ্ছি।' তারপর আমি চলে গেলাম।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৩০৯
হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মসজিদে বসা ছিলাম, এমন সময় এক গ্রাম্য বেদুইন এলো এবং সে মসজিদে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ তাকে ধমক দিয়ে বলতে লাগলেন: 'থামো, থামো!' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তার পেশাব বন্ধ করিও না (বা তাকে মাঝপথে বাধা দিও না), তাকে ছেড়ে দাও।' ফলে সাহাবীগণ তাকে ছেড়ে দিলেন এবং সে পেশাব শেষ করল। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে বললেন: 'এই মসজিদগুলো পেশাব কিংবা নোংরা-আবর্জনা ফেলার জন্য উপযোগী নয়; এগুলো তো কেবল আল্লাহর জিকির, নামায এবং কুরআন তিলাওয়াতের জন্য।' বর্ণনাকারী বলেন: অতঃপর তিনি উপস্থিত লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তিকে আদেশ দিলেন, সে এক বালতি পানি নিয়ে এসে পেশাবের ওপর ঢেলে দিল।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৮৫
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নম্রতা ও বিনয়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের দাওয়াত কবুল করতেন—চাই সে স্বাধীন হোক বা দাস, ধনী হোক বা গরীব। আর তিনি মদীনার দূরপ্রান্তে গিয়েও অসুস্থ ব্যক্তিদের দেখতে যেতেন (সেবা করতেন) এবং কোনো ব্যক্তি ওজর পেশ করলে তার ওজর গ্রহণ করতেন।
আর তিনি ছিলেন বিনয়ীদের সর্দার। তিনি আল্লাহ তাআলার এই বাণীকে নিজ চরিত্রে ধারণ করতেন ও মেনে চলতেন: "ওই পরকালীন নিবাস তো আমি সেই সকল লোকের জন্যই নির্ধারণ করব, যারা পৃথিবীতে বড়ত্ব দেখাতে ও ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায় না। শেষ পরিণাম তো মুত্তাকীদেরই অনুকূলে থাকবে।" সূরা আল-কাসাস, আয়াত নং: ৮৩
ফলে তিনি অহংকার থেকে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দূরে ছিলেন। আর তা হবে না-ই বা কেন, যখন তিনি নিজেই বলেছেন: "খ্রিস্টানরা যেভাবে মারইয়ামের পুত্র (ঈসা)-এর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছিল, তোমরা আমার প্রশংসায় সেরূপ বাড়াবাড়ি করো না। আমি তো কেবলই একজন বান্দা; সুতরাং তোমরা (আমার সম্পর্কে) বলো: আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।" সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩৪৪৫
আর তা কেনইবা হবে না , যখন তিনি বলতেন: "একজন বান্দা যেভাবে আহার করে আমি সেভাবেই আহার করি এবং একজন বান্দা যেভাবে বসে সেভাবেই বসি।" মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং: ৫৮৩৬
আর তা কেনইবা হবে না , যখন তিনি (আমার পিতা-মাতা তাঁর ওপর উৎসর্গ হোক!) বলেছেন: "আমাকে যদি পশুর সামান্য একটি পায়ের খুরও উপহার হিসেবে দেয়, তবে আমি তা গ্রহণ করব; আর যদি আমাকে তা খাওয়ার জন্যও দাওয়াত দেয়, তাহলেও আমি সেই দাওয়াতে সাড়া দিব।" সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৫১৭৮
আর তিনি অহংকার থেকে কেনইবা দূরে থাকবেন না, যখন তিনি অহংকার সম্পর্কে তীব্র সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন: "যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৯১
আর তাঁর বিনয় ও নম্রতার একটি বড় নিদর্শন হলো—তিনি দাওয়াত কবুল করতেন, তা যদি সাধারণ যবের রুটিরও হতো; এবং তিনি উপহারও গ্রহণ করতেন।
হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যদি যবের রুটি এবং পুরনো ও গন্ধ হয়ে যাওয়া চর্বি খাওয়ার জন্যও দাওয়াত দেওয়া হতো, তাহলেও তিনি তা গ্রহণ করতেন।" শামাঈলে তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৩৩
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাস্যরস ও কৌতুক
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম সুন্নাত ছিল বৃদ্ধা নারীদের সাথে কৌতুক করা। একবার এক বৃদ্ধা নারী এসে তাঁকে বলল: "হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন যেন তিনি আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।" তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: "হে অমুকের মা! জান্নাতে তো কোনো বৃদ্ধা নারী প্রবেশ করবে না।" এ কথা শুনে বৃদ্ধা নারীটি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যেতে লাগল। তখন নবীজি বললেন: "তাকে জানিয়ে দাও যে, সে বৃদ্ধা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে না (বরং যুবতী হয়ে প্রবেশ করবে)। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: 'আমি জান্নাতী নারীদের নতুনভাবে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তাদেরকে বানিয়েছি কুমারী, সোহাগিনী ও সমবয়সী।'
সূরা আল-ওয়াকিয়াহ, আয়াত নং: ৩৫–৩৭; শামাঈলে তিরমিযী, হাদীস নং: ২৪০
আর তাঁর হাসির অধিকাংশ রূপই ছিল মুচকি হাসি, বরং তাঁর পুরো হাসিটুকুই ছিল কেবল মৃদু হাসি (যাতে উচ্চ শব্দ বা হট্টগোল থাকত না)। আর তাঁর সর্বোচ্চ হাসির পরিধি ছিল এমন—যাতে তাঁর মাড়ির দাঁত মোবারক ভেসে উঠত।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দানশীলতা
সাহল ইবনে সা’দ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে একখানা চাদর নিয়ে আসলেন। এরপর সেই মহিলা আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে এটি পরিধানের জন্য দিলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাদরখানি এমনভাবে গ্রহণ করলেন, যেন তার এটির দরকার ছিল। এরপর তিনি এটি পরিধান করলেন। এরপর সাহাবীদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি সেটি তার দেহে দেখে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা কতই না সুন্দর! আপনি এটি আমাকে দিয়ে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ (দিয়ে দেব)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে চলে গেলেন, অন্যান্য সাহাবীরা তাকে দোষারোপ করে বললেনঃ তুমি ভাল কাজ করনি। যখন তুমি দেখলে যে, তিনি চাদরখানা এমনভাবে গ্রহণ করেছেন যেন এটি তার প্রয়োজন ছিল। এরপরও তুমি সেটা চেয়ে বসলে, অথচ তুমি অবশ্যই জান যে, তার কাছে যখনই কোন জিনিস চাওয়া হয়, তখন তিনি কাউকে কখনো বিমুখ করেন না। তখন সেই ব্যক্তি বললঃ যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি পরিধান করেছেন, তখন তার বরকত হাসিল করার আশায়ই আমি একাজ করেছি, যেন আমি এ চাদরটাকে আমার কাফন বানাতে পারি। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬০৩৬
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ধৈর্য
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ব্যক্তিগত হকের ক্ষেত্রে যেকোনো কষ্ট ও অন্যায়ের ওপর ধৈর্য ধারণ করতেন। কিন্তু বিষয় যদি হতো মহান আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে, তখন তিনি আল্লাহর আদেশের অনুসরণে দৃঢ়তা ও কঠোরতা প্রদর্শন করতেন। আর কাফের ও আল্লাহর সীমানা লঙ্ঘনকারীদের প্রতি এই কঠোরতা ছিল তাদের অন্যায় থেকে বিরত রাখার সর্বোত্তম মাধ্যম এবং এর মধ্যেই শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল। তাঁর সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং আপসের মধ্যে একে অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র।" সূরা আল-ফাতহ, আয়াত নং: ২৯
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধৈর্যের অন্যতম নিদর্শন হলো—যখন কাফেরদের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর নির্যাতনের মাত্রা প্রচণ্ড বৃদ্ধি পেল (তায়েফের ঘটনার পর), তখন পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তাঁর কাছে এসে বললেন: "হে মুহাম্মদ! আপনি যদি চান, তবে আমি এদের ওপর 'আখশাবাইন' (মক্কার দুই পাহাড়)-কে ধসে মিলিয়ে দিয়ে এদের পিষে ফেলি।" তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: "না, বরং আমি আশা করি আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন লোক বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।" সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩২৩১
ইবনে সাদ (রহ.) আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: "আমি (নবীজির ছোট ছেলে) ইব্রাহিমকে দেখলাম, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে অন্তিম শ্বাস গ্রহণ করছিল (মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল)। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উভয় চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। অতঃপর তিনি বললেন: 'চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে এবং অন্তর শোকে ব্যাকুল হচ্ছে, তবে আমরা মুখে এমন কিছুই বলব না যাতে আমাদের প্রতিপালক অসন্তুষ্ট হন। হে ইব্রাহিম! আল্লাহর কসম, তোমার বিচ্ছেদে আমরা সত্যিই অত্যন্ত ব্যথিত ও শোকাহত!"
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৩১৫
আল্লাহ তাআলা অধমসহ সমগ্র উম্মাহকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম চরিত্র, আখলাক ও আদর্শ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঈমানের মেহনত : পরিচয় ও পদ্ধতি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর.. মুহতারাম হাযেরীন! আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের জন্য চারট...
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
ইলমে দীন ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ভাবনা
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعم...
ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম : বিভ্রান্তি নিরসনে মুসলমানদের যা জানা দরকার
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন