প্রবন্ধ
প্রশান্ত হৃদয় চাই!
২১ অক্টোবর, ২০২৬
১৫৫৯
০
প্রশান্ত হৃদয়ের প্রত্যাশা প্রতিটি মানুষের। সকলেই চায় একটি সুন্দর ও প্রফুল্ল মন। কেননা মানুষের জীবনের সুখ-শান্তি আর সফলতা নির্ভর করে এই প্রশান্ত হৃদয়ের উপর। কিন্তু বর্তমান সমাজের বাহ্যিক অবস্থা এর বিপরীত। মানুষের মনে শান্তি নেই। হৃদয়ে প্রশান্তি নেই। শান্তি ও প্রশান্তি অনেকটা সোনার হরিণ। মানসিক অস্থিরতা, হতাশা, পেরেশানি কারো পিছু ছাড়ছে না। আবার অন্যদিকে এই অশান্ত ও অস্থির হৃদয় নিয়ে বাঁচাও হয়ে যাচ্ছে কষ্টকর। তাই মানুষ কোনো উপায় না পেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে দিগ্বিদিক। খুঁজে বেড়াচ্ছে অসংখ্য পথ ও পদ্ধতি। বিনিময়ে শুধু একটি প্রশান্ত হৃদয় চাই। আর সকলে যেন এখানেই হোঁচট খাচ্ছে। সঠিক পথ ছেড়ে আঁকাবাঁকা পথটাকেই বেছে নিচ্ছে। বিশুদ্ধতার পথ ছেড়ে অশুদ্ধতাকেই প্রধান্য দিচ্ছে।
কিছু মানুষ আপন প্রশান্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে নেশার মাঝে। ভুলে থাকতে চাচ্ছে সকল ব্যথা-বেদনা আর দুঃখগুলো। আর এভাবে সুস্থ জীবনটাকে নিজ হাতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মরণ-পথে। প্রশান্তির পরিবর্তে ঘরে ফিরছে অশান্তি নিয়ে। ঘরটাকে অশান্তির আগুনে জ্বালাচ্ছে।
অবৈধ সম্পদ উর্পাজনেও অনেকে শান্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে। জুয়া, ক্যাসিনো, অবৈধ ব্যবসা আর দুর্নীতির মাধ্যমে টাকার পাহাড় গড়ে তুলছে। শুধু একটু শান্তি চাই। একটু হতাশামুক্ত আরামের জীবন চাই। কিন্তু সেই টাকাই তার আরও অনেক অশান্তির কারণ হচ্ছে।
অবসরপ্রাপ্ত কিছু মানুষ, যারা ঘরের কোনো কাজে মন বসাতে পারেন না, আবার বাড়ির সকলের অসৌজন্যমূলক আচরণ ও তিক্ত কথায় জর্জরিত, তিনি একটু প্রশান্তি চান। উপায়অন্ত না পেয়ে যোগ দেন বিভিন্ন মেথডে। কেউ বা তৈরি করেন বিভিন্ন সংঘ। যাদের অনেকেই ভোরে রাজধানীর বিভিন্ন মাঠ ও ক্লাবে জমা হন। সংসদের কাছেও পাওয়া যায় অনেককে। তারা কিছুক্ষণ শরীর চর্চা করেন। কিছুক্ষণ সকলে মিলে আওয়াজ করে হাসেন। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে আকাশে ডানা মেলে ওড়েন। আরো অনেক অদ্ভুত কাজ তারা করেন, যা দেখে তাদেরকে মানসিক প্রতিবন্ধী মনে হয়। এসবকিছু করার একটাই লক্ষ্য, একটাই উদ্দেশ্য, মনের শান্তি চাই, প্রশান্ত হৃদয় চাই।
কেউ বা ঘুরে বেড়াচ্ছে মাযারে মাযারে। দরবারে দরবারে। মসজিদে সিজদা না করে সিজদা ঠুকছে বাবার পায়ে। শুধু একটু প্রশান্তি চাই। দূরে থাকতে চাই একটু দুনিয়াবী সমস্যা আর হতাশা-দুর্দশা থেকে। দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে।
এজাতীয় অসংখ্য পথ ও মত রয়েছে প্রশান্তিকামী মানুষের, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- শান্তি কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। প্রশান্তি কারো হাতে ধরা দিচ্ছে না। তাহলে কোন্ পথ ও পন্থা দিতে পারে হৃদয়ের প্রশান্তি? একজন মানুষ হতে পারে প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী?
হাঁ! একটি পথ রয়েছে; এবং এটিই একমাত্র পথ। হৃদয় যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর বাতলানো পথ। হৃদয়ের প্রশান্তি যাঁর সৃষ্টি তাঁর দেখানো পথ। হৃদয়ের স্রষ্টার সাথে হৃদয়ের সংযোগ স্থাপনের পথ। সিরাতে মুসতাকীম। সিরাতল্লাযীনা আন‘আমতা ‘আলাইহিম।
মুমিন তার ঈমানের কারণে সহজেই সন্ধান পেয়ে যায় এ পথের। সহজেই পারে এই গৌরব অর্জন করতে। মুমিন সহজেই হতে পারে প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী। হৃদয় যেহেতু আল্লাহ তাআলার দান, কলব যেহেতু দিয়েছেন আল্লাহ মহান, তাই এর যে কোনো সমস্যার সমাধান পেতে হলে সকলকে খোদাপ্রদত্ত ব্যবস্থাপনাই গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া আর কোনো পথ ও পদ্ধতি মানুষকে সুস্থ ও সুন্দর হৃদয় উপহার দিতে পারে না। হৃদয়ে প্রশান্তি দিতে পারে না। হতাশামুক্ত সুন্দর জীবন দিতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রশান্ত হৃদয় প্রাপ্তির ব্যবস্থাপনা দিয়েছেন ‘সূরা রা‘দ’-এর ২৮ নং আয়াতে। তিনি বলেন-
اَلَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ تَطْمَىِٕنُّ قُلُوْبُهُمْ بِذِكْرِ اللهِ، اَلَا بِذِكْرِ اللهِ تَطْمَىِٕنُّ الْقُلُوْبُ
এরা সেইসব লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের অন্তর আল্লাহ্র যিকিরে প্রশান্তি লাভ করে। স্মরণ রেখ, আল্লাহ্র যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২৮
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন যে, ঈমান ও আমলে সালেহ-এর সাথে সাথে ‘যিকরুল্লাহ’ হতে পারে একজন মানুষের প্রশান্ত হৃদয় লাভের প্রধান মাধ্যম। এখানে এই যিকির দ্বারা ব্যাপক যিকির বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ একজন মানুষ যিকিরের যে কোনো শাখার এবং যিকিরের যে কোনো ধরনের নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে হৃদয়ে প্রশান্তি পেতে পারে। আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের স্বীকারের মাধ্যমে এবং তাঁর মনোনীত দ্বীনের পূর্ণ অনুসরণে একজন মানুষ হতে পারে প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী।
হাদীস ও সুন্নাহ্য় বর্ণিত বিভিন্ন যিকির এবং বিশেষত নির্দিষ্ট সময় ও কাজের জন্য রাসূলের শেখানো যিকির করাও এর অন্তর্ভুক্ত। আর কুরআন তিলাওয়াত তো ‘আফযালুয যিক্র’-শ্রেষ্ঠ যিকির। সুতরাং এর মাধ্যমেও মনে প্রশান্তি লাভ হবে। আল্লাহ তাআলার নিআমত ও করুণার গুণগান গাওয়াও যিকিরের একটি মাধ্যম। এমনিভাবে নামায আল্লাহ তাআলার যিকির। আল্লাহ বলেন-
وَاَقِمِ الصَّلٰوۃَ لِذِکۡرِیۡ
আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম কর। -সূরা ত্ব-হা (২০) : ১৪
তাইতো রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো সমস্যা বা পেরেশানির সম্মুখীন হলে নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। হাদীসে এসেছে, হুযাইফা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো কারণে পেরেশান হতেন তখন দ্রুত নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩২৯৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩১৯
সাহাবী, তাবেয়ী ও আসলাফের জীবনীতে এমন অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়- বিভিন্ন কঠিন মুহূর্ত ও কষ্টের সময়গুলোকে তাঁরা আল্লাহ তাআলার যিকির, বিশেষত তিলাওয়াতে কুরআন ও নামাযের মাধ্যমে কাটিয়ে দিয়েছেন এবং এর শক্তিতেই শত কষ্ট ও দুঃখ হাসিমুখে বরণ করেছেন।
হযরত ইউনুস আ. যখন তিন তিনটি অন্ধকারে নিমজ্জিত; রাতের অন্ধকার, সমুদ্র তলদেশের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকার। বাঁচার কোনো পথ যখন তিনি দেখছিলেন না, তখন একমাত্র আল্লাহ্র যিকির ও স্মরণকেই তিনি নিজের প্রশান্তির মাধ্যম বানিয়েছেন এবং বলতে শুরু করেছেন- ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্তি কুনতু মিনায যলিমীন’। হযরত মূসা আ. বনী ইসরাঈলকে নিয়ে যখন চলে যাচ্ছিলেন তখন কঠিন এক অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন। পেছনে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত ফেরাউনের বাহিনী, সামনে সাগর। বাঁচার কোনো উপায় নেই। কিন্তু মূসা আ. এই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করলেন। বললেন, আমার পালনকর্তা আমায় পথ দেখাবেন। ঠিক তাই হল। তিনি প্রশান্ত মনে সকলকে নিয়ে পার হয়ে গেলেন। আর ফেরাউন তার দলবল নিয়ে নিমজ্জিত হল সাগরে।
আর একটি ঘটনা, যা সকলেরই জানা। মক্কার কুরাইশরা সকলেই ক্ষিপ্ত আমাদের নবীজীর উপর। এর মাঝে রাসূল পার করেছেন এক কঠিন অধ্যায়। হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন। সাথে প্রিয় সাহাবী আবু বকর রা.। পথিমধ্যে আশ্রয় নিলেন এক গুহায়। মক্কার কুরাইশরা খুঁজে পেলেই নির্ঘাত হত্যা। কী কঠিন ও ভয়ংকর এক মূহর্ত, যা কল্পনা করা যায় না। যখন সেই কাফেররা একেবারে গুহার নিকটে তখন আবু বকর রা. নবীজীকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা তো কাছে চলে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই মুহূর্তে শান্ত মনে ও প্রশান্ত চিত্তে বললেন-
لَا تَحْزَنْ اِنَّ اللهَ مَعَنَا
‘ভয় করো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’ -সূরা তাওবা (৯) : ৪১
ইবনে তাইমিয়াহ রাহ. অধিক পরিমাণে যিকিরের কারণে এতটাই প্রশান্ত হদয়ের অধিকারী ছিলেন যে, তিনি জেলে থেকে বলতেন, ‘আমার শত্রুরা আমার সাথে কী আর করবে? যদি তারা আমাকে মৃত্যুদ- দেয় তাহলে আমি শহীদ। আর যদি আমাকে বন্দী করে রাখে তাহলে আমি লেখালেখি ও ইবাদতের জন্য নিরিবিলি সময় পাবো। আর যদি দেশান্তরিত করে তাহলে দেশ ভ্রমণের সুযোগ পাবো।’
এভাবে অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে বুঝে আসে যে, যিকরুল্লাহর মাধ্যমে একজন মানুষ প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী হতে পারে। অন্য কোনো মাধ্যম বা মেথডের প্রয়োজন নেই। কারণ, যিকরুল্লাহ ছাড়া শত চেষ্টা-প্রচেষ্টা দ্বারা কোনো লাভ আশা করা যায় না। আখেরাতের সফলতা ও সুখ তো নয়ই, পার্থিব সুখ, সফলতা ও শান্তিও এভাবে মিলবে না।
অন্যদিকে মানুষের হৃদয়টাকে অস্থির ও অশান্ত করে তোলে ইবলীস শয়তান। বিভিন্ন কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনার আশ্রয় নিয়ে সে মানুষকে দিগভ্রান্ত ও পেরেশান করে তোলে। আর এই কুমন্ত্রণা দানকারী শয়তান থেকে বাঁচার উপায়ও হল যিকরুল্লাহ। সূরা নাসের তাফসীরে ইবনে আব্বাস রা. এমনটিই বলেছেন। তিনি বলেন, ‘শয়তান মানুষের কলব ও হৃদয়ের উপর ওঁৎ পেতে বসে থাকে। যখন মানুষ গাফেল ও আল্লাহবিমুখ হয় তখন সে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দেয়। আর যখন আল্লাহর যিকির করে তখন সে পলায়ন করে।’ (তাফসীরে ইবনে আব্বাস রা., সূরা নাস, আয়াত ৫ দ্রষ্টব্য)
যিকির বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন সময়ের রয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট আর কিছু আছে সময় ও স্থানের বন্ধনমুক্ত, যেকোনো সময় করা যায়। সকাল-সন্ধ্যায় রয়েছে নির্দিষ্ট যিকির। প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর রয়েছে নির্দিষ্ট যিকির। এ যিকিরগুলো আমরা নিয়মিত করতে পারি। এছাড়া অন্যান্য যিকির আমরা যেকোনো সময় করতে পারি। আর এর মাধ্যমে আমরা অসংখ্য ফযীলতের সাথে সাথে লাভ করতে পারি একটি প্রশান্ত হৃদয়। তাই চলুন আমরা যিকরুল্লাহ্র অভ্যাস গড়ে তুলি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কবুল করুন। তাওফীক দান করুন- আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইসলামই পৃথিবীর ভবিষ্যত
...
তাহাফফুযে খতমে নবুওত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়
الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه،ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا،...
মূর্তি ও ভাস্কর্যপ্রীতি : ইসলাম কী বলে?
ইসলামের যে বিষয়গুলোর নিষিদ্ধতা অকাট্য ও মুতাওয়াতিরভাবে প্রমাণিত তার মধ্যে প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ ...
শরীয়তের উপর অবিচলতা
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন