প্রত্যাশা-হিসাব ও তাওয়াক্কুল-বরকত
প্রত্যাশা-হিসাব ও তাওয়াক্কুল-বরকত
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।"
وَاللَّهُ يَرْزُقُ مَن يَشَاء بِغَيْرِ حِسَابٍ
"আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিজিক দান করেন।"
নَحْنُ أُمَّةٌ أُمِّيَّةٌ لَا نَقْرَأُ وَلَا نَحْسبُ
"আমরা উম্মি উম্মত, আমরা হিসাব করি না।" (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস)
দুনিয়াদারি ও দীনদারির মূল পার্থক্য
আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মানুষ পাঠিয়েছেন। মানুষ তার জীবনকে বিভিন্ন নীতি ও বুনিয়াদের উপর গড়ে তুলেছে। মোটামুটিভাবে পৃথিবীর সব মানুষের জীবনকে দুইভাগে ভাগ করা যায়:
১. **দুনিয়াবি নীতির উপর জীবন** (দুনিয়াদারি)
২. **দীনি বুনিয়াদের উপর জীবন** (দীনদারি)
আমরা চলতি ভাষায় কাউকে বলি দুনিয়াদার, আর কাউকে বলি দীনদার। আল্লাহ তায়ালা নবীদের পাঠিয়েছেন দুনিয়াদার মানুষকে দীনদার বানাতে, দুনিয়াদারির দিকে ডাকতে নয়।
রোগ ও স্বাস্থ্যের দৃষ্টান্ত
যেমন চিকিৎসায়: একজন রোগী যদি জানে রোগটা কী এবং ভালো স্বাস্থ্য কী, তাহলে তার জন্য চিকিৎসা সহজ হবে। কিন্তু যদি রোগ ও স্বাস্থ্যের ধারণাই উল্টো-পাল্টা হয়, তাহলে চিকিৎসা মুশকিল।
মনে করুন, একজন রোগীর শরীরে পানি জমে গেছে, শরীর ফুলে গেছে। কিন্তু সে অবুঝ হওয়ার কারণে মনে করল তার স্বাস্থ্য খুব ভালো হয়েছে। চিকিৎসার পর যখন পানি কমল, শরীর স্বাভাবিক হলো, তখন সে ভাবতে লাগল বুঝি তার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। এরকম উল্টো ধারণা নিয়ে চিকিৎসা তো মুশকিল।
ঠিক তেমনি আল্লাহ তায়ালা নবীদের পাঠিয়েছেন দীনের দিকে দাওয়াত দিতে, দুনিয়াদারি জীবন ছেড়ে দীনদারির জীবনের দিকে আনতে। এজন্য দুনিয়াদারি ও দীনদারির বুনিয়াদ কী তা ভালো করে বোঝা দরকার।
দীনদারি সম্পর্কে ভুল ধারণা
অনেক সময় আমাদের ধারণা পরিষ্কার নয়। সাধারণ ধারণা হলো: মিথ্যা বলা ছেড়ে দেওয়া, হারাম উপার্জন ছেড়ে দেওয়া, অন্যের জমি দখল না করা—এগুলোই দীনদারি। এটা একেবারে ভুল নয়, তবে **মারাত্মকভাবে অসম্পূর্ণ**।
এমন মানুষ পাওয়া যায় যারা দীন থেকে দূরে থাকলেও কাউকে ঠকায় না, মিথ্যা বলে না, অন্যায় করে না। কিন্তু এসব খারাপ কাজ না করলেই কি সে দীনদার হয়ে যায়? না।
এটা ঠিক যেমন একজন হৃদরোগীর ম্যালেরিয়া নেই, টাইফয়েড নেই, টিবি নেই—এসব রোগ না থাকা মানেই তো স্বাস্থ্যবান হওয়া প্রমাণ করে না। তেমনি মিথ্যা না বলা, চুরি-ডাকাতি না করা মানেই দীনদার হওয়া প্রমাণ হয় না।
জাহান্নামে বেশুমার লোক থাকবে যারা সত্য কথা বলত, অন্যের হক নষ্ট করত না, জমি দখল করত না—তবুও তারা জাহান্নামে যাবে। কারণ তাদের জীবনের বুনিয়াদ দীনের উপর ছিল না।
জীবনের বুনিয়াদ
প্রতিটি জিনিসের কিছু বুনিয়াদ আছে। যেমন একটা ঘর—উপরে দরজা, জানালা, বাথরুম আছে, কিন্তু সবকিছু দাঁড়িয়ে আছে ভিতের উপর। সেই ভিত মাটির নিচে লুকানো থাকে। ভিত যদি নষ্ট হয়, তাহলে যত তলার বিল্ডিংই হোক, পড়ে যাবে।
আমাদের দেশে এমন ঘটনা আছে যে, সম্পূর্ণ বিল্ডিং ভেঙে পড়ে গেছে। সেই বিল্ডিংয়ের দরজা-জানালা খারাপ ছিল না, ফ্লোরও ভালো ছিল, কিন্তু ভিত দুর্বল হওয়ায় সব ভালো জিনিস টিকতে পারেনি।
জীবনেরও এমন ভিত আছে। দীনদারির ভিত আছে, দুনিয়াদারিরও ভিত আছে। ভিত যদি শুদ্ধ না হয়, তাহলে বাকি সবকিছু শুদ্ধ হবে না।
দুনিয়াদারির দুই বুনিয়াদ
১. **প্রত্যাশা** (Expectation)
২. **হিসাব** (Calculation)
দীনদারির দুই বুনিয়াদ
১. **তাওয়াক্কুল** (আল্লাহর উপর ভরসা)
২. **বরকত** (আল্লাহর পক্ষ থেকে অপ্রত্যাশিত কল্যাণ)
তাওয়াক্কুল ও প্রত্যাশা একসাথে চলতে পারে না। বরকত ও হিসাব একসাথে চলতে পারে না। তাওয়াক্কুল বাড়লে প্রত্যাশা কমবে, হিসাব বাড়লে বরকত কমবে।
প্রত্যাশার জীবন: দুনিয়াদারির প্রথম বুনিয়াদ
আল্লাহ তায়ালা এই পৃথিবীকে একটি নিয়মের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন। সূর্য নিয়মমতো উদিত হয়, অস্ত যায়। পূর্ণিমা-অমাবস্যা হয় নিয়ম অনুযায়ী। এই নিয়মের কারণেই বৈজ্ঞানিকরা নিয়ম আবিষ্কার করতে পারে এবং নামাজের সময়, সেহরির সময়ের ক্যালেন্ডার তৈরি করতে পারে।
দুনিয়াদারি জীবন এই নিয়মের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই নিয়মের বুনিয়াদে প্রত্যাশা করা—মানে ধারণা করা যে এটা হবে।
প্রত্যাশার উদাহরণ
**ডাক্তারের প্রত্যাশা:** একজন ডাক্তার রোগী দেখে বলে দেয় ৬ মাসের বেশি বাঁচবে না, বা কিছুদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যাবে। বেশিরভাগ সময় তার কথা ঠিক হয়। কারণ সে দুনিয়াবি নিয়ম জানে।
**ব্যবসায়ীর প্রত্যাশা:** আমের ব্যবসায়ী গাছ দেখেই আন্দাজ করতে পারে কত মণ আম হবে। তার অভিজ্ঞতা ও নিয়মের জ্ঞান আছে।
**কৃষকের প্রত্যাশা:** একজন কৃষক জমিতে ধান লাগালে সে আশা করে সাড়ে তিন মাস পরে ধান পাকবে। এটা প্রত্যাশা, নিয়মের ভিত্তিতে আশা করা।
কৃষিকাজ মানুষকে প্রত্যাশা শিখিয়েছে। বীজ মাটিতে দিলে তা মিশে যায়, কিন্তু কিছুদিন পরে অঙ্কুর বের হয়, তারপর গাছ হয়, শিষ আসে, পাকা ধান হয়। এই সবগুলো ধাপ ধাপে হয়।
প্রথমে মানুষ শিখল কাঁচা আম পাকে। পরে শিখল মুকুল থেকে আম হয়। আরও পরে শিখল শুধু আমগাছ দেখেই বোঝা যায় আম হবে। এভাবে প্রত্যাশা বাড়তে থাকে।
আজকাল বাজারে (যদিও শরিয়তে নাজায়েজ) মুকুল আসার আগেই শুধু পাতা দেখে আম বিক্রি হয়ে যায়। যে কিনছে সে পাতা খাবে না, পাকা আম বিক্রি করবে। এটা সবই প্রত্যাশার উপর।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা
গরিব বাবার ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। সে রাতে স্ত্রীর সাথে আলোচনা করে—পাশের জমিদারের মেয়ে তাদের ঘরে মানাবে কি না! তার ছেলে এখনো ডিগ্রি পায়নি, কিন্তু সে কল্পনা করছে জমিদারের সাথে হুক্কা খাবে, বেয়াই ডাকবে! এটাই প্রত্যাশা।
দুনিয়া চলে প্রত্যাশার উপর। মানুষ যত উন্নত হয়, তার প্রত্যাশা তত লম্বা হয়। উন্নত জাতির ৫০-৭০ বছরের পরিকল্পনা থাকে। তারা হিসাব করে ২০৬৬ সালে কত পেনশন লাগবে, অথচ এখন ২০০৬! যারা এভাবে দূরের হিসাব করে, তাদের বলা হয় উন্নত জাতি।
হিসাবের জীবন: দুনিয়াদারির দ্বিতীয় বুনিয়াদ
প্রত্যাশা করলে তার সাথে হিসাবও জড়িত হয়ে যায়। ধান পাব—কত মণ পাব? আম হবে—কতগুলো আম হবে, বিক্রি করলে কত লাভ হবে?
ব্যবসায়ী পেঁয়াজের দাম বাড়বে শুনলেই ব্যবসা করতে পারে না। তাকে হিসাব করতে হয়: কত পেঁয়াজ কিনবে, কত বাড়বে, বহন খরচ কত, কতগুলো পচবে, কর্মচারীদের বেতন—সব হিসাব করে তবেই বোঝা যায় লাভ হবে কি না।
প্রত্যাশা ও হিসাব—এই দুই মিলে দুনিয়াদারি জীবনের বুনিয়াদ।
তাওয়াক্কুলের জীবন: দীনদারির প্রথম বুনিয়াদ
আল্লাহ তায়ালা নবীদের পাঠিয়েছেন প্রত্যাশার মোকাবেলায় তাওয়াক্কুল শেখাতে।
হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনা
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম উর্বর শাম দেশে ছিলেন, যেখানে ভালো ফসল হয়, ফল পাওয়া যায়। মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠেছে উর্বর জমিতে, কারণ সেখানে খাদ্য, পানি, তুলা (কাপড়ের জন্য), গাছ (ঘরের জন্য)—সব পাওয়া যায়।
উর্বর জমি হলো সভ্যতার বুনিয়াদ, প্রত্যাশার কেন্দ্র। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা চান উম্মত গড়তে, ঈমান-আমলের ভিত্তিতে। এজন্য ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে প্রথম হুকুম (এখনো নামাজ-রোজার হুকুম আসেনি):
**"উর্বর শাম ছেড়ে অনুর্বর আরবে যাও, পরিবার নিয়ে।"**
উর্বর জমিতে তো সভ্যতা আপনা-আপনি গড়ে ওঠে, যেমন আগাছা। কিন্তু উম্মত গড়তে হয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে অনুর্বর আরবে নিয়ে গেলেন, আমলের বুনিয়াদে উম্মত গড়লেন। নামাজ কায়েম করালেন।
তারপর আল্লাহ হুকুম দিলেন: **"দোয়া করো, তোমার সন্তানদের যেন আল্লাহ ফল খাওয়ান।"**
يَرْزُقُهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ (তাদের ফলের রিজিক দাও)
শাম দেশে ফল পাওয়া যেত প্রত্যাশার লাইনে। আল্লাহ ফল দিতে চান, তবে আমলের লাইনে, প্রত্যাশার লাইনে নয়। এজন্য প্রত্যাশার লাইন থেকে সরালেন, আমলের লাইনে গড়লেন।
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম দোয়া করলেন। কেন? কারণ তাঁর মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল: **ফল উর্বর জমি থেকে আসে না, মানুষের প্রত্যাশা থেকেও আসে না। আল্লাহ দেন। আল্লাহর জন্য উর্বর জমির দরকার নেই।**
এভাবেই নবীরা মানুষকে প্রত্যাশার জীবন থেকে তাওয়াক্কুলের জীবনে আনতে এসেছেন।
হযরত মুসা (আ.)-এর লাঠি
আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করলেন: **"হে মুসা, তোমার ডান হাতে কী?"**
মুসা (আ.) উত্তর দিলেন:
**"عَصَايَ—আমার লাঠি। أَتَوَكَّأُ عَلَيْهَا—এর উপর আমি ভরসা করি। وَأَهُشُّ بِهَا عَلَى غَنَمِي—এর দিয়ে ছাগলের জন্য পাতা ঝাড়ি। আর এতে আরও অনেক উপকার আছে।"**
মানুষের বৈশিষ্ট্য: যার উপর ভরসা করে জীবন চলে, সেটাই তার ভরসা, জীবিকা, এবং আরও অনেক ফায়দার উৎস।
আল্লাহ বললেন: **"এই লাঠি ফেলে দাও।"**
লাঠি ফেলানো উদ্দেশ্য নয়, লাঠির সাথে জড়িত প্রত্যাশা ফেলানো উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে মুসা (আ.) লাঠি আবার হাতে নিলেন, কিন্তু লাঠির উপর ভরসা নেই—ভরসা আল্লাহর উপর। লাঠি দিয়ে জীবিকা নেই—আল্লাহই মান্না-সালওয়া খাওয়াচ্ছেন।
লাঠি দিয়ে ফেরাউনের সামনে সাপ হয়ে গেল (অপ্রত্যাশিত), সমুদ্রে রাস্তা হলো (অপ্রত্যাশিত), পাথর থেকে পানি বের হলো (অপ্রত্যাশিত)। সব ফায়দা পেয়েছেন, কিন্তু প্রত্যাশিত ফায়দা একটাও নয়।
**সব নবীর একই শিক্ষা:** তোমার ভরসা যার উপর, তা ছাড়ো। প্রত্যাশিত জীবন ছাড়ো। আল্লাহর উপর ভরসা করো, আল্লাহর কাছ থেকে আশা করো।
বরকতের জীবন: দীনদারির দ্বিতীয় বুনিয়াদ
হিসাব ও বরকত একসাথে চলে না। আগুন-পানি যেমন মিশে না, তেমনি হিসাব ও বরকত মিশে না।
রাসুল (সা.)-এর জীবন থেকে উদাহরণ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ছিল বরকতের উপর, হিসাবের উপর নয়।
**আবু হুরাইরা (রা.)-এর ঘটনা:**
আবু হুরাইরা (রা.) খুব ভুখা ছিলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। বাড়িতে ছিল এক বাটি দুধ। আবু হুরাইরা (রা.) খুশি হলেন যে তাঁকে দুধ খাওয়াবেন।
কিন্তু রাসুল (সা.) বললেন: **"আসহাবে সুফফাকে (সত্তরজন) ডেকে নিয়ে এসো।"**
আবু হুরাইরা (রা.) রওনা হলেন, কিন্তু মনে মনে হিসাব করছেন: ১ বাটি দুধ, ৭০ জন মানুষ। ৭০ দিয়ে ভাগ করলে ১ জনের ভাগে ১ চামচও পড়বে কি না! আর তাঁকেই তো খাওয়াতে হবে, তাহলে তাঁর ভাগে তো কিছুই থাকবে না।
এই সব চিন্তা তাঁর মনে এলো। এটাই দুনিয়ার প্রভাব—বিনা প্রয়োজনেও মানুষ হিসাব করে ফেলে।
তিনি সবাইকে ডেকে আনলেন। রাসুল (সা.) তাঁর হাতে বাটি দিয়ে বললেন: **"মেহমানদের খাওয়াও।"**
তিনি খাওয়াতে লাগলেন। সব মেহমান খেলো, তবুও কিছু দুধ বাকি রইল! এটা তাঁর প্রত্যাশার বাইরে।
এবার রাসুল (সা.)-এর কাছে বাটি আনলেন। রাসুল (সা.) বাটির দিকে তাকালেন, তাঁর দিকে তাকালেন, আর একটু মুচকি হাসলেন।
এই হাসির অর্থ গভীর। রাসুল (সা.) তাঁকে অঙ্ক শেখাচ্ছেন: **"১ বাটিকে ৭০ দিয়ে ভাগ করলে কত হয়, একটু ভালো করে বুঝে নাও।"**
তারপর রাসুল (সা.) বললেন: **"এখন তো শুধু তুমি আর আমি। খাও।"**
তিনি খেলেন। কিছু এখনও বাকি। আবার ফিরিয়ে দিলেন। রাসুল (সা.) বললেন: **"আরও খাও।"**
দুই-তিনবার এভাবে চললো। শেষে আবু হুরাইরা (রা.) বললেন: **"ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আর পারছি না।"**
বাকিটুকু রাসুল (সা.) খেয়ে নিলেন।
**এই ঘটনার শিক্ষা:** রাসুল (সা.) শুধু নিজের বা আবু হুরাইরা (রা.)-এর জন্য নয়, কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষের জন্য শিক্ষা দিচ্ছেন -হিসাবের জীবন থেকে বরকতের জীবনের দিকে ডাকা হচ্ছে।
আর প্রথমে যে কথা বলছিলাম যে, হিসাব এবং বরকত—এই দুই কথা একসাথে চলে না। আগুন-পানি যেমন মেশে না, তেমনি হিসাব ও বরকতও মেশে না, তাওয়াক্কুল আর প্রত্যাশাও মেশে না।
তাওয়াক্কুলের জীবন যদি হয়, তো পরিকল্পনার জীবন নয়। পরিকল্পনার জীবন যদি হয়, তাহলে তাওয়াক্কুলের জীবন নয়। হিসাবের জীবন যদি হয়, তাহলে বরকতের জীবন নয়। বরকতের যদি হয়, তাহলে হিসাবের নয়।
নবীদের শিক্ষা
আল্লাহ তায়ালা নবীদের পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষকে তাওয়াক্কুল এবং বরকতের জীবনের দিকে ডাকার জন্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পূর্ণ জীবনই বিভিন্নভাবে, অন্যান্য শিক্ষার মধ্য দিয়ে, এই তাওয়াক্কুল এবং বরকত—এই দুটো বিশেষভাবে শেখানো হতো। আরও অনেক কথা আছে, কিন্তু এগুলো বড় মৌলিক কথা, যেগুলোর তালিম দেওয়া হয়েছে।
মুসা আলাইহিস সালামের লাঠির ঘটনা
এটা শুধু আমাদের নবীর শিক্ষা নয়, সকল নবীরই শিক্ষা। মুসা আলাইহিস সালামের সাথে আল্লাহ তায়ালা প্রথম কথা জিজ্ঞেস করলেন, "হে মুসা, তোমার ডান হাতে কী?" মুসা আলাইহিস সালাম উত্তর দিলেন:
**عَصَايَ** (আসায়া) - আমার লাঠি
**أَتَوَكَّأُ عَلَيْهَا** (আতাওয়াক্কাউ আলাইহা) - তার উপর আমি হেলান দিই, অর্থাৎ তার উপর আমি ভরসা করি
**وَأَهُشُّ بِهَا عَلَى غَنَمِي** (ওয়া আহুশশু বিহা আলা গানামি) - এর দ্বারা আমি পাতা সরাই, এর দ্বারা আমি ছাগলের জন্য পাতা ঝাড়ি, অর্থাৎ এর মধ্যে আমার জীবিকা
এবং এছাড়া আরও উপকার আছে।
মানবজীবনের বৈশিষ্ট্য হলো, যার উপর ভরসা করে তার জীবন চলে, ওটা তার ভরসা হয়, ওটা তার জীবিকা হয়, আর ওটার মধ্যে এছাড়া আরও অনির্দিষ্ট ধরনের ফায়দা থাকে। যেমন, এই যে দোকান দেখছেন—এটা দিয়ে আমার জীবন চলে, সংসার চলে। এছাড়াও আরও ফায়দা হলো, সমাজ আমাকে এই দোকানের মাধ্যমে চেনে, লোকজন আমাকে এই দোকানের কারণে ব্যবসায়ী হিসেবে চেনে।
এটা আমার চাকরি, এর পেছনে আমার পরিবার চলে। প্রথম হলো আমার ভরসা, এটা আমার জীবিকা, আর এছাড়া এর মধ্যে আরও অনেক উপকার আছে—চাকরি দিয়ে আমার পরিচয়, মান-সম্মান ইত্যাদি।
মুসা আলাইহিস সালামও এই তিন কথাই একসাথে বলে দিলেন। এটার উপর আমার ভরসা, এটার উপর আমার জীবিকা, আর এছাড়া আরও অনেক ফায়দা এর মধ্যে আছে।
লাঠি ফেলার নির্দেশ
আল্লাহ তায়ালা বললেন, "এই লাঠি ফেলে দাও।" লাঠি ফেলানো উদ্দেশ্য নয়, লাঠির সাথে জড়িত যে প্রত্যাশা, ওটাকে ফেলানো। কারণ, পরবর্তী জীবনে মুসা আলাইহিস সালামকে নিয়ে আরও অনেক ঘটনা আছে। ফেরাউনের কাছে গেলেন, সমুদ্র অতিক্রম করলেন—এই সব ঘটনায় পাওয়া যায় যে, মুসা আলাইহিস সালামের হাতে লাঠি ছিল।
আল্লাহ তায়ালা যদি লাঠিকে ফেলার হুকুম দিতেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে লাঠি থাকার কথা নয়। তো আল্লাহ তায়ালা লাঠিকে ফেলিয়েছেন লাঠিকে ফেলার জন্য নয়; লাঠি আবার হাতে নিয়ে নিয়েছেন, লাঠির সাথে জড়িত যে প্রত্যাশা ছিল ওটা ফেলে দিয়েছেন।
পরবর্তীকালে লাঠি হাতে ছিল, কিন্তু লাঠির প্রত্যাশিত কোনো ফায়দা ছিল না। লাঠি দ্বারা পরবর্তী সময়ে ফেরাউনের কাছে গিয়েও ফায়দা পেয়েছেন—অপ্রত্যাশিত ফায়দা, সাপ হয়ে অন্যান্য সাপ খেয়ে ফেলল। সমুদ্রে গেলেন, আরেক অপ্রত্যাশিত ফায়দা—লাঠির দ্বারা রাস্তা বের হলো, অতিক্রম করে মরুভূমিতে চলে গেলেন। ওখানে পানির অভাব, আবার আরেক অপ্রত্যাশিত ফায়দা—তখন পাথর থেকে পানি বের হলো।
তো লাঠিকে ব্যবহার করেছেন বিভিন্নভাবে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফায়দা একটাও নয়। মুসা আলাইহিস সালাম যেমন বলেছিলেন যে, এটার উপর আমার ভরসা আর এটা দিয়েই আমার জীবিকা—পরবর্তীকালে লাঠি হাতে আছে ঠিকই, কিন্তু লাঠির উপর ভরসা মোটেই নয়, ভরসা আল্লাহর উপর। আর লাঠি দিয়ে জীবিকাও নয়, আল্লাহ তায়ালা অন্যান্য মান্না-সালওয়া খাওয়াচ্ছেন। এবং অন্যান্য ফায়দাও আছে।
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের শিক্ষা
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের উপর যেমন আল্লাহ তায়ালার প্রথম আদেশ ছিল যে, "তোমার ভরসার দেশকে ছাড়ো, উর্বর জমি ত্যাগ করো," মুসা আলাইহিস সালামের উপরও ওই একই কথা যে, "তোমার ভরসা যে লাঠির উপর, ওটাকে ছাড়ো।"
সব নবীদেরকে আল্লাহ তায়ালা পাঠিয়েছেন দুনিয়ার মানুষকে তাদের ভরসা যেটার উপর, যা কিছু সে করছে, ওখান থেকে তাকে সরানোর জন্য আর তাজদের প্রত্যাশিত জীবন থেকেও তাদের সরানোর জন্য। বরং আল্লাহর উপর ভরসা করা শেখানোর জন্য—আর এটাকে তাওয়াক্কুল বলে। আর আল্লাহর কাছে আশা করা শেখানোর জন্য।
তাকওয়া ও রিজিকের সম্পর্ক
আল্লাহ তায়ালা হেদায়েতের সাথে দীনকে জড়িত করেছেন, আর হেদায়েত আসে তাকওয়া থেকে। আর তাকওয়া সম্পর্কে বলেছেন:
**وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ**
"যে মুত্তাকি হয়, আল্লাহ তায়ালা তাকে পথ দেখান বিপদ থেকে বের হওয়ার, আর এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যেখান থেকে সে প্রত্যাশা করে না।"
ইহতেসাব মানে প্রত্যাশা করা, ধারণা করা যে এখান থেকে আসবে। তো আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকিদের রিজিক দেন এমন জায়গা থেকে যেখান থেকে সে ধারণা করে না।
ঈমানি জীবনের মূল ভিত্তি
আল্লাহ তায়ালা পুরো দুনিয়ার মানুষকে ঈমানি জীবনের দিকে ডাকছেন। আর ঈমানি জীবনের মূল ভিত্তিই হলো দুনিয়াবি কোনো নিয়মের ভিত্তির উপর কোনো কিছু আশা না করা, কিছু প্রত্যাশা না করা। বরং আল্লাহর কাছ থেকে আশা করা—এটাকে বলে তাওয়াক্কুল।
আল্লাহ তায়ালা নবীদেরকে পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষকে তাওয়াক্কুল এবং বরকতের জীবনের দিকে ডাকার জন্য।
প্রত্যাশা বনাম তাওয়াক্কুল
প্রত্যাশার জীবনের উপর যখন মানুষের জীবন হয়, তো প্রত্যাশার জীবনের ভিত্তি হলো যে সে দুনিয়াবি মেহনত করে:
- **কৃষক** প্রত্যাশা করে ফসল পাবে, তো জমির উপর মেহনত করে
- **ছাত্র** প্রত্যাশা করে চাকরি পাবে, তো ডিগ্রির জন্য মেহনত করে
- **ব্যবসায়ী** প্রত্যাশা করে লাভ হবে, তো ব্যবসার উপর মেহনত করে
আর এর বিপরীতে যে তাওয়াক্কুল করে, সে মেহনত করে না; সে আল্লাহর ইবাদত করে, আল্লাহর হুকুম আদায় করে। যেমন কৃষক মনে করে যে জমির উপর মেহনত করলেই তো ফসল পাব, তেমনি তাওয়াক্কুলওয়ালা মনে করে যে আল্লাহকে রাজি করলেই তো আল্লাহ তায়ালা রিজিক দেবেন। এটাকে আমল বলে।
প্রত্যাশার ভিত্তি থেকে জন্ম নেয় কাজের জীবনের, শ্রমের জীবনের। যেমন মানুষ বলে যে, "কাজ করি, ব্যবসা করি, কৃষিকাজ করি, কাজ করে খাই"—দুনিয়ার মানুষ বলে। এর বিপরীতে ঈমানওয়ালা—সে আল্লাহর উপর ভরসা করে আর আল্লাহর কাছ থেকে নেয়।
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের উদাহরণ
ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তায়ালা ফল খাওয়াচ্ছেন ঠিকই, প্রত্যাশার ভিত্তির উপর মেহনত করে নয়, বরং তাওয়াক্কুলের ভিত্তির উপর দোয়া করে।
- এক হলো প্রত্যাশা করে মেহনত করা
- আরেক হলো তাওয়াক্কুল করে দোয়া করা
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ডাকছেন যে, আমরা যেন তাওয়াক্কুলের ভিত্তির উপর দোয়া করা শিখি। এটাই দীন, দীনি জীবনের ভিত্তি।
প্রকৃত দীনদারি কী?
প্রথমেই বলছিলাম যে, আমরা মনে করি চুরি করলাম না, ডাকাতি করলাম না, অন্যায় কাজ করলাম না, জুলুম করলাম না—দীনদার হয়ে গেলাম। না, দীনদার হয়নি। বেদীনির অনেকগুলো কাজ সে করে না।
একজন বেদীন হলেই সব বেদীনি সে করতে হবে তা তো আর নয়। চুরি করলেই ডাকাতি করতে হবে, ডাকাতি করলেই মদ খেতে হবে, মদ খেলেই চুরি করতে হবে—তা তো আর নয়। বিভিন্ন অবস্থা আছে। একজন মানুষ বেদীন বলে যে সে চুরিও করবে, মিথ্যাও বলবে, অন্যের সম্পত্তি ছিনতাইও করবে, দখল করবে—তা তো আর নয়।
এই অন্যায় কাজগুলো না-করা তাকে তার বেদীন না-হওয়াও প্রমাণ করে না, দীনদার হওয়াও প্রমাণ করে না। বরং এটুকু বলা যায় যে, অনেকগুলো বেদীনি খারাপ কাজ সে করে না।
দীনদার মানুষ কখন হবে?
যখন সে তার সম্পূর্ণ জীবনকে তাওয়াক্কুলের ভিত্তির উপর আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আনবে। আল্লাহর উপর ভরসা করে আল্লাহর হুকুম মানার জীবন—এটাই হচ্ছে দীনদারি জীবনের ভিত্তি। আর তার জীবন চলবে হিসাবের উপর নয়, বরং আল্লাহর কাছ থেকে বরকতের উপর।
আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবানি করে আমাদেরকে দীন দিয়েছেন। আল্লাহর পথে বের হয়ে আমরা:
- হিসাবের জীবন থেকে → তাওয়াক্কুলের জীবনের দিকে
- প্রত্যাশার জীবন থেকে → তাওয়াক্কুলের জীবনের দিকে
- পরিকল্পনার জীবন থেকে → তাওয়াক্কুলের জীবনের দিকে
- হিসাবের জীবন থেকে → বরকতের জীবনের দিকে
যখন কেউ তাওয়াক্কুল এবং বরকতের জীবনের দিকে আসবে, তার সাথে সম্পূর্ণ শরীয়ত আছে—ফরজ-ওয়াজিব পালন করা, হারাম-মাকরুহ ত্যাগ করা ইত্যাদি সব দীনদারি আসবে। কিন্তু এই ভিত্তির উপর যে, আল্লাহর উপর ভরসা করে আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়ার আশা করা।
নতুন ভিত্তিতে জীবন গড়া
আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানি করে আমাদেরকে দীন দিয়েছেন আমাদের জীবনকে সম্পূর্ণ নতুন ভিত্তির উপর গড়ার জন্য। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম উর্বর দেশে ছিলেন, একটা পরিবার ছিল, একটা ধরন ছিল—মরুভূমিতে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ভিত্তির উপর জীবনকে গড়লেন।
**ঈমানি জীবন হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ভিত্তির উপর নিজের জীবনকে আবার নতুন করে গড়া।**
আর সেই নতুন ভিত্তি কী? প্রধানত **তাওয়াক্কুল** এবং **বরকত**।
এছাড়া আরও অনেকগুলো জিনিস আছে, তো সব আলোচনা একসাথে হয়ে যাবে না। কিন্তু এই দুটো বড় গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যদি আমরা আমাদের জীবনকে তাওয়াক্কুলের উপর এবং বরকতের উপর আনতে পারি, ইনশাআল্লাহ তায়ালা সম্পূর্ণ জীবন দীনদারির দিকে আনা সহজ হয়ে যাবে।
আল্লাহর পথে বের হওয়া
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক নসিব করুক। এজন্য আমরা সবাই নিয়ত করি যে, বেশি থেকে বেশি সময় নিয়ে আল্লাহর পথে বের হব, ওই প্রত্যাশা ছাড়ার জন্য আর তাওয়াক্কুল শেখার জন্য।
প্রত্যাশার বাধা
যখনই বলা হয় যে তিন চিল্লায় চলে যাও, বলে যে এখন পারছি না। খোঁজ করে দেখা যাবে ওর কিছু প্রত্যাশার জগতে কিছু বাধা আছে, সেই বাধাগুলো তাকে যেতে দিচ্ছে না:
- ধান পাকছে, এখন ধান কাটতে হবে—তার একটা প্রত্যাশা আছে, ধান কাটলে লাভ হবে। এখন যদি তিন চিল্লায় চলে যাই, তো ধান নষ্ট হবে।
- এখনই আমার প্রমোশনের সময়। এখনই যদি তিন চিল্লায় চলে যাই, তাহলে ঊর্ধ্বতনের কাছে বদনাম হয়ে যাবে আর প্রমোশন হবে না। আর যদি আমি না যাই আর খুব কাজ দেখাতে পারি, তাহলে হয়তো প্রমোশন হবে।
তো ওর পেছনে দেখা যাবে যে বলছে নানান অসুবিধা, ভেতর থেকে তার কিছু পরিকল্পনা আছে, সেই পরিকল্পনাগুলো তাকে পেছন থেকে টানছে। যদি আমি তাওয়াক্কুলের উপর আসতে পারি, তো পাকা ধানও বাধা দেবে না আর প্রমোশনের সম্ভাবনাও বাধা দেবে না। দেয় তো আল্লাহ তায়ালা।
হিসাবের বাধা
আর ওইরকম বরকতের একটা ব্যাপার আছে। সময় আছে, বিদেশ সফরে চলে যাও। ঘুরে-ফিরে বলবে যে এখন তো পারছি না। পরিষ্কার খুলে বলছে না, "পারছি না"-র ব্যাখ্যা হলো অত টাকা আমার হাতে নেই।
খোঁজ করলে দেখা যাবে যে, সরাসরি যদি ক্যাশ নাও থাকে, ওর কাছে যেসব জিনিসপত্র আছে, যেগুলো দৈনন্দিন ব্যবহারের অতিরিক্ত, সেই জিনিসগুলো যদি বিক্রি করে দেয়, তাহলে এই এক সফর কেন, কয়েক সফর হতে পারে। বিক্রি করে দাও—তো সেটাও বিক্রি করতে পারবে না। কেন? যে তার একটা হিসাব আছে—কত টাকা দিয়ে কিনেছি, কত টাকায় বিক্রি করে দাম পাব, হিসাব মিলে না।
বরকতের উপর জীবন আনলে ওর টাকাও আছে। যদি তাওয়াক্কুলের উপর আসে, তো পেছন থেকে তার পরিকল্পনা বাধা দেবে না। আর যদি বরকতের উপর আসে, তো পেছন থেকে হিসাব বাধা দেবে না।
নিয়ত করা
এজন্য আমরা আল্লাহর পথে বের হই যাতে আমি তাওয়াক্কুলের উপর আসতে পারি আর বরকতের উপর জীবনকে গড়তে পারি। এজন্য আমরা সবাই নিয়ত করি ইনশাআল্লাহ যে:
- নিজেও যাব
- আমার আপনজনকেও পাঠাব
মাসতুরাতের যদি সুবিধা থাকে তো সেই সুবিধামতো নিজেও গেলাম, সবসময় এরকম সুবিধা তো থাকেও না, কখনো থাকে কখনো থাকে না; তো নিয়ত তো সবসময় রাখতে পারি। আর এ ছাড়া যখন সুবিধা হলো নিজেই গেলাম, সুবিধা হলো না পাঠালাম, আমার বাপ, আমার স্বামী, আমার ছেলে, আমার ভাই ইত্যাদি তাদেরকে আমি পাঠালাম।
দুনিয়ার সব কাজই মিলে চলে। একজন বাজার করে, আরেকজন রান্না করে, সবাই মিলে খায়। দ্বীনও সেরকম, এক অংশ একজন করবে, আরেক অংশ আরেকজন করবে। গোটা পরিবারের মধ্যে দ্বীন আসবে। কেউ ঘরের আমল করবে, জিকির-তেলাওয়াত-তসবিহাত, সাদাসিধা জীবন, মেহমানদারি, আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো সম্পর্ক, ঘরে না থাকা অবস্থায় মেহমানদারি করবে, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর করবে, অভাবের সময় পেরেশানির সময় একই কাজগুলো ঘরে করবে, বাইরে যে যাবে সে বাইরে গাশত করবে, তালিম করবে, দুইয়ে মিলে একটা দ্বীনদারির জীবন আসবে। ঘরের মধ্যে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক, ভালো জিকির-তেলাওয়াত-তসবিহাত আছে, তো বাইরের মেহনত যদি না থাকে তাহলে এক অংশ হলো, আরেক অংশ হলো না। বাইরের মেহনত ভালো আছে, ভেতরের মেহনত যদি না থাকে তাহলেও এক অংশ হলো, আরেক অংশ হলো না। তো শুধু যেরকম মাছবাজার থেকে উত্তম মাছ আনলেই খাওয়া যাবে না, কাঁচা মাছ কেউ খায় না, রান্না করে খেতে হবে; আর যদি মাছবাজার থেকে আনেই না, তো বাতাস রান্না করবে না কি। তো কাঁচা মাছ আনতেও হবে, আবার রান্নাও করতে হবে; তবেই-না খাওয়ার উপযোগী হবে। তো ওইরকম বাইরেরও মেহনত আছে, ভেতরেরও মেহনত আছে। দুনিয়াবি জগতে যেরকম বাইরের মেহনত ভেতরের মেহনত মিলে দ্বীন, দ্বীনি জিন্দেগির ভেতরেও বাইরের ভেতরের মিলে দ্বীন। এর জন্যে বাইরের মেহনত কখনো করব কখনো করাব, ভেতরের মেহনতও কখনো করব কখনো করাব। দুটো মিলে হবে, এর জন্যে বেশি থেকে বেশি লম্বা থেকে লম্বা নিয়ত করি ইনশাআল্লাহ, যাওয়ারও নিয়ত করি, পাঠাবারও নিয়ত করি। দেশে-বিদেশে সফরের নিয়ত করি। চিল্লা, তিন চিল্লার নিয়ত করি, যাদের আগে তিন চিল্লা হয়ে গেছে, প্রত্যেক বছর তিন চিল্লার নিয়ত করি। আর মজবুতির সাথে মোকামি কাজেরও নিয়ত করি। তো পুরুষের জন্যে যেরকম মোকামি কাজ হচ্ছে কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা দেওয়া, মাসে তিন দিন দেওয়া, তো ওরকম ভেতরে ঘরের মধ্যে যারা আছেন, তাদের জন্যে মোকামি কাজ হচ্ছে জিকির, তেলাওয়াত, তসবিহাত, সাদাসিধা জীবন, সুন্নতের পাবন্দিএসব মিলেই পরিপূর্ণভাবে মোকামি কাজ। তো আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে পুরা দ্বীনের ওপর চলার তাওফিক নসিব করুক। এখন দোয়ার পর আমরা কবে যাব, বা কে কত দিনের জন্যে পাঠাব, লিস্ট করে পাঠাই।
لاَ إِلَهَ إلَّا اللهُ، الْحَلِيْمُ الْكَرِيْمُ، سُبْحَانَ اللهِ رَبِّ الْعَرْشِ الْعَظِيْمِ، الْحَمْدُ للهِ رِبِّ الْعَالَمِيْنَ، نَسْأَلُكَ مُوْجِبَاتِ رَحْمَتِكَ، وَعزَائِمَ مَغْفِرَتِكَ وَالْغَنِيْمَةَ مِنْ كُلِّ بِرٍّ وَالسَّلَامَةَ مِنْ كُلِّ اِثْمٍ، لَا تَدَعْ لَنَا ذَنْبًا إلاَّ غَفَرْتَهُ، وَلَا دَيْنًا إلاَّ قَضَيْتَهُ، وَلَا مَرْضًا إِلاَّ شَفَيْتَهُ، وَلَا ضَالًّا إِلَّا هَدَيْتَهُ وَلَا حَاجَةً هِيَ لَكَ رِضًا إلَّا قَضَيْتَهَا يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ.
سُبْحَانَ الله وَبِحَمْدِهِ ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ نَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ ، نَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوبُ إِلَيْكَ. سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عمَّا يَصِفُوْنَ، وَسَلاَمٌ عَلَى الْمُرْسَلِيْنَ، وَالْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، آمِيْن.
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দ্বীন ও দুনিয়া
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] দুনিয়ার সব মানুষের কাজকর্ম ও চেষ্টা-পরিশ্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
২৩৩০
নফি ও ইসবাত: দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
২৩৫৬
দাওয়াতের প্রাণ মুহাব্বত
আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে ইখলাসের হুকুম দিয়েছেন। ইবাদতের মধ্যে যেমন ইখলাস দিয়েই তার মূল্য। পরিমাণে খুবই...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৫১২